আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_৩৩

0
24

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৩৩
#জান্নাত_সুলতানা

আজ নিজাম সিদ্দিকী এবং তন্বী রহমান দুজনেই নির্ভাণের রূপ দেখেছে। তারা দু’জনেই যদিও আগে থেকে এটা নিয়ে সন্দেহ করছিল তবে আজ নিশ্চিত হয়ে তারা চিন্তিত হয়ে গেলো। নিজাম সিদ্দিকী তৎক্ষনাৎ ছেলেকে নিজের রুমে ডেকে পাঠালেন। তন্বী রহমান আর বাবা ছেলের মাঝখানে আসেননি।

নিজাম সিদ্দিকী ছেলের কে বেশ আয়েশ করে চায়ের কাপ হাতে তুলে দেন। নির্ভাণের চা পছন্দ নয়৷ কিন্তু বাবার সাথে সে খুবই ভদ্র। চা হাতে নিয়েই বসলো।

“তুমি আমাদের পরিবারের বড়ো সন্তান। তোমার ওপর দায়িত্ব অনেক বেশি।”

নিজাম সিদ্দিকী থেমে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবারও বলেন,

“আমার মনে হচ্ছে তোমার নিজেকে পরিবর্তন করা দরকার। সানায়া ছোট। ওর ঠিকবেঠিক বোঝার বয়স এখনো হয়নি। তাই তুমি নিজেকে সামলাও।”

সেদিন নির্ভাণ বাবার মুখের ওপর কিছু বলতে পারেনি। সে ইচ্ছে করেই বলেনি। কারণ সত্যি সানায়া তার থেকে অনেক ছোট। আর এইজ গ্যাপ রিলেশনশিপ গুলো যে খুব বেশি দূর পর্যন্ত যায় না। এটা চারপাশে একটু নজর দিয়ে দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল। সে তখনও সানায়ার অনুভূতি নিয়ে নিশ্চিত ছিলো না। মেয়ে টা তাকে আদোও ভালোবাসে? না-কি কিশোরী বয়সের আবেগ সে? বা মোহ? যেটা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন ও হতে পারে।

—–

তন্বী রহমান বাপ ছেলের বৈঠকের কারণ ঠিকই বুঝেছিলেন। তিনি ফাস্টএইড বক্স হাতে সানায়ার রুমের দিকে এলেন। সানায়া মাত্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে। বড়ো মামি কে নিজের রুমে দেখে বেশ উচ্ছ্বসিত হলো মেয়ে টা। টাওয়াল নিয়ে বসে গেলো মামির সামনে। তন্বী রহমান ওর চুল শুকিয়ে দেন। সানায়ার এরমধ্যে রাজ্যের গল্প জুড়ে বসে মামুনির কাছে। তন্বী রহমান মাঝে মাঝে ওর মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে হাসে। সানায়া ঠিক দেখতে ওর বাবার মতোই হয়েছে। আর আরোরা এইজন্যই মেয়ে কে তেমন পছন্দ করে না। তিনি দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। সানায়ার এলোমেলো চুলগুলো কিছু টা গুছিয়ে দিয়ে বললো,

“যা, গিয়ে নির্ভাণের হাতে ঔষধ লাগিয়ে দিয়ে আয়।”

“আমি যাব?”

সানায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো। তন্বী রহমান ঠোঁট এলিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে ওর কপালে স্নেহময় স্পর্শ করে গালে হাত ছুঁয়ে রেখে বলেন,

“হুম। আমার অন্য কাজ আছে।”

সানায়া মনে মন বেশ খুশি। নির্ভাণ ভাই ভীষণ রেগে ছিলেন। সানায়া কোনো বাহানা পাচ্ছিল না মানুষ টার আশেপাশে যাওয়ার। যদিও জ্যাকেট ফিরিয়ে দেওয়ার নাম করে দেখা করার একটা বাহানা ছিলো তবে জ্যাকেট শুকাতে শুকাতে আরও একদিন। সানায়া খুশিমনে ফাস্টএইড বক্স নিয়ে নির্ভাণের রুমের দিকে গেলো।

—–

নির্ভাণের হাতে ব্যান্ডেজ করছে সানায়া। এলোমেলো চুল যখনই এদিক-ওদিক দিয়ে গড়িয়ে সামনে এসে ওকে বিরক্ত করছে তখনই ব্যাস্ত হাতে ছোট ছোট আঙুল তুলে কোনো রকম কানের পিঠে চুল গুঁজে দিচ্ছে মেয়ে টা। নির্ভাণের বুকের ভেতর শীতল বাতাস বইতে থাকে। সে দৃষ্টি সরিয়ে ও রাখতে পারে না। আবার বেশিক্ষণ তাকিয়েও থাকার মতো সাহস করতে পারে না। মেয়ে টা বারবার নাক টানছে। আর তার মনোযোগ বারবার সেদিকেই যাচ্ছে। নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে রাখে। এই মেয়ে এমন কাঁদছে কেনো? তাকে যে এই দিনকে দিন অধৈর্য পুরুষ বানিয়ে দিচ্ছে। যদিও সে ভীষণ ধৈর্যবান পুরুষ। এটা সে খুব ভালো করেই জানে। সে বারকয়েক চেয়েও সানায়ার এলোমেলো চুলগুলোতে হাত টা ছুঁয়ে দিতে গিয়ে পিছিয়ে এলো। সানায়া নিজের কাজ শেষ করে নির্ভাণের দিকে চাইলো। ওর ওড়নায় আটকানো একটা হেয়ারব্যান্ড। নির্ভাণ এবার ইশারায় ওকে ওঠে দাঁড়াতে বললো। সানায়া দাঁড়াতে নির্ভাণ এবার ওকে নিজের পাশে হাত ধরে বসিয়ে হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে এলোমেলো চুলগুলো কোনো রকম বেঁধে দিলো। সানায়ার শরীরের অল্পস্বল্প কম্পন টের পেলো সে। সে-ই সাথে নিজেকে খুব কষ্টে সামলে কাজ শেষ করে বললো,”সর।”

“নির্ভাণ ভাই!”

“উম, বল।” নির্ভাণ জবাব দেয়। সানায়া নাক টানে আবার। হয়তো সুইমিংপুলের পানির জন্য ওর সমস্যা হচ্ছে। না-কি তার হাত কেটেছে বলে মেয়ে টা কাঁদছে? নির্ভাণ বুঝেই দীর্ঘ শ্বাসের সাথে আড়ালে হাসলো। এরপর নিজের প্যাকেট থেকে রুমাল বের করে ওর সামনে ধরলো। সানায়া খুব সহজেই তা নিলো। নাকের এবং চোখের জল মুছে সেটা বাড়িয়ে দিলো নির্ভাণের কাছে। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাতে নিলো রুমাল। এরপর আলগোছে রাখলো টেবিলের ওপর। এরমধ্যে সানায়ার কণ্ঠ শোনা যায়,

“আমি গাড়িতে যেতে চাই না।”

“তো কিভাবে যাবি?”

“বাইক করে।”

নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেললো। এতো দূরের পথ বাইকে করে যাওয়া একটু না অনেক বেশি রিস্কের। সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ওঠে দাঁড়াল।

“গাড়িতে করে যেতে হবে।”

সানায়া নিজেও ওঠে দাঁড়ায়। নির্ভাণ ল্যাপটপ কোলে বিছানায় বসে। সানায়া নির্ভাণের ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখে। অনেক্ক্ষণ হয়ে গেলেও ওর যাওয়ার নাম নেই রুম থেকে। নির্ভাণ ঘড়ি দেখলো। রাত ভালোই হয়েছে। সে ওকে ডেকে বললো,”রুমে যা।”

“আর একটু থাকি?”

“কেনো?”

“থাকি না। প্লিজ।” ওর আবদার ফেলতে পারে না নির্ভাণ। ও এটা-সেটা গোছানোর নাম করে নির্ভাণ কে ঘুরে ফিরে দেখছে। নির্ভাণ যদিও বুঝতে পারছে এটা। তবে সে নিজেকে বেশি কাজেই ব্যাস্ত রাখা চেষ্টা করছে। সানায়া বাচ্চা হতে পারে কিন্তু সে তো না।

নির্ভাণ কাজে মনোযোগ দিতে চেয়েও পারে না। সে শুঁকনো ঢোক গিলে। নিজেকে শান্ত করতে একটু পানি খায়। সানায়া তখন তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে তার ঘড়ি টা হাতে পরছে।

“নির্ভাণ ভাই?” সানায়া আবার ডাকে। নির্ভাণের ধ্যান ফিরে এবং কিছু টা অপ্রস্তুত হতেই নিজেকে সামলে সাথে সাথে জবাব দেয়,

“উম!”

“এলোয়েনা নামের মেয়ে টা খুব সুন্দর।” সানায়ার মুখে এলোয়েনা নাম টা শুনেই নির্ভাণ স্তব্ধ হয়ে গেলো। হাত থেমে গেলো। অবাক দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে। সানায়া তখন ওড়নার এক কোণ আঙুলে পেঁচাতে ব্যাস্ত। নির্ভাণ ওর নত মুখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বললো,

“দেখিনি কখনো।”

“সত্যি দেখেননি?”

“না।”

নির্ভাণের শান্ত স্বাভাবিক ভাবে উত্তর। সানায়ার মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়। জ্বলজ্বল করে ওঠে চোখ দু’টো।

“আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ?”

কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। নির্ভাণ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। তার কী ধৈর্যের ফাইনাল এক্সাম চলছে না-কি? নয়তো এই মেয়ে তাকে এতো কেনো জ্বালাচ্ছে? সে ল্যাপটপ রেখে সটান হয়ে দাঁড়াল। গেঞ্জি টেনে ঠিক করে নিয়ে স্লিপার পায়ে এসে ধুপধাপ করে ওর পাশে দাঁড়াল। আচমকাই হাত ধরে রুমের বাইরে এনে রেখে কিছু না বলেই দরজা বন্ধ করে দিলো। ঘটনা এতো দ্রুত ঘটলো সানায়া কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

নির্ভাণ মাথার ওপর দিয়ে এক টানে নিজের গায়ে থাকা গেঞ্জি খুলে সোফায় ফেলে ওয়াশরুমে চলে এলো। শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো সেটার নিচে। চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস ফেললো বারকয়েক। পেশিবহুল পুরুষালী হাত দেয়ালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে মাথা নুইয়ে দাঁড়ায়। তার ধৈর্য দিনদিন ফুরিয়ে আসছে।

#চলবে…….

[গল্প দেরি করে দেওয়ার জন্য আমি ভীষণ দুঃখিত, দুঃখিত। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here