আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_১৮

0
34

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৮
#জান্নাত_সুলতানা

“সানা কিভাবে যাবে? ওর শরীর কাঁপছে ভয়ে।”

মাঠে যেতে খাল বেরিয়ে বাঁশের পুল দিয়ে যেতে হয়। বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরি করে বানানো এই পুল। এক এক করে সবাই পেরিয়ে গেলেও সানায়া আফি নির্ভাণ পেছনে রয়ে গিয়েছে। সানায়া আফির হাত ধরতেই আফি টের পেলো বেচারির শরীর কাঁপছে। আফি নিজেও সাহস পাচ্ছে না যাওয়ার। সেখানে আরেকজন সাথে নেওয়ার তো বিলাসিতা।

আফির ভয়ার্ত স্বর সবার কানে পৌঁছাল। নির্ভাণ গুরুগম্ভীর স্বরে বললো, “সবাই যাও। সানা কে আমি নিয়ে আসছি।”

সবাই অবাক এবং ভাবুক হলে-ও নির্ভাণের ওপর ভরসা আছে বিধায় নিশ্চিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।

“আমি কিছুতেই যাবো না নির্ভাণ ভাই। আপনি চলে যান।” সানায়ার ভীত কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর। নির্ভাণ আচমকাই ওর কোমরে এক হাত এবং হাঁটুর নিচে অন্য একটা হাত নিয়ে ঝুঁকে কোলে তুলে নিলো ওকে। সানায়া ভয়ে চমকে ওঠে নির্ভাণের জ্যাকেটের কলার চেপে ধরলো। বিস্মিত দৃষ্টিতে হতভম্ব হয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে নির্ভাণের মুখের দিকে তাকালো। নির্ভাণ শান্ত এবং স্বাভাবিক ভাবে পুলের ওপর দিয়ে হাঁটা ধরলো। পুল ক্ষণেক্ষণে কেঁপে ওঠে। সেই সাথে সানায়ার ভয় দিগুণ হয়। ভয়ে চোখ বন্ধ করে নির্ভাণের বুকে মুখ গুঁজে। এতোটাই ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে মেয়ে টা খেয়াল পর্যন্ত করলো না যে বুকে সে লেপটে আশ্রয় নিলো সেই বক্ষে চামড়া ভেদ করে যে একটি হৃদযন্ত্র রয়েছে সেটার অস্বাভাবিক স্পন্দন।

—–

সরিষা লাগানো প্রায় জমি গুলোতে। শীতের শিশিরে ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটতে সেহের জুতো খুলে হাতে নিয়ে ছিল। তবে বড়ো ভাইয়ের ধমক খেয়ে সে আবারও জুতো পায় দিয়ে মুখ ভার করে রাখে। সানায়া মেয়েদের মধ্যে সবার পেছনে। আর নির্ভাণ ঠিক ওর পেছনে। সানায়া হাত দিয়ে সরিষা গাছের শিশির ছুঁয়ে দিচ্ছে। একান্ত আজ সানায়াকে ছেড়ে আফিকে দেখছে। তিয়ান তপ্ত শ্বাস ফেললো। না চাই তেও দৃষ্টি তার-ও চৌদ্দে পা রাখা প্রিয়মের দিকেই যাচ্ছে। সে নিজেই বিব্রত হচ্ছে। কী আশ্চর্য! সে ও বন্ধুর বোনের প্রেমে পড়ছে না-কি? না। না। তা কখনো হতে দেওয়া যাবে না যে।

“একটু খালি পায়ে হাঁটি? হাঁটব?”

সানায়া আস্তে আস্তে বলে। নির্ভাণ আচমকাই ওর প্রশ্নে থমকে গেলো। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “উম, না। দরকার নেই।”

“একটু? দেখুন রাস্তায় চলে এসছি আমরা। প্লিজ এইটুকু যায়গা হাঁটি।”

সানায়ার সাথে সেহেরও তাল মেলায়। নির্ভাণের তখন ভারিক্কি সুর পরিবর্তন আসে না। বললো,

“পায়ে পোকামাকড় অনেক কিছু লাগতে পারে। সো এসব করার দরকার নেই।”

সানায়া চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো। কী এক মুসিবত রে বাবা৷ এ কেমন নিরামিষ মানুষ? নির্ভাণের সাথে আর কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না। ধুপধাপ পা ফেলে সানায়া আগে আগে চলে গেলো। নির্ভাণ কে পেছন থেকে তিয়ান বললো, “ওর সাথে একটু সুন্দর করে কথা বলতে পারিস ব্যাটা।”

নির্ভাণ কিছু সময় নিশ্চুপ থাকে। যায়গা টা ফাঁকা হতেই উদাস কণ্ঠে বললো, “ও আমাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবে। আমি চাইনা আমার জন্য এমন কিছু অনুভূতি ওর মনে জন্মায়।”

“কেনো কেনো? সানায়াশা খারাপ কী?” তিয়ান নির্ভাণ দু’জনেই হতভম্ব হয়ে পেছনে তাকাল। ইকবাল পেছনে প্যান্টের জিপার লাগাচ্ছে। তিয়ান দাঁত কিড়মিড় করে। এতোগুলা মেয়ে আর এই বেয়াদব এখানে এসব করছিল! এরমধ্যে নির্ভাণের দীর্ঘ শ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যায়। সে বলে,

“ও আমার চেয়ে অনেক ছোট।”

“এটা এমন কোনো মহা সমস্যা নয়। এখন এসব এইজ গ্যাপ নরমাল।” ইকবাল সব সময় চিল মুডে থাকে। এইজন্যই বোধহয় ওর সব বিষয় নিয়ে চিন্তা কম।

“এই যে সব কিছু সহজভাবে নিতে পারিস, তোর মুখ এইজন্যই বেশি গ্লো করে ইক বাল।” তিয়ানের রসাত্মক স্বর নির্ভাণ ঠোঁট চেপে হেঁসে উঠলো। ইকবাল খ্যাকখ্যাক করে হাসছে। তার মা-ও এই কথা বলে। তবে তার বাবা তার এরূপ খামখেয়ালি ব্যবহার একদম পছন্দ করে না।

সানায়া উল্টো পথে গিয়ে একটা ফার্মে ঢুকেছে সবাই তখন সেখানে গেলো। এটা চৌধুরী পরিবারের। বিশাল বড়ো ফার্ম হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, কুয়েল পাখি বিভিন্ন রকমের শীতকালীন শাকসবজি কোনোটার কমতি নেই। একান্ত এবং ছোট মামা তাদের ঘুরঘুর করে সব দেখাতে লাগলেন।

“আমরা আজ চলে যাচ্ছি।” ইকবাল রাফাকে উদ্দেশ্য করে বলে। রাফা অন্যমনস্ক ছিলো। অন্যমনস্ক ছিলো বলতে সে নির্ভাণ কে দেখছিল। ইকাবালের কথায় হকচকিয়ে জবাব দিলো,

“আবার আসবেন।”

“হয়তো আর কখনো আসা হবে না এভাবে।” একটু থেমে আবারও ইতস্তত করতে করতে বললো, “তুমি তোমার নাম্বার টা দিয়ো। মাঝেমধ্যে ভালো মন্দ খবর নিলে সমস্যা কোথায়?”

“না। সমস্যা নেই।” রাফা না চাইতেও রাজি হয়। এই ছেলেকে মোটেও সুবিধার লাগেনি এই তিন দিনে। কেমন সুযোগ পেলেই ফ্লার্ট করে তার সাথে।

আফি একান্ত প্রায় পাশাপাশি হাঁটছে। নির্ভাণ তা দেখে ওদের মাঝখানে চলে এলো। একান্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেল। সে কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই নির্ভাণ দাঁতে দাঁত চেপে হুমকি দিলো, “আমার বোনের থেকে দূরে থাক।”

একান্ত শয়তানি হেঁসে সানায়ার দিকে তাকায়। নির্ভাণের শরীরে যেনো কেউ কেরোসিন ঢেলে দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সে একান্ত কে পারলে এক্ষুণি এক ঘুষি বসিয়ে দিতো।

“বোনকে প্রটেক্ট কর। আমি তোর কাজিনের কাছে গেলাম।”

নির্ভাণ আচমকাই একান্তর হাত টেনে ধরলো। সানায়ার কাছে সে কিছুতেই যেতে দিবে না ওকে। একান্ত বাঁকা হেঁসে বললো, “তুই আমার রাস্তায় এলে আমিও তোর রাস্তায় যাব। সিম্পল।” নির্ভাণ কিছু বলার আগেই আফির দিকে তাকাল। সে সানায়ার সাথে কথা বলছে৷ নির্ভাণ কিছু না বলে একান্তর সাথে চোখে চোখে এক দফা যুদ্ধ করতে ছাড়ল না।

—–

দুপুর থেকে সানায়া ভেবেছিল নির্ভাণের সাথে আর কথা বলবে না। না মানে কোনো কথা না। কিন্তু তা আর হলো না৷ পুরো এক গাড়ি ভরতি করে তন্বী রহমানের ভাইয়েরা শীতকালীন শাকসবজি থেকে শুরু করে পুকুরে মাছ। দেশি মুরগী। ফার্মের নিজেদের গোরুর দুধ আরও অনেক কিছু দিয়েছে। নিবে না। এটা যেনো ওনারা শুনতেই পারছে না। কিংবা মেনে নিচ্ছেন না।
এতে করে মানুষ যাওয়ার যায়গা কমেছে। আফির আবার জ্বর এসছে হঠাৎ করে। বাইকে সে কিছুতেই বসে যেতে পারবে না। তিনজন মোট তিনটা বাইকের পেছনে বসতে হবে। ছোট মামা এবং মেঝো মামা ইকবাল তিয়ানের পেছনে বসলো৷ এখন সানায়াকে না চাই তেও নির্ভাণ ভাইয়ের বাইকে বসতে হবে। সবার গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর-ই নির্ভাণ বাইক স্টার্ট করলো। তৎক্ষনাৎ রাফা দৌড়ে এলো। লাজুক সংকোচ নিয়ে হড়বড়িয়ে বলে, “আপনার ফেসবুক আইডি নেই? অনেক খুঁজেও পাইনি।”

নির্ভাণের মেজাজ খারাপ হলো। এই কথা জিজ্ঞেস করতে এই মেয়ে এভাবে দৌড়ে এসছে? নির্ভাণের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু বলার আগেই সানায়া জবাবে বলে উঠলো,

“নির্ভাণ ভাই এসব চালায় না।”

“আচ্ছা আসি আমরা। মামনি আপনারা সবাই যাবেন।” নির্ভাণ একটু দূরে দাঁড়ানো মামিদের স্বর উঁচিয়ে কথা গুলো বললো। আর বাইক স্টার্ট করে এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। চলতি বাইক সানায়া নির্ভাণের কাঁধে স্বেচ্ছায় হাত রাখে। নির্ভাণ এলোমেলো হলো। তার অনুভূতি নাড়াচাড়া শুরু হলো। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,

“তুই এমন করছিস কেনো?”

নির্ভাণের কথায় সানায়া নিশ্চুপ। কোনো কথা না বলে ফের দুই হাত নির্ভাণের দুই কাঁধে রাখে। নির্ভাণ আচমকাই এমন স্পর্শে নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে সে সহজেই তা নিজের কাছে মেনে নিলো না। নিজেকে শান্ত রেখে রাস্তায় মনোযোগ দিলো। সানায়া মিটমিট করে হাসে। ভিউ মিররে নির্ভাণের দৃষ্টি যেতেই সে-ও অনুভব করলো এই মূহুর্তে একটু পানির বড্ড প্রয়োজন ছিলো।

#চলবে…….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here