হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:45

0
34

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:45

অন্ধকার ঘরে প্রায় কয়েক ঘন্টার বেশি সময় ধরে আটকে পরে আছে নাবহা।দাসী শারিকা কোন এক বিশেষ কাজের বাহানায় তাকে পাঠিয়েছিলো এই ঘরে।কিন্তু এই ঘরে আসার পরেই বোকা রমনী বুঝতে পারে এটা নিশ্চয়ই কোন ষড়যন্ত্র,তাকে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র।
কিন্তু অনেক ভেবেও মেয়েটার মাথায় এলো না কেন করা হলো এই ষড়যন্ত্র,তাকে আটকে রেখে কি এমন উদ্দেশ্য হাসিল হবে দাসী শারিকার?

এদিকে নেশাগ্রস্ত অর্ধ উন্মাদ আইরিশকে কয়েকজন প্রহরী এসে খুব সাবধানে রেখে গেলো নিস্পার কক্ষের সামনে।পরিকল্পনা মতো সব কাজ শেষ,এখন শুধু আইরিশের নিস্পার কক্ষে প্রবেশ করার অপেক্ষা।

আইরিশ তার নেশায় টালমাটাল কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে যখনই নিস্পার কক্ষের দরজা স্পর্শ করবে ঠিক তক্ষুনি পাশের কক্ষ থেকে ভেসে এলো নাবহার মোলায়েম কন্ঠ,

“কেউ আছেন?দরজা টা খুলে দিন না দয়া করে।আমাকে এখানে আটকে রাখার কারণ কি?”

নাবহার কন্ঠ কানে আসতেই ধপড়ফড়িয়ে উঠলো আইরিশ,উদগ্রীব দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে তাকালো নাবহার কক্ষের দিকে।তারপর টালমাটাল পা জোড়া দোলাতে দোলাতে এগিয়ে গেলো সেদিকেই।

বাইরে থেকে লাগানো দরজার কপাট খুলে ধীর পায়ে টলমল করে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল এক অপরিচিত পুরুষ।নাবহা থমকে গেলো, স্থির হয়ে গেলো পাথরের মূর্তির মতো,বুকের ভেতর শুরু হলো কাঁপন।আতংকিত দৃষ্টিজোড়া অস্থির হয়ে খুজলো পালানোর পথ।

ততক্ষনে কক্ষের বাইরে জ্বলজ্বলে মশালের আলোয় আলোকিত হয়েছে অন্ধকার ঘর।আগুনের ক্ষীন আলো এসে লুটিয়ে পড়লো আইরিশের মুখের উপর।অপরিচিত পুরুষ অবয়ব টা এবার পুরোপুরি অপরিচিত ঠেকলো না নাবহার কাছে।এলোমেলো চুল, আর নেশাগ্রস্ত লাল রক্তাভ চোখজোড়া অপরিচিত লাগলেও,ওই সুন্দর সুস্পষ্ট মুখটা বড্ড পরিচিত লাগলো নাবহার।সচল মস্তিষ্ক আইরিশের উপস্তিতি টের পেলো খুব শীঘ্রই, সঙ্গে সঙ্গে একটুকরো ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো হৃদয়গহ্বর।

এতোক্ষণে রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো মেয়েটা,সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আইরিশ কে দেখে অস্থির কন্ঠে বললো,

“আপনি?আপনি এখানে কি করে এলেন?”

পরপরই ভয়াতুর দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকিয়ে হেচকা টান বসালো আইরিশের হাতে,আইরিশকে কক্ষের ভেতরে ঢুকিয়ে ব্যাস্ত হাতে দরজা বন্ধ করতে করতে বললো,

“আপনি এখানে এসেছেন কেউ দেখে নি তো?দেখলে কি হবে জানেন?শাস্তি পেতে হবে।আপনাকে শাস্তি পেতে দেখলে আমার ভিষণ কষ্ট হয়।”

“ভালোবাসো মেয়ে? আমায় খুব ভালোবাসো তাই না?”

আইরিশের হিম শীতল কন্ঠে স্তব্দ হয়ে যায় নাবহা।থমকে যায় সমস্ত তাড়াহুড়ো, স্থির হয়ে তাকায় আইরিশের শুন্য চোখের দিকে, যেখানে অনুভুতি নেই,আছে কেবল নেশা আর নেশা।মেরুন রঙের একটা ফতোয়া আর লুঙ্গি পড়া টগবগে বাঙালী যুবক,দেখতে দূর আকাশের ওই চাঁদের মতো সুন্দর,যার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় কিন্তু ছোয়া যায় না।

বদ্ধ ঘরের চারদেয়ালে বন্দি বাতাসে ভেসে বেড়ানো নেশাদ্রব্যের বিশ্রী গন্ধ নাকে এসে আছড়ে পড়ছে নাবহার,তার বুঝতে বাকি নেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সজ্ঞানে নেই,সে নিশ্চয়ই নেশাগ্রস্ত। অগত্যা শুখনো ঢোক গিললো সে,প্রকম্পিত স্বরে আওড়াল,

“আপনি নেশা করেছেন। এসব কোথায় পেলেন আপনি ?

নির্বিঘ্নে পা দোলাতে দোলাতে নাবহার কাছে এসে দাঁড়ায় আইরিশ,নাবহার করা প্রশ্ন সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে মোহিত কন্ঠে বলে,

“তুমি খুব সুন্দর মেয়ে।একদম আমার মায়ের মতো।শুনেছি তিনি নাকি তোমার মতো শ্যামলা ছিলো।”

আইরিশের বাক্যে বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় ছলকে উঠলো নাবহার নাজুক স্বত্ত্বা,কোমল কন্ঠে প্রত্যুত্তর করে বললো,

“আপনি নিজের মধ্যে নেই তাই প্রশংসা করছেন।শুনতে মন্দ লাগছে না।”

আইরিশের চোখে দগ্ধতা,সে এগিয়ে এলো আরও কাছে,মধ্যকার সমস্ত দুরত্ব ঘুছিয়ে চেপে ধরলো নাবহার কোমর,বিমোহিত কন্ঠে বললো,

“তুমি খুব ভালো মেয়ে।আফসোস তোমাকে ভালোবাসার সাধ্য হলো না আমার।”

কিছু একটা বলতে গিয়ে কন্ঠ নিভে আসে নাবহার,বনভাসি স্রোতের মতো অথৈ জলে কোটর ভরে আসে,শুখনো ঢোক গিলে বিপর্যস্ত স্বরে বলে,

“এই ভালো মেয়েটাকে ভালোবাসলে কি এমন ক্ষতি হবে আপনার?”

“লাভ ক্ষতির হিসেবে আমি বড্ড কাচা।ব্যাবসার হিসেব কষতেই হিমসিম খাই,আর এটা তো ভালোবাসা।”

আইরিশের নিটোল কন্ঠের নির্বিকার উত্তরের বিপরীতে নাবহা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন।তারপর নিস্পল কন্ঠে বললো,

“ভালোবাসা যদি ব্যাবসা হতো?তবে আপনিই হতেন আমার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।”

আইরিশ তার বুজে আসা দুটো চোখ টান টান করে তাকালো,এলোমেলো কন্ঠে বললো,

“ভুল ঠিকানায় বিনিয়োগ করতে চাইছো মেয়ে,আমি এমন এক ঝুঁকি, যা অনেক আগেই দেউলিয়া হয়ে গেছে অন্য ঠিকানায়।”

নাবহা ঠোঁট টিপে বিষাধ গিললো,আফসোসের সহিত বললো,

“একটু আগে বলেন না আমি বোকা।সত্যিই আমি বোকা।নিষিদ্ধ জেনেও আপনার দেউলিয়া হৃদয়ে পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখি বেহায়ার মতো।”

আইরিশের অনুভূতি এবারেও শুন্য,তার মনযোগ অবিন্যস্ত, নাবহার কপালের উপর ছড়িয়ে থাকা কেশগুচ্ছ হাত দিয়ে গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,

“বোকামি করো না মেয়ে,ভাঙা দেয়ালের ওপর রাজপ্রাসাদ তোলা যায় না,এই অংশটুকুতে তোমার জন্য কবর খোরা হচ্ছে সংগোপনে।তোমার স্বপ্ন শুধু ধ্বংস হবে এখানে।”

আইরিশের ঠান্ডা হাতের স্পর্শে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নাবহা,বিধ্বস্ত কন্ঠে বললো,

“আপনাকে ভালোবাসাটাই যে একধরনের আত্মহুতি।কবর দেবেন?দিন।অন্তত স্বপ্ন মরবে তার ভালোবাসার জমিনে।”

“ভালোবাসার জমিন বলে কিছু নেই, সবই মরুভূমি। তুমি শুধু মরবে না, হারিয়ে যাবে শূন্যতায়।”

আইরিশের প্রতিটি বাক্য অসার করে দিচ্ছে নাবহার শরীর, যন্ত্রণায় নেতিয়ে আসছে তার লতানো নারী দেহ।বিভর্ষ যন্ত্রণা গিলে নিয়ে সে প্রত্যুত্তরে বললো,

“আপনি এতো নিষ্ঠুর কেন?যেই হৃদয়ে ফ্লোরেন্সাকে নিয়ে সংসার বাধার জায়গা হবে সে হৃদয়ে আমার কবরের জায়গাটুকু দিতে এতো কেন অনিহা?”

আইরিশ মুচকি হেসে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নাবহার কোমর,টালমাটাল কন্ঠে বললো,

“ফ্লোরেন্সার ভাগ আমি অন্যকাউকে দিতে অনিচ্ছুক।”

নাবহার কন্ঠ তেতে উঠলো এপর্যায়ে, নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“আর এই স্পর্শ?ফ্লোরেন্সার জন্য তুলে রাখা পরশ আমাকে কেন বিকিয়ে দিচ্ছেন?”

আইরিশ উত্তর দেয় না,অকস্মাৎ নাবহাকে কোলে তুলে নেয় দু’হাতে।তারপর নির্বিক পদচারণায় এগিয়ে যায় বিছানার দিকে।নেশাধরা কন্ঠে বলে,

“শান্তি চাই মেয়ে,এই ক্লান্ত পথিককে শান্তি দেও।”

_________

“উনি আমার জন্মদাত্রী ছিলো।আমার মা।যার গর্ভে দশ মাস ছিলাম আমি।কিন্তু তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো আমাকে গর্ভে ধারণ করা।তিনি কেন আমাকে গর্ভে ধারণ করলো যদি সে আমাকে লালন পালনই করতে না পারে?জন্ম দেওয়া পর্যন্তই কি একটা মায়ের দায়িত্ব শেষ?
উনি বেইমানী করেছে, নিজের সন্তানের সাথে বেইমানী করেছে,কারণ উনি বাঙালী কন্যা ছিলেন।বাঙালী মেয়েরা ছলনাময়ি,সেলফিশ। আই হেইট মাই মম,আই হেইট বেঙ্গলী গার্ল।”

নেশার ঘোরে কথাগুলো একা একাই বিরবির করছে জোসেফ।নিস্পা অদ্ভুত ভাবে ঝুকে তাকিয়ে আছে তার দিকে।চোখে মুখে তার উপছে পড়া বিষন্নতা।জোসেফের কথাগুলো ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছে তার।শক্ত খোলশে আবৃত মানুষটার ভেতরে যে এতো বেশি একাকিত্ব, এতো বেশি যন্ত্রণা সব কিছু বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে নিস্পা।জোসেফের বলা শেষ দুটো লাইনে কি ছিলো নিস্পা জানে না,তবে অদ্ভুত ভাবে দুটো লাইন বারবার বাজছিলো নিস্পার কানে,নিস্পা বারবার শুনতে পাচ্ছিলো সেই আহত কন্ঠের আক্ষেপ,

“আই হেইট মাই মম, আই হেইট বেঙ্গলী গার্ল।”

নিস্পার মায়া হলো, এতো এতো দিন পর আজ ভেতরে ভেতরে কিঞ্চিৎ মায়া হলো জালিম প্রিন্স জোসেফের জন্য নয় একটা মা হারা সন্তানের জন্য।নিস্পার মা নেই,সেই পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছে,সে যানে মা ছাড়া বড় হওয়া কতটা কঠিন,মায়ের শুন্যতা ভুলে স্বাভাবিক হওয়া কতটা কষ্টের।
নিস্পা তার কোমল হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো জোসেফের মাথায়,তারপর জোসেফের সিলকি চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো,

“আপনাকে বুঝতে হলে আপনার ভেতরটা পড়তে হবে।অথচ আপনার ভেতরে আবদ্ধ শব্দ গুলো অনেক বেশি জটিল।আমি ভুল করেও বুঝতে চাই না।”

জোসেফ নিজের মাথায় নিস্পার কোমল হাতের অস্তিত্ব টের পেতেই চট করেই উঠে বসে,অকস্মাৎ জোসেফের উঠে বসায় বেশ ঘাবড়ায় নিস্পা,জোসেফের মাথায় বুলানো হাতটা সরিয়ে নিতে চায় দ্রুত।কিন্তু নাহ!সে সাধ্য তার হলো না,তার আগেই জোসেফ চেপে ধরলো তার হাত,তারপর হেচকা টানে নিয়ে ফেললো বিছানায়।নিস্পার চোখে চোখ রেখে মাদকিয় কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো,

“”আমি পাথর হতে চেয়েছিলাম, অথচ তুমি ছুয়ে দিয়ে গলিয়ে দিলে।এটা প্রেম নাকি প্রতারণা মেয়ে?”

নিস্পা স্তব্ধ।বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে চেপে আসছে, যেন শত শত প্রশ্নের ভারে পিষে যাচ্ছে অব্যাক্ত হৃদয়।কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো প্রতিধ্বনি, শুধু অনুভব,প্রবল এক অনুভব যা ভাষাহীন অথচ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে তাকে।মনে হচ্ছে মহাকালের জাগতিক সকল ভ্রম জর্জরিত করেছে তার কন্ঠস্বর,

“যদি প্রেম বলি তবে রুপকথা।আর যদি প্রতারণা বলি তবে রূঢ় বাস্তবতা।কোনটায় অভ্যস্ত আপনি?”

ঠিক নীল আকাশে জমে থাকা বিষাক্ত মেঘের মতো জোসেফের নীল চোখে নেই কোন স্থিরতা। মনে হচ্ছে এক দুর্দমনীয় ঝড় সেই নীল গহ্বরে হোচট খেয়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে বারেবারে।বুনো আবেগের উথলে আসা ঢেউয়ের মতো যন্ত্রণা গুলো কন্ঠতালুতে জমিয়ে রেখে ফিসফিসিয়ে বললো,

“আমি তোমার দুঃস্বপ্ন হতে চেয়েছি মেয়ে,তুমি আমার স্বপ্নের রানী হয়ে আমাকেই শাসন করতে শুরু করলে।আমি মুক্তি চেয়ে ফের ব্যর্থ হই।এ এক মারাত্মক সুন্দর অভ্যাসে অভ্যস্ত আমি।”

একজোড়া নীল চোখের গভীরতা এলোমেলো করে দিচ্ছে নিস্পাকে।জোসেফের এতো এতো অভিযোগ নিঃশব্দ টর্নেডোর মতো তছনছ করে দিচ্ছে তার ভিতরটা।সে রুদ্ধশ্বাসে জবাব দিলো,

“আপনি শাসিত কিনা যানি না,তবে আপনার স্বীকারোক্তি প্রিন্স জোসেফের দূর্বলতা আরেকবার প্রকাশ করে দিলো।”

গলার গভীরে আটকে যাওয়া কিছু অমিমাংসিত উত্তর কন্ঠ রোধ করলো জোসেফের,ভাঙা বাসির মত টালমাটাল কন্ঠে বললো,

“আমার দূর্বলতার সমস্তটা তুমি মেয়ে,চাইলে শোষন বা শাসন যা ইচ্ছে করো,নিয়ন্ত্রণ শুধু তোমার।”

নিস্পা ভ্রুকুটি তুলে কটমট করে তাকিয়ে বললো,

“আগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন মশাই,হাতির মতো শরীর দিয়ে পিষে দিচ্ছেন আমায়,আরেকটু সময় অতিবাহিত হলে নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপরে চলে যাবে।”

জোসেফের আগুনে রাঙানো ক্ষতস্থানের মতো দুটি চোখ,যেখানে জ্বলে উঠা অনুভূতি পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে যুক্তির শেষ বস্ত্রটুকুও,সেই জ্বলন্ত খামের ন্যায় দৃষ্টি তাক করলো নিস্পার চোখের গভীরে, ভনিতা না করে উত্তর দিলো,

“সহ্য করতে শেখো মেয়ে,তোমার নিঃশ্বাস হারিয়ে যেতে দেও আমার বুকে,শুধু শরীর নয়, আমি আমার সমস্ত কামনা দিয়ে তোমায় ঢেকে ফেলতে চাই এই মূহুর্তে।”

নিস্পা কেঁপে উঠল।শরীরের প্রতিটি স্নায়ু বিদ্যুৎস্পষ্ট হয়েছে মনে হলো।নিঃশ্বাস কেঁপে কেঁপে উঠলো। এক দুর্বার আকর্ষণ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো তাকে,ঠোঁট কাঁপতে শুরু করলো তিরতির করে, গলার গভীরে জমে থাকা নিঃশ্বাস আটকে আটকে বললো,

“ছাড়ুন আমায়,বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন আপনি।”

জোসেফ একটু একটু করে এগিয়ে এলো নিস্পার খুব কাছে,কামনার ঘোরে ঝাপসা দুচোখ তার,সে কামাতুর কন্ঠে বললো,

“চলো চুক্তি করি।তুমি আমায় শাসন করো আর আমি তোমায় গ্রাস করি।”

নিস্পা চাতক পাখির ন্যায় দাপাদাপি শুরু করলো ছাড়া পাওয়ার জন্য,জোসেফের সুডৌল বক্ষ দু হাতে ঠেলতে ঠেলতে কম্পিত কন্ঠে বললো,

“কীসব বলছেন আপনি? গ্রাস করবেন মানে?”

জোসেফ নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিস্পার কোমল ঠোঁটের দিকে,ঠিক যেমন তৃষ্ণার্ত পথিক তাকায় দূরের জলরাশির দিকে।সে দুরত্ব কমালো,নিঃশ্বাস গাঢ় করলো,তার নিঃশ্বাসের উত্তপ্ত দংশন লুটিয়ে পড়লো নিস্পার মুখের উপর,অত:পর মাদকিয় কন্ঠে ফিসফিসালো,

“প্রস্তুত তো মাই হার্ট? এবারের যুদ্ধে তোমার ঠোঁট আমার যুদ্ধক্ষেত্র হতে চলেছে।”

নিস্পার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো,জোসেফের কথার ব্যাখ্যা আঁচ করেতে পেরেই তৎক্ষনাৎ দন্তপাটি দিয়ে কামড়ে ধরলো নিজের অধর,পরপরই সমস্ত অনুভুতিকে অগ্রাহ্য করে নিজের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরালো জোসেফকে,

“আপনি নেশাগ্রস্ত, নেশার ঘোরে বোধ বুদ্ধি হারিয়ে বসে আছেন,এই কক্ষ ত্যাগ করাই আপনার জন্য মঙ্গল হবে।”

জোসেফ ফুসে উঠলো,মেনে নিতে পারলো না নিস্পার প্রত্যাখ্যান,সে ক্ষুব্ধ হয়ে চেপে ধরলো নিস্পার গ্রীবাদেশ।নিস্পা তড়পে উঠলো,দম আটকে গেলো জোসেফের হাতের মুঠোয়।নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত না পেয়ে ছেড়ে দিলো একফোঁটা চোখের পানি।ব্যাস!নিস্পার চোখের পানির মতোই গলে জল হয়ে গেলো জোসেফের সমস্ত ক্রোধ,গ্রীবা ছেড়ে দিয়ে এবারে দু হাতে আগলে ধরলো নিস্পার দুটো কোমল গাল,নিরেট কন্ঠে বললো,

“ভালোবাসি অভিশপ্ত সুন্দরী,তোমার আগুনের মতো জ্বলন্ত দু’খানা চোখের প্রেমে পড়েছি।আজকে রাতটা আমার নামে লিখে দেও।”

নিস্পার চোখে অনুভুতির ঘনঘটা,একদলা অবাধ্য অনুভুতি ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চাইছে তার কোটর ফেটে। কিন্তু সে নিরুপায়,এই অনুভুতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো বোকামি সে করবে না, কিছুতেই করবে না।নিয়তি তাকে সুযোগ দিয়েছে,নিজের জন্য সঠিক মানুষটা কে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, আর সে এতোদিনে বুঝতে পেরেছে নিঃসন্দেহে জোসেফ বা ত্রিজয় তার জন্য নয়।
কথাগুলো ভেবে শুখনো ঢোক গিললো নিস্পা,জোসেফকে না রাগানোর প্রচেষ্টায় দুস্টু কন্ঠে বললো,

“সামলাতে পারবেন না, মোমবাতি গলে যাবে।”

টালমাটাল জোসেফ বুঝে উঠতে পারলো না নিস্পার ছুড়ে দেওয়া বাক্য, সে কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“মানে? মোমবাতির কি প্রয়োজন?”

নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো, একটু আগে বেপাশে কথা বলার কারণে নিঃশ্বাস টাই বন্ধ হতে বসেছিলো এই ব্যাটার হিংস্র থাবায়।তাই যাই করুক না কেন আপাতত এই মাতাল লোকটাকে রাগানো যাবে না, এই কথা মাথায় সেট করে নিলো নিস্পা।পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্য ঠোঁট টিপে হেসে তাকালো জোসেফের মুখের দিকে, তারপর রস্য কন্ঠে বললো,

“মাত্রই না বললেন আমি আগুনের মতো জ্বলন্ত?আগুনের সংস্পর্শে আসলে আপনার মোমবাতি তো বংশের আলো জ্বালানোর আগেই গলে যাবে।”

জোসেফের কপালে কুচকানো ভাবটা আরেকটু গাঢ় হলো,নিস্পার কথায় তার সাদা চামড়ার ভাজে ধরা দিলো চাপা জেদ,ক্রোধের বসবর্তি হয়ে দু হাতে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার নরম গাল,দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

“ভুল বলেছি আগুন তোমার চোখে নয়, মুখে বলা উচিত ছিলো।খুললেই আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা বের হয়।”

নিস্পা কটমট করে তাকালো, তেতে উঠে প্রত্যুত্তর করলো বিদ্যুৎ গতিতে,

“বাহ!হক কথা বলেছি এতেই আগ্নেয়গিরি হয়ে গেলাম,একটু আগে যে এইখানেই যুদ্ধ করতে চাইছিলেন তখন মনে হয়নি আমার মুখে আগ্নেয়গিরি, যেকোনো মূহুর্তে ঝলসে যেতে,,,,,,”

মাঝপথেই কথা বন্ধ করে দিলো নিস্পা,হুশ ফিরতেই বুঝতে পারলো জেদের বসে কি থেকে কি বলে ফেলেছে।লজ্জায় আইঢাই শুরু করলো এবার,আমতা আমতা করে বললো,

“না মানে না আসলে,,আমি,আসলে,,,,”

এইটুকু কথা বলতে বলতেই ঘামে ভিজে একাকার মেয়েটা।শরীরে জমে থাকা লজ্জাগুলো ঘামের বিন্দু হয়ে স্পষ্ট হয়েছে সমগ্র মুখে।লজ্জা নামক এই ছোট্ট শব্দটা আচানক অলিক বস্ত্রের ন্যায় জড়িয়ে নিয়েছে তার পুরো শরীর।আর স্পষ্টত প্রতীয়মান ঘামের কণাগুলো নির্লিপ্তে উন্মোচন করে দিতে শুরু করেছে সেই অদৃশ্য সংকোচের আবরণ।

জোসেফ ততক্ষণে দুরত্ব কমিয়েছে,এক ন্যনো সেন্টমিটার দুরত্বও অবশিষ্ট নেই আর।তার আবেগ মাখা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিস্পার নাকের ডগায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের উপর।সে নির্লিপ্তে তার হাত এগিয়ে আনে,আঙুলের আগায় তুলে নেয় ঘামের ক্ষুদ্র কণা,তারপর নেশাময় কন্ঠে বলে,

“তোমার ঘামে ভেজা শরীরের বাঁকে আত্মসমর্পণই আমার প্রিয় পাপ!”

নিস্পা সড়ে দাঁড়ায়,ফের দুরত্ব বাড়ায় কয়েক ইঞ্চি,হেয়ালি কন্ঠে বলে,

“পাপ যে কখনো কারো প্রিয় হয় সেটা আপনার থেকেই জানলাম।আপনার মতো পাপির কাছে এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়।”

কথাটা বলতে গিয়ে তাচ্ছিল্য হাসলো নিস্পা,জোসেফ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে এলো পুনরায়,নিস্পা সরে যেতে চাইলে চট করেই টেনে ধরলো তার হাতের কব্জা,ব্যাকুল কন্ঠে বললো,

” কেন হেয়ালি করছো মেয়ে?কেন বুঝতে পারছো না তোমার প্রেমের বিষ আমার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে গিয়েছে,তুমি ছাড়া এই বিষক্রিয়া কাটানো অসম্ভব।”

নিস্পা এবারেও নির্লিপ্ত,যদিও জোসেফের প্রতিটি বাক্য তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু করেছে তবে মনে আঁচর কাঁটতে দেয় নি একটুও,সে সম্পূর্ণ টপিক এড়িয়ে যেতে রস্য কন্ঠে বললো,

“না মানে আমি শুনেছি টয়লেটের চকলেট খাওয়ানো হলে বিষক্রিয়া কেটে যায়,আপনি কি সেটা একবার ট্রাই,,,,,,

নিস্পা তার কথা সম্পূর্ণ করার সময় পেলো না,তার আগেই জোড়ালো একটা থাপ্পড়ে ফেটে গেলো তার নরম গালের চামড়া,জোসেফের ধৈর্যের বাধ ভাঙলো এপর্যায়ে।পাহাড়চাপা নদী দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকার পর যেমন করে উথলে উঠে,ঠিক তেমন করেই সমস্ত ধৈর্য পিষে দিয়ে উথলে উঠলো তার ক্রোধ।অগ্নিগর্ভ লাভার ন্যায় সমস্ত সংযম ভেঙে অবশেষে চেচিয়ে উঠলো রুক্ষ স্বরে,

” তুই খা বেয়াদব।”

____________

রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে হনহনিয়ে মহলের সিংহদ্বার পেরিয়ে বেরিয়ে আসে জোসেফ। কপালে বিরক্তির রেখা ফুটিয়ে সোজা গিয়ে থামে রাজ দিঘির সামনে।দিঘির নীলজলে আয়নার মতো ফুটে ওঠে তার পরাজয়ের প্রতিবিম্ব। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রূঢ় নিস্তব্ধতা,অথচ এই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতেও হাসফাস লাগছে জোসেফের।চিবুকে তার টানটান উত্তেজনা,ব্যস্ত হাতে সিগারেট বের করে পকেট থেকে।তারপর অপরাজিত প্রেমিকের ন্যায় ঠোঁট গোল করে ধোঁয়া ছাড়ে আকাশের দিকে।যেন ব্যর্থ প্রেমিক তার অভিমান আর আকাঙ্ক্ষা উড়িয়ে দিচ্ছে ধোঁয়ার দিগন্তে।ঘন্টা কাটে,মিনিট কাটে, সেকেন্ডের কাটা ঘুরে সময় বাড়ে,অথচ জোসেফ এক ইঞ্চিও নড়ে না, দহনমগ্ন পুরুষের প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ই থাকে সেই রাজদিঘির কিনারায়।

ঠিক তক্ষুনি সমস্ত নিস্তব্ধতা ডিঙিয়ে একটা শব্দ ভেসে আসে।কারো শ্বাসরুদ্ধ কান্না মেশানো গোঙানী।জোসেফ ভ্রুকুটি তুলে তাকালো, কান খাড়া করে মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো সেই শব্দ।রাজদিঘির নির্জনতা, বাতাসের নিস্পন্দ স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে আবার ভেসে এলো সেই অস্পষ্ট ডাক,

“আম্মিজান, আ,,আম্মি,,অলিক কন্যা।”

ধোঁয়া আর নেশার ভেলায় হারিয়ে যাওয়া জোসেফ গুলিয়ে ফেললো সব।শব্দটা সত্যি নাকি তার কল্পনা এই হিসেব মেলাতে বড্ড কষ্ট হলো তার।জোসেফ ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো,গুনে গুনে বাড়ালো চার কদম,তারপর পুনরায় শুনতে পেলো সেই শব্দ।মনে হচ্ছে কারো গলা টিপে ধরা হয়েছে,কেউ ছটপট করছে শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণায়।জোসেফের হৃদস্পন্দন বাড়ে,অর্ধপোড়া সিগারেট টা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পায়ের গতি বাড়ায় দ্রুত।ঠিক আরো চার কদম সামনে যেতেই বিস্ফোরিত হয় তার নয়ন,বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায় ঝোপের মাঝে পড়ে থাকা সত্যের রক্তাক্ত দেহের দিকে।

তার মেরুদণ্ড হঠাৎ শক্ত হয়ে যায়।শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে এক অচেনা স্নায়বিক টান, বুকের ভেতরে জমে থাকা পাষাণ হৃদয়ে প্রথমবারের মতো উথলে ওঠে অজানা দগ্ধতা।ছোট্ট বাচ্চাটার রক্তাক্ত দেহ নাড়িয়ে দেয় জোসেফের জালিম হৃদয়ের গভীরতম স্তর।

জোসেফ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সত্যের সামনে।তার মাথার চুলের সাথে আটকে আছে সাদা পালক।জোসেফ কম্পিত হাতে তুলে নেয় সেই পালকের একটা অংশ।সত্যের প্রান তখনও নিভু, নিভু।জোসেফের হাতে পালকটা দেখতে পেয়েই ডুকরে কেঁদে উঠে বাচ্চা টা,ব্যাথাতুর কন্ঠে বলে,

“ওরা আমার বীনারে মাইরা ফালাইছে পচা লোক।”

সত্যের যন্ত্রণায় দগ্ধ কন্ঠস্বর ফের কম্পন তুলে জোসেফের শরীরে, জোসেফ পালকটা ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে নিজের কোলে তুলে নেয় সত্যের মাথাটা।ধীরস্থির কন্ঠে শুধায়,

“এমন হাল কে করেছে তোমার?এই মহলে কার এতো স্পর্ধা হলো?”

সত্য হাপায়,পেটে গেঁথে থাকা ছুরিটার দিকে ইশারা করে বলে,

“ওরা আমারে বাঁচতে দিলো না পচা লোক।আমার আম্মিজানের কাছে যাইতে দিলো না।তুমি অলিক কন্যার কাছে বিচার দিও আমার হইয়া।ওদের শাস্তি দিও পচা লোক।”

জোসেফের মায়া হলো। ভয়ানক রকমের মায়া।
দুইদিন আগেও যেই বাচ্চা ছেলেটার গলা চেপে ধরার জন্য, তার নিঃশ্বাস থামিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো তার ভেতরের অশুভ আত্মাটা,আজ সেই ছেলেটার কাঁপতে থাকা, রক্তমাখা ছোট্ট শরীরটা
জোসেফের ভেতর কিছু একটা তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিল।হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা কঠোরতা হঠাৎ করে গলে যেতে লাগলো,ঝাপসা হয়ে উঠলো কঠিন চোখজোড়া।ভাঙা ভাঙা জড়ানো কন্ঠে বললো,

“ভয় পেয়ো না।কিছু হবে না তোমার।আমি প্রিন্স জোসেফ কিছু হতে দিবে না তোমার।”

বেদনাবিধুর কন্ঠে কথাটা বলতে বলতে জোসেফ একটানে খুলে ফেললো সত্যের পেটে বিধে থাকা ছোট্ট ছুড়িটা।তৎক্ষনাৎ ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে বেড়োতে শুরু করলো তাজা রক্ত,সেই গড়গড়ানো রক্তের সাথে নিঃশ্বব্দে বেড়িয়ে গেলো সত্যের পরান পাখি টাও।

আকাশ কাঁপানো এক চিৎকারে থমকে গেলো চারদিক।থরথর করে কেঁপে উঠলো দিঘির জল।ঝোপের আড়াল থেকে ভয়ে উড়ে গেলো ঝোনাক পোকার দল।জোসেফ স্তব্ধ।নির্বাক, নিথর।তার নীল রঙা নয়নে জমাট বেধেছে নির্মম সত্যের বিস্ফোরণ।তার হাতে ধরা ছুরিটা কাঁপছে,মূক নয়নে, নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে সে চেয়ে আছে সেই রক্তমাখা ছুরিটার দিকে।

ঠিক তখনই,নীরবতার বুক চিরে ভেসে এলো এক করুণ কণ্ঠ,নিস্পার বিধ্বস্ত, অথচ তীক্ষ্ণ তীরের মতো কন্ঠ ধেয়ে এসে বিদীর্ণ করলো জোসেফের ভাঙাচোড়া বুকপাজর,

“নিজের পশুরূপটা দেখিয়ে দিলেন তো?
অবশেষে প্রমাণ করে দিলেন আপনি জালিম,
জালিমের বুকে প্রেমের ফুল ফোটে না।”

চলবে,,,,

#স্পেশাল অফার🫰
200+ রেসপন্স পেলে পরশুর মধ্যে বোনাস পার্ট পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here