#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৬
#জান্নাত_সুলতানা
খাবার খেতে বসে সানায়ার খাবার তালুতে ওঠে গেলো। কাশতে কাশতে মেয়ে টার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সানায়ার বরাবর তিয়ান বসে ছিলো সবার হুড়োহুড়ি মাঝে তিয়ান পানির বোতল এগিয়ে দেয় সানায়ার দিকে। নির্ভাণ তখন ফোনে কথা বলতে গিয়েছে অন্য পাশে। সে যতক্ষণ এখানে উপস্থিত হয়েছে সানায়া তখন তিয়ানের দেয়া পানিটুকু খেয়ে হাঁপাচ্ছে। নির্ভাণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। প্রিয়ম আফির আর সানায়ার মাঝের চেয়ারে বসে ফিসফিস করে, “হাউ কেয়ারিং আপু। ইশ।”
“আবার ফুসুরফুসুর করছো? চুপচাপ খাবারে মনোযোগ দাও।”
পাশ থেকে নিজাম সিদ্দিকী বলেন। তাই ওরা খাবার খেতে লাগলো আবার। নির্ভাণ হাতে থাকা পানির বোতল টা সবার অগোচরে দূরে ফেলে দিলো। আর নিজের চেয়ারে বসে পড়লো। খাওয়ার ফাঁকে নির্ভাণ এক বারের জন্য ও আর সানায়ার দিকে চোখ তুলে তাকায় নি আর না কারোর সাথে একটা বাক্য বিনিময় করেছে। সানায়া একটু ভাবুক হয় হঠাৎ হঠাৎ কী হয় এই মানুষ টার কে জানে।
—-
আফি গাড়িতে একটু বাঁকা হয়ে বসে ফোনে কিছু দেখছিলো। মেয়ে টার চোখ-মুখ তখন স্বাভাবিক ভাবে কেমন লাজুক দেখাচ্ছিল। সানায়া ভ্রু কুঁচকে নেয়। আর একবার দেখার চেষ্টা করে ফোনে কী আছে। তবে তা দেখার আগেই আফি ফোন বন্ধ করে নিজের ব্যাগে নিয়ে নেয়। সানায়ার মুখ পাংশুটে হয়ে যায়। মুখ ভেংচি কাটে সে। আর ফিসফিস করে বলে, “দেখো একদিন আমার ও ফোন হবে। হুঁ।”
“আগে এসএসসি পাশ কর। তারপর না ফোনের স্বপ্ন দেখবি।”
আফি কাঁধ ঝাঁকাল। সানায়া চোখ মুখ অন্ধকার করে নেয়। আর মুখ বাংলার পাঁচ বানিয়ে প্রিয়মের কানে কানে ফিসফিস করে, “দুইটা ভাইবোন এক ক্ষেতের মুলা প্রিয়ম। দেখতে ভালো কিন্তু ভেতর টা আসলে গন্ধে ভরা।”
প্রিয়ম বাবার ভয়ে ঠোঁট চেপে হাসে৷ আফি শুনেছে। আর মিটমিট করে হাসছে। সতেরো বছর হতে চললো মেয়ে টার। কিন্তু ব্যবহার এখনো সাত বছরের বাচ্চার মতো। সেহের সামনে বাবার কোলে বসা। নির্ভাণ ড্রাইভিং করছে। সেহের ভাইয়ের সাথে গল্পে মেতে আছে। নির্ভাণের সাথে ছেলেটার ভারি ভাব। বাড়ির ছোট হওয়ার সুবাদে যেমন সবাই আদর করে তেমন সে নিজেও খুব ভদ্র। যেমন পড়াশোনায় ভালো তেমন বাধ্য ছেলে। তাদের কথাবার্তা বেশিভাগ পড়াশোনা নিয়ে হয় আর নয়তো গেইম। এখন কী নিয়ে হচ্ছে কে জানে। তবে হঠাৎ করে সেহের পেছনের দিকে ফিরে বোনদের উদ্দেশ্য বলে উঠলো, “আপু আজ মুভি দেখবে?” কথাটা যদিও সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেছে যেনো বাবা আর ভাইয়ের কানে না পৌঁছায়। তবে ওর বাবা শুনে ফেলে। আর গম্ভীর স্বরে বলেন,
“কোনো মুভি টুভি হবে না। অনেকটা জার্নি করা হয়েছে সবাই ঘুমবে বাড়ি ফিরে।”
“ঠিক আছে ছোট আব্বু।”
আফি মেনে নেয়। সেহেরের মন টা খারাপ হয়। সানায়া ওকে ইশারায় কিছু বলতেই সেহের ঠোঁট প্রসারিত করে। নির্ভাণ লুকিং মিরের সানায়ার ইশারা দেখে ফেলে।
—–
তিন বান্ধবী মনোযোগ দিয়ে উপন্যাস পড়ছে। তিনজনের হাতেই উপন্যাসের বই ছিলো। সবার মধ্যে তায়েবা হঠাৎ করে বই বন্ধ করে কিছু মনে পড়ার মতো করে বলে উঠলো, “সৈকত ছেলেটাকে না-কি সেদিন কারা যেনো মেরেছে ইয়ার।” ওর এমন হঠাৎ এতোটা সিরিয়াস হতে দেখে কিছু টা হতভম্ব হয়ে যায় সবাই। বুঝতে পারছে না কে সেই ছেলে আর এই মেয়ে সেই ছেলে কে নিয়ে এতো সিরিয়াসই বা কেনো? সানায়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“সৈকত কে?”
রিক্তা ঠাশ করে কপাল হাত রাখে। হতাশ হয়ে বলে, “তুই যার জন্য গান গাইলি।”
সানায়া জোর করে হাসে। আসলে ওর তেমন কোনো ছেলের প্রতি আগ্রহ নেই। নামধাম কোনো কিছু নিয়ে ও নয়। সানায়ার ছেলেটার কথা মনে পড়তেই সাথে মনে পড়লো নির্ভাণের সেই হুমকি। ও দ্রুত মাথা নাড়ে আর বান্ধবীদের সাথে গোপন আলোচনায় লেগে পড়ে। আসলেই এটা ভাবার বিষয় ছিলো।
—–
আজ সানায়া কে পড়তে আসার জন্য ডাকতে হয়নি৷ নিজেই চলে এসছে নির্ভাণ বাড়ি ফেরার পর। হাতে সব সময়ের মতো কফির মগ আরেক হাতে বুকে চেপে রাখা বই খাতা। নির্ভাণ কফির মগে ধীরে চুমুক দিতে দিতে খাতা দেখে। আজ অংক ভালোই করেছে সানায়া। নির্ভাণ তবুও বলে,
“পরীক্ষা শেষ গানের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।”
“আমি সেদিন ইচ্ছে করে গান গাইনি। আমি শুধু খেলার রুলস অনুযায়ী শর্ত পূরণ করেছি।”
সানায়া নরম কণ্ঠে বলে। ঠোঁট উলটে মাথা নিচু করে রাখে। নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে নেয়।
“স্কুল তো তুই পড়তে যাস না। গান গাইতে আর খেলতে যাস।”
নির্ভাণ তাচ্ছিল্যের সুরে বললো। সানায়ার কান্না পায়। তিনি এক লাইন বেশি বুঝে। সে মরিয়া হয়ে আছে নির্ভাণ সত্যি টা জানলে আর তাকে খারাপ মেয়ে ভাববে না। তাই সত্যি টা জানুক আগে তিনি। কিন্তু কী দরকার এটার? সে কেনো এই মানুষ টাকে সত্যি মিথ্যা প্রমাণ দিতে এতো মরিয়া?
—-
স্কুলে ছেলে টাকে সানায়া না দেখে স্বস্তি পায়। ওই বেয়াদব ছেলে ওকে শুধু ভয় দেখায়। এভাবে কেটে যায় কয়েকদিন। ইদানীং নির্ভাণ আরও ব্যাস্ত। ভার্সিটি থেকে রাত করে ফিরে কাজ শেষ করে। সেইজন্য সানায়া কেও পড়াতে পারছিলো না। কাল ষোলই ডিসেম্বর।
আর যেহেতু সানায়া টেস্ট এক্সাম দিয়ে ফেলেছে আর ফর্ম পূরণ ও করে ফেলেছে তাই ওদের ষোল ডিসেম্বরে স্কুল যাওয়ার দরকার নেই। নির্ভাণ গত দিন গোসল দেয়নি। আজ রাতেও সে হলে থাকবে। সানায়া এটা জানতো। নির্ভাণ ভাই প্রায় প্রতি বছর এমন করে। সানায়ার মন টা হঠাৎ করেই নির্ভাণ ভাইয়ের কাছে পড়তে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করলো। তার কেমন জানি কিছু একটা নেই মনে হচ্ছে আজ দু’দিন ধরে। রোজ রোজ পড়তে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে হয়তো।
সিঁড়ির ওপর সিলিং এ লাইট জ্বলছে। সানায়া সেই আলো ধরে এগুচ্ছে নির্ভাণ ভাইয়ের রুমের দিকে। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে যেন নির্ভাণ ভাই রুমে থাকে। দরজা চাপানো ছিলো। খুব সাবধানে সে কক্ষে পা ফেললো। বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে আছে নির্ভাণ। খালি গায়ে কোমর পর্যন্ত কম্ফর্টার টেনে দেওয়া। বলিষ্ঠ দেহ প্রায় উপরিভাগ উন্মুক্ত। পেশিগুলো তার ভেসে কয়েক খন্ডে। মেরুদন্ডটির খাঁজ স্পষ্টতই ফুটে আছে। দরজায় আলতো হাতে টোকা দেয় সানায়া।
“কে?” ঘুমঘুম কণ্ঠ পুরুষ টার। সানায়ার গলা শুঁকিয়ে যায়। সে কণ্ঠ উঁচিয়ে তবুও জবাবে বলে উঠলো,
“আমি। ঘুমিয়ে আছেন নির্ভাণ ভাই?”
“উম, কী হয়েছে?”
নির্ভাণ শোয়া থেকে উঠে বসলো। হেড বোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসে ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়। সানায়া হাত কচলায়। জিজ্ঞেস করে,
“আজ পড়াবেন না? অনেকদিন পড়ান না।”
নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে নেয়। অবাক হয়ে বলে উঠলো,
“অনেকদিন কোথায়? মাত্র চারদিন পড়াইনি।”
“কিন্তু এক্সাম কিছুদিন পর। আমার কাছে চার মিনিট ও খুব ইম্পর্ট্যান্ট সেখানে আপনি চার দিন ধরে পড়াচ্ছেন না।”
“তাড়াতাড়ি আসবি। আমাকে এক ঘন্টা মধ্যে বেরুতে হবে।”
নির্ভাণ গম্ভীর স্বরে কথা বলতে বলতে ফ্লোরে পা ফেলে৷ উন্মুক্ত শরীর। পরনে একটা ট্রাউজার। সানায়া দৃষ্টি দ্রুত ফ্লোরে রাখে। আর যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়ে বলে,
“আমি বই নিয়ে আসছি এক্ষুণি।”
নির্ভাণ ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকালো। চোখ দু’টো রক্তজবার ন্যায় লালিমা ধারণ করেছে। চোখে রাজ্যের ঘুম তার। শরীর ক্লান্ত। তবুও সে জোর করে ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসে রইলো। সানায়া একটা কফি হাতে এলো রুমে। নির্ভাণ কফি পেয়ে তাতে দ্রুত চুমুক বসায়। এই মূহুর্তে এটার খুব দরকার ছিলো। সানায়া ফ্লোরে বসে। অংক বই বের করে অংক করতে থাকে। নির্ভাণ ক্লান্ত শরীর নিয়ে ওকে অংক বুঝিয়ে দেয়। আর সানায়া ফাঁকে ফাঁকে নির্ভাণ ভাইয়ের দিকে তাকায়। চাপদাড়িতে জলের ছোঁয়া আছে কিছু টা। চোখের পাতা ফুলে আছে মানুষ টার। নাকের ডগাটা লাল। চোখ দু’টো থেকে তখনও ঘুম ঘুম ভাবটা কাটেনি। কফির মগে ঠোঁট গোল করে যখন ফু দিচ্ছে যেনো সদ্য ফোঁটা গোলাপের পাপড়ির মতোই নাজুক মনে হচ্ছে ওষ্ঠদ্বয়। সানায়া সাথে সাথে নিজের দৃষ্টি সংবরন করে। আশ্চর্য! মানুষ কে ঘুম থেকে উঠলে এতো সুন্দর লাগে না-কি? কই আগে তো কখনো এমন মনে হয়নি। না-কি তিনি আগেও সুন্দর ছিলো সে নিজেই খেয়াল করেনি!
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
