আমার উপমা তুমি (১৮)
আফরোজা আঁখি
ইয়াশ আর কাশফিয়া এসেছে রোহিকে দেখতে। কাশফিয়াকে দেখেই সিমি দৌড়ে গেছে ওর কাছে। দুজনে মিলে গল্প করেছে অনেকক্ষণ। ইয়াশ ওকে সিমির কাছে রেখেই চলে গেছে রোহির সাথে দেখা করতে। কিন্তু কেবিনে এসে রোহিকে পেল না সে। এদিক সেদিক তাকিয়ে খুঁজল অনেকক্ষণ, কোথাও না পেয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল আফিয়া বা উজ্জ্বলকে জিজ্ঞেস করবে বলে।
সময়টা সন্ধ্যা, রোহিকে নিয়ে উজ্জ্বল একটা ক্যাফেতে এসেছে হাসপাতাল থেকে বেশ খানিকটা দূরে। বাঙালিয়ানায় মোড়ানো একটা সুন্দর ক্যাফে আছে। ক্যাফের সৌন্দর্য, স্টাফদের কথাবার্তা, আর খাবারের ধরন দেখলে মনে হবে লন্ডনের বুকে একটুকরো বাংলাদেশ! উজ্জ্বলের মুখে ক্যাফেটার সম্পর্কে শুনে রোহির ইচ্ছে হলো এখানে আসবে। উজ্জ্বল শুনল বোনের কথা, সম্মতি দেওয়ার সাথে সাথেই এখানে নিয়ে এলো রোহিকে। আফিয়া আর সিমিকে হাসপাতালে রেখেই এসেছিল যেন ইয়াশ আর কাশফিয়াকে নিয়ে আসে এখানে।
ইয়াশের গাড়িটা এসে থেমেছে ক্যাফেটার সামনে। কাশফিয়া একবার গাড়ির জানালা দিয়ে চোখ বুলালো ক্যাফের দিকে। চারিদিকে রঙ বেরঙের লাইটিং করা। লোকজনের যাতায়াত চলছে সেখানে। সবার পোশাকে আর সাজগোছে বাঙালিই মনে হচ্ছে। উজ্জ্বলের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ইয়াশ, কাশফিয়া, সিমি আর আফিয়া ক্যাফের ভিতরে গেছে। রোহির সাথে সবাই কথা বলেছে অনেকক্ষণ। রোহিকে দেখে কেমন কষ্ট হচ্ছে কাশফিয়ার মেয়েটা শরীরে এত বড় রোগ নিয়ে চলাফেরা করছে ভাবলেই খারাপ লাগছে ওর। এত অসুস্থতার মধ্যেও ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে রোহির। বুঝতে পারল কাশফিয়া, নিজেকে ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে রোহি। রোহির ডাকে ধ্যান ভাঙল কাশফিয়ার,
“আমি ইয়াশের সাথে আলাদাভাবে কিছুক্ষণ কথা বললে কি তুমি রাগ করবে, কাশফিয়া?”
দুইদিনে মাথা নাড়াল কাশফিয়া, যার উত্তর না। রোহি মুচকি হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“তুমি সুখী হও কাশফিয়া। তোমাদের সংসারে সুখ আসুক। একটা ছোট্ট রাজকন্যা বা রাজপুত্র আসুক। দোয়া রইল তোমাদের জন্য।”
ক্যাফের বাইরে পাতানো একটা বেঞ্চে বসে আছে রোহি। ইয়াশ এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশেই। ইয়াশ লক্ষ্য করল ওকে। মেয়েটা কেমন শুকিয়ে গেছে গায়ের ফর্সা ত্বক এখন আর আগের মতো নেই। চুলগুলো সব পড়ে গেছে। আগের রোহি আর এখনের রোহির মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। রোহি এতক্ষণ খেয়াল করেনি ইয়াশকে মাত্রই দেখল। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আমার পাশে বসবে, ইয়াশ?”
ইয়াশ কথা বলল না, দাঁড়িয়ে রইল ওভাবেই। ঘাড় ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই উজ্জ্বল, কাশফিয়া আর বাকিদের দেখল সে। উজ্জ্বল আর আফিয়া মাথা নাড়িয়ে বলছে ইয়াশকে,রোহি যা বলছে শুনতে। কিন্তু ইয়াশ তো তাকিয়ে আছে উপমার দিকে কেমন অন্ধকারে ঢেকে আছে ওর উপমার সুন্দর মুখটা। সে কি তবে রাগ করল, রোহির সাথে কথা বলায়? ভাবনা মিথ্যা হলো ইয়াশের, কাশফিয়া মুচকি হেসে চোখের ইশারায় একই কথা বলল ওকে। ইয়াশও হাসল কাশফিয়ার হাসির উত্তরে, বসল গিয়ে রোহির পাশে। বড় একটা শ্বাস ছেড়ে ইয়াশের দিকে তাকাল রোহি, বলল ওকে,
“বলেছিলাম না, ইয়াশ, আমাদের আবার দেখা হবে?”
ইয়াশ মুচকি হাসল, জিজ্ঞেস করল রোহিকে,
“তুমি ভালো আছো, রোহি?”
“আমি তো বরাবরই ভালো থাকি, ইয়াশ। তুমি আজ আমার কথা রেখে এসেছ, তাই একটু বেশিই ভালো লাগছে।”
চারিদিকে শীতল আবহাওয়া। ক্যাফেতে এত সুন্দর করে লাইটিং করা, পুরো দিনের মতোই লাগছে। পাশেই বসে থাকা ইয়াশের কাঁধে মাথা রাখল রোহি। কী হলো বুঝতে পেরে দ্রুত সরে যেতে চাইল ইয়াশ—রোহি আঁকড়ে ধরল ওর বাহু। ইয়াশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অসহায়ের মতো বলল সে,
“যেও না ইয়াশ, আজকের দিনটা প্লিজ! আমি আর বিরক্ত করব না তোমায়।”
ইয়াশের কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। রোহির প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসাও নেই তার মনে। কিন্তু এভাবে ওকে প্রশ্রয় দিলে তো নিজের কাছেই নিজেকে দোষী মনে হবে পরে! ইয়াশ কিছু বলতে চেয়েও চুপ করে গেল, নিরবতা ভেঙে কথা বলল রোহি,
“একটা অন্যায় আবদার করব ইয়াশ, রাখবে তুমি?”
ইয়াশ কথা বলল না, তাকিয়ে রইল রোহির দিকে। আবারও নিশ্চয়ই অবুঝের মতো ভালোবাসা চাইবে ইয়াশের! রোহি কেন বোঝে না, ইয়াশ তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে দিয়েছে উপমাকে! ইয়াশের উত্তরের অপেক্ষা না করেই রোহি বলল আবারও,
“একবার ভালোবাসি বলবে, ইয়াশ? মিথ্যে করে হলেও একবার প্লিজ বলো না, তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল ইয়াশ। মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হলেও আপাতত নিজেকে সংযত করল সে। রোহি অসুস্থ রেগে কিছু বলে বসলে হয়তো কষ্ট পাবে! নিজেকে শান্ত করল ইয়াশ, বলল রোহিকে,
“তুমি তো অবুঝ নও, রোহি। কেন বারবার এমন অন্যায় আবদার করছ? মনে একজনকে রেখে মুখে আরেকজনকে ভালোবাসি বলা পাপ জানো না তুমি?”
“আমার কাছে তুমিই সবার আগে, ইয়াশ। সব পাপ পুণ্যের ঊর্ধ্বে তুমি। একবার বলো না, ইয়াশ, তুমি আমাকে ভালোবাসো। মিথ্যে করে হলেও একবার বলো। আমি তো সারাজীবন অন্যায় করে এসেছি তোমাকে ভালোবেসে,তুমিও আজকে একটু অন্যায় করো। একবার আমাকে ভালোবাসি বলো।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বলল ইয়াশ,
“রোহি!”
রোহি ছেড়ে দিল ইয়াশের হাত বুঝল, ইয়াশ শুনবে না ওর কথা। রোহির ভিতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে বলল ইয়াশকে,
“আমাকে ভালোবাসি বলতে হবে না, ইয়াশ। তুমি ভালো থেকো, আমাকে একটু মনে রেখো তাহলেই হবে।”
কথাটা বলা শেষ করে কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল রোহি,—-“চা নিয়ে আসবে?”
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল ইয়াশ। উঠে গেল চা নিয়ে আসবে বলে। কাশফিয়ারা সবাই এখনও দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গাতেই। অন্য সময় রোহির মুখে ইয়াশের কথা শুনলে রাগ হয় কাশফিয়ার, কিন্তু আজকে যে খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। বুঝতে পারছে, মেয়েটা কতটা ভালোবাসে ইয়াশকে। কাশফিয়ার রাগ হচ্ছে নিজের উপরেই,ও যদি ইয়াশের জীবনে না আসত তাহলে তো রোহি এভাবে কষ্ট পেতো না! ইয়াশ নিশ্চয়ই সাড়া দিত ওর ভালোবাসার ডাকে। কাশফিয়ার মুখটা কেমন বেজার করে রেখেছে, রোহির জন্য হয়তো খারাপ লাগছে ওর। উজ্জ্বল লক্ষ্য করল এটা চোখের পানি মুছে বলল কাশফিয়াকে,
“রোহির কথায় তুমি রাগ করো না, কাশফিয়া। ওর মাথা ঠিক নেই। অসুস্থ তাই আমিও কিছু বলি না।ও আর কয়দিন বলো! আমার বোনের জন্য তোমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হোক, আমিও চাই না।”
নিজেকে ধাতস্থ করে উত্তর দিল কাশফিয়া,
“আমি রাগ করিনি ভাইয়া।”
কাশফিয়ার উত্তরে খুশি হলো উজ্জ্বল সবাইকে নিয়ে চলে যেতে চাইলো এখান থেকে। রোহি না হয় আরেকটু সময় এখানে বসুক। কাশফিয়াও সায় জানাল উজ্জ্বলের কথায়। ততক্ষণে চায়ের কাপ হাতে ইয়াশ এসে দাঁড়িয়েছে রোহির সামনে। রোহি হাসিমুখ করে তাকিয়েছে ওর দিকে চায়ের কাপটা হাতে নেবে, তখনই কানে আসল কাশফিয়ার চিৎকার! কী হলো বুঝতে না পেরে সবাই-ই তাকাল ওর দিকে। রোহি হয়তো কিছু আন্দাজ করল, কাশফিয়াকে ছুটে আসছিল ইয়াশের দিকে ওকে সরিয়ে দিয়ে গিয়ে নিজেই দাঁড়াল ইয়াশের সামনে। কোনো কিছুর বিকট শব্দে কেঁপে উঠল সবাই। ইয়াশের চোখ মুখে রক্তের ছিটে এসে পড়ল কি হলো বুঝে ওঠার আগেই রোহির শরীরটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। ক্যাফের লোকজন সবাই এসে জড়ো হয়েছে জায়গাটাতে। উজ্জ্বল সবটা লক্ষ্য করে বুঝল কেউ গুলি মেরেছে রোহির উপরে। হাত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে ওর। যে ছেলেটা গুলি করেছে তাকে ধরতে পারেনি কেউ-ই কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটা পালিয়েছে ক্যাফের সীমানা ছেড়ে। ইয়াশ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই। কাশফিয়া ওর কাছে গিয়ে হাতে সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
“দাঁড়িয়ে আছেন কেন? রোহি আপুর হাতে গুলি লেগেছে হাসপাতালে নিতে হবে এক্ষুণি!”
স্তব্ধ ইয়াশ ফিরে কাশফিয়ার মুখপানে। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল আবারও। রোহির হাতে গুলি লেগেছে! মাটিতে পড়ে আছে ওর নিথর দেহ। অথচ গুলিটা লাগার কথা ছিল ইয়াশের বুকে। ওকে বাঁচাতে গিয়েই রোহির এই অবস্থা ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠছে বারবার। ইয়াশ দ্রুত বসে পড়ল রোহির কাছে। রোহির মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“রোহি, তোমার কিছুই হবে না। আমি আছি তো!”
রোহি নিভু নিভু চোখে তাকাল ইয়াশের মুখপানে, নিজের রক্তমাখা হাতটা ওর গালে ছুঁইয়ে বলল,
“একবার আমাকে ভালোবাসি বলো না, ইয়াশ? একবার বলো।”
ইয়াশ চুপ করেই রইল। উদ্যত হলো রোহিকে কোলে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়েই ইয়াশকে আটকাল রোহি, আবার বলল একই কথা। কাশফিয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে রোহির এমন অবস্থা দেখে। ইয়াশ এতটা কঠোর, পাষাণ কি তবে রোহির জন্যই? কাশফিয়াকে ভালোবাসে সে। কেন একবার শুনছে না রোহির কথা? কাশফিয়া কান্না করতে করতে বলল ইয়াশকে,
“আপনি এত পাষাণ কেন? একবার বলুন না ভালোবাসি!”
ইয়াশ বড় একটা শ্বাস ফেলল। কাশফিয়া যে আবেগী হয়ে কথাগুলো বলছে, ভালো করেই জানে সে। রোহির মুখটার দিকে তাকাল ইয়াশ, পরে আবার কাশফিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল আস্তে করে,
“ভালোবাসি।”
ইয়াশের কথায় ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল রোহির। রোহি জানে ইয়াশ তার উপমাকেই ভালোবাসি বলেছে। তবুও তো শুনল ওর কথা! মিথ্যে করে হলেও বলল ভালোবাসি। এই ভেবেই শান্তি পেল রোহি। ইয়াশ তাকিয়ে আছে রোহির হাসিমাখা মুখটার দিকে এমন অবস্থাতেও মানুষ হাসতে পারে? এই রোহি কী দিয়ে তৈরি ভেবে পায় না সে! রোহি সবার দিকে একবার তাকাল কাশফিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল,
“আমার না হওয়া প্রিয় মানুষটাকে তুমি ভালো রেখো কাশফিয়া। যত্নে রেখো ওকে। তোমাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকুক আজীবন!”
কথাটা বলেই কষ্ট করে বড় বড় শ্বাস ফেলল রোহি। ইয়াশের মুখের দিকে তাকাল সে। কেমন বিধ্বস্ত লাগছে ইয়াশকে, চোখের কোণে পানি জমেছে ওর। আজকে প্রথম রোহি ইয়াশের চোখে নিজের প্রতি একরাশ মায়া দেখছে! রোহি নিজেকে সামলে বলল ইয়াশকে,
“আমার মৃত্যুর জন্য কখনোই নিজেকে দায়ী করো না, ইয়াশ। আমি আগেই বুঝছিলাম, আমার সময় শেষ। তাই তো তোমাকে ডেকে আনলাম, শেষ দেখা দেখব বলে।”
ইয়াশ বরাবরের মতোই মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বলল রোহিকে,
“তোমার কিছুই হবে না, রোহি। আমি তোমার কিছুই হতে দেব না।”
প্রতি উত্তর করল না রোহি। ওর মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না আর। চোখের পাতা দুটো লেগে আসছে বারবার, তাকানোর শক্তিটুকুও নেই আর রোহির মধ্যে। নিজের সবটুকু ভর ইয়াশের উপরেই ছেড়ে দিল রোহি। কী হলো বুঝতে পেরে উজ্জ্বল আর বাকিরা চিৎকার দিয়ে উঠল। বারবার ইয়াশকে বলল, রোহিকে গাড়িতে তুলতে, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। দেরি করল না ইয়াশ, দ্রুত কোলে তুলে নিল রোহিকে।
———————
হাসপাতালের করিডরে পায়চারি করছে উজ্জ্বল। কাশফিয়া তখন থেকেই কান্না করে যাচ্ছে রোহির জন্য। কাশফিয়া তখন দেখেছে, গাড়িতে বসে থাকা লোকটাকে, ইয়াশকেই টার্গেট করেছিল লোকটা। কাশফিয়া তো ওকে বাঁচাতে চেয়েছিল, ছুটে এসেছিল ইয়াশের কাছে, কিন্তু ওকে সরিয়ে দিয়ে রোহিই যে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে জানা ছিল না কাশফিয়ার। কেন করল রোহি এমন? এসব ভাবছে আর কান্না করছে কাশফিয়া, কান্না করতে করতে চোখ দুটো ফুলে গেছে ওর। ইয়াশ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, একবার কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল সে। কত শত চিন্তা ইয়াশের মাথায়, তখন কে এসেছিল ওকে মারতে? নিশ্চয়ই ঈশান! কিন্তু ঈশান এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হলো কীভাবে? ঘুরে ফিরে বারবার ইয়াশের সন্দেহ যাচ্ছে ঈশানের দিকেই। কাশফিয়াকে জিজ্ঞেস করতে যাবে কিছু তখনই, ডাক্তাররা বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। ইনায়াও ছিল সেখানে। ইয়াশ ছুটে গেল ইনায়ার কাছে, উদ্বিগ্ন হয়ে বলল ওকে,
“রোহি কেমন আছে, ইনায়া? ঠিক হয়ে যাবে তো?”
চুপ করে রইল ইনায়া। উপস্থিত সবাই অপেক্ষা করছে ইনায়ার উত্তরের জন্য। ইনায়া সবার চিন্তিত মুখগুলোর দিকে তাকাল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল ইয়াশকে,
“রোহি আর নেই, ইয়াশ। ওর আয়ু হয়তো এতোটুকুই ছিল।”
কয়েক পা পিছিয়ে গেল ইয়াশ। অন্ধকারে ঢেকে গেলো ওর পুরো মুখ। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দুফোটা পানি। হ্যাঁ ইয়াশ কাঁদছে,এই প্রথম হয়তো সে কারো জন্য কাঁদছে। ইয়াশের যে প্রচন্ড রকমের অনুশোচনা হচ্ছে বার বার রোহির মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দোষারোপ করে যাচ্ছে সে। ইনায়ার মুখ থেকে কথাটা শুনেই কাশফিয়া শব্দ করে কান্না করে দিল, সাথে সিমি আর আফিয়াও। উজ্জ্বল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে ওর। ইস, কতো কতো অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল ওর বোনটা! মেয়েটার ভাগ্যে আল্লাহ সুখ লিখেননি হয়তো, তাইতো হলো এমন। রোহি ইয়াশের প্রতি এতোটা দূর্বল তা এখানে না আসলে হয়তো বুঝতোও না উজ্জ্বল। কতোটা ভালোবাসে ওর বোন ইয়াশকে নিজের জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করল না সে একবার। কথাগুলো ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল উজ্জ্বল,এখন আর এতো কিছু ভেবে কি হবে? যে যাওয়ার সে তো চলেই গেছে। উজ্জ্বল কথা না বলে এগিয়ে গেলো রোহির কেবিনের দিকে।বোনের প্রানহীন দেহটার কাছে বসে রইলো কিছুক্ষণ। কান্না করবে না ভেবেও কান্না করে দিল উজ্জ্বল। সে ও তো মানুষ কষ্ট তারও হয়। মা-বাবার পরে আপন বলতে তো ওর রোহিই ছিলো মেয়েটাও স্বার্থপরের মতো চলে গেলো ওকে ছেড়ে? কে উজ্জ্বলকে ভাইয়া বলে ডাকবে এবার? ভুলবাল কাজ করে বসলে কেই-বা বকাবকি করবে। কথাগুলো ভাবছে আর অজোরে কাঁদছে উজ্জ্বল, জাপ্টে ধরেছে রোহির প্রানহীন নিস্তেজ শরীরটা।
————————
রোহির মৃত্যুর আজ প্রায় ৪ মাস হতে চলল। ওকে ক’বর দেওয়া হয়েছে দেশেই। অদ্ভুত ভাবে রোহির মৃত্যুর পর থেকে ঈশানকেও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। কারোরই বুঝতে বাকি নেই কাজটা ঈশানের। ইয়াশও সেদিনের পর থেকে পাগলের।মতো খুঁজে চলেছে ঈশানকে। নিজ হাতে মারতে না পারলে শান্তি পাবেনা সে। ইয়াশ বসে আছে ওর অফিসরুমেই। ভাবছে কথাগুলো, হঠাৎই ড্রয়ারে রাখা একটা হলুদ খামটার দিকে চোখ যায় ওর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে খামটা হাতে তুলে নেয় ইয়াশ, ভিতরে রাখা গুটি গুটি অক্ষরে লেখা চিঠিটা বের করে পড়তে শুরু করে সে,
~আমার না হওয়া প্রিয় মানুষ।
তুমি নিশ্চয়ই আমার চিঠিটা পড়ছ! তুমি যখন আমার এই চিঠিটা পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার থেকে অনেক দূরে,শত আলোকবর্ষ দূরে, চাইলেও যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না। জানো তো ইয়াশ, তুমি আমার হবে না জেনেও আমি সবসময় চেয়ে গেছি তোমাকে। তুমি কি ভাবলে, আমি বাঁচতে চাই বলে ছুটে এসেছি এতদূর? না ইয়াশ, যে জীবনে তুমি নেই, সেই জীবন রেখে আমি কী করব? সব কিছু পেলেও যে তোমার শূন্যতা থেকে যাবে আজীবন। এত অপূর্ণতা নিয়ে বাঁচা যায়, বলো? আমি তোমাকে দেখব বলে এসেছি, শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখব বলে। মুখে তোমাকে ভুলে গেছি বললেও, যে আমার পাগল মনটা সারাক্ষণ খুঁজে বেড়ায় তোমাকে, পেতে চায় তোমার ভালোবাসা। আমার তৃষ্ণাক্ত চোখ জোড়া বারবার দেখতে চায় তোমাকে। মাঝেমধ্যে তোমার উপমার প্রতি আমার অনেক হিংসা হয় ইয়াশ। কেন আল্লাহ ওর ভাগ্যটা আমাকে দিলেন না! পরক্ষণেই আবার ভাবি, আমার ভাগ্যে আল্লাহ হয়তো তোমাকে লিখেননি। উনিও চান না তুমি আমার হও।নিয়তি ভেবেই সান্ত্বনা দিই নিজেকে। কিন্তু এতো কিছু করেও ভুলতে পারিনা তোমাকে। বার বার মনে পড়ে তোমার কথা।
তোমার উপমা তো ভাগ্যবতী, ইয়াশ। সে তোমার ভালোবাসা পেয়েছে, যত্ন পেয়েছে, তোমার বুকে ঠাঁই পেয়েছে। কত সহজে সে না চেয়েও পেয়ে গেল তোমাকে! আর আমাকে দেখ আমি কেবল ধ্বংস করতেই জানি, তাই তো এত করে চেয়েও পেলাম না তোমাকে। তবে আমার আফসোস নেই। আমি জানি, শেষবার তুমি ফেলবে না আমার কথা। মিথ্যে করে হলেও একবার ভালোবাসি বলবে আমাকে। না বললে আমি জোর করেই বলিয়ে নেব। এক জীবনে এত অপূর্ণতা নিয়ে আমি মরেও যে শান্তি পাব না।
আবারও বলছি ইয়াশ, তুমি ভালো থেকো। পৃথিবীর সবটুকু সুখ তোমার হোক। সব ভালো তোমার ভাগ্যেই থাকুক। আমায় তুমি মনে রেখো ভালোবাসায় না হোক, ঘৃণায় রেখো, তবুও প্লিজ মনে রেখো। আমার হাত কাঁপছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমি আর লিখতে পারছি না, ইয়াশ।
নিজের উপর আজ হাসি পাচ্ছে আমার,আমি কতো নির্লজ্জ দেখো! মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমি তোমাকেই চাইছি। সত্যিই আমি তোমাকে চাই,এ জীবনে যদি না পাই, তবু পরজন্মে যেন তোমাকেই পাই।
ভালো থেকো আমার না হওয়া ভালোবাসার মানুষ। আমার না হলেও তুমি অন্যের হয়ে ভালো থেকো।
#চলবে……
আজকেই গল্প শেষ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু হলো না। আমার মন খারাপ, ভিষণ রকমের মন খারাপ! এইটুকু যে কতো যুদ্ধ করে লিখেছি কেবল আমিই জানি। কারেন্ট আসছে যাচ্ছে, ফোনের নেট নেই তাই আপলোড করতে এতো সময় লাগলো।

