#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১৫
#লেখনিতে খুশবু আকতার
আজ আর ঘুম থেকে উঠতে জবার একটুও দেরি হলো না।ফজরের আজান কানে পড়তেই উঠে পড়লো।বিছানা থেকে নামতে ধরে শাড়িতে একটু টান পড়তেই পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল জবার শাড়ির আঁচলের একটা অংশ মতিউরের হাতের মাঝে।জবার মনে হলো মতিউর বোধহয় সারা রাত এভাবেই আঁচলটুকু আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে ছিল।কিছুক্ষণ সেভাবে অপলক দৃষ্টিতে মতিউর কে দেখল,কোন কথা বলল না,মতিউরকে জাগালোও না।নিজেই খুবই সাবধানতার সাথে মতিউরের হাত থেকে শাড়ির অংশটুকু বের করে নিয়ে উঠে চলে গেল।হাত মুখ ধুঁয়ে রান্না ঘরের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো।গতকাল থেকে জবার সাথে আর কান্তা কিংবা শিল্পী কারোরই কোন কথা হয়নি।জবা অবশ্য এগিয়ে এসে দুই একবার কথা বলেছিল কিন্তু ওর প্রশ্নের উত্তরটুকু দেওয়ার পর্যন্ত প্রয়োজন মনে করেনি কেউ।জবার এখন নিজেকে কেমন যেন অপরাধী লাগছে।এই কয়েকদিন হলো শ্বশুর বাড়িতে এসেই পরিবারের মাঝে একটা অশান্তি তৈরি হলো ওর জন্য।উঠোনে পা রাখতেই দেখল কান্তা আর শিল্পীও ঘর থেকে বের হচ্ছে।জবা কে দেখেই দুজনে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সোজা রান্না করে ঢুকলো।জবা আজও আগ বাড়িয়ে ওদের সাথে কথা বলতে গেল।যেহেতু ঝামেলাটা জবার জন্য হয়েছে তাই আগে আগে কথা বলাটাই ঠিক হবে।এটা নিশ্চয়ই কোন অপরাধ না।
“ভাবি কি করতে হবে বলুন?”
জবা কথাটা বলার সাথে সাথে কান্তা ঝাঁঝালো গলায় বললো,
“তোমারো কেডা আইতে কইছে?কাল মতিউর তো কম কথা শুনাইলো যে আজ আবার নতুন করে শুনাইতে চাও?যাও তো যাও।তোমার এত ঢং এর কথা শুনবার মন চায় না।”
জবার ভীষণ খারাপ লাগলো।আজ অব্দি বোধ হয় এভাবে কেউ ওর সাথে কখনো কথা বলে নি।তবু নিজের মন খারাপ কে এক পাশে রেখে পুনরায় বলল,
“ওনার হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি ভাবি।আমি জানি কাল আপনাদেরকে ওভাবে বলাটা উচিত হয়নি।
আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো এমন হবে না।”
কান্তা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“ভালোই তো হাত করছো মতিউররে।তা এই রূপ দিয়াই নিশ্চয়ই আঁচলে বানছো তাই না?”
কান্তার কথার ধরণটা জবার কাছে ভীষণ অশ্লীল লাগলো।তবে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শিল্পী বলে উঠলো,
“এসব কথা বাদ দাও।মায়ের ঘরে যাও।রাইতে আমারে কইয়া রাখছিল সকালে তুমি ঘুম থেইকা উঠলে মায়ের ঘরে যেন পাঠাইয়া দেই।”
জবা আর কথা বাড়ালো না।চুপচাপ নিজের শাশুড়ির ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।দরজাটা খোলাই।ঘরের ভেতরে উঁকি দিতেই দেখল তার শাশুড়ি মমি খাতুন চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে।জবা ভিতরে আসার জন্য অনুমতি চাইতেই তিনি চোখ খুলে দরজার দিকে তাকিয়ে জবা কে দেখতে পেয়ে অনুমতি দিলেন।
“আপনি ডেকেছেন আমায় মা?”
“হ ডাকছিলাম।আমার ছোট আব্বা কি ঘুমাইতাছে?”
মমি খাতুন ঠিক কার কথা ইঙ্গিত করলেন জবা সেটা বুঝলো না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কার কথা বলছেন মা?”
“তোমার সোয়ামির কথা কইতাছি,মতিউর।ওরে আমি ছোট আব্বা কইরা ডাকি জানো না?”
জবা মেঝের ওপর দৃষ্টি তাক করে বলল,
“আসলে জানতাম না আপনি ওনাকে এই নামে ডাকেন।ওঠেনি এখনও।”
“ওহ্।তা বাপের বাড়ি কি রান্নাবান্না করো নি?অভ্যাস নাই নাকি?”
“না মা করেছি।আমি সব কাজ পারি,রান্নাবান্না সব পারি।”
“সব যহন পারো তাইলে কালকে আসতে না আসতেই সংসারে এমন অশান্তি বাঁধাইলা ক্যান?কান্তা আর শিল্পী সম্পর্কে আর বয়সে তোমার থেইকা বড়।অযথা এই ঝামেলা খান না করলে কি হইতো না?”
জবা এই বিষয়ে আর কথাই বাড়াতে চায় না তাই সবটুকু অভিযোগ নিজের মাথায় নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“ক্ষমা করবেন মা।এরপর থেকে আর এমন হবে না আপনাকে কথা দিচ্ছি।”
মমি খাতুন গম্ভীর গলায় বললেন,
“না হওয়াই ভালো।তোমায় একখান কথা কই আমি,সংসারের টুকটাক ঝামেলা হইবো এইডাই স্বাভাবিক।তিন পরিবারের হাঁড়ি যহন এক চুলাতেই বসে তাইলে একটু ঝামেলা হইবোই।তাই বইলা সব কথায় গিয়া ছোট আব্বার কানে তোলার কোন দরকার নাই।হ তুমি হয়তো বাপের বাড়িত সোহাগের মাইয়া ছিলা তাই বলে শ্বশুরবাড়ি আইসাও যে তুমি সেই একই কাম করবা এইডা কিন্তু হইব না বউ।তাই সব কথা যাইয়া ছোট আব্বার কানে দেওয়া বন্ধ করো।”
“আমি তো ওনাকে কিছু বলিনি মা।আসলে ধোঁয়ার জন্য আমার ভীষণ কাশি হয়েছিল।সেই কাশির শব্দ পেয়ে ঘর থেকে ছুটে এসেছিলেন।আমি ওনাকে কিছু বলার সুযোগই পাইনি।”
“থাক।এই নিয়া আর কথা না বাড়ানই ভালো।আমি কান্তা আমার শিল্পী রে কইয়া দিছি সকালে তুমি রাঁধবা।এহনো তো নতুন বউয়ের হাতের রান্দোন কারো পেটে যায়নাই।দেহি কেমন কি পাও।”
জবা মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলল,
“আপনি চিন্তা করবেন না।আমি রান্না করে দেবো।”
“ভালো।যাও এহন।”
জবা চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।জবার আচরণে মমি খাতুন বেশ সন্তুষ্ট হলেন।সেই সাথে তার দুই ছেলের বউ তার কাছে যে অভিযোগ করেছিলেন তিনি সেই অভিযোগের পুরোপুরি সত্যতা যেন এখন খুঁজে পেলেন না।জবা কে দেখেই বোঝা যায় যে সে অযথা তর্ক করার মেয়েই না।অবশ্য না করাই ভালো।কেননা অযথা তর্ক করলে তিনিও যে চুপচাপ সে সব মেনে নেবেন তেমনটাও তো না।
______
সকালে নাস্তা শেষে জলিল তালুকদার নিজের ঘরে জুঁই কে ডাকলেন।শরীরটা তার আজ একটুও ভালো না।গতকাল সারারাত তীব্র জ্বরে কেটেছে।ভোরের দিকে একটু ঘুমোতে পেরেছেন।তবে সারারাত দু চোখের পাতা এক করা হয়নি আনোয়ারার।এই জলপট্টি দিয়ে দিয়েছে,তো এই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন,আবার কখনো বা হাত পাখা দিয়ে বাতাস করেছেন।যখন যেটা প্রয়োজন হয়েছে সেটাই করেছেন।এক মুহূর্তের জন্য ঘুমিয়ে পড়েনি যদি স্বামীর কোন অসুবিধা হয়।এখনো ঠিক পাশে বসে বাতাস করা যাচ্ছেন।মানুষ নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে তার উদাহরণ আনোয়ারা।জীবনে কখনো স্বামীর থেকে তিনি একটু সহানুভূতি,সম্মান কিংবা ভালোবাসা কোনটাই পাননি তারপরও স্বামীকে সবটা উজাড় করে দিয়েছেন।জুঁই এসে বাবার পাশে বসলো।জলিল তালুকদার তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।জুঁই একবার ভাবলো ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ডাকল,
“আব্বা ডেকেছিলে তুমি আমায়?”
মেয়ের কন্ঠে চোখ খুলে তাকালেন।জুঁইয়ের মুখটা দেখতে পেতেই তার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।মেয়ের মাথায় হাত রেখে আদুর গলায় বললেন,
“সকালে খেয়েছ আম্মা?”
“হ্যাঁ খেয়েছি।তুমি খেয়েছো?”
“হুম।”
“কি যেন বলবে বলে তুমি আমায় ডেকেছিলে?”
জলিল তালুকদার উঠে বসার চেষ্টা করলেন।খুব কষ্ট হলো কিন্তু তারপরেও উঠে বসলেন।এই কথাটা বলা বেশি জরুরী।জুঁই এই কথাটা শোনার পর ব্যাপারটা ঠিক কি ভাবে নেবে সেটা তিনি জানেন না।তবে যতটা তাড়াতাড়ি পারেন ততটা তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে মীমাংসা করতে চান।শরীরটাতো আজকাল ভালো যাচ্ছে না।বলা তো যায় না কবে কি হয়ে যায় তার আগে তিনি তার ছোট মেয়ের একটা গতি করে দিয়ে যেতে চান।
“দেখো মা তুমি অনেক বুদ্ধিমতি,পড়াশোনা জানা একটা মেয়ে।আমি তোমায় বাস্তববাদী ভাবি।আমার শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না তুমি সেটা নিশ্চয়ই জানো।আর আমি আমার ছেলেদেরকে এতটা ভরসা করতে পারি না যে ওদের হাতে তোমার দায়িত্ব দিয়ে চলে যাব।ভরসাযোগ্য কারো হাতে তোমার দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে হতে চাই আমি।”
জুঁইয়ের মুখটা শুকিয়ে এলো।জলিল তালুকদার যে ওর বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন এই ব্যাপারে তার কোনো আন্দাজই ছিল না।এখন জুঁই কি করে বলবে যে সে জহির কে ছাড়া আর অন্য কাউকে বিয়ে করতে চায় না?এই কথাটা শোনার পর জলিল তালুকদারের অভিব্যক্তিই কেমন হবে?
“কি ভাবছ আম্মা?”
“কিছু না,বলো তুমি।”
“জবার বিয়ে আমি একটা ভালো ঘরে দিতে পেরেছি।মতিউর ছেলে হিসেবে ভীষণ ভালো।ওকে নিয়ে আমার কোন চিন্তা নেই।মেয়েটা সারাজীবন মতিউরের কাছে ভালো থাকবে।”
“সত্যি কি ভালো থাকবে আব্বা?এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে দুলাভাই খুব ভালো কিন্তু তুমি কি আপার সুখের ব্যবস্থা করতে পেরেছো?”
বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো জলিল তালুকদারের।এই প্রশ্নটা তো তিনি নিজেও নিজেকে বেশ কয়েকবার করেছেন।এই যে মেয়েটা বাড়ি ফিরল এক মূহুর্তের জন্য মেয়ের মুখে একটু হাসি দেখেননি। এতোটুকুই ওনাকে নিজের সিদ্ধান্তের উপরে প্রশ্ন উঠাতে বাধ্য করেছে।জুঁই পুনরায় বলে উঠলো,
“জানো আব্বা যদি তোমরা একটু সহৃদয়বান হতে ওদের প্রতি,যদি তোমরা মনুষত্ব দিয়ে ভাবতে তাহলে আজ অনেকগুলো জীবন বেঁচে যেত।দুলাভাই ভীষণ ভালো মানুষ কিন্তু আপা হয়ত কখনোই ওনাকে মন থেকে ভালোবাসতে পারবে না।আমার আপা ভীষণ কোমল হৃদয়ের।সারাটা জীবন চুপচাপ মুখ বুঝে সংসার করবে ঠিকই কিন্তু কখনো হয়তো সুখি হতে পারবে না।যদি তোমরা সুজন ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে তাহলে ওরা দুজনেও ভালো থাকতো আর দুলাভাইও অন্য কাউকে বিয়ে করে ভালো থাকতে পারতো।”
“যা হয়ে গেছে সে সব কথা না হয় এখন বাদ দাও। এখন তো চাইলেও কিছু ঠিক করা সম্ভব না তাই না?”
“তাও অবশ্য ঠিক বলেছ।যখন সম্ভব ছিল তখন তো তোমরা সেসব কিছু করোনি।যাই হোক বলো।”
“তোমার তো পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে তাই না?”
“হ্যাঁ আব্বা আমি অনেক পড়তে চাই।”
“আমিও চাই আমার মেয়ে অনেক পড়াশোনা করুক,নিজের পায়ে দাঁড়াক।আমি যেমন এতগুলো বছর আমার মেয়ের পড়াশোনাতে কোন বাঁধা দিইনি তেমনি ভবিষ্যতে যার জীবনে আমার মেয়ে যাবে সেও তাতে কোনো বাঁধা না দিক।আর আমি এমন কারোর সাথেই তোমার বিয়ে ঠিক করেছি।”
জুঁই বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে বলল,
“তুমি বিয়ে ঠিক করেছো আমার?মানেটা কি এসবের?”
“মানে হলো তোমার জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধে এসেছিল।ছেলে তোমায় পছন্দ করে।ওর সাথে বিয়ে হলে তোমার পড়াশোনায় কোনো সমস্যা হবে না।বরং ও নিজে তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করবে।”
“আমি এখন বিয়ে করবো না আব্বা।আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না।”
“কেন?”
“এমনিতেই।আমি এখন বিয়ে করতে রাজি না আব্বা।আগে পড়াশোনাটা শেষ করতে চাই তারপর এসব নিয়ে ভাববো।”
“পড়াশোনাটা তুমি বিয়ের পরেও চালিয়ে যেতে পারবে সে কথা আমার হয়ে গেছে।আমি তো তোমায় বলছি তুমি তোমার পড়াশোনা নিয়ে কোন চিন্তা করো না।যার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেছি সে নিজে তোমার সব স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে।”
“দরকার নেই আমার আব্বা।আমার স্বপ্ন পূরণে কারো সাহায্যের দরকার নেই।তুমি আছো তো আমার পাশে তাহলেই হবে।”
“সেটাই তো ভয় হচ্ছে আমার।আমি হয়তো আর বেশিদিন নাও থাকতে পারি তখন কি হবে একবার ভেবে দেখেছো?আমি বেঁচে থাকতেই তোমার দুই ভাই তোমার সাথে যে আচরণ করে আমার অবর্তমানে তারা তোমার দায়িত্ব নেবে না।জলে ভাসিয়ে দেবে তোমায়।আমি ছেলেদেরকে মানুষ করতে পারিনি ঠিকঠাক সেজন্যই তো ওদের কাছে তোমায় রেখে যেতে আমার ভয় করছে।”
“তুমি চিন্তা করো না।তোমার মেয়ে এতটা দুর্বল না যে ভাসিয়ে দিলেই ভেসে যাবে।আর তাছাড়া দুলাভাই আছে তো।ভাইজানরা কিছু করলে দুলাভাই ওদেরকে দেখে নেবে।”
“যেখানে নিজের ছেলেদের উপরে বিশ্বাস রাখতে পারছি না সেখানে অন্যের ছেলের উপরে কি করে রাখি বলো?”
জুঁই এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো।কিছুতেই তো আব্বা কে রাজি করাতে পারছে না।এই শরীরিক অবস্থায় এখন জহিরের কথাটাও বলতে পারছে না।বললে বাড়িতে একটা ঝড় বয়ে যাবে,জীবনেও মেনে নেবে।যেখানে সুজনকেই মেনে নেয়নি সেখানে জহির কে মেনে নেওয়ার তো কোন প্রশ্নই উঠছে না।কিন্তু কথা হলো কে জুঁইয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে?কার ওকে পছন্দ হলো?প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তার আগে বলোতো কার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছো?”
“নাদিমের সাথে।”
“হাই স্কুলের মাস্টার নাদিম এর সাথে?”
“হ্যাঁ।ও তোমাকে পছন্দ করেছে।ওর বাবা আমাকে বিয়ের প্রস্তাবটা দিয়েছে এবং আমিও রাজি হয়ে গিয়েছি।এখানে না করার কোনো কারণ নেই।পরিবার ভালো,ছেলেও ভালো।আমি বলছি তুমি ভালো থাকবে।”
জুঁই এখন কি বলবে বা কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।নাদিমের হাব-ভাব সুবিধার লাগতো না ঠিকই তবে তাই বলে যে সরাসরি বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেবে এই কথাটা ভাবেনি।নাদিম সত্যিই ভালো ছেলে এই ব্যাপারে আসলেও কোন সন্দেহ নেই।এখন এই বিয়েটা ভাঙবে কি করে,জহিরের কথা বলবে কি করে।জুঁই কে চুপচাপ থাকতে দেখে জলিল তালুকদার বললেন,
“আমি তোমার মত চাইছি তোমার বিয়েতে।”
“আর আমি যদি মত দিতে না চাই তাহলে?”
“মেনে নেব তোমার কথা।তবে অমত করার সঠিক কারণ দেখাতে হবে আমায়।”
“আমি ভেবে বলছি তোমায় আব্বা।আমায় একটু সময় দাও।”
“বেশ দিলাম সময় তবে বেশি সময় চেওনা।আমার হাতে হয়ত বেশি সময় নেই।”
________
“আরে আরে আমি কি ভুল দেখছি নাকি?মেলায় কিনা সুজন মিয়া এসেছে!”
হঠাৎ পরিচিত কারো কন্ঠ পেয়ে সুজন পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলে রুমি দাঁড়িয়ে আছে।চোখে মুখে তার হাসি উপচে পড়ছে।সুজনকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে রুমি পুনরায় বলল,
“কিগো সুজন মিয়া তুমি হঠাৎ মেলাতে যে?”
“কেন?আসতে পারি না নাকি?তোমাকে কি আমি কখনো বলেছিলাম আমি মেলায় আসি না?”
সুজনের এমন কথায় রুমি একটু বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
“সব সময় আমার সাথে এমন ঠাস ঠাস করে কথা বলো কেন বলোতো?মুখে কি মধু নেই?”
“সেজন্যই তো তোমায় বলি আমার থেকে দূরে থাকো।”
রুমি বিরবির করে বলল,
“কি করি বলো তোমার মুখে বিষ ও যে আমার বড্ড ভালো লাগে সুজন মিয়া।”
কথাটুকু সুজনের কানে গেল ঠিকই তবে এমন ভাব ধরলো সে কিছু শুনতে পায়নি।
“তা মেলায় যখন এসেছো চলো না একটু ঘুরে দেখি দুজন মিলে।”
রুমির এমন প্রস্তাব সুজন সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলল,
“আমিতো এখানে তোমার সাথে মেলায় ঘুরতে আসিনি রুমি যে তোমার সাথে ঘুরে বেড়াবো।”
“আহা সুজন মিয়া মানলাম যে আমার সাথে ঘুরতে আসোনি কিন্তু এখন যেহেতু দেখা হয়ে গেছে একটু ঘুরে দেখি না চলো।আমায় একটু কাঁচের চুড়ি কিনে দেবে?”
সুজন ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভালোবেসে আমার কি পরিণতি হয়েছে দেখতে পাচ্ছো না?ভালোবেসে জবার কি পরিণতি হয়েছে তুমি সেসব দেখতে পাচ্ছো না?তারপরও ভালোবাসার সাহস পাও কি করে তুমি?বুঝতে পারো না ভালোবাসায় শুধু যন্ত্রনা আছে?এখানে সুখ বলতে কিছু নেই।”
“তোমায় পেলে সব কবুল।তোমাকে পাওয়ার জন্য যদি যন্ত্রণাও ভোগ করতে হয় আমি তাতেই রাজি।তবুও তোমাকে চাই আমার সুজন মিয়া।”
“এটা কি জেদ যে আমায় পেতেই হবে?”
“ভালোবাসায় একটু জেদ থাকতেই হয় সুজন মিয়া,সেই সাথে ভরপুর পাগলামি।”
“পাগলামো করো না।আমি এমন বিশেষ কেউ না যে আমার জন্য এত যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।তুমি আমার থেকে অনেক ভালো কাউকে জীবনে পেয়ে যাবে।এসব করে নিজেকে কষ্ট দিও না।”
“তোমাকে ভালোবাসার মাঝে যে সুখটা আছে না সেখানে এই কষ্টটুকু কিছুই না।আমি তোমার চাইতে ভালো কাউকে চাই না।আমার জীবনের আমি তোমাকেই চাই।আর আমি বলছি আমার কথা মিলিয়ে নিও একদিন তুমিও আমায় ঠিক চাইবে।”
“আর যদি না চাই?”
“নিজের ভালোবাসা হারিয়ে কতটা যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে ছাড়া থাকতে কতটা কষ্ট হয় সেটাও তুমি ভালো করেই জানো।হয়তো আমার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাবে,হয়তো আমি সংসার করবো,তবে ঠিক কতটা সুখি হতে পারবো সেটা তুমি আন্দাজ করতে পারো সুজন মিয়া।আর আমি জানি তুমি কাউকে এতটা কষ্ট দিতে পারো না।এতটা নিষ্ঠুর আমার সুজন মিয়া না।”
সুজন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“কে বলেছে তোমায় আমি কাউকে কষ্ট দিতে পারি না?নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে আমি পাথর হয়ে গেছি। সারা দুনিয়া আমার সাথে যখন অন্যায় করেছে আমি কেন তাদের সাথে অন্যায় করতে পারবোনা?আমার প্রতি অযথা এতটা বিশ্বাস রেখোনা,ঠকে যাবে।”
“তুমি ঠকাতে পারো না কাউকে।তুমি শুধু ভালোবাসতে জানো।আর যে কাউকে একবার এতটা ভালোবাসতে জানে তার হৃদয় কখনো পাথর হতে পারে না।অন্তত তার পূর্বের ভালোবাসা তার হৃদয়কে পাথর হতে দেয় না।”
রুমির কথা শুনে সুজন নিজেই ভাবনার মাঝে পড়ে গেল।ভেবেছিল হৃদয়টা পাথরে পরিণত হয়েছে।সেখানে নতুন করে আর কোন ব্যথা,যন্ত্রণা কিছুই অনুভব হয় না।তবে রুমি এতটা বিশ্বাসের সাথে কি করে বলল যে সুজনের হৃদয় এখনো পাথর হয়নি?তবে সত্যি কি সুজন ভুল ভাবছে?সুজন কে ভাবনার জগতে নিমজ্জিত থাকতে দেখে রুমি হেসে বলল,
“কিই?ভাবনায় ফেলে দিলাম তো?আমি ইচ্ছে করেই এই কথাটা বললাম।এখন তুমি এই কথাটার সত্য মিথ্যে যাচাই করতে চাইবে।আর যখনই যাচাই করতে চাইবে তোমার এই প্রশ্নটার দরকার হবে আর যখন এই প্রশ্নটার দরকার হবে তখনই প্রশ্নকারী মানুষটাকে তোমার মনে পড়বে।এভাবে তোমার ভাবনায় সারাক্ষণ আমি থাকতে থাকতে একসময় দেখবে তোমার দুনিয়া জুড়ে শুধু আমি হয়ে গিয়েছি।”
কথাগুলো বলে রুমি সেখান থেকে চলে গেলে।সুজন শুধু হা করে ওর কথাগুলো শুনল।বুঝতে পারছেনা যে রুমি কথাগুলো আদৌও সত্যি হবে কিনা?
চলবে।

