#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
২২.
সাইরের কান্নার শব্দে পশুপাখিরাও স্তব্ধ হয়ে গেল। আম গাছে বসা নাম না জানা নানান পাখিরাও ভয়ের চোটে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। কিন্তু সাইরের কান্না কিছুতেই থামছে না।
নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সাইর। ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছলো সে। তার নীল হয়ে যাওয়া চোখের মণি রাগে‚ ক্ষোভে এখন টকটকে লাল হয়ে আছে।
সাইর দেখলো তার চারপাশের বাতাস এখন ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খাচ্ছে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ এসেছে কি-না? সামলে তাকিয়ে একটা শকুনকে দেখতে পেলো সাইর। বিপদ হাতের কাছে বুঝতে পেয়ে সাইর জোড়ে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ধোয়ার সৃষ্টি করলো। চারপাশের ধুলো-বালি ঝড়ের বেগে উড়ে ঘোলা পরিবেশ তৈরি করলো। মুহুর্তেই ঝড়ের মাঝখান থেকে ঈগল রূপে সাইর উড়াল দিয়ে চলে গেলো।
জমিদার বাড়ির আঙিনায় উৎসবের আলো আজ একটু বেশিই প্রখর। ঝাড়-বাতির হলদেটে আলো আর রঙিন কাগজের ঝালর বাতাসের দাপটে দুলছে। উঠোনের এক কোণে ঢাক-ঢোলক বাজিয়ে গ্রামের মহিলারা বিয়ের গীত গেয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করছে। গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা রঙিন জামা পরে উঠোন জুড়ে হইহুল্লোড় করছে।
মেহেদী অনুষ্ঠানের মাঝেই মুন্নিকে ঘিরে বসেছে তার সখীদের দল। মুন্নির পরনে বাসন্তী শাড়ি, দুই কানে গাঁদা ফুলের দুল। তার দু-হাত ভরে লতাপাতার সূক্ষ্ম নকশাঁ করে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে সহিনী। মুন্নি মাঝে মাঝেই আড়চোখে বারান্দার দিকে তাকাচ্ছে। রাইসুল সাদা পাঞ্জাবি পরে এক মনে মুন্নির দিকেই তাকিয়ে আছে। মুন্নি তাকাতেই চোখাচোখি হলো তাদের। মুন্নি কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো।
পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাঝে এক ধরণের চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। কালপরশুর বিয়ে নিয়ে অনেকেই অনেক আনন্দ মনে কষে রেখেছে। জমিদার গিন্নী হন্তদন্ত হয়ে সবার খোঁজ নিচ্ছে। সে বারবার অন্দরের দিকে তাকাচ্ছে। এমন সময় অন্দরের ভারী কাঠের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো জমিদার মামুনুর রহমান। তাঁর পরনে কালো জোব্বা‚ সাদা লুঙ্গি। চোখের কোণ দিয়ে অন্ধকার যেন চুইয়ে পড়ছে। তিনি বেরুতেই ঢোলের শব্দ কিছুটা থিতু হয়ে এলো।
জমিদার একবার অন্দরের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় গর্জন করে উঠল„ —“সাইর কোথায়? সাইরকে দেখছিস কেউ?”
রন্ধনশালার কাছ থেকে জমিদার গিন্নী এগিয়ে এলো। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল„ —“সাইর তো বাড়িতে নেই। তুলি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ছেলেটা কেমন পাগলপারা হয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে।”
জমিদারের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তাঁর চোখের মণি দুটো বিড়ালের মতো জ্বলে উঠল। জমিদার আর এক মুহুর্ত দেরি না করে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। বাগানের অন্ধকারের মাঝ বরাবর হাঁটা শুরু করলো সে।
সাইর পাহাড়ের চূড়ায় পা রাখতেই অন্ধকার গুহার মুখ খুলে গেলো। সেখানে শোঁ-শোঁ বাতাসের শব্দ যেন তৃষ্ণার্ত আত্মার গগানোর আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে। গুহার মাঝখানে নীল আগুনের একটি বৃত্ত। তার মাঝে আগুনের খাঁচায় অর্কা’কে বন্দি রাখা হয়েছে। বৃত্তের ভেতরের খাঁচায় ধোঁয়ার মতো একটা অবয়ব ছটফট করছে। সাইর সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ব্যথাতুর শরীর নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল অর্কা। বলল„ —“জমিদারের ছোট জমিদার?”
অর্কা’র হাসির শব্দে সাইরের রাগ আরও চওড়া হলো। ধুলো ছিটিয়ে দিলো খাঁচার উপরে। তখনই অর্কা’র ব্যথাতুর শরীর আরও ব্যথায় ভরে গেলো।
সাইর গুহার দেয়াল কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠল„ —“তুই জানিস আমি তোকে এখানে কেন রেখেছি। তোকে বলেছিলাম তুলির থেকে দূরে থাক। কিন্তু তুই শুনিস নি। যদি তুলির এক চুল পরিমাণ ক্ষতি হয় তবে তোকে চিরতরে ছাই করে দেব আমি। বল‚ তুলি কোথায়?”
ব্যথাতুর কন্ঠে অর্কা বলল„ —“আমি জানি না।”
সাইর আরও রেগে গেলো„ —“বল বলবি কি না?”
অর্কা কোনো উত্তর দিলো না। সাইর তার দুই হাত প্রসারিত করতেই ডাবনার দুই পাশে ঈগলের দুটি পাখা বেরিয়ে এলো। খাঁচার ভিতরে ডানার ঝাপটা দিতেই অর্কার ধোঁয়ার কুন্ডলী নিভু নিভু হলো। খাঁচার ভেঙে দূরে ছিটকে সরে মাটিতে পরে গেলো। ধোঁয়ার কুন্ডলীটা হাতে নিলো সাইর। সাইর তার অনামিকা আঙুল কুন্ডলী মাঝে ঢুকিয়ে দিতেই একটা নেকড়ে হাজির হলো সামনে। সাইর অকপটে নেকড়ের গলাটা চেপে ধরলো।
অর্কা সাপের মতো হিসহিসিয়ে বলল„ —“তুলি তো এখন আমার হেফাজতে নয়, বরং তুলি তোর বাবার হেফাজতে। সে এখন তোর বাবার হাতের পুতুল। তবে তাকে পেতে হলে তোকে ‘নরক-পথ’ পাড়ি দিতে হবে সাইর। পারবি তো? নিজেকে বিসর্জন দিয়ে সেই পঁচা লাশের নদী আর হাড়ের জঙ্গল ডিঙিয়ে যেতে?”
সাইর নেকড়ে রূপি অর্কা’র গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরল। জোড় গলায় বলল„ —“পথ দেখা!”
অর্কা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে নিজের নখ দিয়ে মাটিতে এক আঁকাবাঁকা রেখা টানল। সাথে সাথে গুহার মেঝে দুভাগ হয়ে গেল। ভেতর থেকে বের হয়ে এল এক কুচকুচে কালো দীর্ঘ পথ, যেখান থেকে পঁচা লাশের তীব্র গন্ধ আর হাজার হাজার মানুষের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
অর্কা বিদ্রুপের সুরে বলল„ —“যা সাইর! এই পথের শেষে তোর বাবার সেই যজ্ঞের বেদী। কিন্তু মনে রাখিত আজ হয় তো তুই বাঁচবি নয় তো তোর বউ। এই পথে পা বাড়ালে মানে শরীরের গোস্ত একটা একটা করে দান হবে। তুলিকে পেতে হলে তোকে নিঃস্ব হয়ে পৌঁছাতে হবে তার কাছে।”
সাইর পেছনে ফিরে তাকালো না। সে সেই অন্ধকার গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সামনে যেতেই সাইরের সামনে ভেসে এল প্রথম বাঁধা। এক বিশাল নদী। পানিবিহীন নদী। পানি বিপরীতে নদীতে রয়েছে জমাটবদ্ধ মানুষের রক্ত। সেই রক্তে হাজার হাজার হাত কিলবিল করছে। সাইর সেই রক্ত-নদীতে নামতেই অনুভব করল তার পায়ের চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। হাতগুলো তাকে নিচের দিকে টেনে ধরতে চাইছে। বারবার মনে ভয় কাজ করছে তার। মনে হচ্ছে এই বুঝি নদীতে ডুবে হাতের আঁচড়ে মারা পরবে সে।
চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সাইর। লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সামনে তাকালো। নদীর উপরি ভাগ থকথকে কালচে রক্তের মতো লাল। সেখান থেকে যে বাষ্পিত ধোঁয়া উঠছে তার গন্ধে সাইরের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। ফুসফুসে বাতাসের বদলে বিষাক্ত আর্দ্রতা ঢুকে পড়ছে তার শরীরে।
এক পা এগোতেই হাঁটুর নিচ থেকে শত শত ঠান্ডা, হাড়সর্বস্ব হাত তাকে জাপটে ধরেছে। সেই হাতগুলোর কোনোটি কঙ্কালসার তো কোনোটির চামড়া ঝুলে পড়েছে আর কোনটি পঁচে গিয়ে বিশ্রী গন্ধ নাকে আসছে।
রক্তের নিচ থেকে অস্পষ্ট গলায় শত শত কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে উঠল„ —“যাস না। আমাদের এখানে তোর মুক্তি নেই, তুই আমাদের তৃষ্ণা মেটা। বড্ড তৃষ্ণার্ত আমরা।”
সাইর দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করল। নদীর প্রতিটি ঢেউ তার কাছে এক একটি আগুনের ঝাপটা। তার পায়ের চামড়া যখন অ্যাসিডসম রক্তে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এক বীভৎস দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কত-শত পূর্ণিমার রাতে কত-শত মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করেছে সে। আবার তাদের হত্যা করে তাদের রক্ত‚ মাংস এমনকি যকৃৎ পর্যন্ত সে ভক্ষণ করেছে।
হঠাৎই নদীর মাঝখানে হঠাৎ একটা মস্ত বড় খুলি ভেসে উঠল। যার কোটর থেকে লাভার মতো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। খুলিটা মুখ হা করতেই তার ভেতর থেকে সহস্র জোঁকের মতো জীবন্ত রক্তচোষা লতা বেরিয়ে এলো নদীতে।
সাইর তার দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। তার ক্ষত-বিক্ষত শরীর থেকে ঝরা রক্তগুলো নদীর সাথে মিশে নীল স্ফুলিঙ্গ তৈরি করছে। সাইর চোখ বন্ধ করে বিরবির করে কিছু বলতে লাগলো।
সাইরকে বিরবির করতে দেখে হঠাৎ একটি বিশালাকার পঁচা হাত তার গলা টিপে ধরল। তাকে টেনে-হিঁচড়ে সেই থকথকে রক্তের নিচে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। সাইর হাবুডুবু খেতে লাগল। তার নাকে-মুখে সেই নোনতা, তামাটে রক্ত ঢুকতেই গলগল করে বমি করল সে।
পানির নিচে হাজার হাজার চোখ স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা হাসছে। এক পৈশাচিক আনন্দ তাদের চোখের মণিতে। এতদিন সাইর সবাইকে বলী দিয়েছে আর আজ তাকে বলী দিতে উৎ পেতে আছে হাজারও নর-খাদক‚ নর-কঙ্কাল।
গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে বনের ভেতর ঢুকতেই হঠাৎ জমিদারের সামনে এক বিশাল নেকড়ে এসে পথ আগলে দাঁড়ালো। নেকড়েটির চোখের মণি আগুনের মতো লাল। আর শরীর থেকে পঁচা লাশের গন্ধ বেরোচ্ছে। নেকড়েটি মানুষের গলায় খিলখিল করে হেসে উঠলো।
নেঁকড়েটা হিসহিসিয়ে বলল„ —“দেরি করলি জমিদার! তোর ছেলে তো আমার মায়াজাল ছিঁড়ে ‘রক্ত-পথ’ পাড়ি দিচ্ছে। সে এখন আমার আর তোর ক্ষমতার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
জমিদারের চোখে কোনো পিতৃত্বের লেশমাত্রা নেই। সে লোভাতুর চক্ষু নিয়ে সাইরের মতো শত্রুর মোকাবেলা করতে যাচ্ছে। সে ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলল„ —“আমার অমরত্বের পথে যে আসবে, তার রেহাই নেই। চলো অর্কা, আজ পিতার হাতেই পুত্রের বলীদান সম্পন্ন হবে। সাইরকে আমি নিজের হাতে বলী দিবো! আর কাল পূর্ণিমায় বলী দিবো তুলিকে।”
রক্তের নদীর নিচে সাইরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সেই পিশাচ হাতগুলো‚ তার মনে হলো সহস্র বছরের জমাটবদ্ধ অন্ধকার তাকে গিলে খাচ্ছে। তার কানে বাজছিল সেই সব মেয়েদের আর্তনাদ, যাদের একসময় সে নিজের লালসা আর অর্কা’র তুষ্টির জন্য বলী দিয়েছিল। আজ যেন সেগুলো পাপের পাহাড় হয়ে রক্ত-নদী তাকে গ্রাস করতে চাইছে। সাইরের ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো, নাকে-মুখে নোনতা রক্তের স্বাদ ঢুকে।
হঠাৎ তার মনের কোণে তুলির সেই পবিত্র মুখটা ভেসে উঠল। যে মুখটা দেখার পর সাইর তার পৈশাচিক সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ হতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজের বাবার জন্য তা আর হলো না। আজ যত কালো জাদুই করতে হোক না কেন? যে কোনো কিছুর মূল্যে সাইর তুলিকে নিয়ে ফিরবেই।
সাইর প্রচণ্ড একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো। চিৎকারের ফলে সাথে সাথে পানির নিচে বুদবুদ হয়ে বেরিয়ে এলো। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে সেই বিশালাকার পঁচা হাতটির কব্জি কামড়ে ধরল। পৈশাচিক এক আর্তনাদ শোনা গেল জলের নিচে। সাইর তার নখ দিয়ে নদীর তলদেশের পড়ে থাকা কঙ্কালগুলো আঁকড়ে ধরে নিজেকে উপরের দিকে ঠেলে দিল।
নদী পার হতেই তার মুখ দিয়ে রক্ত পরছে। অনবরত গলগল করে বমি বেরোচ্ছে। কিন্তু সে এখন এক জখমি বাঘ। কোন কিছুতেই হার মানবে না এখন। টলতে টলতে নদীর ওপারে পা রাখতেই চোখর পরল জঙ্গল।
এদিকে বনের অন্ধকারে জমিদার মামুনুর আর নেকড়ে রূপী অর্কা দ্রুত গতিতে সাইরের দিকে এগোচ্ছে। জমিদারের হাতের আঙুলের নখগুলো লম্বা হয়ে গেছে, তাঁর গায়ের চামড়া কেমন যেন খসখসে সাপের মতো দেখাচ্ছে। মুহুর্তেই শকুনের রূপ নিলে জমিদার। অর্কা নেকড়ে রূপে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সামনেই পাহাড়ের সেই ফাটল যেখান দিয়ে নরক-পথের শুরু।
জমিদার মামুনুর ফাটলের দিকে তাকিয়ে এক বীভৎস অট্টহাসি দিলো। শকুন থেকে মানুষ রূপে পরিবর্তন হয়ে চূড়ার গুহায় গেলো। পকেট থেকে বের করলো একটি মাটির পাত্র। যাতে জমা করা আছে মানুষের হৃদপিণ্ডের তাজা রক্ত। জমিদার সামনে তাকিয়ে বলল„ —“অর্কা, আমার সন্তান যদি এই পথ পাড়ি দিয়ে বেদীর কাছে পৌঁছায়, তবে সে হবে আমার অমরত্বের সবচেয়ে বড় উৎস। পুত্রের রক্তে যখন এই মাটি ভিজবে, তখন চূর্ণচূড়ার রাজত্ব হবে চিরস্থায়ী।”
নেকড়ে রূপী অর্কা মাথা নোড়াল। তার মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। সে জানে, জমিদার এখন উন্মাদ। ক্ষিপ্ত সিংহের মতো তার আচরণ। ক্ষমতার লোভে সে নিজের বংশপ্রদীপ নেভাতেও দ্বিধা করছে না।
সাইর নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে দেখল সামনে এক বিশাল মরুভূমির জঙ্গল। যেখানে আছে কেবল মানুষের হাড়ের গুঁড়ো। মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়াময় অবয়ব। সাইর কাছে যেতেই অবয়বটা হারিয়ে গেলো। সাইর এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। তাকিয়ে দেখলো সামনে থেকে বিভিন্ন বিষাক্ত লতাপাতা তার দিকে এগিয়ে আসছে। সাইর তার হাতের আঙুল দিয়ে মাটিতে এক জোড়া ঈগলের চিহ্ন আঁকল। মুহূর্তেই হাড়ের মরুভূমি চিরে আগুনের লেলিহান শিখা বের হয়ে এল। সাইর সেই আগুনের ওপর দিয়েই দৌড়াতে শুরু করল।
সুড়ঙ্গের শেষে এক রক্তবর্ণের আলো দেখা যাচ্ছে। সাইর দ্রুত সেখানে পৌঁছালো। তার পেছনে ছুটে আসছে বিষাক্ত সেই লতাপতাগুলো। নিজের সমস্ত শক্তি ব্যয় করলো সাইর। তাকে যে করেই হোক তুলিকে বাঁচাতে হবে।
হাড়ের মরুভূমি পার হতেই সাইরের শরীর যেন জীর্ণ এক কঙ্কালসার কাঠে পরিণত হয়েছে। তার শরীরের ত্বক জায়গায় জায়গায় ফেটে রক্ত ঝরছে। সেই রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তৃষ্ণার্ত ধুলোবালি তা শুষে নিচ্ছে। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় থাকা সেই রক্তবর্ণের আলোটা এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
সুড়ঙ্গ থেকে বের হতেই এক বিশাল খোলা প্রান্তর দেখতে পেলো সাইর। মাথার ওপর আকাশের বদলে আছে পাথরের জমাটবদ্ধ এক গম্বুজ। মাঝখানে উঁচিয়ে থাকা এক বেদী, যা সম্পূর্ণ মানুষের হাড় আর মাথার খুলি দিয়ে তৈরি। বেদীর চারপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের কুণ্ড। আর সেই বেদীর ওপর নিথর হয়ে শুয়ে আছে তুলি। তার সাদা পোশাকটা এখন রক্তের কারণে কালচে হয়ে গেছে। তুলির গলার কাছে সেই শেকড়গুলো এখন জীবন্ত সাপের মতো তার শরীরের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে।
সাইর টলতে টলতে এক পা বাড়াতেই কান ফাটানো অট্টহাসি পুরো প্রান্তর কাঁপিয়ে তুলল„ —“অবশেষে পৌঁছালি তবে? নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে তবে নিজের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে এলি?”
সাইর মাথা তুলে তাকালো। বেদীর অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার মামুনুর রহমান। তার হাতের খড়ম আগুনের মতো জ্বলছে। জমিদারের পাশে সেই বিশাল রক্তচক্ষু নেকড়ে রূপী অর্কা।
সাইর ভাঙা গলায় গর্জন করে উঠল„ —“বাবা! আপনি নিজের অমরত্বের জন্য নিজের সন্তান আর এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে বলী দেবেন? এখনো সময় আছে ফিরে আসুন!”
জমিদার মামুনুর এক কদম এগিয়ে এলো„ —“মায়া? মায়া তো দুর্বলদের জন্য সাইর। তুই আমার রক্ত হতে পারিস, কিন্তু আজ তুই আমার পথের সবচেয়ে বড় বাঁধা।”
সাইর কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত জমিদারের কাছে গেলো। একটা ধোঁয়া তাদের দুজনের শরীরে ছুইয়ে দিয়ে তরতর করে উঠে পরলো আকাশের দিকে। খুলিগুলো পেরিয়ে তুলির কাছে পৌঁছে গেলো সে।
জমিদার আর অর্কা ধোঁয়ার সাথে মিশে জমিয়ে গেলো। তারা আর নড়াচড়া করতে পারছে না। দুজনই এক জায়গায় স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে।
সাইর চিৎকার করে উঠল„ —“তুলি! চোখ খোলো তুলি!”
কিন্তু তুলির কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। লতাগুলো দ্রুতগামী এগিয়ে আসছে সাইরের দিকে। সাইর কোনো কিছু ভাবার আগেই তুলিকে কোলে তুলে নিলো। চোখ বন্ধ করতেই ঈগলের দুটি ডানা হাজির হলো তার পীঠে। আকাশ পথে উড়াল দিলো তুলিকে নিয়ে। কিন্তু তুলিকে নিয়ে সে কোথায় যাবে এটাই এখন চিন্তা। যদি জমিদার বাড়িতে আবারও তারা যায়। তাহলে জমিদার বাড়ি ফিরলেই তাদের দুজনকে আবারও ধরে নিয়ে যাবে বলীর জন্য। এখন তাকে এবং তুলিকে লুকিয়ে থাকতে হবে। এমন জায়গায় যেতে হবে যাতে জমিদার কোন মতেই তার হদিস না পায়।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ🕊️
[ আগামী পর্বে গল্পের সমাপ্তি দিবো ইন-শা-আল্লাহ। সবাই বেশি বেশি মন্তব্য করবেন। কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু? ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

