আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_৮ #জান্নাত_সুলতানা

0
28

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৮
#জান্নাত_সুলতানা

“আমি যেতে পারব।”

“জিজ্ঞেস করেছি তোকে?”

নির্ভাণ বিরক্তিকর স্বরে বললো। সানায়া সাথে সাথে মাথা নাড়ে। নির্ভাণ বাইকে বসে সানায়া কে ইশারা করে। বাইকে বসলো সানায়া যথেষ্ট দুরত্ব রেখে। নির্ভাণ বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে একবার ভিউ মিররে দেখে নিলো সানায়া কে। এরপর গম্ভীর স্বরে আদেশ দিলো, “ধরে বোস।”

সানায়া থতমত খেলো। এক হাত আলগোছে নির্ভাণের কাঁধে রাখলো। বাড়িতে যাওয়ার আগে নির্ভাণ ওকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে থামলো। সানায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“বাড়ি যাবো না?”

নির্ভাণ কোনো জবাব দিলো না। বাইক পার্ক করে এসে বললো, “আমার সাথে আয়।”

সানায়ার ইচ্ছে না থাকলেও এখন কোনো উলটা পালটা বলে নির্ভাণ ভাইয়ের ধমক খেয়ে এই মাঝ রাস্তায় সম্মান হারাতে চাইছে না। তাই অনুসরণ করলো নির্ভাণ কে। একটা কোণের টেবিলের কাছে যাওয়ার পরপরই একটা ছেলে দৌড়ে এলো। ভার্সিটির পাশে হওয়াতে রেস্টুরেন্টটা এখানে প্রায় যাতায়াত হয় নির্ভাণের। ছেলেটা ওকে দেখেই অস্থির হলো। মেনু কার্ড দিয়ে ঠান্ডা পানি দিলো। নির্ভাণ দুপুরের খাবার অর্ডার দিয়ে সানায়া কে উদ্দেশ্য করে বললো,

“যা ফ্রেশ হয়ে আয়।”

ইশারা করে ওয়াশরুম দেখালো। সানায়া কিছু না বলে হাতমুখ ধুয়ে ফিরে এলো পাঁচ মিনিটের মধ্যে। খাবারের গন্ধে পেট শব্দ করতে শুরু করলো। নির্ভাণ চেয়ারে বসে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “ভার্সিটিতে কেনো গিয়েছিলি?”

সানায়া মাথা নিচু করে নিলো। কিছুতেই সত্যি বলা যাবে না আর মিথ্যা বললেও লাভ হবে না। নির্ভাণ ভাই ঠিক কোনো না কোনো ভাবে সত্যি জেনে যাবে। ওকে নিশ্চুপ দেখে নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেললো। তেহারি এবং একটা কফি নিয়ে হাজির হলো ওয়েটার ছেলেটা। খাবার একটা টা দেখে সানায়া ভ্রু কুঁচকে নিলো। ছেলেটা বলে উঠলো, “ভাইয়া আপনি খেলে খুশি হইতাম।”

“লাঞ্চ করেছি আমি তারেক। আরেকদিন আসবো আবার।”

“আপনার পরীক্ষা শেষ হলে তো আর এদিকে আসবেন না ভাই।”

“আসবো আসবো৷ তুই মন দিয়ে কাজ কর আর কোনো ঝামেলা করিস না।”

তারেক ছেলেটা পকেটমার ছিলো আগে। একদিন ভার্সিটি যাওয়ার পথে নির্ভাণের মানিব্যাগ পকেট থেকে বের করে নিচ্ছিল প্রায়। তবে বিচক্ষণ পুরুষ এটা হতে দেয়নি। তৎক্ষনাৎ ধরে ফেলে। তারেকের বয়স তখন চৌদ্দ। ভয়ে ছেলেটা প্রায় আধমরা। নির্ভাণ বুঝে ছিল এই ছেলে প্রফেশনাল নয়। হয়তো কোনো কারণ আছে এই কাজের পেছনে। কথা বলে জানা গেলো বাবা মা কেউই নেই। পরিবার বলতে এক দূরসম্পর্কের আত্মীর সাথে থাকে। আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল নয় পরিবারটা। আর কিছু টা বাধ্য হয়ে এসব করছে তারেক। তারউপর ছেলেটা কর্মট নয়। অলস প্রকৃতির, তাই তো সহজে ইনকাম করার মাধ্যম বেছে নিয়েছে পকেটমার।

নির্ভাণ ছেলেটার সাথে কথা শেষ করে ফোন বের করে। সানায়া খাবার খেতে ততক্ষণে শুরু করেছে। নির্ভাণ ফোন হাতে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সানায়া খাবার টা অর্ধেক খেলো। পুরো এক প্লেট তেহারি কিংবা বিরিয়ানি কোনোটাই সে সম্পূর্ণ খেতে পারেনা। খাওয়া শেষ নির্ভাণ বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য উদ্যত হতেই সানায়া পেছন থেকে বলে উঠলো,

“অনেক গরম। একটা আইসক্রিম কিনে দেন না নির্ভাণ ভাই।”

সানায়ার ঠান্ডা খেলে সহ্য হয় না। গলা ব্যথা হয় সাথে সাথে। নির্ভাণ ওর দিকে একবার তাকিয়ে ওয়ালেট পকেটে ঢুকিয়ে বললো, “ঠান্ডা খেতে হবে না।”

পরপরই ওয়েটার ডেকে একটা কোল্ড ড্রিংকস নিলো ওর জন্য। সানায়া মুখ ভোঁতা করে নেয়। এটা আর আইসক্রিমের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আইসক্রিম ঠান্ডা এটা কী গরম?

“কিনেই যখন দিবেন তো আইসক্রিম নিলে কি-ই বা হতো।”

নির্ভাণ কোনো কথা বললো না। দুই হাতের তালুর মাঝে কিছু সময় ক্যান টা চেপে ধরে রাখে। ঠান্ডা ভাব টা কেটে যেতেই সেটা সানায়াকে দিলো। সানায়া তপ্ত শ্বাস ফেললো। বোতলের ছিপি খুলে অর্ধেক খেয়ে বাকিটা অনেকটা জড়তা নিয়ে নির্ভাণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জড়ানো কণ্ঠস্বরে বলে, “আমি আর খাবো না।”

নির্ভাণের চলন্ত পা থেমে গেলো, ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে সানায়ার দিকে চাইলো। সানায়া সামনে মাথা উঁচিয়ে নির্ভাণ কে দেখে ফের দৃষ্টি নত করে। সে এটা বাড়িতে নিতে চাইছে না। মা তাকে ঠান্ডা খেতে দেখলে বকাঝকা করবে। আর এটা আর আইসক্রিম দুইটার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। নির্ভাণ নিবে কি-না জানা নেই। কিন্তু সানায়ার এখন মনে হচ্ছে এটা না সাধাই ভালো ছিলো। ধমক টমক নিশ্চয়ই নির্ভাণ ভাই দিবে। এই পুরুষ খাবে তার খাওয়া এঁটো খাবার? কখনো না। হাজার টা নিজের মনে তৈরী করা কথাগুলো নিয়ে হাত টা গুটিয়ে নিচ্ছিল ঠিক তখনই নির্ভাণ বাঁধ সাধল। খপ করে ওর হাত থেকে ক্যান টা ছিনিয়ে নিলো। সানায়া থতমত খেয়ে হাত গুটিয়ে নিলো। তবে পরক্ষণেই ওর ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম এক হাসি ফুটে উঠলো।

—–

আফি প্রিয়মের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিল সানায়া৷ সেহের টিউশনি থেকে ফিরেনি তখনও। তাদের টপিক ও সেহের এবং এই বাড়ির মেঝো ছেলে কে নিয়ে। সে না-কি খুব শীগ্রই দেশে আসবে। এটা নিয়ে কথা উঠলেই আফি কেমন উৎসুক হয়। সাথে চোখেমুখে কেমন একটা অস্থিরতা দেখা দেয়। ওদের কথাবার্তা চলছে এরমধ্যে এসে উপস্থিত হলো আরোরা।

“দু’দিন বাদে পরীক্ষা। সে খবর আছে? যা পড়তে। নির্ভাণ ডেকেছে।”

সানায়া মলিন মুখে মাথা নাড়ে। মায়ের কথামতো রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

নির্ভাণ ভাই সত্যি ওর খাওয়া ক্যান টা সেদিন খেয়েছে। সানায়ার আজো এটা ভাবলে বুক ধড়ফড় করে ওঠে। মায়ের সে-ই বিরক্তিকর কঠিন মুখের শাসানি নিমেষেই বাষ্পীভূত হয়ে যায়। মানুষ টার কথা ভাবলেই কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়। বই নিয়ে দুরুদুরু বুকে সানায়া নির্ভাণের কক্ষের সামনে উপস্থিত হলো। সেদিনের পর আজ দু’দিন বাদে নির্ভাণ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। কিছুদিন পর থেকে পরীক্ষা সানায়া তাই উপেক্ষা করেনি। যদিও ভেবেছিল মায়ের অগোচরে সে রুমে বসে থাকবে। কিন্তু নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে চলেই এসছে শেষমেশ।

“আসবো নির্ভাণ ভাই?”

সানায়া মিহি স্বরে অনুমতি চায়। নির্ভাণ সোফায় একটা বই নিয়ে বসে আছে। বাইরে থেকে একটু একটু দেখা যাচ্ছে মানুষ টাকে। গায়ে সাদা একটা টি-শার্ট।
নির্ভাণের মনোযোগ সম্পূর্ণ বইয়ে ছিলে তাই আনমনে অনুমতি দিলো,

“হুঁ, আয়।”

সানায়া গুটি গুটি পায়ে কক্ষে প্রবেশ করলো। এসে ফ্লোরে বসলো। নির্ভাণ এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলো,” বই খোল।”

সানায়া বই হাতে নিতেই ওর কোলে সেদিনের সে-ই চিঠির খাম ঝপ করে পরল। সানায়া থতমত খেলো। নির্ভাণ দেখার আগেই ওটা বইয়ের ভেতর রেখে দৃষ্টি তুলে নির্ভাণের দিকে তাকাতেই দেখলল নির্ভাণ চোয়াল শক্ত করে ওকে দেখছে। সানায়া ঘাবড়ে গেলো। কিছু বলার আগেই নির্ভাণ কঠিন স্বরে বলে উঠলো, “কী ওটা? দেখা।”

সানায়া ভরকে গেল। বইটা আঁকড়ে ধরে বললো, “কিছু না।”

“দেখাতে বলেছি।”

নির্ভাণের কঠিনতম শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। সানায়া ঢোক গিলে। নির্ভাণ বইটা ধরতেই সানায়ার হাত ঢিলে হয়। নির্ভাণ বইয়ের ভেতর থেকে খাম বের করে। আর সানায়া যা কল্পনা ও করেনি তাই হলো। নির্ভাণ ওটা পড়ে চিঠি টা ছিঁড়ে ফেললো। সানায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মানুষটার বিরক্তি মাখা মুখের দিকে।

“আপনি যা ভাবছেন,,, ”

সানায়া কথা সম্পূর্ণ করতে পারে না। নির্ভাণ তার আগেই বসা ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল। সানায়া ভয় পেয়ে নিজেও ফ্লোর থেকে ওঠে দাঁড়ায়। নির্ভাণ কোনো কিছু না বলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে যেতে ধরে রুম থেকে। সানায়ার ভয়ে শরীর হিম হয়ে আসে। থরথর করে কাপে শরীর। তিনি কী কোনো ভাবে ভেবে নিয়েছে এটা সানায়ার? এইজন্যই কী এখন মায়ের কাছে বিচার দিতে যাচ্ছে? সানায়া এটা ভাবতে গিয়ে ভয়ার্ত হলো। মায়ের কানে এসব গেলে একটা থাপ্পড় ও মিস হবে না। সবগুলো তার পিঠে আর গালে পরবে। সানায়া এলোমেলো পায়ে নির্ভাণের পেছনে ছুটে। সে চেষ্টা করলো বারকয়েক নির্ভাণ কে বলতে “তিনি যা ভাবছে তেমন নয় ব্যাপার টা।” কিন্তু সানায়ার কণ্ঠনালী দিয়ে একটা শব্দও বেরিয়ে আসছে না, আশ্চর্য!

#চলবে……

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here