হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:43

0
32

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:43

গাঢ় ধূসর মেঘে ঢেকে গেছে নীল আকাশের শেষ চিহ্নটুকু।প্রকৃতি ধারণ করেছে ভয়ংকর দৈত্যের রূপ।আকাশের গর্জন শুনে মনে হচ্ছে মহাকাল তার ক্রোধ জানাচ্ছে।গাছের ডালপালা কাঁপছে, ছিড়ে পড়ছে পাতা, মাটির বুকে উঠেছে ধুলোর ঝড় ।

বৃষ্টি এখনও নামে নি, তবে তার আগমনের পূর্বাভাস প্রকৃতি জুড়ে,আকাশের হাহাকার, বজ্রের ধমক আর ঝড়ের ক্রমবর্ধমান তাণ্ডব মাথায় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সুফি।বাতাসের দাপটে উড়ছে গলায় ঝুলে থাকা ওড়না টা,অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই মেয়েটার,একটা মোটা আকারের বাসের খুটি বকুল গাছের নরম ডালের সাথে ঠেসে দেওয়ার আপ্রান চেষ্টায় হাপাচ্ছে সে।

“কিরে?এই ঝড় বৃষ্টিতে এখানে কি করছিস?”

পেছন থেকে ভেসে আসা চেনা কন্ঠস্বর কানে আসতেই তরাক করে ঘুরে তাকালো সুফি,লুঙ্গি আর ফতোয়া পরিহিত আশিককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথায় ঘোমটা তুললো তাড়াতাড়ি,দৃষ্টি নমিত করে সালাম দিলো,

“আসসালামু আলাইকুম আশিক ভাই।”

আশিক সালামের উত্তর দিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলো,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম।এই ঝড় বৃষ্টিতে এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছিস?”

সুফি চিবুক নামিয়ে রেখেই উত্তর দিলো,

“না মানে ভাইয়া এই গাছটা,,,,,।”

সুফির দৃষ্টি অনুকরণ করে আশিক তাকালো পাশেই দুলতে থাকা বকুল গাছটার দিকে।হাওয়ার দাপটে গাছটা দোলনায় চড়া শিশুর মতো দুলছে,যে কোন মূহুর্তে নরম ঢাল ভেঙে পড়বে ভাব।

“এটা একটা সামান্য গাছ সুফি।”

গাছটার দিকে তাকিয়ে থেকে কথাটা বললো আশিক।সুফি চিবুক তুললো না,ওড়নার একটা অংশ আঙুলে পেচাতে পেচাতে বললো,

“গাছটা আইরিশ ভাইয়ের আমানত ভাইয়া।আইরিশ ভাই গাছটার খেয়াল রাখতে বলে গিয়েছেন।”

“আইরিশ?ওহ হ্যাঁ!আইরিশের কাছেই তো এসেছিলাম। কোথায় ও?আজ সপ্তাহ খানেক হতে চললো দেখছি না গঞ্জে।”

আশিকের প্রশ্নের উত্তরে কন্ঠ ভেঙে এলো সুফির,ঝাপসা চোখের পানি আড়াল করার প্রয়াস চালিয়ে বললো,

“উনি তো ব্রিটিশ মহলে গিয়েছে, ফ্লোরেন্সাকে ফিরিয়ে আনার জন্য।”

আশিক অবাক হলো,আইরিশ ফ্লোরেন্সার জন্য যতোদূর যাবে কখনোই ভাবেই নি সে,ভাগ্যিস আইরিশের আগেই ফ্লোরেন্সাকে ধরে এনেছে , নয়তো আইরিশের সাথে মুখোমুখি হতে হতো তাকে।
মনে মনে কথাগুলো ভেবে শুখনো ঢোক গিললো আশিক,বিস্মিত হওয়ার ভান করে বললো,

“মানে?কি বলছিস সুফি?আইরিশ ব্রিটিশ মহলে গিয়েছে আর বাড়ির লোক যেতে দিলো কি করে?তোরা জানিস না ওই জালিম পশুদের মধ্যে গেলে আইরিশ ফিরে আসতে পারবে না কখনো।আইরিশের সাথে যে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রিন্সের শত্রুতা সে কথা কি করে ভুলে গেলো সবাই?”

সুফির ঠোঁট ভেঙে এলো এবার,নিজেকে সংযত রাখার সব প্রয়াস ব্যার্থ,ঝুপঝুপ করে ছেড়ে দিলো চোখের পানি,

“আমি বারন করেছিলাম আশিক ভাই।আমি খুব করে বলেছিলাম ওই ব্রিটিশ মহলে না যেতে।কিন্তু আইরিশ ভাই শুনলেন না, ফ্লোরেন্সাকে ফিরিয়ে আনার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে গেলো।আমার কথার শুনলেন না উনি,কেনই বা শুনবে বলুন, বাড়ির সামান্য আশ্রিতার কথা কি কেউ শুনে?”

আশিকের চাহনি বাঁকা,কোন এক গুপ্ত সংবাদ জানার মতোই ভেতর ভেতর সতস্ফূর্ত আনন্দ তার।

“তুই আশ্রিতা সুফি?”

আশিকের সন্দিহান কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই ঢোক গিললো সুফি,হাতের আঙুল কচলাতে কচলাতে বলল,

“আমার আম্মা আব্বা মারা যাওয়ার পর এইটাই তো আমার পরিচয় আশিক ভাই।আমি খাঁন বাড়ির আশ্রিতা।ভাগ্যিস উনারা দয়া দেখিয়ে আমাকে মাথা গোজার ঠাই দিয়েছেন।”

আশিকের বাঁকা দৃষ্টিতে পরিবর্তন এলো না একটুও,সোজাসাপ্টা খরখরে কন্ঠে প্রশ্ন করলো ফের,

“তোর আব্বা আম্মাকে কে খুন করেছে সুফি?”

বালুচরের মাঝে হারিয়ে যাওয়া নদীর মতো শুকিয়ে এলো সুফির গলা,সে চোখ বন্ধ করে নিলো দ্রুত,চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিনকার বিভীষিকাময় দৃশ্য,সেই রক্ত, সেই লাশ, আর? আর তার আব্বা আম্মার ক্ষতবিক্ষত শরীর গুলোর কথা মনে করতেই শরীরে লোম দাঁড়িয়ে গেলো সুফির,ঠোঁট দুটো কাঁপলো,কম্পনের তোপে ঠকঠক আওয়াজ হলো দাঁতের ঘর্ষনের,ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে খামচে ধরলো ওড়না,আতংকিত কন্ঠে বললো,

“এসব আমাকে কেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন আশিক ভাই।ভুলে থাকতে চাই, ভুলে থাকতে চাই আমি সেই লোমহর্ষক দৃশ্য।”

আশিক দৃষ্টির ধরন পাল্টালো, ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে।মুষুলধারে বৃষ্টির বড়বড় ফোটা সেকেন্ডের মধ্যেই ভিজিয়ে দিয়েছে আশিক আর সুফির শরীর।আশিক আকাশের দিকে তাকালো,আকাশে ভারী বজ্রপাতের শব্দ আত্মা কাপিয়ে দিচ্ছে,সে কথার প্রসঙ্গ পাল্টে তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,

“বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে সুফি।দ্রুত বাড়ি ফিরে যা,এই গাছের জন্য নিজের প্রাণ টা দিবি নাকি?”

সুফি নিজেও তাকালো কালো মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে,তিরতির কাঁপতে থাকা কন্ঠে বললো,

“গাছটার কিছু হয়ে গেলে আইরিশ ভাই কষ্ট পাবে ভাইয়া,এই গাছটার কাছে থাকলে মনে হয় আইরিশ ভাইয়ের পাশেই বসে আছি,উনি পাশে থাকলে কিছু হবে না আমার।”

“পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই,এই গাছ পাহাড়া দেওয়ার চক্করে নিঃশ্বাস না খোয়াতে হয়।”

সুফি মুচকি হাসলো,অপারগ কন্ঠে বললো,

“আমি শেষ নিঃশ্বাস অব্দি থেকে যেতে চাই উনার রেখে যাওয়া গাছের মালি হয়ে।”

“বেশ থাক তাহলে, আমি আসছি।”

আশিক চলে যেতে নিলেই পেছন ডাকে সুফি,

“শুনুন না ভাইয়া।”

আইরিশ কয়েক কদম দৌড়ে গিয়েও থামে,পেছন ফিরে গলা ছুড়ে বলে,

“কি বলবি তাড়াতাড়ি বল,আর কিছুক্ষণ থাকলে তোর সাথে নির্ঘাত বাজ পড়ে মরবো আমি।”

সুফি ব্যাস্ততা দেখালো,অথচ ইনিয়ে বিনিয়ে বললো,

“না মানে বলছিলাম কি আপনি তো সবজি নিয়ে প্রায়শই শুনি ব্রিটিশ মহলে যান,এবার যদি যেতে পারেন তবে আইরিশ ভাইয়ের একটা খবর এনে দিবেন? খুব উপকার হতো।”

সুফির কথায় ঠোঁটে হাসি ফোটায় আশিক,রস্য কন্ঠে বললো,

“মহলে তো তোর সই ফ্লোরেন্সাও আছে,ওর খবর নেওয়ার কথা বললি না যে?”

ফ্লোরেন্সার কথা বলতেই সুফির মুখটা চুপসে গেলো,মিনসে কন্ঠে বললো,

“ও তো ওর ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছে সুখের জন্য।অবশ্যই সে সুখেই আছে,আমি দোয়া করি ব্রিটিশ প্রিন্সের সাথে তার একটা সুখের সংসার হোক।”

“ফ্লোরেন্সার সংসার হলে তোর এক হিসেবে লাভই হবে বল?আইরিশকে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তোর আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রইবে না।”

“আমি ফ্লোরেন্সাকে কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবি নি ভাইয়া,ও যদি আইরিশ ভাইয়ের সাথেও সংসার পাতে তবেও আমি খুশি হবো,আমার দু দুটো ভালোবাসার মানুষের সুখের সংসার দেখবো আমি,আমার যে চাঁদ কপাল।”

আশিক আর ঘাটলো না,বাড়ালো না কথা,ম্লান হেসে বললো,

“তুই পারিসও বটে সুফি।”

কথাটা বলার জন্য সময় নষ্ট হলো এক সেকেন্ড, কিংবা তারও একটু বেশি সময়।আর ঠিক তখনই আকাশ চৌচির হলো বিদ্যুতের ধারালো চিৎকারে। মুহূর্তের ব্যাবধানে চারপাশ ঝলসে উঠলো আলোয়।তারপরই বিষণ্ণ নীরবতা ভেঙে আকাশজুড়ে গর্জে উঠলো বজ্রপাত। বিভীষিকাময় শব্দে কেঁপে উঠল মাটি পর্যন্ত।সেই একই শব্দে অবশ হয়ে পড়লো সুফির সমস্ত ইন্দ্রিয়।ভয়ে দু’হাতে কান চেপে কুঁকড়ে বসে পড়লো সে,আতংকে কাঁপছে মাথা থেকে পা পর্যন্ত।

বজ্রপাতের অভিঘাতে থরথর করে কেঁপে উঠলো আশিকের কলিজা। এক মুহূর্তও দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো সুফির কাছে,এক বুক উৎকণ্ঠা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো,

“সুফি, ঠিক আছিস তুই?”

সুফি ধিরে ধিরে চোখ খুলে তাকালো,আশিককে আস্বস্ত করার জন্য বলল,

“ঠিক আছি ভাইয়া,পাশেই কোথাও বজ্রপাত হলো মনে হচ্ছে।”

“হ্যাঁ,ওই বটতলার মাথায় ধোঁয়া উঠছে দেখ।ওখানেই মনে হয় বিজলী পড়েছে।”

সুফি কপালে হাত রেখে তাকালো অদূরে,সত্যিই তো দূর থেকে কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে,সুফি সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত কন্ঠে বললো,

“জায়গাটা এমনিতেই অভিশপ্ত, এখন উপর ওয়ালাও ক্ষোভ প্রকাশ করে তার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এখানে নিশ্চয়ই কোন অনাচার হয়েছে।”

“অনাচার তো হয়েছে বটেই,হুজুর আব্দুল খালেক আর তার মেয়ে ফাতেমার ভয়াবহ মৃত্যু যে হয়েছিল সেখানে।”

আশিকের কথায় বেদনার ছাপ দেখা গেলো সুফির চোখে, আগ্রহী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“ফাতেমা?উনাকে দেখেছিলেন আপনি আশিক ভাই?”

“দেখেছি, আমি আর আইরিশ তখন ছোট, আট বছর বয়স আমাদের।এক সকালে কাচারি পড়তে যাওয়ার সময় বটতলায় গঞ্জের সকল মানুষদের জড়ো হতে দেখলাম।সবার দেখাদেখি আমরাও গেলাম সেখানে,গিয়ে দেখলাম রাইতের অন্ধকারে ব্রিটিশরা তাদের খুন কইরা রাইখা গেছে।”

“শুনেছি ওই দুজন মানুষ নাকি এই গঞ্জ আর এই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য অনেক বড় অবদান রাখছিলো তাইলে তাদের মৃত্যুতে এই গঞ্জের মানুষ আওয়াজ উঠাইলো না ক্যান আশিক ভাই?”

“ভয়ে, ভয়ে রে সুফি।ব্রিটিশ শাসকদের প্রচুর ভয় পায় আমাগো গঞ্জের মানুষ।তাই চুপ হইয়া থাকতে বাধ্য হইছিলো।”

সুফি চুপ করে যায়,দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“উনি কেমন দেখতে ছিলো আশিক ভাই?উনার চেহারা মনে আছে তোমার?”

আশিক নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো সুফির দিকে,ফটাফট প্রতুত্তর করলো,

“একদম তোর মতো।”

সুফির বুকটা ধ্বক করে উঠলো,অস্বস্তিতে গুলিয়ে গেলো মস্তিষ্ক।আশিক সেদিকে তাকিয়ে রহস্য হাসলো, প্রসঙ্গ পাল্টালো ফের,

“যাবি?ওখানে?”

সুফি তপ্ত শ্বাস ফেললো,প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো আশিকের দিকে,অস্পষ্ট জিজ্ঞেস করলো,

“কোথায়?”

আশিক আঙুল তুলে ইশারা করলো কালো ধোঁয়া উড়তে থাকা বট গাছের মাথার দিকে,স্ফূর্ত স্বরে আওড়াল,

“বটতলায়।”

______________

সমগ্র কক্ষ জুড়ে কয়লার স্তুপ, সবগুলো কয়লা উত্তপ্ত,গরম ধোয়ার কুন্ডলী উড়ছে চারপাশে।উন্মুক্ত শরীরে সেখানটাতেই বসে আছে আইরিশ।পড়নের সাদা লুঙ্গিটা কয়লার কালিতে মলিন হয়ে গিয়েছে।মনে হচ্ছে মৃত্যুর ধূসর চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে মৃত প্রায় মানব।তার এলোমেলো চুলগুলো ঢেকে রেখেছে কপাল , চোখের কোনে জমেছে ক্লান্তির ছায়া।অথচ হাত দুটি ব্যাস্ত কয়লা ভাঙার কাজে।

এই নিঃশ্বাস-বন্ধ করা ঘর্মাক্ত নরকে তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে এক প্রহরী।কাজের ফাঁকে হাত থামানোর চেষ্টা চালালেই সে দানব ঠাস ঠাস করে চাবুক মারছে আইরিশের উন্মুক্ত পিঠে।

কক্ষের বাইরে কাঠের তৈরি উঁচু দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রতিটি নরকতুল্য দৃশ্য অশ্রুসিক্ত লোচনে অবলোকন করছে নাবহা।চাবুকের প্রতিটি আঘাত আর ধ্বনিত হওয়া প্রতিটি শব্দ সোজা এসে বিষাক্ত কাটার ন্যায় গেঁথে যাচ্ছে তার বক্ষে, ভেতরটা নিঃশ্বেস করে দিচ্ছে চমৎকার দংশনে।

প্রায় বেশ কিছুক্ষণ সময় গড়ায়।হাতের ঔষধি বাটিটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে নাবহা।অনেকটা সময় একই দৃশ্য চলার পর অপেক্ষার অবসান ঘটে তার।কক্ষে পাহারাদার সৈন্যরা আইরিশকে কক্ষে রেখে বেড়িয়ে যায় কারণ বসত।সে সুযোগ লুপে নেয় নাবহা।গুটি গুটি পা টিপে গিয়ে দাঁড়ায় আইরিশের সামনে।

নাবহার অপ্রত্যাশিত পদার্পনে মনোযোগ বিঘ্নিত হয় আইরিশের,কিংকর্তব্যবিমুঢ় নয়নে নাবহাকে দেখা মাত্রই হন্তদন্ত হয়ে নজর বুলায় পুরো কক্ষে,তারপর ব্যাতিব্যাস্ত কন্ঠে বলে,

“তুমি এখানে?”

নাবহা তার হাতের বাটিটা নিয়ে চুপচাপ এসে বসলোল আইরিশের পাশে,তারপর মোলায়েম কন্ঠে বললো,

“ফ্লোরেন্সা পাঠিয়েছে।বললো আপনি আঘাতপ্রাপ্ত।”

ফ্লোরেন্সার কথা শুনতেই মনে প্রশান্তি অনুভব করলো আইরিশ,শান্ত স্বরে বললো,

“তাতে কি?এমন আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েই পা রেখেছি এই মহলে।ওকে বলে দিও আমার জন্য চিন্তা না করতে।”

নাবহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,একটু অধিকার খাটিয়ে ধরলো আইরিশের পোড়া দুই হাত,তারপর ব্যাথিত কন্ঠে বললো,

“একি আপনার হাতের অবস্থা তো ভয়াবহ।চামড়া পুড়ে গিয়েছে।”

আইরিশ এক ঝটকায় সরিয়ে নিলো নিজের হাত,

“তেমন কিছু না,ফ্লোরেন্সা কেন পাঠালো সেটা বলে দ্রুত প্রস্থান করো।প্রহরী দেখতে পেলে পাছে না তোমাকে শাস্তি পেতে হয়।”

“আমার জন্য চিন্তা হচ্ছে নাকি আপনার?”

নাবহার কন্ঠে আগ্রহ,আইরিশের চিন্তায় বিরাজ করাটাও যে তার কাছে ভাগ্যের ব্যাপার।অথচ এ ব্যাপারে সহায় হলো না তার ভাগ্য,তাকে নিরাশ করে দিয়ে আইরিশ বলে উঠে,

“ঠিক তেমন কিছু নয় মেয়ে,ফ্লোরেন্সা তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে, এখন যদি তুমি ধরা পরে শাস্তি পাও ফ্লোরেন্সা কষ্ট পাবে,মেয়েটা এমনিতেই নাজুক,অপরাধবোধে ভুগবে খুব।”

নাবহা ঠোঁট টিপে তপ্ত শ্বাস ছাড়ে,মিনসে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“ফ্লোরেন্সা কে খুব ভালোবাসেন তাই না?”

“হ্যাঁ,ওকে যতবার দেখি প্রেমে পড়ি।ওই যে কাল তার রুদ্রদেবীর রুদ্রাণী রুপটা দেখার পর থেকে তো ভুলতেই পারছি না,মনে হচ্ছে আবার নতুন করে ওর নতুন রুপের প্রেমে পড়েছি।”

নাবহা মুখটা চুপসে ফেলে এবার,হাতে করে নিয়ে আসা বাটি থেকে তুলে নেয় ঔষধ, তারপর আইরিশের উন্মুক্ত পিঠে লাগাতে লাগাতে বলে,

“আচ্ছা ফ্লোরেন্সা ভালোবাসে আপনাকে?”

“জানার প্রয়োজন বোধ করি নি কখনো, কারণ ভালোবাসা সবসময় একপাক্ষিক হয়।দুটো মানুষ যদি বলে তারা একে অপরকে সমান ভালোবাসে,তবুও আমি বলবো ভালোবাসা একপাক্ষিকই হয়।কারণ সম্পর্কে একজন মানুষ বিপরীত মানুষটাকে একটু হলেও বেশিই ভালোবাসে।”

“সেই বেশি ভালোবাসার একজন মানুষটাই কি আপনি?”

“বেশি নয় অতিরিক্ত বেশি ভালোবাসি আমি।”

“যদি কখনও জানতে পারেন আরও একজন মানুষ আছে, যে আপনাকে আপনার মতো করেই একপাক্ষিক ভালোবাসে।”

“তবে দুঃখ প্রকাশ করবো।বলে দিবো ভেলায় ভাসিয়ে দিতে তার সমস্ত ভালোবাসা।”

“ভেলাটা যদি বেহায়া হয়?যদি সে ঘুরেফিরে ভাসতে ভাসতে বারবার এসে থামে আপনার ঘাটে?তখন? তখন কি করবেন?”

নাবহার এমন প্রশ্নে ভ্রু কুচকায় আইরিশ,ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নাবহার পানে,নাবহা একটু বিব্রতবোধ করে,ঠোঁটে ঠোঁট টিপে চিবুক নামায় দ্রুত।আইরিশ ভ্রু উঁচায়,সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“হটাৎ এসব কথা জিজ্ঞাসা করার কারণ?”

নাবহা অপ্রস্তুত ভঙিতে চোখ উল্টে তাকায়,হাতের নখ খুটতে খুটতে বলে,

“না মানে এমন তো হতেই পারে কেউ আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসে, আর সে চায় আপনিও তাকে ভালোবাসুন।”

আইরিশ ম্লান হাসলো,তারপর পুরোপুরি ঘুরে বসলো নাবহার দিকে।কয়লার আগুনে পুড়ে যাওয়া দু’হাত নাবহার চোখের সামনে মেলে ধরে বললো,

“এইযে দেখছো দু’হাতের চামড়াগুলো যেভাবে পুড়েছে,ঠিক এর চেয়ে জঘন্যভাবে ভেতরটা পুড়ছে আমার,ফ্লোরেন্সাকে এক নজর দেখার আক্ষেপে।এতো বেশি আক্ষেপ নিয়ে কি অন্য কাউকে ভালোবাসা সম্ভব মেয়ে?”

“ফ্লোরেন্সা মহলে এসেছে দীর্ঘদিন হলো,এতোদিন তো দিব্যি ছিলেন ওকে না দেখেই।”

“বললাম না মেয়ে প্রেমে পড়েছি নতুন করে,কালকের সেই রুদ্রাণী আলেকজান্দ্রার রুদ্ধশ্বাস রুপ যখনি স্মরণ হয় তখন ভালোবাসায় নয় আত্মহননের নেশায় পাগল হয় মন।তাকে দেখার আক্ষেপ ভারি হয় সেকেন্ডের গতিতে।”

“রুদ্রতায়ও বুঝি প্রেম হয়?”অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে নাবহা।

“হয় মেয়ে হয়।রুদ্রতায় প্রেম হয় না বলে যারা বিশ্বাস করে, তারা আলেকজান্দ্রার চোখে তাকাক,দেখতে পাবে আগুনেও প্রেম ফুটে ওঠে।”

নাবহার মেঘবরণ বদনে আধার ঘনালো,মাথা নমিত করে দৃষ্টি রাখলো তার হাতের শ্যামলা ত্বকের দিকে,তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,

“দেখা করবেন আপনার রুদ্রাণী আলেকজান্দ্রার সাথে?”

নাবহার কথায় কিঞ্চিৎ চমকালো আইরিশ,নজর বুলালো পুরো কক্ষে।আপাতত কেউ নেই,হয়তো সবাই খাবার খেতে গিয়েছে, পুরো কক্ষ ফাঁকা, যদিও ফ্লোরেন্সার কাছে যাওয়ার মতো সুবর্ণ সুযোগ আছে তবুও যাওয়া হবে না মনে হচ্ছে।তার সামনে কয়লার মস্ত বড় স্তুপ।সেগুলো থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছে, প্রহরীরা ফিরে আসার আগেই এই সবগুলো কয়লা। ভাঙতে হবে তাকে, নয়তো প্রিন্স জোসেফ বলে রেখেছেন কাজের সামান্যতম গলদ হলে, তার মাশুল দিতে হবে ফ্লোরেন্সাকে।কি ধুরন্ধর ওই প্রিন্স,কীভাবে কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হয় খুব ভালো করেই জানে সে।কী নির্মম চাতুর্যে আইরিশের মনের দূর্বলতাকে শাসনের অস্ত্র বানিয়ে কাবু করে রেখেছে আইরিশের প্রতিবাদী আত্মাকে।

প্রায় অনেক্ষন যাবৎ আইরিশের উত্তর না পেয়ে সামনে থাকা কয়লার স্তুপের দিকে তাকালো নাবহা।খুস্ক ঠোঁট নাড়িয়ে ফ্যাকাসে হেসে বললো,

“এই কক্ষ থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে গুনে গুনে ছয় কদম হাটার পর পশ্চিম দিকের শেষের ঘরটায় ফ্লোরেন্সা আছে।আপনি যেতে পারেন,ততক্ষণে আপনার কাজটা আমি করে দিচ্ছি।”

আইরিশ ভিষণ আশ্চর্য হয়,বিস্মিত নয়নে তাকায় নাবহার দিকে,অস্ফুটে আওড়ায়,

“তুমি পাড়বে?”

আইরিশের এমন প্রশ্নে ম্লান হেসে ফেলে নাবহা।আর চোখে তাকায় আইরিশের হাতের দিকে,লোকটা স্বার্থপর, চরম পর্যায়ে স্বার্থপর।যে কয়লা ভেঙে সে নিজের পুরুষালি শক্ত হাতের চামড়া পুড়িয়ে ফেললো সে কয়লা একটা মেয়েকে ভাঙতে দিতে কীভাবে রাজি হয়ে যেতে পারে এ বান্দা?এই স্বার্থপর পুরুষের কি একবারেও মনে হয় নি এই কয়লা স্পর্শ করা মাত্রই ঝলসে যাবে মেয়েলী হাতের কোমল চামড়া।

কথাগুলো ভাবতেই চোখ ঝাপসা হয়ে এলো নাবহার,যথাসম্ভব চোখের পানি আড়াল করে চুপচাপ উপর নিচ মাথা নাড়ালো সম্মতিতে।

আইরিশ খুশি হয়,তার নিরেট ঠোঁট জোড়ায় স্পষ্ট হয় হাসির রেখা।ফ্লোরেন্সাকে দেখতে পাওয়ার এক বুক উত্তেজনা নিয়ে বলে,

“আমি যাবো আর আসবো ততক্ষণে একটু কষ্ট করে কাজটা এগিয়ে রাখো।নয়তো প্রহরী রা আসার আগে কাজ সম্পূর্ণ না হলে ফ্লোরেন্সা কে শাস্তি পেতে হবে।”

নাবহা এবারেও কিছু বললো না,একদলা বিষন্নতা আর যন্ত্রণা গিলে নিয়ে মাথা নাড়ালো দুপাশে।

আইরিশ আর অপেক্ষা করলো না দ্রুত পা বাড়ালো কক্ষ থেকে বেড়োনোর উদ্দেশ্যে। পরমূহুর্তেই কিছু একটা মনে করে পেছন ফিরে চাইলো নাবহার দিকে।তারপর দুকদম পেছনে ফিরে এসে নিজের পুড়ে যাওয়া খরখরে হাতটা রাখলো নাবহার গালে,সতস্ফুর্ত কন্ঠে বললো,

“তুমি খুব ভালো মেয়ে,আমার ভাবনার চেয়েও ভালো।”

আইরিশের স্পর্শ পেয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো নাবহা,একফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিতে নিয়েও চেপে রাখলো ন্যানো ইঞ্চি পাতলা চামড়ার পেল্লবের নিম্নদেশে,মনে মনে আওড়ালো,

“কিন্তু আপনি স্বার্থপর, আমার ভাবনার চেয়েও বেশি স্বার্থপর।অথচ আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেললাম।”

কয়েক সেকেন্ড গড়ালো নৈঃশব্দে,তারপর একা একাই বিরবিরালো পুনরায়,

“প্রেম শিখি নি আমি,অথচ স্বার্থপরকে ভালোবেসে আত্মহুতি দিয়েছি প্রথম দেখায়।কি নির্মম ভাগ্য আমার,আপনার চোখে ভালো হইলাম অথচ ভালোবাসা পাইলাম না।”

_______________

ভারী পর্দায় মোড়ানো জানালার ফাঁক গলে হালকা আলো এসে পড়ছে ঘরের কার্পেটে। জানালার এপাশটা একদম অন্যরকম, প্রহরা, পায়চারি কোনটাই নেই, আছে কেবল একটা জবা ফুল গাছ।হয়তো সবার চোখের আড়ালে খুব অযত্নেই বড় হয়েছে গাছটা, সবুজ পাতার ফাকে একটি লাল মখমলের মতো জবা ফুল ফুটে আছে।নিস্পার দৃষ্টি আপাতত সেদিকটাতেই স্থির, যেন এই একটুকরো লাল গোটা প্রাসাদের কাঠিন্যের মাঝে একটা কোমল হৃদয়।

নিস্পার দৃষ্টি অনুকরণ করে সেদিকে তাকালো সত্য।বাচ্চা ছেলেটার দৃষ্টি নিখুঁত,চোখের গহব্বরে কালো কুচকুচে মনিটা তাক করে তাকানো মাত্রই ঠিক বুঝে ফেললো নিস্পা এতোক্ষণ কি দেখছিলো।জবা ফুলের দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসলো সত্য,চিকন কন্ঠে বললো,

“ওই ফুল তোমার চাই নাকি গো অলিক কন্যা?”

সত্যের কন্ঠ শুনে ধ্যান ভাঙলো নিস্পার,ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো পেছনে,তারপর পানসে মুখে বললো,

“হাতের নাগালের বাইরে,চাইলেই কি আর ছোয়া যায়?”

সত্য ঠোঁট প্রসারিত করে বললো,

“তুমি চাইলে আমি তোমারে ফুলটা আইনা দিতে পারি অলিক কন্যা।”

নিস্পা ভ্রুকুটি তুলে তাকালো,বিস্মিত কন্ঠে বললো,

“কিভাবে আনবে?এটা তো আমারই নাগালের বাইরে,তুমি কি করে নাগাল পাবে?”

“পাবো পাবো, দেখই না কীভাবে এনে দেই।”

কথাটা বলতে বলতে সত্য চোখ উল্টে তাকালো তার মাথার উপর বসে থাকা বীনা পাখির দিকে, তারপর একগাল হেসে দিয়ে বললো,

“কিগো বীনা পাখি ওই লাল ফুলটা আনতে পারবা তো তুমি?অলিক কন্যার মনে ধরেছে ওই ফুল।”

বীনা পাখি পিউক পিউক শব্দ করলো, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেড়িয়ে গেলো জানালার ফাঁক দিয়ে।নিস্পা বিস্মিত নয়নে অবলোকন করলো সেই দৃশ্য।
সাদা পেখম উড়িয়ে দিয়ে বীনা পাখি গিয়ে বসলো জবাফুল গাছের সবুজ ডালের এক প্রান্তে। তারপর ঠোঁট দিয়ে একটানে ছিড়ে ফেললো লাল জবার নরম বোটা,এপর্যায়ে বিস্মিত নয়ন জোড়া ছলকে উঠে নিস্পার,হা হয়ে আসা পুরু দু ঠোঁট জোড়ার উপর করতালু চেপে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে বীনা পাখির দিকে।তার মনে হচ্ছে পুরনো রূপকথার পাতা খুলে এসে বসেছে তার চোখের সামনে।কি অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য।

একটুকরো লাল হৃদয়ের মতো জবা ফুল টা ঠোঁটের আগায় ধরে রেখে উড়তে উড়তে ফিরে এলো বীনা পাখি।ঠিক আগের মতোই এসে বসলো সত্যের মাথার উপর।সত্য খিলখিল করে হাসলো,কালাচাঁদের কালো ত্বকে ঝিলমিল করে উঠলো সে হাসির ছাপ।সে ফুলটা নিস্পার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“এই নেও অলিক কন্যা।দূরের ওই ফুল এখন তোমার হাতের নাগালে।”

নিস্পা মুচকি হাসলো,ফুলটা একহাতে তুলে নিয়ে, আরেকহাতে আদুরে স্পর্শ করলো সত্যের গালে,

“ধন্যবাদ কালাচাঁদ।”

সত্য লজ্জা পাওয়ার ন্যায় মিটিমিটি হাসলো,লাজুক স্বরে বললো,

“শুধু তো ধন্যবাদে হইবো না অলিক কন্যা।আমার তো অন্য কিছু চাই।”

নিস্পা উদ্বিগ্ন নয়নে তাকালো,ভাবুক কন্ঠে বললো,

“ধন্যবাদে হবে না?তাহলে? কি চাই তোমার?”

“ভাত খাবো অলিক কন্যা,পেটে মেলা খিদে পেয়েছে।পচা লোকের দাসীরা ভাত দিয়া গেলো,কিন্তু আমি তো নিজের হাতে খাইতে পারি না,সবসময় তো আম্মিজানই খাইয়ে দিতো।আমাকে ভাত খাইয়ে দিবে অলিক কন্যা?”

সত্যের অপ্রত্যাশিত আবদারে বুক ভারি হয়ে এলো নিস্পার,এক অদ্ভুত অদৃশ্য দহনে কোটর ভরে এলো জল,দু’হাত বাড়িয়ে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো সত্যকে,আদুরে কন্ঠে বললো,

“মন খারাপ করো না কালাচাঁদ।খুব শীঘ্রই তোমার মায়ের কাছে তোমাকে নিয়ে যাবো আমি,ততদিন তোমাকে একা ভাত খেতে হবে না, আমি নিজের হাতে তোমার আম্মিজানের মতো করেই খাইয়ে দিবো তোমায়।”

“বাচ্চাটা কে ফ্লোরেন্সা?”

পেছন থেকে রাশভারী পুরুষালি কন্ঠ শুনে কুচকে এলো নিস্পার ললাট,পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো আইরিশকে।সুঠাম দেহি তাগড়া যুবক।গালে হালকা চাপ দাড়ি,আর চোখ গুলো ভয়ংকর রকমের লাল।দু হাতে কয়লার কালি লেপ্টে কালো হয়ে আছে,তবে লোকটা যে ফর্সার সাথে ভিষণ সুন্দর সে বিষয় টা এক চুটকিতেই ধরে নেওয়া যায় তার নাকের ডগায় একটা লাল তিলের দিকে তাকালেই।

নিস্পার নিরবতা ডিঙিয়ে দু কদম এগিয়ে এলো আইরিশ,ঠিক নিস্পার থেকে দু ইঞ্চি দূরত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে ফের বললো,

“বাচ্চাটাকি এই মহলের?দেখে তো মনে হচ্ছে বাঙালীর সন্তান।”

নিস্পা নড়েচড়ে বসলো,উদগ্রীব নয়নে তাকালো সত্যের দিকে, তারপর শুখনো ঢোক গিলে বললো,

“ও সত্য,আমার বিপদের সঙ্গি,আমার অতীত ভবিষ্যৎ এর পথ পদর্শক আপাতত এটাই ওর পরিচয়।”

আইরিশ তপ্ত চোখে তাকিয়ে রইলো নিস্পার দিকে,তবে লাভ হলো না বেশ,নিস্পার কঠিন কথার মানে বুঝে উঠতে পারলো না কিছুতেই।

“এতো কঠিন কথা শিখলি কবে থেকে?”

আইরিশের প্রশ্নে ভিষণ বিব্রত হয় নিস্পা,আইরিশ যে তাকে ফ্লোরেন্সা ভাবছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই,তবে আইরিশের ভুলটা ভাঙানোর প্রয়োজন বোধ করলো নিস্পা,গলা পরিস্কার করে বললো,

“আপনি আমাকে ফ্লোরেন্সা ভাবছেন তাই না?”

আইরিশ ভ্রুকুটি তুলে তাকালো,চোখ ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করলো,

“এখানে আসার পর নিজের পরিচয় পাল্টে ফেলেছিস নাকি?তা নতুন পরিচয়টা কি শুনি?”

নিস্পা এবার ভিষণ অস্বস্তিতে পরে,আইরিশ কে বোঝানোর জন্য বলে,

“আসলে আমি ফ্লোরেন্সা নয়,ফ্লোরেন্সার মতো দেখতে অন্য কেউ।আমার নাম নিস্পাপ, আমি 2025 সাল থেকে অতীতে চলে এসেছি টাইম ট্রাবল করে।”

নিস্পার কথায় তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না আইরিশ,কেমন ভাবলেশহীন ভাবে বললো,

“বাহ!ব্রিটিশ পুত্রের সাথে থেকে তো বেশ উন্নতি হয়েছে দেখছি,রাতারাতি ইংরেজি শিখে গিয়েছিস,সাথে মিথ্যা কথা বলাটাও একদম নিখুঁত শিখেছিস।”

নিস্পার মেজাজ খারাপ হলো,চোয়ালে বিরক্তিভাব ফুটিয়ে কটমট করে আওড়াল,

“এদেরকে সত্য বলে লাভ নেই নিস্পা,যতই সত্য বল এরা কেউ তোর আজগুবি কথা বিশ্বাস করবে না।”

নিস্পাকে চুপ থাকতে দেখে দু’হাত বাড়িয়ে নিস্পার হাত আঁকড়ে ধরলো আইরিশ।আইরিশের অযাচিত স্পর্শে শিউরে উঠলো নিস্পা,কম্পনের ফলে হাত থেকে পিচলে পড়লো লাল জবা।নিস্পা অপ্রস্তুত ভঙিতে হাত সরিয়ে নিতে চাইলো,থতমত হয়ে বলল,

“কি কি করছেন কি আপনি?”

আইরিশের দৃষ্টি ব্যাকুল।সে মোহিত কন্ঠে বললো,

“কেমন আছিস ফ্লোরেন্সা?”

নিস্পা চুপটি করে রইলো, এমন সুন্দর প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে থাকা মানায় না,তাই প্রতুত্তরে বললো,

“ভালো।”

আইরিশ ঠোঁট টিপে অপলক চেয়ে রইলো নিস্পার দিকে, তারপর মলিন স্বরে বললো,

“মিথ্যা বলিস না ফ্লোরেন্সা।আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তুই ভালো নেই।ওই ব্রিটিশ প্রিন্স তোকে টর্চার করে তাই না?”

“সুযোগই তো পায় নি,আমাকে টর্চার করা এতো সহজ নয়।”

নিস্পার উত্তরে না চাইতেও হেসে ফেললো আইরিশ,হাত ছেড়ে দিয়ে এক হাতে গাল টেনে ধরে বললো,

“আমার বোকা রানী ভিষণ সাহসী হয়েছে।বিচার সভায় কেমন ব্রিটিশ পুত্রকে নাজেহাল করলি তাতো স্বচোক্ষেই দেখলাম।বিশ্বাস কর, আমি তোর থেকে এমন নির্ভিক কাজ মোটেও আশা করি নি।”

“কেন?ফ্লোরেন্সাকে কি বোকাসোকাই মানায়?সাহসী ফ্লোরেন্সাকে কি মানতে কষ্ট হয়?”

আইরিশ এবার নিজের দুইহাত তুলে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার দুই গাল,তারপর বিমোহিত কন্ঠে বললো,

“প্রেমে পড়েছি আলেকজান্দ্রা।তোর এই নতুন রুপের প্রেমে মত্ত হয়েছে এই অধম।”

নিস্পার চাহনিতে বিস্ময়,সে চোখ বড়বড় করে চাইলো আইরিশের চোখের দিকে,দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে সরে দাঁড়ালো বিঘে পরিমাণ দুরত্ব নিয়ে।

আইরিশের দু’হাতের কালি তখন লেপ্টে গিয়েছে নিস্পার গালে, অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখালো না নিস্পা,কাঁপা কন্ঠে বললো,

“এসব কি বলছেন আপনি?”

আইরিশ আশাহত,তার চোখে বেদনার নিগুঢ় ছাপ,সে ব্যাকুল কন্ঠে বললো,

“যে সন্ধ্যায় তোকে প্রথম বকুল তলায় ফুল কুড়োতে দেখেছিলাম সে সন্ধ্যা থেকেই প্রেমে পড়েছি তোর।তোর রুপের মোহ আমাকে পাগল করে দিয়েছিলো ফ্লোরেন্সা।”

“আর কাল তোর ওই নতুন রুপ সর্বনাশ ডেকে এনেছে,আমি নিজেকে হারিয়েছি দ্বিতীয়বার।প্রেমে পড়েছি তোর নির্ভিক কন্ঠস্বরের।”

নিস্পা কি করবে বুঝতে পারলো না, তবে আইরিশ কে বোঝানো দরকার সে ফ্লোরেন্সা নয়,

“কিন্তু আমি,,,,

নিস্পাকে তার কথা সম্পূর্ণ করতে দিলো না আইরিশ, তার আগেই বললো,

” প্রিন্স জোসেফকে ভালোবাসা তোর মোহ ছিলো ফ্লোরেন্সা,প্রকৃত অর্থে তোর মতো সরল ফুল কখনো ওই জালিম নিষ্ঠুর প্রিন্সকে ভালোই বাসতে পারে না।প্রিন্স জোসেফ তোকে সম্মোহন করেছে এখনো কি বুঝতে পারছিস না?”

আইরিশ ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো নিস্পার সামনে,দু’হাতে নিস্পার কাঁধ ঝাকিয়ে বললো,

“আমার চোখের দিকে তাকা আলো,আমার দিকে দেখ।

নিস্পা ঠোঁট কামড়ে চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে।আইরিশের জোড়াজুড়িতে পিটপিট করে খুললো চোখের পেলব,আবিষ্ট নয়নে তাকালো আইরিশের দিকে, আইরিশের চোখ ঝাপসা,পুড়তে থাকা কয়লার মতো দগদগে লাল।সে শুখনো ঢোকের সাথে গিলে নিলো বিষাধের তেতো তরল,ক্ষতবিক্ষত কন্ঠে বললো,

“আমি ভালোবাসি তোকে আলেকজান্দ্রা।যদি এজন্মে না পাই,তবে আরো একবার জন্মাবো,এই অতৃপ্ত আত্মা ফিরবে আবার,হয়তো অন্য নামে, নয়তো অন্য শরীরে তবে মনে রাখিস এই একই প্রেমের তৃষ্ণা নিয়েই জন্মের পর জন্ম তোর পিছু করবো আমি।”

।নিস্পার হাপড় হাপড় লাগলো,কাধ ঝাকিয়ে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে,ঘনঘন শ্বাস ফেলে বললো,

“ভুল হচ্ছে মস্ত বড় ভুল হচ্ছে।খুব আফসোস করতে হবে একদিন।”

তাকরিমের নজর আটকালো মেঝের উপর পড়ে থাকা জবা ফুলের উপর,সে ঝুকে গিয়ে তুলে নিলো ফুলটা তারপর নিস্পার দিকে এগিয়ে গিয়ে কোমল আলিঙ্গনে নিস্পার কানে গুজে দিলো লাল জবা ।নিস্পার হৃৎপিন্ড লাফাচ্ছে,ধকধক শব্দ হচ্ছে বুকের ভেতর,সে আনমনেই হাত ছোয়ালো কানের কাছে।আইরিশ মোহিত কন্ঠে আওড়াল,

“তোকে মারাত্মক সুন্দর লাগছে আলেকজান্দ্রা।এতো বেশি সুন্দর লাগছে যে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করছে।”

“পরের জিনিসের দিকে তাকানোর ভুল করবেন না জনাব।প্রিন্স জোসেফ কিন্তু আপনার চোখ উপরে ফেলার ক্ষমতা রাখে।”

পেছন থেকে প্রিন্স জোসেফের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই অপ্রস্তুত দৃষ্টি ঘোরায় আইরিশ আর নিস্পা।প্রিন্স জোসেফ বুক ফুলিয়ে চিতাবাঘের ন্যায় এগিয়ে এসে দাঁড়ায় নিস্পার মুখোমুখি।তারপর অভিব্যক্তি বিহীন হাত বাড়িয়ে দেয় নিস্পার কানের কাছে গুজে রাখা ফুলটির দিকে।নিস্পা দ্রুত হাত উঠায়, বাধা দিতে চায়, তবে প্রিন্স জোসেফের বাজ পাখির ন্যায় শিকারী চোখ জোড়ায় দৃষ্টি আটকাতেই স্থির হয়ে যায় হাত।জোসেফ অভিব্যক্তি বিহীন চোখের পেল্লব নাড়ায় একবার তারপর জবা ফুল টা টেনে এনে সোজা পিষে ফেলে পায়ের নিচে।

আইরিশ রাগে চোয়াল শক্ত করে,প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ষাড়ের মতো তেড়ে এসে থামে জোসেফের নাকের ডগা ঘেঁষে।দুজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের সংঘর্ষে বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা,আইরিশের চোয়াল শক্ত,কপালের শিরা উপশিরা টানটান,সে ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“নির্দয় মানব, যে হাত সামান্য ফুল ছোঁয়ার যোগ্য না, সে হাতে কীভাবে নারীর কোমলতা চূর্ণ করে সাহস দেখাস?”

প্রিন্স জোসেফ ইশারা করলো সাথে থাকা প্রহরীদের।সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন প্রহরী এসে বাজেয়াপ্ত করলো আইরিশকে,টেনে হিচড়ে দূরে সরালো জোসেফের কাছ থেকে।জোসেফ এক মনে নৃশংস ভাবে ফুলটা পিষতে পিষতে আওড়াল,

“ফুলের সৌন্দর্য বর্ধনে ফুলের প্রয়োজন হয় না।প্রয়োজন হয় দুটো মুগ্ধ চোখের।”

কথাটা বলেই নজর উঁচু করলো জোসেফ,তারপর প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বললো,

“জনাব আইরিশের আমার আতিতেয়থা পছন্দ হয় নি মনে হয়।উনার আরেকটু ভালো আপ্যায়নের ব্যাবস্থা করো।কয়লা নয়,উত্তপ্ত লোহা কাটার কাজে নিয়োজিত করো তাকে,বিশ্রামের সময় তো নয়ই, যেন নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় না পায়।”

আইরিশ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে চেচালো,

“যত ইচ্ছে শাস্তি দে, তবে মনে রাখিস ফ্লোরেন্সাকে না নিয়ে ফিরবো না আমি।ফ্লোরেন্সা আমার, তার গায়ে একটা ফুলের টোকা দেওয়ার সাহস দেখাবি না বলে দিলাম। মনে রাখ, যাকে তুই কোমল ফুল ভেবে পায়ে মারানোর কথা ভাবছিস তার চরনতলে জন্ম নিবে এক নতুন সভ্যতা, যেখানে তোর মতো স্বৈরাচারী দানবের কোন অস্তিত্ব থাকবে না।”

“”দানবের জন্ম তখনই হয়, যখন সভ্যতা ফুলের সৌন্দর্যকে সহ্য করতে শেখে না।দানব তো ফুলকে নিষিদ্ধ করার অজুহাতে ফিরে বারকে বার।”

ভরাট কন্ঠে কথাটা বলতে বলতে হাত তুলে ইশারা করলো জোসেফ,
“নিয়ে যাও ওকে।”

প্রহরীরা জোসেফের কথা মতো টেনে হিচরে নিয়ে যেতে শুরু করলো আইরিশ কে।নিস্পার খুব রাগ হলো,আইরিশকে চোখের আড়াল করের আগেই চেচিয়ে উঠলো বিপ্লবী কন্ঠে,

“কি করছেন কি?ছাড়তে বলুন উনাকে।এতো নির্দয়ের মতো কেন করছেন বলুনতো?”

“আমি নির্দয় তাই আমার কাজগুলোও হবে নির্দয়ের মতোই।”

জোসেফের সোজাসাপটা উত্তরে মেজাজ খারাপ হলো নিস্পার,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“উনাকে ছেড়ে দিন বলছি।ফিরে যেতে দিন উনাকে।”

জোসেফ তোয়াক্কা করলো না,একপলক আইরিশের জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার কোমর,তারপর ভরাট কন্ঠে বললো,

“কিন্তু উনি তো তোমাকে ছাড়া ফিরবে না বললো।”

নিস্পা জোসেফের চোখে চোখ রেখে শক্ত কন্ঠে বললো,

“তাহলে যেতে দিন আমায়,ফিরতে দিন উনার সঙ্গে।”

জোসেফ আরেকটু শক্ত করে ধরলো নিস্পার কোমর,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আমার মহলের অভিশাপ তুমি,তোমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে উনি নিজের ফিরে যাওয়ার সুযোগ টুকু হারিয়েছে কি করার বলো?”

আইরিশ দূর থেকে দেখলো নিস্পা আর জোসেফের ঘনিষ্ঠতা,হৃদপিন্ডে কুড়োল মারার মতো যন্ত্রনায় ছটফটিয়ে উঠলো তার ভেতরটা,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললো,

“নিজেকে সুরক্ষিত রাখ ফ্লোরেন্সা।আমার ভালোবাসার আলেকজান্দ্রাকে পবিত্র রাখ যেকোন মূল্যে।”

নিস্পা মুচড়াতে শুরু করলো, নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় কিল ঘুষি দিতে শুরু করলো জোসেফের বুকের উপর,ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,

“ছাড়ুন আমায়,আপনার নোংরা স্পর্শে শরীর গুলিয়ে আসে,বোমি পায় আমার।”

প্রিন্স জোসেফ একপ্রকার খামচে ধরলো নিস্পার কোমরের কোমল অংশ,ফিসফিসিয়ে বললো,

“বোমি করার মতো করে তো স্পর্শ করি নি, আমি তো শুনেছি সে স্পর্শ আরো জঘন্য হয়।”

“ছিঃ, আপনি এতো জঘন্য কেন?এসব নোংরা কথা কীভাবে বলতে পারেন?একটা মেয়েকে আর কতটা জঘন্যভাবে স্পর্শ করার ইচ্ছে আপনার?”

“যতটা স্পর্শ করলে কলঙ্কিত করা যায়,ততটাই গভীর স্পর্শ করার ইচ্ছে আমার।”

কথাটা বলতে বলতে জোসেফ নিস্পার কানের কাছে ঝুকে এলো,ফের ফিসফিসিয়ে বললো,

“তোমার ভাষায় যাকে বোমি করানোর স্পর্শ বলে সেই স্পর্শই করতে চাই আমি।”

“এমন স্পর্শ করার আগে আপনার মৃত্যু হোক।”

“বাহ!উন্নতি হয়েছে দেখছি।আগে নিজের মৃত্যু চাইতে এখন আমার মৃত্যু!”

নিস্পা দাঁতে দাঁত পিষলো,চাপা স্বরে বললো,

“নিজের মৃত্যু তো বোকা রা চায়।আমি সেই কাতারের নই।নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যকে মারতে হাত কাঁপবে না আমার।”

প্রিন্স জোসেফ রহস্য হাসলো,হেচকা টানে নিস্পাকে ঘুরিয়ে নিলো পেছনের দিকে,তারপর নিস্পার পিঠের উপর ফ্রকের জিফারটা টেনে খুলে ফেলতেই আঁতকে উঠল নিস্পা,এক হাত তুলে নিজের উন্মুক্ত পিঠ ঢাকার চেষ্টা চালিয়ে ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“ব্রিটিশের বাচ্চা তোকে জানে মেরে দিবো আমি।”

জোসেফ দ্বিরুক্তি করল না, নিজের খরখরে ঠান্ডা হাত ছুইয়ে দিলো নিস্পার পিঠের উপর ক্ষত স্থানে,যেখানটায় চাবুকের আঘাতে নিজেই রক্তাক্ত করেছে মেয়েটার কোমল ত্বক।জোসেফের হাতের স্পর্শ পেতেই শিউরে উঠলো নিস্পা,পকম্পিত কন্ঠে অস্পষ্ট আওড়াল,
“কি কি করতে চাইছেন আপনি?”

জোসেফের বিমোহিত মুগ্ধ দৃষ্টি নিস্পার পিঠের উপর,সে কেবল মাদকিয় কন্ঠে বললো,

“তোমার ক্ষত স্থানটা বিকৃত হওয়ার কথা ছিলো, অথচ এটা আমার ধারনার চেয়েও অসম্ভব বেশি সুন্দর।তুমি কি যানো মেয়ে ওই লাল ফুল তোমার সৌন্দর্যকে হিংসে করছিলো।”

নিস্পার কন্ঠে তেজ,কঠোর স্বরে প্রতিত্তোর করলো,

“নিজের সৌন্দর্যের প্রতি বরাবরই উদাসীন আমি,আমাকে কে হিংসে করলো না করলো সেসবে মাথা ব্যাথা নেই আমার।”

জোসেফ দ্বিরুক্তি করলো না,পাশের টেবিলে রাখা ঔষধি তরল তুলে লনিলো নিজের হাতের আঙুলে। তারপর ধিরে ধিরে নিস্পার ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বললো,

“ফুল যদি নিজেই না জানে সে কতটা সুন্দর, তবে বাহারি বাগানও তাকে আত্মবিশ্বাস বিলাতে ব্যার্থ।”

“আপনার কথাগুলো বরাবরই শক্ত,যাকে ব্যাকারনের ভাষায় বলে কঠিন।তবে শুনতে মন্দ নয়।”

“কিন্তু আমি যে মন্দ মানুষ সে কথা অস্বীকার করার পথ নেই।”

নিস্পা সুযোগ লুপে নিলো,কথার ফাঁকে চট করেই ধাক্কা দিলো জোসেফকে,নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,

“ভুলেই বসেছিলাম আপনি একটা জানোয়ার।”

জোসেফ কপাল কুচকালো,এগিয়ে যেতে চাইলো নিস্পার দিকে,নিস্পা চোরা চোখে চাইলো এদিক সেদিক, তারপর একটা ফুলদানি হাতে তুলে নিয়ে তাক করলো জোসেফের দিকে,রুদ্ধস্বরে বললো,

“এগোবেন না আমার কাছে,একটা নির্দয় জালিম পুরুষের ছোয়া আমার শরীরে সুচের মতো বিঁধে।”

“ঘৃনা করো আমায়?তাতে কি?তোমার ঘৃনাতেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই।”

“আপনি আনন্দ পান, কারণ আপনি অসুস্থ, আপনার মস্তিষ্ক অসুস্থ।”

“আমি জানি আমার মস্তিষ্ক অসুস্থ, নয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমার সান্নিধ্য চাইতো না।”

“বাহ আপনার মস্তিষ্ক দেখি গিরগিটির মতো রঙ পাল্টায়।কাল যাকে চাবুক মেরে আহত করলো,আজ তার সান্নিধ্য পেতে উতলা হয়ে গেলো?”

জোসেফ চোয়াল শক্ত করে একটি সিগারেট ধরালো,তারপর কয়েক সেকেন্ড কাটলো নিরবতায়।ঠোঁট গোল করে নিস্পার দিকে ছুড়ে দিলো সিগারেটের কালো ধোঁয়া,তারপর থমথমে কন্ঠে বললো,

“তোমার নেশা এই নিকোটিনের চেয়েও ভয়ংকর ,আমি একটু একটু করে পুড়ে যাচ্ছি,স্বইচ্ছায়।”

নিস্পা বাকরুদ্ধ,পাজরের নিম্ন দেশে মেরমের শব্দ হচ্ছে,মনে হচ্ছে এক অদৃশ্য অনুভুতির জাতাকলে তার বুক পাজরের হাড় গুলো ভেঙে যাচ্ছে,নিজেকে কোনভাবে সামলালো নিস্পা,লম্বা শ্বাস টেনে বললো,

“আপনাকে আমি জালিম ভেবেছিলাম কিন্তু আপনি তো দেখছি আবালের অধিপতি।”

নিস্পার ব্যাঙ্গার্থক বাক্যে এপর্যায়ে অপমান বোধ করলো প্রিন্স জোসেফ,অভিব্যক্তি কঠোর করে বললো,

“তুমি আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছো মেয়ে।এর ফল ভয়ংকর হতে পারে।”

“ভয় পাই নাকি?আমার নামে যার হৃদস্পন্দন বাড়ে তাকে পাবো ভয়?”

প্রিন্স জোসেফ অগ্নি চোখে তাকালো, নিজের দূর্বলতা আড়াল করার প্রয়াসে দাম্ভিক কন্ঠে বললো,

“আমার হৃদয় নেই মেয়ে,আর তাই তা স্পন্দিত হওয়ার শঙ্কাও নেই।”

নিস্পা মুচকি হাসলো,হাতের ফুলদানি টা বিছানার নকশাকাটা পাল্লার সাথে আঘাত করে ভেঙে ফেললো অর্ধেক টা।বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,

“আমি অভিশপ্ত সুন্দরী, যে আপনাকে ভালো না বেসেই আপনার হৃদয় গড়ে ফেলেছে এক চুটকিতে।”

“আত্মবিশ্বাস ভালো, তবে অত্মগৌরব ভালো নয় মেয়ে,শয়তানের হৃদয় গড়া অসম্ভব।”

নিস্পা বিদ্রুপ হাসলো,হাতে চেপে ধরা ভাঙা ফুলদানি টার চৌকল অংশের দিকে তাকিয়ে বললো,

“আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি আপনার হৃদয় আছে।”

কথাটা বলার কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের গতিতে নিস্পা তার হাতের ফুলদানিটার ধারালো অংশ এগিয়ে নিয়ে গেলো নিজের পেটে বিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে।

সময় থমকে গেল। সেকেন্ড টেনে নিল মিনিটকে, মিনিট টেনে নিল অনন্তকাল।নিস্পা ধীরে ধীরে খুললো তার খিচে নেওয়া চোখের পাতা। কিন্তু ব্যাথা?কই অনুভব তো হলো না।অথচ সে অনুভব করলো তার কোমল পায়ের উপর উত্তপ্ত তরলের উপস্থিতি।সে ধিরে ধিরে পায়ের দিকে তাকালো, তার ফর্সা পা ভিজে গিয়েছে লাল রক্তে।সে তার এক হাত তুলে রাখলো পেটে, নাহ!বিদীর্ণ হয় নি,একটুও ছিলে নি তার ত্বক।নিস্পা শুস্ক ঢোক গিললো, তারপর বিস্ফোরিত দৃষ্টি তুলে তাকালো প্রিন্স জোসেফের চোখের দিকে,জোসেফের চোখে জমাট বাঁধা রক্তের লালিমা।সে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে আছে ধাতব খণ্ডটা,যার চৌকল অংশ অনায়াসে বিদীর্ণ করেছে তার হাতের চামড়া।

“আমার হৃদয়কে অভিশপ্ত করে তুমি মরার অধিকার খুইয়েছ অভিশপ্ত সুন্দরী।”

প্রিন্স জোসেফের ধারালো বাক্যে নিস্পার চোখে খেলে গেলো বিস্ময়, অথচ ঠোঁট জুড়ে বিদ্রুপ হাসির রেখা এক সুতোও কমে নি,ভনিতা না করেই বললো,

“আমি জানতাম আপনি আমার কিছু হতে দিবেন না,কিন্তু আমার জন্য নিজেকে আহত করবেন এটা ভাবতেও পারি নি।”

কথাটা বলতে বলতে একটু ঝুঁকে এলো নিস্পা,জোসেফের কানের কাছে ঠোঁট রেখে হেয়ালি কন্ঠে ফিসফিসালো,

“শালা নীল চোখের বাচ্চা এবার বিশ্বাস হলো তো?আপনার হৃদয় আছে যার পুরোটাই ধারাকতাহে মেরে নামছে।”

একটু থেমে পুনরায় বললো,

“এতো বড় উপকার করলাম একটা লাল সালাম দিন মশাই।”

অন্তরের তাড়নায় অস্থির জোসেফ নিজের দ্রিম দ্রিম শব্দে স্পন্দিত হৃদয়টাকে ঢাকতে চাইলো শক্ত খোলসের আড়ালে,হিংস্র কন্ঠে বললো,

“আমাকে রাগীও না মেয়ে,আমার ভেতরের পশু বেড়িয়ে এলে শিকার ছাড়া শান্ত হবে না।”

নিস্পা ঠোঁটের সাথে ভ্রু উচালো,জোসেফের কথার তোয়াক্কা না করে অদম্য কন্ঠে বললো,

“আসুক বেড়িয়ে, টিকটিকি ভয় পাই না আমি।”

জোসেফ ভ্রুকুটি তুলে তাকালো,স্বগোতক্তিতে আওড়াল,

“টিকটিকি?”

নিস্পা ঠোঁট টিপে হাসলো, ছলচাতুরী না করে সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো,

“এটাও চেনেন না?টিকটিকি হলো গরিব কুমির,যে প্রাণী ছোটবেলায় হরলিক্স খেতে পায় নি।”

নিস্পার কথায় দাবানলের ন্যায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠল জোসেফের সচল মস্তিষ্ক, মুহূর্তেই রূপ নিলো উন্মত্ত অগ্নিকুণ্ডে,যেখানে যুক্তির শীতল ছায়া খুঁজে পাওয়া দুর্লভ।হৃদয়ের তীব্র তাড়না আর মস্তিষ্কের অস্থিরতা মিলেমিশে বুকের ভেতর শুরু হলো নির্মম দ্বন্দ্ব। সদ্য জন্ম নেওয়া অচেনা অনুভূতিরা পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে বেড়াতে শুরু করলো তার অস্তিত্বজুড়ে।যে অনুভূতি গুলোকে শেকল বন্দী করতে চায় জোসেফ,গলা টিপে হত্যা করতে চায় নিজ হাতে। কিন্তু সে ব্যর্থ। অনুভবের নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তার রক্তধারায়।তার শিরা উপশিরা আর হৃদস্পন্দনে এখন কেবল প্রবাহিত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত দহন।

বিভ্রমে ডুবে গিয়ে বোধশক্তি হারায় জোসেফ,লোপ পায় চিন্তাধারা,চট করেই নিজের রক্তাক্ত হাতটা তুলে রাঙিয়ে দেয় নিস্পার চওড়া সিতি।শুষ্ক কন্ঠতালু ভেদ করে অস্ফুটে আওড়ায়,

“অভিশপ্ত সুন্দরী আমার হৃদয়ের সন্ধান দিয়ে ভয়ংকর অপরাধ করেছ তুমি।এই চমৎকার দংশন তোমার জন্য।তোমার সিতিতে আমি লাল রঙের সিলমোহর এঁকে দিলাম,স্বীকৃতি দিলাম ব্রিটিশ প্রিন্সের মহারানী হিসেবে।”

নিস্পা বাকরুদ্ধ,কিংকর্তব্যবিমুঢ়।ঘটিয়মান ঘটনা আচ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো তার,তারপর ধিরে ধিরে হাতটা তুলে বিবষ আঙুল গুলো দ্বারা স্পর্শ করলো সিতি জুড়ে রাজত্ব করা জোসেফের লাল রক্ত,প্রারম্ভে রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে বললো,

“বিষয় টা সেন্সিটিভ,কিন্তু সেঞ্চুরি মারার কৌশলটা ভুল।”

হাতের তালুর সাহায্যে রাঙা সিতির রক্ত মুছতে মুছতে পুনরায় বললো,

“আমি মুসলিম, সামান্য লাল রঙে রাঙানো সিতি কখনো সম্পর্কের মানদণ্ড হতে পারে না।”

প্রিন্স জোসেফ হাত বাড়িয়ে নিস্পার কপালেই চেপে ধরলো তার হাত,বজ্র কন্ঠে প্রতুত্তর করলো,

“আমি বিধর্মী, কোন ধর্ম নেই আমার, আমার কাছে
সম্পর্কের স্বীকৃতি পাওয়াটাই মুখ্য।সে যে ধর্মের রীতিতেই হোক না কেন।”

চলবে,,,,,

(সামনে আরও চমক অপেক্ষা করছে,আশিক এবং আব্দুল হানিফ দুজনেই উপস্থিত হতে চলেছে ব্রিটিশ মহলে।পরবর্তী পর্বের জন্য অবশ্যই একটু বেশি বেশি রেসপন্স করো,নয়তো আমি লিখতে বসবো না)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here