#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ 65
দুই তলা বিশিষ্ট ঘর।নিস্পা ঘাপটি মেরে বসে আছে একটা বড় কেবিনেটের ভেতর।তার পাশেই একটা লাশ।মানুষটাকে চেনে না নিস্পা।আয়মান বোধহয় চিনে,চেনারই কথা,সেদিন নিজের হাতে নিজের একমাত্র বন্ধু রোহানকে খুন করে এখানটাতেই তো রেখেছিলো সে।
লাশের ব্যাবস্থা করার সময় পায়নি একদম।কোনরকম কেবিনেটের মধ্যে রেখেই চলে গিয়েছে নিস্পাকে কিডন্যাপ করার জন্য।ঘটনাচক্রে সেই লাশেত সাথেই দেখা হয়ে গেলো নিস্পার।আয়মানের থেকে বাঁচার জন্য নিস্পা ছুটে এসে লুকিয়েছে বড়সড় কেবিনেটটার ভেতরে।কেবিনেটের ভেতরে ঢুকতেই একটা ভয়ংকর লাশের সম্মুখীন হতেই কেঁপে উঠলো তার পুরো অস্তিত্ব, হাল্কা ঝাঁকুনি দিলো তার শরীরের হাড়গুলো।
সে আতংকে বেড়িয়ে যেতে নিলো কেবিনেট থেকে ঠিক তখনই শোনা গেলো আয়মানের হাড় হীম করা কন্ঠ,
“নিস্পা!নিস্পা!কোথায় তুমি?”
আয়মানের অশরীরী কন্ঠে হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে নিস্পার।সে কেবিনেট থেকে বেড়োতে নিয়েও বেড়োলো না,সে রক্তাক্ত চোখে চাইলো পাশেই ঝুলিয়ে রাখা রোহানের লাশটার দিকে।আর কিছু করার নেই,সে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো,আয়মানের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে একটা লাশের সাথে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তেমন বড় ব্যাপার নয়।আর যাই হোক মৃত লাশের দ্বারা তো জীবন সংকটের ভয় নেই।
নিস্পা বেড় হলো না,দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো কুজো হয়ে,ভয়ে কলিজা শুখিয়ে গিয়েছে তার।ত্রিজয়ের আসার অপেক্ষায় দ্রিম দ্রিম করছে বুক।এই লাশটার পরিনতি দেখে সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আয়মানের হিংস্রতা।লোকটা আগের জন্মের মতোই ভয়ংকর।
তাই ধরা পরা যাবে না।কিছুতেই ধরা পরা যাবে না।ত্রিজয় আসা পর্যন্ত নিজেকে বাচিঁয়ে রাখবে সে,আয়মানকে ক্ষতি করার সুযোগ দিবে না কোনভাবেই।
নিস্পাকে খুঁজে না পেয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক সেদিক খুজছে আয়মান,কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না কিছুতেই।নিস্পা এই কেবিনেটের ভেতরে ঢুকতে পারে এটা ধারণাতেও আসে না তার।রোহানের লাশের কথা তো বেমালুম ভুলে গিয়েছে নিজের প্রতিশোধস্পৃহা মস্তিষ্ক। ঘরেরর প্রতিটি কোনায় হাঁটছে আর জানালার পর্দাগুলো একটা একটা করে সরিয়ে খুজছে নিস্পাকে,গা হীম ধরানো কন্ঠে ডাকছে,
“নিস্পা জান!লুকিয়ে লাভ নেই জান।বেড়িয়ে এসো।”
নিস্পা ভয়ে ওড়না মুখে চেপে কামড়ে ধরে আছে।নিঃশ্বাসের ভারী শব্দটাও যেন শুনতে না পাওয়া যায় সেই চেষ্টায় আঁটকে রেখেছে দম।
আয়মান ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে,বিছানার নিচে উঁকি দিতে দিতে আবার ডাকলো,
“কোথায় লুকিয়েছ নিস্পা!বেড়িয়ে এসো বলছি।”
বিছানার নিচেও নেই নিস্পা।আয়মানের ভীষণ রাগ হলো এবার।নিস্পার সাথে এমন লুকোচুরি খেলায় তেমন মজা লুপে নিতে পারছে না সে।রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠলো তার শরীর, ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“আমাকে রাগিও না নিস্পা।আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো,তুমি যদি বেড়িয়ে না আসো তবে আমি কিন্তু এই পুরো ঘরটা জ্বালিয়ে দেবো।”
আয়মানের মুখে এমন ভয়ংকর কথা শুনে রুদ্ধশ্বাসে জবান বন্ধ হয়ে এলো নিস্পার।সে এখন কি করবে ভেবে পেলো না।চোখ বন্ধ করে বিরবির করে আওড়াল,
“ত্রিজয়! কোথায় আপনি? এতো দেরি কেন করছেন?বাঁচান আমাকে।”
এদিকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন নিস্পার বেড়োনোর নাম গন্ধ অব্দি পাওয়া গেলো না,ঠিক তখনই আয়মান শুরু করলো কাউন্ট ডাউন,ঠান্ডা কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
“এক।”
নিস্পার পায়ের তালু ঠান্ডা হয়ে এলো।কোনরকম নিজের শরীরটাকে চেপে বসিয়ে রাখলো বড় কেবিনেটার ভেতরে।
“দুই।”
নিস্পাকে এবারেও বেড়োতে না দেখে আয়মান শেষ করলো তার লাস্ট কাউন্ট ডাউন,
“তিন।”
আয়মানকে ভীষণ রকম হতাশ করে নিস্পা শক্ত হয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলো কেবিনেটের ভেতর।
আয়মান রাগে ফোস ফোস করে উঠলো।নিস্পার চতুরতা খুব ভালো ভাবে বুঝে গিয়েছে সে।নিস্পা যে সময় নষ্ট করতে চাইছে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।নিস্পা যখন বলেছে তার মানে ত্রিজয় গন্ধ শুখে শুখে এপর্যন্ত আসবেই।তার আগেই নিস্পার একটা ব্যাবস্থা করতে হবে তার।নিস্পা তার না হলে সে কারো না।কাউকে পেতে দেবে না।
কথাগুলো ভেবেই বক্র হাসলো আয়মান,অশুভ কন্ঠে বললো,
“বেড়োলে না তো?তোমার সাথে লুকোচুরি খেলার মুড নেই আমার।আমি বেড়িয়ে যাচ্ছি।এসিডে তো সামান্য মুখটা ঝলসে যেত,আর এখন আগুনে তুমি সম্পূর্ণটা ঝলসে যাবে সোনা।”
“বাই বাই।”
______
সূর্যটা পশ্চিমের কিনারায় ডুবে যেতে যেতে চারপাশে ছড়িয়ে দেয় নরম কমলা আলোর ছায়া।আকাশজুড়ে বেগুনি আর লালচে আভা তুলির টানে মিশে যাচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে তখন।অনু নিজের ঘরে খিল এঁটেছে দুপুরের পর থেকেই।
জীবনের এক অনন্য শুভ যাত্রায় কেমন দেউলিয়া লাগছে সব।বারকে বার মনে পড়ছে কিয়ানের বলা কথাগুলো।আচ্ছা বৈধ সম্পর্কের পাওয়ার বুঝি এটা!একটা মানুষকে চিনে না জানে না অথচ স্বামীর স্বকৃতি কীভাবে দেওয়া যায়?বোঝাপড়াও তো একটা ব্যাপার আছে।
অনু ভেবে পায় না।কিয়ানের এমন পরিবর্তন তাকে নেগেটিভ কিছু ভাবতেই দিচ্ছে না।মানুষটার সরল স্বীকারোক্তি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে তাকে।ভালোবাসা বুঝি সত্যিই এলো?সত্যিই কি একটা বৈধ সম্পর্ক তাকে ফিরিয়ে দেবে তার না পাওয়া ভালোবাসা।
সাত পাঁচ ভাবনার মাঝেই দরজায় করাঘাতের শব্দে ধ্যান ভাঙলো অনুর।নিজেকে সামলে নিয়ে চোখের কোনে জমে থাকা জল দু’হাতে মুছে নাক টানলো,দ্রুত হাতে খুলে দিলো দরজা।
দরজার ওপাশে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিয়ান।একটা টিশার্ট আর কালো টাউজার পড়নে তার।
“আ,,আপনি!”
এই অসময়ে কিয়ানকে নিজের ঘরের সামনে দেখে অনেকটাই বিব্রত অনু।তবে কিয়ান তেমন একটা তোয়াক্কা দেখালো না,অনুর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
“সীদ্ধান্ত নিয়েছ?”
অনু ঘাবড়ালো,শুখনো একটা ঢোক গিলে খসখসে কন্ঠে বললো,
“কী,,কীসের?”
কিয়ান অনুর বেড সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নেড়েচেড়ে দেখলো,গমগমে কন্ঠে রোবটের মতো আওড়াল,
“আমাকে হাসবেন্ড হিসেবে মানা উচিত তোমার।”
অনু তড়াগ করে চাইলো,কয়েকটা শুখনো কাশ দিয়ে বললো,
“আপনি ভালোবাসেন আমাকে?”
কিয়ান এগিয়ে এসে পানির গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরলো অনুর সামনে,অপকটে বললো,
“উহু।ঘৃণা করি।”
অনু কাঁপা হাতে তুলে নিলো পানির গ্লাসটা,এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে শেষ করলো সবটুকু পানি,বড় একটা শ্বাস টেনে বললো,
“তাহলে স্বামী হতে কেন চাচ্ছেন?”
কিয়ান অনুর হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে রাখলো আগের যাউগায়,নির্বিকার ভঙিতে বললো,
“নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে।”
অনু হাত দিয়ে ঠোঁটে লেগে থাকা পানি মুছলো,তারপর ঠোঁটে ঠোঁট টিপে অস্পষ্ট আওড়াল,
“আমি বুঝতে পারছি না আপনার কথা।”
কিয়ান অকস্মাৎ এগিয়ে এলো,একহাত বাড়িয়ে দিয়ে তৎক্ষনাৎ চেপে ধরলো অনুর কোমর,নেশাময় কন্ঠে বললো,
“চলো বুঝিয়ে দেই।”
অনু বিব্রত,অস্বস্তিতে পাথর জমেছে বুকে,শিরশিরে অনুভুতি গলা চেপে ধরেছে তার,সে অস্পষ্ট আওড়াল,
“কী কী করছেন?”
কিয়ান অনুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“খাবো।”
অস্বস্তিতে খেই হারালো অনু,অবিন্যস্ত কন্ঠে বললো,
“কি! মানে!”
কিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো,প্রগাঢ় কন্ঠে বললো,
“করলা যেভাবে চিবিয়ে খাই সেভাবে খাবো।করলা রক্ত পরিস্কার করে।”
অনু শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠে বললো,
“আ,,আমি করলা নই।”
“তুমি করলার ফিমেইল ভার্সন।তোমাকে খেলে মন সুদ্ধ হবে।”
“দেখুন আপনি কিন্তু ভুল করছেন।আপনি তো নিস্পাকে ভালোবাসেন।”
কিয়ান কৌশলে এড়িয়ে যেতে চাইলো অনুর কথা,ভণিতা করে বললো,
“ভালোবাসা কি?খাওয়া যায়?ক্ষুধা মিটবে?”
অনু চোখ রাঙিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলো কন্ঠে,
“আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন।”
কিয়ান এবার আর ছল চাতুরী করলো না,সোজাসাপ্টা উত্তরে বললো,
“কারণটা তুমিই।”
অনু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,কিয়ানকে তার জন্মের উদ্দেশ্য মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বললো,
“এতোগুলো দিন রুপাঞ্জেল বলে বলে মুখে ফেনা তুলে দিতেন।এক রুপাঞ্জেল কে ভালোবেসে আপনার পূনর্জন্ম হয়েছে অথচ আপনি কিনা এখন আমাকে এসব,,,
কিয়ান নিজের আঙুল চেপে ধরলো অনুর ঠোঁটের উপর।অনুকে শেষ করতে দিলো না সম্পূর্ণ কথাটুকু।কিয়ান তার আগেই অনুর প্রতিটি শব্দের যুক্তি খন্ডাতে বললো,
” পূনর্জন্ম শুধু পাওয়ার জন্য হয় না,পূনর্জন্ম হয় নিজের জীবনের জন্য সঠিক আর সুন্দরকে বেছে নেওয়ার জন্য।গত জন্মের সমস্ত ভুলকে ফুলে রুপান্তর করার জন্য।”
অনু অবাক দৃষ্টিতে চাইলো কিয়ানের দিকে,স্বগোতক্তিতে আওড়াল,
“আপনি সত্যি বলছেন!”
কিয়ান নিজের গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো অনুর ভাবুক চোখে,কামুক কন্ঠে বললো,
“আমার চোখে তাকিয়ে দেখো।”
অনু না চাইতেও তাকালো,কিয়ানের দুটো চোখে কোন ভাষা নেই,বা হয়তো আছে সে দেখতে পাচ্ছে না।কিয়ানের চোখের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থেকে অনু আনমনে বললো,
“আপনার চোখের দৃষ্টি শুন্য।কই কোথায় কোন কথা নেই।”
“আছে ভালো করে দেখো।”
“আমি পাচ্ছি না।”
কিয়ান হাত বাড়িয়ে আচমকা অনুর মাথাটা চেপে ধরলো তার বুকের বাঁ পাশে,ফিসফিসিয়ে বললো,
” এখানে শোন।”
অনুর মুখের এক পাশ পিষে আছে কিয়ানের বুকের ভেতর।কিয়ানের গায়ের গন্ধ অবশ করে দিতে চাইছে তার ইন্দ্রিয়।সে ধড়পড়ানো কন্ঠে বললো,
“কি শুনবো?”
“হৃদপিন্ড টা কথা বলছে।”
“কি বলছে?”
“তোমাকে খেতে।”
অনু কিয়ানের বুকে ধাক্কা মেরে ছিটকে সরে এলো,অস্পষ্ট শব্দ বের হলো মুখ থেকে,
“ছিঃ।”
কিয়ান শ্লেষ হেসে নিজের ঠান্ডা হাত রাখলো অনুর গালের উপর,শুষ্ক কন্ঠে বললো,
“খাবে?”
অনু অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,
“কি?”
কিয়ান নিজের মুখটা নিয়ে গেলো অনুর কানের কাছে,এতোটাই কাছে যে তার ঠোঁটের স্পর্শ ছুয়ে দিচ্ছে অনুর কানের লতিকা।অনু কাঁপছে, কিয়ান স্পষ্ট উপলব্ধি করছে অনুর শরীরে উঠা জলোচ্ছ্বাসের জ্বালাময় উপস্থিতি,কিয়ান সেই জ্বালা টা ক্ষততে রুপান্তর করার জন্য, মাদকিয় কন্ঠে বললো,
“আদর।”
অনু হাত দিয়ে খামচে ধরলো ওড়না,চোখ খিচে বন্ধ করে বললো,
“আপনি কে?”
“তোমার লিগেল হাসবেন্ড।”
অনুর বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হলো,সে কন্ঠ খাদে নামিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,
“আর আমি?”
কিয়ান তার অন্যহাতটাও তুলে নিলো এবার,খরখরে কন্ঠে বললো,
“আমার লিগেল ওয়াইফ।”
অনু নিজের হাতটা ধিরে ধিরে নিয়ে রাখলো কিয়ানের চোখের উপর,নাজুক কন্ঠে বললো,
“চোখ বন্ধ করুন।”
“আপনি আপনার রুপাঞ্জেলকে দেখতে পাচ্ছেন। ”
কিয়ান চোখ বন্ধ করলো,সত্যি সত্যিই দেখতে পেলো নিস্পার মুখ,একটা স্নিগ্ধ সুন্দর মুখ।লালশাময় সর্বাঙ্গে মুক্তোর মতো জ্যোতি চিকচিক করছে।অনবদ্য এক সুন্দরী ঝলসে দিচ্ছে তার চোখ।অথচ কি সুন্দর অস্বীকার করে গেলো সে,চোখ বন্ধ করে দেখা মুখটাকে সরাসরি অস্বীকার করলো সে,মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বললো,
“কোত্থাও নয়।সবখানে একটা কালো মেয়ে প্রদীপ হাতে দৌড়াচ্ছে।”
লজ্জায় চিবুক নামিয়ে নিলো অনু,কোমল মনের মেয়েটা বড্ড ভালোবাসা পিপাসু।কেউ একটু ভালোবেসে আচরণ করলেই ফাঁদে পড়ে যায় নিমিষে।আর এই লোকতো রীতিমতো দাবি যানাচ্ছে,অনোশন বসিয়েছে মনের অন্দরে, ভুলিয়েছে নির্মম অতীত, উনাকে কি আর অবজ্ঞা করা চলে?এড়িয়ে যাওয়া যায়?অস্বীকার করা যায় কোনভাবে?
অনু পারলো না,কিয়ানের এমন ভালোমানুষি আর ভালোবাসা প্রদর্শন তার ভেতরটা গলিয়ে জল করে দিলো,সে ঠিক কি উত্তর দেবো ভেবো পেলো না,দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে নিলো চুপচাপ,দমবন্ধকর কন্ঠে বললো,
“এবার আমি চোখ বন্ধ করলাম।”
কিয়ান বক্র হাসলো,জ্বিভে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি দেখতে পাচ্ছো?এমপি মশাইকে?”
অনুর বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠলো কিয়ানের মুখ।এমপি মশাই সেখানে নেই।সেই স্বার্থপর স্বার্থেন্বেষি লোকটাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছে না অনু।তার কাঁদামাটির মতো কোমল মনে গেঁথে গিয়েছে কিয়ানের প্রতিটি শব্দ,প্রতিটি অনুভূতির ব্যাখ্যা।সে কিয়ানের প্রশ্নে মাথা নাড়ালো দুপাশে,সদ্য জন্ম নেওয়া অনুভূতির সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে আওড়াল,
“উঁহু।দেখতে পাচ্ছি একটা ধবধবে ফর্সা লোক কালো মেয়েটার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে।”
কিয়ানের ঠোঁটের আগায় বক্র হাসির রেখা গভীর হলো আরেকটু,নিজের মাথাটা এগিয়ে নিয়ে এসে কপালে কপাল ঘষলো অনুর,আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে নাকে নাক লাগিয়ে বললো,
“কি প্রমাণ হলো?”
অনু চোখ বন্ধ করে চোখের পানি ছেড়ে দিলো,মনে হলো এই প্রথম বুঝি সঠিক মানুষটাকে জীবনে পেয়েছে সে,এই নাটকিয় জীবনের নাট্যমঞ্চে অবশেষে কেউ তো এলো,ভুলিয়ে দিলো সমস্ত পিছুটান।অনু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অস্পষ্ট বললো,
“পিছুটান নেই।”
কিয়ান অনুকে আরেকটু গভীর আলিঙ্গনে বাধলো,আলতো ভালোবাসার পরস এঁকে দিলো অনুর ললাটে,মোহিত কন্ঠে বললো,
“আমাদের ভালোবাসা ভুল ছিলো।তাই আমরা ভুলে যেতে পেরেছি।”
অনু আবেগের তাড়নায় দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানকে।একটা ভরসার আর ভালোবাসার আশ্রয় পেয়ে মুখ গুজলো কিয়ানের নিরেট বক্ষে,ডুকরে কেঁদে উঠে বললো,
“সত্যিটা কি নির্মম।”
কিয়ান সুযোগ লুপে নিলো,আচমকা কোলে তুলে নিলো অনুকে।অনু ভড়কে গিয়ে আঁকড়ে ধরলো কিয়ানের গলা,কিয়ান নেশাময় কন্ঠে বললো,
“চলো ভয়ংকর করে তুলি।”
অনুর বুকে পাওয়া গেলো ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ভাবাস,এক নতুন অনুভূতি আর,এমন অযাচিত স্পর্শে কেঁপে উঠলো তার নারীস্বত্ত্বা।সে সময় চাইলো,মিনতি করে বললো,
“সময় দিন।”
কিয়ান বিছানায় ছুড়ে ফেললো অনুকে,শ্বাসরোধ করা কন্ঠে বললো,
“অসম্ভব।”
আর কোন কথা হলো না,শব্দ ব্যয় করার নূন্যতম সময় পেলো না অনু।তার আগেই কিয়ান ঝাপিয়ে পড়লো তার উপর।একে একে দিশেহারা করলো তার সর্বাঙ্গ।অনুভুতি তৈরি হওয়ার আগেই নিঃশেষ হতে শুরু করলো,কিয়ানের দংশন ক্ষত তৈরি করলো তার শরীরে।এ কেমন ছোয়া,এ কেমন স্পর্শ।অনু সহ্য করতে না পেরে খামচে ধরলো কিয়ানের ফর্সা পিঠ।কিয়ান ধিরে ধিরে উন্মুক্ত করলো অনুর শরীরের শেষ সুতো টুকুও,হাস্কি গলায় বলল,
“তুমি চাইলে চিৎকার করতে পারো।
________
বিশাল বড় বাড়িটায় দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন।আগুনের লেলিহান জিহ্বা গ্রাস করে নিয়েছে চারদিক।বাড়িটা জনবহুল এলাকার বাইরে,শুনশান জায়গা।আশেপাশের কয়েক মাইলেও লোকজনের বসতি নেই বলাচলে।
একটা লাশের সাথে কেবিনেটের ভেতর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না নিস্পা।লাশটার পচন ধরেছে, পচা গন্ধে গা গুলিয়ে বোমি আসছে তার। আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বদিকে,আগুনের উত্তাপে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গিয়েছে নিস্পার।
ত্রিজয় আর তাকরিম একসাথে পৌছেচে ঘটনাস্থলে।বাড়ির চারদিকের আগুন থেকে উড়ছে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী।ত্রিজয় বুদ্ধিমান, চতুর।নিস্পা কোথায় আছে কারো থেকে জানার প্রয়োজন পড়লো না তার।বাড়িটা আগুনে পুড়ছে, তারমানে এই বাড়ির ভেতরেই রয়েছে নিস্পা।সে তার বাইকের গতি এক সেকেন্ডের জন্যেও কমালো না,বরং নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে হাই স্প্রিডের বাইক নিয়ে ছুটে গেলো বাড়ির ভেতরে।
আগুনের মধ্যে প্রবেশ করতেই গায়ের জ্যাকেটে আগুন লেগে গেলো ত্রিজয়ের।ত্রিজয় দ্রুত খুলে ফেললো জ্যাকেটটা।আগুনে পিঠের অনেকটা অংশ ঝলসে গিয়েছে তার।অথচ সেদিকে ধ্যান দিলো না ত্রিজয়,জ্যাকেটটা খুলে ছুড়ে ফেলে দৌড়াতে শুরু করলো উপরের তলার দিকে,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকলো,
” কলিজা।কোথায় তুমি?সাড়া দেও কলিজা।আমি এসেছি।”
“দোতালায় এখনো আগুন ছড়ায় নি তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়বে নিশ্চিত।আগুনের কালো ধোঁয়ায় নাকের তালু অব্দি জ্বলছে ত্রিজয়ের।নিস্পারও নিশ্চয়ই এমনই কষ্ট হচ্ছে।নিশ্চয়ই যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়েছে তার ফর্সা মুখশ্রী।কথাগুলো ভাবতেই ত্রিজয়ের বুকের হাড়ে ক্ষত হওয়ার মতো যন্ত্রণা বাড়লো,পাজর গুলো ভেঙে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় পৃষ্ট হলো হৃদপিন্ড।মস্তিষ্ক আউট অফ কন্ট্রোল, সে পায়ের গতি বাড়ালো, উন্মাদের মতো ডাকলো,
” কলিজা?কোথায় তুই সাড়া দে প্লিজ।আমাকে বল তুই ঠিক আছিস।”
নিস্পার কানে পৌছালো না ত্রিজয়ের ডাক।তার রুমও ইতমধ্যে আগুন কব্জা করে নিয়েছে,জানালা দিয়ে দাউদাউ করে ঢুকছে আগুনের লেলিহান শিখা।সে কোনমতে কেবিনেটের দরজা ঠেলে বাইরে বেড়িয়ে এলো।তবে শেষ রক্ষার উপায় বুঝি আর নেই,চোখের সামনে সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে,যেখানে তাকাচ্ছে আগুন আর আগুন।একটু পর নিশ্চয়ই পুরো ঘর জ্বলতে শুরু করবে,সেই সাথে জ্বলতে শুরু করবে নিস্পার শরীর।তার আর নিজেকে বাচিয়ে নেওয়া হবে না,ত্রিজয়ের জন্য অপেক্ষা করা হবে না আরও কয়েক পল।
নিস্পা ডুকরে কেঁদে উঠলো, হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“আপনি এলেন না কেন ত্রিজয়।আমি বড্ড বেশি আশা করে রেখেছিলাম।আপনি এলেন না।অবশেষে এ জনমেও একটা সুখের সংসারের ক্ষুদা বুকে নিয়েই মরতে হলো আমায়।”
চলবে,,,,,

