প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ৪ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
153

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৪
#লেখনিতে খুশবু আকতার

“জুঁই কোথায় গিয়েছিলি তুই?”

কলেজ থেকে ফেরার পথে জুঁইয়ের সখী রুমির সাথে দেখা হয়েছিল।বাকি পথটা ওর সাথেই গল্প করতে করতে এসেছে।সে সখীর সাথে গল্প করতে করতে উঠোন পেড়োতেই জামশেদের গম্ভীর গলার স্বর ভেসে এলো ওর কানে।থেমে গিয়ে শান্ত কণ্ঠে জবাবে বলল,

“কলেজের সংস্কার কাজ কতদূর এগোলো সেটা দেখতে গিয়েছিলাম।”

“এসব ব্যাপারে তোকে এত মাতব্বরি করতে কে বলেছে?কার অনুমতি নিয়ে গেছিলে তুই?”

“আব্বা আমাকে অনুমতি দিয়েছে।মাতব্বরি করতেও আব্বাই বলেছে।আর তাছাড়া সকালে যাওয়ার আগে আম্মাকে বলে গিয়েছে আমি।আব্বা ছিল না জন্য বলতে পারিনি।”

জুঁই কথাটা বলতেই জামশেদ হাঁক ছেড়ে জলিল তালুকদার কে ডাকল।ছেলের ডাক শুনতেই জলিল তালুকদার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মৃদু রাগান্বিত স্বরে বলল,

“বাড়ির উঠোনে এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন?”

“আপনি আর কোন উপায় রেখেছেন?মেয়েকে এভাবে মাথায় তুলছেন কেন?একজনকে মাথায় তুলে কি অবস্থা করলো সেটা দেখেননি?এরপরও ওর পড়াশোনা বন্ধ করার ব্যবস্থা করছেন না কেন আপনি?দু’চারটা অক্ষর শিখলেই এদের পাখনা গজায়।”

জুঁই শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় জামশেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইজান দয়া করে কোন অপমানজনক কথা বলবেন না।ভুলে যাবেন না সম্পর্কে আমি আপনার ছোট বোন হই।এমন কোন কথা বলবেন না যেন আমি আপনাকে বড় ভাইয়ের মর্যাদাটা না দিতে পারি।”

জুঁই কথাটা বলতেই জামশেদ জুঁইয়ের দিকে তেড়ে এসে হুংকার ছেড়ে বলল,

“একটা চ/ড় মে/রে তোর দাঁত ভেঙে দেবো বেয়াদব মেয়ে।আমার সাথে মুখে মুখে তর্ক করছিস।একদম ঠ্যাং ভে/ঙে বাড়িতে বসিয়ে রাখবো।তারপর দেখব তোর এসব বড় বড় বুলি কোথা থেকে বের হয়।”

জুঁই এবার জলিল তালুকদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আব্বা আপনার সামনে আমার সাথে বড় ভাইজান এভাবে কথা বলছে আপনি কিছু বলবেন না?আপনার কি কিছুই বলার নেই?”

জামশেদ জলিল তালুকদারের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নিজেই বলে উঠলো,

“আব্বাকে কি নালিশ করছিস?আর তোর চোখে কিসের এত তেজ?মেয়ে মানুষ হয়েছিস যখন তখন তেজ কমা।আমার সামনে এসব তেজ দেখাবি না একদম জুঁই।আর আব্বা আপনাকে বলছি,কলেজের সংস্কার কাজের তদারকি ও কেন করছে?ও মেয়ে মানুষ হয়ে পুরুষ মানুষদের সাথে এত অবাধ মেলামেশা চালাচ্ছে কেন?ও কি নিজেকে পুরুষদের সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে নাকি?”
“চুপ করো জামশেদ।জুঁইকে আমি যেতে বলেছি বলেছি।আর তাছাড়াও জুঁই একা না সুজন আর বড় জামাই গিয়েছিল ওর সাথে।সবটা দেখাশোনা তো সুজনই করছে,জুঁই এর ইচ্ছে হয়েছিলে যাওয়ার গিয়েছে।”
“কে ওর সাথে গিয়েছিল সেটা বড় কথা না আব্বা।আমার একটাই কথা আপনি ওর এত ওড়াউড়ি বন্ধ করুন।এরপর কিন্তু হাত থেকে বেরিয়ে গেলে আর ধরতে পারবেন না।আর আপনি না পারলে আমায় বলুন মেয়ে মানুষের তেজ কি করে কমাতে হয় সেটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।”

“তোমারও তো কম তেজ দেখছি না জামশেদ।এত তেজ না দেখিয়ে বোনকে ভালোবেসে বললেই তো তোমার কথা শুনে নিতো।”

নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার জন্য মতিউরের বাড়ির ভেতরে আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।এসে এমন কথাবার্তা শুনে সে বেশ বিরক্ত হলো।যদিও সে প্রথমে ওদের এসব পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলাতে চায়নি,যেহেতু সে নতুন জামাই।কিন্তু শেষে আর চুপ করে থাকতে পারলো না।বরাবরই তার অন্যায় কিছু হতে দেখলে প্রতিবাদ করার জন্য জিভটা নিষপিস করতে থাকে।এদিকে মতিউরকে দেখে জামশেদ বোধ হয় একটু শান্ত হলো।পূর্বের থেকে কণ্ঠটা একটু শান্ত করে বলল,

“মেয়ে মানুষকে অত ভালোবাসা দেখাতে নেই মতিউর।ওদের সাথে একটু নরম করে কথা বললে দেখবে ওরা তোমার মাথায় উঠে নাচা শুরু করবে।তাই সব সময় কড়া শাসনের উপর রাখবে যেন বেশি তেরিবেরি না করতে পারে।”

মতিউর স্মিত হেসে বলল,

“তাহলে তো বলতে হচ্ছে তুমি কখনো ভালোবেসে দেখোই নি।মেয়ে মানুষ ভীষণ কোমল।মেয়েরা হয় পুষ্প প্রেমী।আর যারা পুষ্প প্রেমী তারা কখনো কঠোরতায় জীবিত থাকতে পারে না।কঠোর কথাতে তাদের কোমল মনটা ধীরে ধীরে ম/রে যায়।তাদের একটু ভালোবেসে দেখো তারা তোমায় নিজেদের মনের সিংহাসনে রাজা বানিয়ে রাখবে।আর যদি দুর্ব্যবহার করো তবে হয়ত তোমার কথায় উঠবে বসবে তবে তুমি তাদের মন থেকে সে সম্মানটা কখনো অর্জন করতে পারবে না।”

মতিউরের কথায় জুঁই মুগ্ধ হলো।মানুষটা চমৎকার করে কথা বলে।সাথে আফসোস হলো এটা ভেবে যে যদি তার দুই ভাইয়ের ধারণাও এমন হতো।জুঁই মতিউরকে বাহবা দিয়ে বলল,

“একদম ঠিক বলেছেন দুলাভাই।তবে কি বলুন তো আমাদের সমাজে পুষ্প প্রেমীদের কদর খুব কম মানুষই করতে পারে।আপনার মতন খাঁটি সোনা পাওয়া যে বিরল।না হলে সমাজটা তো কিছু মানুষের অমানবিকতায় ভরে উঠেছে।”

জুঁইয়ের খোঁচা মা/রা কথায় জামশেদ এবারে জুঁইকে মা/রার উদ্দেশ্য ওর দিকে তেড়ে এলো।জুঁইও ভেবেছিল আজ হয়তো একটা চ/ড় খাবেই।ভয়ে খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিল।তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এতক্ষণেও জুঁই কোন ব্যথা অনুভব করলো না।চ/ড় মা/রলে তো গালটা ব্যথা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো ওর সামনে ওকে রক্ষা করার জন্য একজন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাইরে এত চেঁচামেচির আওয়াজে সবেমাত্র জবা ঘর থেকে বেরিয়ে ছিল।জামশেদকে এভাবে জুঁইয়ের দিকে তেড়ে আসতে দেখে আর্তনাদ করে উঠেছিল।তবে মতিউর যখন জুঁইকে আড়াল করে দাঁড়ালো তখন জবা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।এদিকে মতিউরের ঠোঁট জুড়ে তখনও লেপ্টে আছে হাসি।জুঁইকে চ/ড় মা/রার উদ্দেশ্যে জামশেদ যে হাতটা তুলেছিল মতিউর সযত্নে সে হাতটা ধরে অন্য হাত ওর কাঁধের উপর রেখে হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

“এত মাথা গরম করলে চলে বলোতো জামশেদ?একটু আগেই তো বললাম পুষ্প প্রেমীদের প্রতি এত কাঠিন্যতা দেখাতে নেই।ও ছোট মানুষ ভুল করতেই পারে তাই বলে এইভাবে মা/রাটা তো উচিত না,তাই না?”

জামশেদ খুব কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

“তুমি এসবের মাঝে থেকো না মতিউর।ওর সাহস বড্ড বেড়েছে।”

“ধুর বাদ দাও তো।এখন এসব কথা থাক।তবে তোমাকে দেখার পর একটা কথা মনে হলো আসার সময় আমার সঙ্গে করে দু চারজন লাঠিয়াল আনা উচিত ছিল।কেননা তোমার যে মাথা গরম দেখছি তাতে যে কোন সময় যার তার সাথে ঝামেলা বেঁধে যেতে পারে।বলা তো যায় না কখন আবার আমাদের মতের অমিল হলো আর তুমি আমাকেও মা/রতে আসলে।নিজের আত্মরক্ষার জন্য তো তখন কয়েকজন লোক লাগবে।ওরা থাকলে আবার আমার ধারের কাছেও কারো আসার সাহস হবে না।”

জামশেদ ঠিক বুঝতে পারল না যে মতিউর ওকে ঠান্ডা গলায় হুমকি দিল কিনা।কি বোঝাতে চাইলো যে ও বেশি বাড়াবাড়ি করলে মতিউর ওকে নিজের ক্ষমতা দেখাতে বাধ্য হবে।তবে কিছু বলতে পারল না।একেই তো মতিউর এই বাড়ির জামাই,যদি ওর অসম্মান হয় তাহলে জলিল তালুকদারও চটে যাবেন।তার উপরে আবার মতিউরের ক্ষমতা তাদের থেকে অনেক বেশি।বাধ্য হয়ে সেখান থেকে চলে গেল।জামশেদ চলে যেতেই মতিউর জলিল তালুকদারকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আব্বা আপনি থাকতে আপনার মেয়েকে এভাবে অপমান করল আর আপনি কিছু বললেন না?মেয়েকে তো স্বাধীনতা আপনি দিয়েছেন।তাহলে অন্য কেউ তার থেকে সে স্বাধীনতাটা যখন কেড়ে নিতে চায় তখন আপনি কোন প্রতিবাদ করছেন না কেন?”

জলিল তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“কি আর বলি জামাই।আমার বড় ছেলেটার মাথা বড্ড গরম।রাগ উঠলে তার জ্ঞান থাকে না।তখন বাপ-মা বলতে তার কোন হুশ থাকে না।আমারও তো বয়স হয়েছে,এই বয়সে এসে আর ছেলেদের সাথে আমার তর্ক বিতর্ক করতে ইচ্ছে করে না।”

“তবে কি বলতে হচ্ছে মাতব্বর জলিল তালুকদারের ক্ষমতা ফুরিয়ে এসেছে?না আব্বা এটা আমি মানতে পারলাম না।এখনো যার এক নামে পুরো গ্রাম কাঁপে সে কিনা তার সন্তানের সাথে পেরে উঠছে না?ক্ষমতা তো এখনো আপনার হাতেই আছে।সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারাও এখনো হয়নি।সুতোটা এখনই টেনে ধরুন।পুরনো তেজটা ফিরে আনুন দেখবেন জামশেদের তেজ এমনিই বেরিয়ে যাবে।”
_______
ঘরে আসতেই জবা চিন্তিত কন্ঠে জুঁই কে বলল,

“তুই ঠিক আছিস জুঁই?”

জুঁই হাসতে হাসতে বলল,

“দুলাভাই বাঁচিয়ে নিয়েছে।তুমি যে কি করে এই মানুষটার উপর রেগে থাকো আমি বুঝিনা আপা।শুধু শুধু মানুষটাকে কষ্ট দিচ্ছো।”

“তোর সাথে মনে হচ্ছে একটু বেশি ভাব জমেছে ওই লোকটার।নিজের আপার থেকেও বেশি ঐলোকটা জন্য তোর কষ্ট হচ্ছে?”

“হওয়াটা কি স্বাভাবিক না?উনি তো বিনা কারণে শাস্তি পাচ্ছেন।”

“থাক আর ওনার হয়ে কথা বলতে হবে না।কষ্ট আমি কিংবা সুজন কেউই কম পাচ্ছি না।”

কথাটা বলে জবা হন হন পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।বিছানার উপর বসে পা দোলাতে দোলাতে রুমি বলল,

“হ্যাঁ রে জুঁই আপার সাথে তোর দুলাভাই এর ঝামেলা চলছে নাকি?”
“আস্তে কথা বল রুমি।বাড়িতে শুনে ফেললে সমস্যা হবে।”

জুঁই এর থেকে সাবধানী বার্তা পাওয়ার পর রুমি যতটা সম্ভব ততটাই নিচু গলায় বলল,

“এবার বল আপা আর দুলাভাইয়ের মাঝে কি হয়েছে?”

“জানিসই তো সুজন ভাইয়ের ব্যাপারটা।আপা এখনো ঠিকভাবে দুলাভাইকে মেনে নিতে পারছে না।অযথা মানুষটাকে দোষারোপ করছে।”

“তাহলে সুজন মিয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেই পারতি।”

“আপা আর আমি তো সেটাই চেয়েছিলাম কিন্তু আমাদের ইচ্ছের মূল্য এই বাড়িতে আছে নাকি?জানিস সুজন ভাইয়ের সব থেকে বড় অপরাধ কি?সুজন ভাই গরীব।তার উপরে আবার বড় ভাবির ভাই।যদি সুজন ভাই ছোট ভাবির ভাই হতো তাহলে হয়তো ছোট ভাইজানের সাথে কথা বলে এই বিয়েটা হলেও হতে পারতো।কিন্তু বড় ভাইজান কোনমতেই বিয়েটা হতে দেয়নি।”

“একটা কথা বলি তুই কিছু মনে করিস না কেমন?”

জুঁই দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় রুমির পাশে এসে বসে পরলো।

“তোর কোন কথায় আমি কখনো কিছু মনে করেছি যে আজ করব?”

“আজকের মতন কোন কিছুই এর আগে কখনো বলিনি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে বল,আমি কিছু বলবো না।”

“সত্যি বলতে তোর বড় ভাইয়ের নাম জামশেদ তালুকদার না রেখে জা*******রা তালুকদার রাখা উচিত ছিল।”

রুমি কথাটা বলতেই জুঁই শব্দ করে হেসে উঠলো।তার হাসি যেন থামার নামই নিচ্ছে না।

“এটা তুই কি শোনালি আমাকে রুমি?তোর মুখ দিয়ে কি সব সময় এই গালিটাই বের হয়?আমার হাসি তো থামতেই চাইছে না।”

“সত্যি কথা বললে এমনই হয়।বিশ্বাস কর তোর বড় ভাইটাকে আমার দু চোখে সহ্য হয় না।কেমন যেন একটা।নিজের বোনের সাথে কেউ এমন আচরণ করে?”

ধীরে ধীরে জুঁইয়ের হাসিটা ম্লান হয়ে এলো।মুখ ভার করে বলল,

“আমার বড় ভাইটা খুব স্বার্থপর।ও নিজেকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে জানে না।জানিস মাঝে মাঝে আমার বড় ভাবির জন্য খুব কষ্ট হয়।মানুষটা এত ভালো অথচ একটু স্বামীর ভালোবাসা পেলো না।ভাবির ভাইজানের সাথে বিয়ে হয়েছিল এই কথাটা মন হলে আমারই খুব আফসোস হয়।”

ওদের কথার মাঝে কেউ দরজায় করাঘাত করলো।জুঁই গলা উঁচিয়ে বলল,

“কে?”

দরজার ওপাশ থেকে জবাব এলো,

“জুঁই আমি সুজন।দরজাটা একটু খোলো।”

সুজন নামটা শুনতেই জুঁই কোনোরক সময় ব্যয় না করে দরজাটা খুলে দিল।

“কিছু বলবে সুজন ভাই?”

সুজন হাতে থাকে একটা কাগজের ঠোঙ্গা জুঁইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“একটু ঝাল মিষ্টি চানাচুর এনেছিলাম।তুমি খেয়ো।”

জুঁই হালকা হাসলো।সুজন যে কেন এই চানাচুর এনেছে সেটা কি জুঁই জানে না নাকি? ঠিকই জানে।এই চানাচুর জবার ভীষণ পছন্দের।মাঝে মাঝে বাজার থেকে ফেরার পরে লুকিয়ে চানাচুর টুকু জবার হাতের মাঝে গুঁজে দিয়ে যেত।ধরা পড়েছিল দুজনে জুঁইয়ের কাছে।তারপর থেকে কোন কিছুই আর লুকোনোর প্রয়োজন হয়নি।জুঁইকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুজন একটু ইতস্তত বোধ করলো।অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,

“আমি এটা তোমার জন্যই এনেছি জুঁই।”

“আমার কাছে না হয় অজুহাত নাই দিলে সুজন ভাই।এই কাহিনী গুলো তো আর আমার অজানা নয় তাই না?”

সুজন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,

“আমি তবে এখন আসি।”

“দাঁড়াও সুজন ভাই।”

সুজন চলে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল।বলা যায় বাধ্য হলো থামতে।পিছন ফিরে তাকাতেই জুঁই কাতর কন্ঠে বলল,

“কিসের আশায় এই চানাচুর নিয়ে এসেছ তুমি?তুমি কি এখনো বুঝতে পারছ না যে যার জন্য এটা নিয়ে এসেছো সে অন্য কারো?তাকে পাওয়ার আশা এখনো ছাড়তে পারছো না কেন?কষ্টটা তো নিজেরই হচ্ছে।”

সুজন কি বলবে ঠিক বুঝতে পারলো না।কিছুক্ষণ অসহায় দৃষ্টিতে জুঁইয়েট দিকে তাকিয়ে রইল।অসহায় কণ্ঠে বলল,

“তাকে যে পাবোই এই আশায় আমি ভালোবাসিনি তাকে জুঁই।জানিনা সে আমায় কি দেখে ভালোবেসেছিল,কি আশায় ভালোবেসেছিল?শুধুমাত্র তার ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারিনি বলে আজ আমি এই সংকটে পড়েছি।বিশ্বাস করো আমি কোন আশায় এখানে আসিনি।জবা চানাচুর খেতে ভালোবাসে,মাঝে মাঝে আমার কাছে বায়না করতো।সে চলে গেছে ঠিকই তবে তার জন্য তৈরি হওয়া আমার কিছু অভ্যাস এখনো থেকে গেছে।”

“ভুলে যাও সুজন ভাই আপাকে।তোমার ভালোবাসার মূল্য এরা দিতে পারবে না।”

“আমার একটু টাকা পয়সা থাকলে আমি বোধহয় জবাকে পেয়ে যেতাম তাই না জুঁই?”

সুজনের মুখ থেকে কথাটা শুনতেই জুঁইয়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।পৃথিবীর সব থেকে অসহায় বাক্য বোধহয় এটাই।মানুষটা যে ঠিক কতটা অসহায়ের মতন জবাকে ভিক্ষে চেয়েছে সেটা কাউকে বলে বোঝানোর মতন না।কিন্তু কিছু পাথর হৃদয়ের মানুষের মন সে গলাতে পারেনি।তারা নাকি বোনকে ভালোবাসে।অথচ সে বোনের ভালো কিসে হবে সেটাই বুঝলো না।আর সুজন সবার ভালোর কথা ভেবে কিনা হাসিমুখে সরে এলো।কি পার্থক্য দুপক্ষের ভাবনার মাঝে।হঠাৎই জুঁইয়ের মনের মধ্যে এক অজানা ভয় দেখা দিল।জহিরও তো গরিব।সে জানে জহিরের সাথেও তার সম্পর্ক পরিবারের কেউ কোনদিনও মেনে নেবে না।জুঁই তাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে যদি সে রকম কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় তবে কোন কিছু না ভেবেই সে জহিরের হাত ধরে পালিয়ে যাবে।কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়?যদি জুঁইয়ের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায় তবে তাে একদিন জবার জায়গায় জুঁই আর সুজনের জায়গায় জহির দাঁড়িয়ে থাকবে।সুজন যদিও ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিতে পারবে কিন্তু জহির তো তা পারবে না।ওই পাগলটা তো শুধু ওকে ভালোইবেসে গেছে।জুঁইকে ছাড়া তো বাঁচতেই পারবে না।জুঁইয়ের এসব ভাবনার মাঝে সুজন পুনরায় বলে উঠলো,

“যদি সম্ভব হয় তাহলে এটুকু জবাকে দিও।আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে জোর করব না আমি।”

“আপাকে নিয়ে পালিয়ে কেন গেলে না?”

সুজন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“সবাই স্বার্থপর হলেও আমি আর জবা স্বার্থপর হতে পারিনি জুঁই।আমরা নিজেদের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়েছি অন্যের জন্য।তোমার বাপ ভাইয়েরা স্বার্থপরের মতন নিজেদের মেয়েকে বড় বাড়িতে বিয়ে দেবে বলে আমাকে দূরে ঠেলে দিলো।আমার আপন বোন নিজের সংসার বাঁচানোর জন্য আমাকে আমার ভালোবাসা ভুলে যেতে বলল।আর আমি কি করলাম?বাকিরা আমাকে যা করতে বলল চুপচাপ ওদের কথা শুনে নিলাম।আমি যে স্বার্থপর হতে শিখিনি জুঁই।”

“একটু যদি স্বার্থপর হতে তাহলে আজ এই অবস্থা হতো না তোমাদের দুজনের।যাক গে যা হয়েছে তা তো আর বদলাতে পারবো না। তোমাকে শুধু একটা কথাই বলবো দুলাভাই খুব ভালো মানুষ।এমনিতেই তোমাদের এই সম্পর্কের জন্য আপা আর দুলাভাইয়ের মাঝে কিছু ঠিক নেই।দয়া করে দুলাভাইকে ভুল বুঝোনা।ওই মানুষটা কিন্তু খুব ভালো।”

“নিজের আপন মানুষদের ওপরই কোনো অভিযোগ রাখি নি,আর সে তো পর।তার ওপর অভিযোগ করা মানেই বোকামি।আর তুমি এটা ভেবোনা জুঁই যে আমি চাইবো জবার সংসারে অশান্তি হোক।”

“আমি জানি তুমি এমনটা চাইবে না।”

সুজন আনমনে হেসে বলল,

“আমার জবার ঠোঁটে আমি হাসি দেখে অভ্যস্ত।হাসলে ওকে ফুটন্ত কলির মতন লাগে দেখতে।বিশ্বাস করো ওর চোখে জল দেখলে আজও আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা অনুভূত হয়।ও আমার না হোক, তবুও ভালো থাকুক।যে ওকে পেয়েছে তার সাথেই সারা জীবন সুখে থাকুক।”

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here