আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_৩১

0
25

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৩১
#জান্নাত_সুলতানা

“তুষার ভাইয়া, আসব?”

তুষারের হাত কেটেছে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখার পরই খেয়াল করেছিল সানায়া। মূলত থেঁতলে গিয়েছে চামড়া। সানায়ার এটা দেখে ভীষণ খারাপ লেগেছে। তার জন্যই তুষার ভাই ওই লোককে মেরেছে। আর ব্যাথাও পেয়েছে। সে যদি ছেলেদের ওয়াশরুম না যেতে তাহলে তো এমন কিছু হতো না। সে এটা নিয়ে অনুতপ্ত। সবাই কতটা ভোগান্তিতে পড়তে হলো। বাড়ি ফিরেই সে তুষারে শয়নকক্ষের দুয়ারে এসে উপস্থিত হয়েছে। তুষার একটা বিয়ার হাতে বসে ছিলো বিন ব্যাগে। সে আঁড়চোখে তাকিয়ে শান্ত স্বরে অনুমতি দিলো,

“এসো।”

বাঁ হাতটা রক্তাক্ত। ফরসা চামড়ায় খুবই ভয়ংকর লাগছে সেই ক্ষতস্থান। সানায়া নিজের হাতে থাকা ঔষধ আর ব্যান্ডেজ গুলো তুষারের সামনে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে মিনমিন করে বললো, “ঔষধ টা লাগিয়ে নিবেন।”

তুষার মেয়ে টার নত মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও বিয়ারে চুমুক দিলো। সানায়া ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। তুষার তখন পেছন থেকে বলে উঠলো, “আমি এক হাত এটা করতে পারব না। তুমি ঔষধ টা নিয়ে যাও।”

সানায়া এবার বিপাকে পড়ে গেলো। সাহায্য করতে এসে এমন অস্বস্তিতে পড়তে হবে জানলে সে কখনোই নিজে আসতো না। বুয়াকে দিয়ে পাঠাত। মেঝো মামিকে ঔষধ লাগাতে দেয়নি জানতে পেরে সে আরও আগ্রহ দেখিয়ে এসছে। গোপনে লম্বা শ্বাস টেনে
নিজের মনের অস্বস্তি নিয়েই সে তুষারের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসার জন্য প্রস্তুত নিলো৷ তবে সে বসার আগেই নির্ভাণ সেই রুমে উপস্থিত হলো।

“মেঝো মাকে ঔষধ লাগাতে দেসনি কেনো? এমন নাটকের কী মানে?”

নির্ভাণের রাগান্বিত স্বর। হঠাৎ নির্ভাণের উপস্থিতি ভরকে যায় সানায়া। সামন্য দূরে গিয়ে দাঁড়ায় সে। দুই ভাইয়ের মাঝে তাকে বড্ড বেমানান লাগে। এরমধ্যে তুষার ফিচলে হেঁসে বললো,

“আমি নাটক করি তোমার মনে হয়?” তুষারের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ভাণ ওর কলার চেপে ধরলো। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“মেঝো মা কষ্ট পাচ্ছে তোর জন্য।”

তুষার টা আগে থেকেই ভীষণ উদাস। ছন্নছাড়া তাকে ফারাজ সিদ্দিকী একটু চাপাচাপি করতেই সে পড়ার জন্য অল্প বয়সেই বিদেশ চলে গিয়েছিল। আর দুই বাপ ছেলের রোষানলে অবলা সর্জিনা বেগম পুড়ছে মাঝে।

“আম্মু ডাকে তোকে।”

নির্ভাণের ভারিক্কি সুর সানায়ার কর্ণকুহর পৌঁছাতেই মেয়ে টা আর দেরি করে না। কক্ষ হতে দ্রুত বেরিয়ে যায়। বড়ো মামি এই রাতে তাকে ডাকছে? কিন্তু কেনো? সে ভারি চিন্তিত হয়ে নিচে চলে যায়। তুষার আঁড়চোখে দেখে। তার চিত্ত দূর্বল করছে এই কিশোরী। বুকের ভেতর চাপ তৈরী হয়। কেমন যেনো সমুদ্রের মতো এই মেয়ে। উথাল-পাতাল ঢেউ তুলে কায়া জুড়ে। সহজেই নিজের দিকে আকৃষ্ট করে যেমন করে আকৃষ্ট করে সমুদ্র।
নির্ভাণ লক্ষ করে তুষারের চালচলন। তার অন্তঃপুরে উৎপাত শুরু হয় দাবানলের। সে নিজেকে কোনো করল শান্ত করে তুষারের সামনে বসলো। আর খুব দ্রুত হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে এরপর চলে গেলো। তার অস্থির লাগছে। কোথাও যেনো একটা খুব জ্বলছে। শরীর ঠান্ডা করতে সে দ্রুত ওয়াশরুমে গেলো। একটা ঠান্ডা শাওয়ারই তার অস্থিরতা কমাতে পারে। মেজাজ নয়তো আজ ঠিক হওয়ার নয়।

——-

বড়ো মামি কিচেনে ছিলো না। বুয়া কফি করে সানায়াকে দিয়েছে। সানায়া চট করে বুঝে যায় নির্ভাণ ভাই বুয়াকে বলে গেছে। সে ব্যথিত পা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ফের ওপরে ওঠে এলো। হিল পরার পর তার পায়ের গোড়ালিতে ক্ষত হয়েছে। এগুলোতে ঔষধ লাগাতে হবে। মা নয়তো এগুলো দেখলে আবার বকাবকি করবে। সানায়া কফি রেখে তাই দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েও আবার দাঁড়িয়ে গেলো। নির্ভাণ পিসি খুলে রেখেছে। সে তাই শাটারে উঁকি দিলো। আর নির্ভাণের তোলা সেই ছবি স্ক্রিনে দেখে অনেকটা অবাক হলো সে। নির্ভাণ সোফায় যেভাবে বসেছিল যেনো তার সাথে কেউ বসে আছে। আর সানায়ার সেই ছবি তার পাশের ফাঁকা যায়গ এডিট করে বসিয়েছেন তিনি। সানায়া হতভম্ব হয়ে যায়। মনে মনে আওড়াল, “বললেই হতো আমার সাথে ছবি তুলতে চাইছিলেন, এভাবে এতো কষ্ট করে এডিট করার কী দরকার ছিলো?” কিন্তু তিনি এভাবে ছবি এডিটই বা কেনো করছে? সানায়া অবুঝ মন কত কিছু ভাবে। হৃৎস্পন্দনের ধুকপুকানি তাকে অস্থির করে তুলে। নির্ভাণ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে সানায়া কে এমন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো। টাওয়াল ঘাড়ে ঝুলিয়ে চুলের পানি ছাড়ায় চুল থেকে। স্লিপার পায়ে এগিয়ে এসে টেবিল থেকে কফির মগ তুলে কফিতে চুমুক দিতে দিতে দৃষ্টি পিসির দিকে গেলো। আর তৎক্ষনাৎ নির্ভাণ ঘাবড়ে গেলো। সানায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার বোঝার চেষ্টা করলো ছবিগুলো ও দেখেছে কি-না। তবে সানায়া কে স্বাভাবিক দেখে নির্ভাণ অস্থির হলো। নিজেকে খুব শান্ত দেখালো। যা দেখে সানায়া লজ্জা পায়। গুটিয়ে আসে শরীর। যেনো সে চুরি করেছে আর একই কাজ আরও একজন করছে। দু’জনে মুখোমুখি হয়ে এখন লজ্জা পাচ্ছে। তবে নির্ভাণ ভাই কী তার সঙ্গে মজা করছে? না-কি অন্য কিছু?
সানায়া এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু নির্ভাণ তার আগেই ওর হাত চেপে ধরে। ভালোবাসে কি-না এটা জানার জন্য কত কিছুই না করেছে। এখন সুযোগ পেতেই আবার লজ্জা পাচ্ছে। কী আশ্চর্য! সানায়ার এখন মনে হচ্ছে তার এখানে আসা একদম উচিৎ হয়নি। নির্ভাণ কফির মগ টেবিলে রেখে ওকে টেনে সোফায় বসায়। সানায়া ভয়ে এবার চোখ বন্ধ করে নিলো। নির্ভাণ ভাই এখন কী করবে? নিশ্চিত তাকে বকাবকি করবে। কেনো সে অনুমতি ছাড়া রুমে এলো। কিন্তু সানায়ার ভাবনায় জল ঢেলে নির্ভাণ ফাস্টএইড বাক্স বের করে ক্ষতস্থানে অয়েন্টমেন্ট লাগায়। জ্বলে ওঠে ওষুধের প্রতিক্রিয়া ক্ষতস্থান। খামচে ধরে সে নির্ভাণের হাত। নখের অল্পস্বল্প আঁচড়ে ফরসা চামড়া লালচে হয়ে ওঠে মূহুর্তে। সানায়া বিচলিত হয়ে হাত সরিয়ে নেয়। নির্ভাণ কিছু বলে না। কাজ শেষ ওঠে দাঁড়ায় সে। কোনো কিছু না বলেই কফির মগ নিয়ে উলটো ঘুরে দাঁড়াল। সানায়া ঠোঁট চেপে তখনও ভেবে যাচ্ছে নির্ভাণ ভাই ওই ছবি নিয়ে কিছু বললো না কেনো? তার জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। তাই আলগোছে বসা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। সাবধানে কোনো শব্দ ছাড়াই পালিয়ে যায় সেখান থেকে। রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করে বসে পড়ে সেখানে।

অস্থিরতায় তখন নির্ভাণ কপোকাত। মগে অর্ধ কফি ফেলে সে অস্থির পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। চোখ বন্ধ করতেই ভেতর থেকে সশব্দে অনুভূতি ঝাপটাঝাপটি শুরু করলো। কোনো রকম ও নিজেকে যখন শান্ত করতে ব্যার্থ হলো সে তখনই রুম থেকে আসার সময় হাতে করে নিয়ে আসা সিগারেট বের করলো। দেশলাইয়ের আগুন শিখা হঠাৎ যেমন জ্বলে তেমনই যেনো মাঝেমধ্যেই তার অনুভূতি গুলো এমন ভাবে জ্বলে ওঠে। সিগারেটে বারকয়েক টান দিয়েও সে নিজেকে শান্ত করতে ব্যার্থ। আনমনে বুকের বাঁ পাশে হাত রাখে সে। বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,”পেইন অফ লাভ!”

#চলবে……..

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here