#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:70
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই,ইচ্ছে কিংবা সিদ্ধান্ত কিছুই কাজ করছে না।ত্রিজয় নির্বাক,তার হিপনোটাইজ এর প্রভাব ন্যাক্সোরার উপর কাজ করলো না কেন সেটাই বুঝতে পারছে না।এদিকে তাকরিমের বুক ধড়ফড় অনুভুতিটাও নিস্তেজ হয়ে এসেছে,আকস্মিক ঘটনাটা পুরপুরি বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে তাকে,কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুললেও মস্তিষ্ক সজাগ হলো দ্রুত,দূর্ধর্ষ একটা নিঃশ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চাপলো,তেড়ে গিয়ে চেপে ধরলো ত্রিজয়ের কলার,গর্জে উঠে বললো,
“এটা কি হলো?কি করলি তুই এটা?”
“আই ডোন্ট নো,কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
তাকরিম কোনরকম নিজেকে সংবরণ করে হুঙ্কার ছুড়ে বললো,
“নাটক মারাস শালা?”
ত্রিজয় চোয়াল শক্ত করলো,ক্ষিপ্রতায় তাকরিমের হাত থেকে মুক্ত করলো নিজের কলার,তারপর ঠান্ডা নিরুত্তাপ কন্ঠে বললো,
“আজাইরা কথা না বলে আগে বলুন নিস্পাকে কি বলবো?”
“যা সত্যি তাই বলবো,তুই ওর দাদিকে মেরে দিয়েছিস।”
“সতিনের সাত রুপ দেখিয়েই দিলেন তাইতো?এই বুড়িকে আমি মেরেছি শুনলে আমার বউ আমাকে মেরে দিবে।”
তাকরিম কপটতা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“তুই মরলে আমার যায়গা ক্লিয়ার।”
বিনিময়ে বিদ্রুপ হাসলো ত্রিজয়,ভ্রুকুটি করে সহাস্যে প্রত্যুত্তর করলো,
“আমি যদি বলি বুড়িকে আপনি মেরেছেন?”
কুচকে এলো তাকরিমের ভ্রু,নিসৃত হলো বিস্মিত কন্ঠ,
“কোন লজিকে বলবি?”
“যেই লজিকে রাত দুটো বাজে আপনি আমার বাসায় দাঁড়িয়ে আছেন।”
তাকরিম নিজেকে সংবরণ করতে ব্যার্থ হলো পুনরায়,হিসহিসিয়ে বললো,
“সতিনের সাত রুপ হয় বললি,কিন্তু তোর মতো মাদা*রচো*দের যে হাজার রুপ হয় সেটা তো বললি না।”
“কলিজা,কলিজা দেখো এমপি মশাই এতো রাতে এই বাড়িতে এসে তোমার দাদিকে মেরে ফেলেছে, আমি কত চেষ্টা করেছি বাঁধা দেওয়ার জন্য, কিন্তু উনি কোন বাঁধা মানেনি।”
ত্রিজয়ের কন্ঠ ফুড়ে বেরিয়ে এলো আরেক দফা নাটকিয় স্বর।তাকরিম রীতিমতো থ,ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়েই রইলো ত্রিজয়ের মুখের দিকে।
ত্রিজয় হো হো করে হেসে উঠলো, ব্যাঙ্গ করে বললো,
“যদি নিস্পাকে এভাবে বলি তাহলে আপনার কি হবে বুঝতে পারছেন তো মশাই?ওর ভেতরে আপনার জন্য যেটুকু শ্রদ্ধাবোধ আছে সেটুকুও ফানুসের মতো ফুস হয়ে যাবে।”
“ফুসসসস,,,”
মুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ করলো ত্রিজয়।
এদিকে কেড়াকলে ফেসে দাঁতে দাঁত চেবালো তাকরিম,ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বললো,
“শালা নটাংকি।”
দাঁত কেলিয়ে হাসলো ত্রিজয়,দীপ্তি কন্ঠে বললো,
“মেডেল দিন।নয়তো সমাধান দিন।”
তাকরিম রেগেমেগে চেচিয়ে উঠলো,
“তোর সা/উ/য়া দেবো আমি।”
“আমাকে ফাঁসাতে চাইলে আমি কিন্তু আপনাকেও ফাঁসিয়ে দেবো বলে দিলাম।”
ত্রিজয়ের কথার বিপরীতে পুনরায় কিছু একটা বলার জন্য উদ্যোত হতেই থেমে গেলো তাকরিম, শুনতে পেলো নিস্পার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর,
“কি হয়েছে?কি হয়েছে এখানে?”
তাকরিম ত্রিজয় দুজনেই চমকালো সমানতালে,নিস্পার উপস্থিতে ধড়ফড় করে উঠলো বুক।উৎকন্ঠায় কেঁপে উঠলো হৃদস্পন্দন।
নিস্পা ঘরে ঢুকতেই অবাক হলো,এতো রাতে ত্রিজয় আর তাকরিমকে ফুলমতির ঘরে দেখে বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনারা দাদির ঘরে কি করছেন?দাদির চিৎকার শুনলাম মনে হলো?”
ত্রিজয় আর তাকরিম চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের মুখের দিকে।নিস্পা উত্তরের অপেক্ষা করলো না,কেন যানি খচখচ করে উঠলো তার বুকের ভেতর,সে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে এগিয়ে গেলো ফুলমতির দিকে,ফুলমতির শরীর ঝাকিয়ে ডাকলো,
“দাদি? দাদি?তুমি এভাবে শুয়ে আছো কেন?”
ত্রিজয় জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,বলতে চাইলো,
“নি,,নি,,স,,,,
নিস্পার ভেতরকার খচখচানিটা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ততক্ষণে,ফুলমতির এমন এলোমেলো শুয়ে থাকাটা মোটেও স্বাভাবিক ঠেকছে না তার,সে চিন্তিত স্বরে বললো,
” কি হলো দাদি উঠছে না কেন?”
ত্রিজয় চোরা চোখে তাকালো তাকরিমের দিকে,আমতাআমতা করে এগিয়ে গিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো নিস্পার বাহু,খরখরে কন্ঠে বললো,
“শোন,,তুমি একটু বস,আমি বুঝিয়ে বলছি।”
শুনলো না নিস্পা,ত্রিজয়ের হাতটা ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো,
“কি করেছেন আপনারা?দাদির সাথে কি করেছেন?দাদি উঠছে না কেন?”
“দাদি?ও দাদি?উঠো।কথা বল দাদি।”
ফুলমতির পুরো শরীর টা ঝাঁকানোর পরেও সে আর উঠলো না,নিস্পা অনেক চেষ্টা করার পর হাল ছেড়ে দিয়ে নিথর কন্ঠে আওড়াল,
“ও দাদি উঠছো না কেন তুমি?”
কাঁদতে কাঁদতেই ফুলমতির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করলো নিস্পা,হন্তদন্ত হয়ে ঝুঁকলো ফুলমতির দিকে,রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে বললো,
“একি!দাদির মুখে ফেনা কেন?দাদির পুরো শরীর নীল হয়ে উঠেছে কেন?”
নিস্পা এবার আর মেনে নিতে পারলো না,মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছুড়ে জিজ্ঞেস করলো,
“দাদির সাথে কি করেছেন সত্যি করে বলুন।আপনারা এতোক্ষণ কি করেছেন এই ঘরে?”
ত্রিজয় এগিয়ে এসে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার মাথাটা,নিস্পাকে শান্ত করার জন্য অভিভূত কন্ঠে বললো,
“শান্ত হও না।আমি বলছি তো?”
“তখন থেকে কি বলবি বলবি করছিস?শব্দ অপচয় না করে বলে দে কি হয়েছে।”
বারুদের গতিতে তাকরিমের কথাটা নিস্পার কানে ধেয়ে আসতেই ত্রিজয়ের বুক থেকে মাথা তুলে তাকরিমের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো নিস্পা।
পরিস্থিতি বেগতিক বুঝতে পেরে কন্ঠে দাপট দেখিয়ে এমপিকে ধমকে উঠলো ত্রিজয়,
“আপনি চুপ করুন।”
নিস্পা কাঁদতে কাঁদতে নাক টানলো,ভেঙে ভেঙে জিজ্ঞেস করলো,
“চুপ করবে কেন?কি লোকাচ্ছেন আপনারা?”
ত্রিজয় কিছু বলতেই যাবে তার আগেই ত্রিজয়ের সম্মুখ থেকে উঠে দাড়ালো নিস্পা,ধিরে ধিরে এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো তাকরিমের সামনে,আহত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি বলুন,দাদির কি হয়েছে?দাদি উঠছে না কেন?”
তাকরিম বড় করে একটা চাপা নিঃশ্বায়া ফেললো,আদ্র কন্ঠে নিঃসংকোচে বললো
“তোমার দাদি আর কখনো উঠবে না আলেকজান্দ্রা,উনি মারা গেছেন।”
নিজের একমাত্র দাদিকে হারিয়ে নিঃস্ব মেয়েটা ফুফিয়ে উঠলো যন্ত্রণায়,বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো খুব,চিৎকার করে বলতে চাইলো,
“মজা করছেন?আপনারা মজা করছেন আমার সাথে?”
ত্রিজয়ও এবার বুকে সাহস নিয়ে বললো,
“এমপি মশাই সত্যি বলছে কলিজা।তোমার দাদি আর নেই।”
নিস্পা পাগলের মতো ছুটে গেলো ফুলমতির কাছে,ফুলমতিকে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মতো বললো,
“কেন?নেই কেন? একটু আগেও তো ছিলো, কি সুন্দর আমার সাথে গল্প করে ঘুমিয়েছিলো, তাহলে এখন কি হলো?”
তাকরিম সুযোগ হাতিয়ে নিলো,ত্রিজয়ের দিকে বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঠান্ডা চাল চেলে বললো,
“নেই কারণ তোমার দাদিকে খুন করা হয়েছে।”
সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুচকালো নিস্পা,বিহ্বলিত কন্ঠে আওড়াল,
“খুন!মানে?কে খুন করেছে আমার দাদিকে?”
“আমি সব তোমাকে বলছি।”
তাকরিম কথাটা বলতেই বুকের ভেতর ধ্বকধ্বক শব্দ শুরু হলো ত্রিজয়ের,নিস্পা যদি একবার জানতে পারে তার পোষা সাপের কামড়ে তার দাদি মারা গিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে বুকের বা পাশ টা ঝাঝড়া করে দিবে নিশ্চিত।তাই যেকোনো মূল্যে তাকরিমকে থামাতে চাইলো ত্রিজয়,তাকরিমের কথার মাঝেই তপ্ত স্বরে বললো,
“আপনি কি বলবেন হ্যাঁ?নিস্পা আমি তোমাকে বলছি শোন।”
“দাঁড়ান।”
ত্রিজয়কে থামিয়ে দিয়ে নিস্পা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো তাকরিমের দিকে,কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এতো রাতে এই বাড়িতে কেন?”
এতোক্ষণে নিস্পাকে একটা বুদ্ধিমত্তার প্রশ্ন করতে দেখে খুশি হলো ত্রিজয়,আগ বাড়িয়ে বললো,
“সেটাই তো?কেন বলুন বলুন?”
তাকরিমের উত্তর রেডি, সে স্পষ্ট বলে দিলো,
“কারণ আমি তোমার দাদিকে বাঁচাতে এসেছি।”
“মানে?”
“মানে আমি দেশে ফিরে তোমাকে একনজর দেখার জন্য তোমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম,ঠিক তখনই তোমাদের দেয়াল টপকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেখলাম।”
“আর আর তারপর এমপি মশাই দরজায় এসে নক করলো, আর আমি গিয়ে দরজা খুলে এমপি মশাই এর কথা বিশ্বাস করছিলাম না,এর ফাঁকে খুনি তার কাজ করেও ফেলে,তুমি যেমন চিৎকার শুনে নিচে নেমে এসেছ আমরাও তোমার দাদির চিৎকার শুনে এসে দেখি এই অবস্থা।”
তাকরিমের কথার সাথে আরেকটু তেল মিশিয়ে নিস্পাকে গড়গড় করে একটা বড় মিথ্যাকথা বুঝিয়ে চাপা শ্বাস ফেললো ত্রিজয়,এমপির দিকে তাকিয়ে বললো,
“তাই না এমপি মশাই?”
এমপি সম্মতি দিলো, কথাটা নিস্পকে বিশ্বাস করানোর জন্য বললো,
“হ্যাঁ। হ্যাঁ ঠিক বলেছে ও।”
_____
কেঁটেছে প্রায় সপ্তাহ খানেক।আজ ডিসেম্বরের দুই তারিখ।ইভান আর চিত্রার বিয়ের শুভদিন।ধানমন্ডির পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সার্কেল ইন ইভানের বিয়ের জন্য বুক করেছে ত্রিজয়।সেই হোটেলের সেকেন্ড ফ্লোরে বসে আছে চিত্রা।কাল রাতেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে।
বিয়ের আনন্দে চারদিকে লুটোপুটি খাচ্ছে সুখ সুখ রব,অথচ শত চেষ্টার পরেও মন থেকে কেন যানি সুখি হতে পারছে না চিত্রা।মনের ভেতর কোথাও একটা অপরাধী ভাবটা রয়েই গিয়েছে।ইভানের মতো মানুষকে এই নোংরা খেলায় ফাসিয়ে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না সে।হৃদয় নিংড়ানো অপরাধবোধ ভেতরটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃসার করে দিচ্ছে তার।
নিজের করা ঘৃনীত আর জঘন্যতম কাজের জন্য এখন নিজেই ভস্ম হচ্ছে সে,ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার আনন্দ থেকে যন্ত্রণা হচ্ছে কয়েকগুন বেশি,যার দরুন শুভ্র মুখের শুভ্রতা লেপ্টে গিয়েছে চোখের পানিতে।
এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো ইভান,চিত্রাকে কাঁদতে দেখে স্বাভাবিক ভাবেই কপালে ভাজ পরলো তার,ওষ্ঠপুট নেড়ে তক্ষুনি জিজ্ঞেস করলো,
“কাঁদছো কেন?”
চিত্রা ভড়কালো,ইভানকে দেখেই তড়িঘড়ি মোছার চেষ্টা করল চোখের পানি, ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট টিপলো,ভেতরের যন্ত্রণার চেপে গিয়ে ইভানের প্রশ্ন এড়াতে জিজ্ঞেস করএ বসলো অন্যকথা,
“আপনি নিজ ইচ্ছেতে বিয়েটা করছেন না তাইনা?এটা আপনার দায়বদ্ধতা থেকে করছেন।”
“কীসের দায়বদ্ধতা?”
কথাটা ইভান এমন ভাবে বললো যেন সে বুঝতে পারছে না চিত্রা কীসের কথা বলছে।ইভানের এরুপ অভিব্যক্তিতে চিত্রা কি বলবে ভেবে পেলো না,তারকাছে মনে হলো সেদিনের ঘটনা টা ইভানকে আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া উচিত,সে হিসেবেই মুখ খুললো,
“সেদিনকার ঘটনাটা,,,”
“সেদিনকে? কিছু ঘটেছিলো নাকি?কই আমার যতদূর মনে পড়ছে আমি তো কিছুই করি নি তোমার সাথে।”
কথাটা বলেই পিচলে হেসে ফেললো ইভান।এদিকে চিত্রার তো দফারফা অভস্থা।চিত্রার ছলচাতুরী ইভান আগে থেকেই জানতো কথাটা বুঝতে পেরেই চিত্রা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আওড়াল,
“আ,,আপনি?”
ইভান প্রতিক্রিয়া হীন ঝুঁকে এলো চিত্রার দিকে,তারপর তরল কন্ঠে বললো,
“তুমি এসব না করে সরাসরি আমাকে বিয়ের কথা বললেই পারতে চিত্রা।”
অপরাধবোধ আর অনুসোচনায় ডুকরে উঠলো চিত্রা,নিজের মায়ের চিকিৎসার টাকা যোগাড় করার জন্য এই সহজ সরল মানুষ টাকে ঠকিয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে সে।লজ্জায় তার মাথা নুয়ে এলো,দু’হাত জোড় করে প্রকম্পিত ঠোঁট কামড়ে বলল,
“আমাকে ক্ষমা করুন,প্লিজ আমাকে ক্ষমা করুন।আমি বুঝতে পারি নি,, ”
ইভান স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,
“এখনও তো বুঝতে পারছো না কি করেছ আর কি হতে যাচ্ছে।”
“আমার আম্মুর চিকিৎসার জন্য এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমি।বিশ্বাস করুন।”
বিনিময়ে চমৎকার হাসলো ইভান,নিজের খরখরে হাতটা চিত্রার গালে রেখে নিরেট কন্ঠে বললো,
“চিন্তা করো না,সামলে নেবো আমি।টুকটুকে বউ সাজো।”
চিত্রা ফুফিয়ে উঠলো,ভেতর থেকে উথলে আসা লজ্জাবোধ থেকে বললো,
“আপনি চাইলে বিয়েটা ভেঙে দিতে পারেন।”
“ভাঙতে হলে তো সেদিনিই সবটা ভেঙে দিতাম,চিন্তা করো না আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
ইভানের জবানে এমন অপ্রত্যাশিত জবাব পেয়ে রীতিমতো থ বনে গেলো চিত্রা,দুই ঠোঁট হা করে আওড়াল,
“সব জানেন?”
ইভান হাসলো,ছোট্ট করে বললো,
“এটুকুতে হবে না আরও অনেক জানার বাকি আছে।”
চিত্রার বিস্ময় যেন কাটছেই না,সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি জানার বাকি আছে আর?”
ইভান আরেকটু এগিয়ে গেলো চিত্রার দিকে,চিত্রা ধড়ফড়িয়ে উঠতেই একহাতে চেপে ধরলো চিত্রার ঘাড়,তারপর চিত্রার কানের কাছে মুখ নিয়ে মাদকিয় স্বরে বললো,
“এই ধর তোমার শরীরে কোথায় কয়টা তিল,,, ”
চিত্রার কানের লতি গরম হয়ে এলো, উপায়ন্তর না পেয়ে নিজের তনু হাতে চেপে ধরলো ইভানের মুখ,লজ্জারাঙা কন্ঠে রিনরিনালো,
“ইসসস,,,কি বলছেন এসব?”
ইভানের চোখের ভাষা অন্যরকম,বোঝা মুশকিল, বা হয়তো সে বোঝাতে চায় না,কিন্তু ওই কামুক চোখে তাকাতেই পুরো শরীর বরফের মতো জমে এলো চিত্রার,অবশ হয়ে এলো সমস্ত কোষ গহ্বর।
চিত্রার ওমন নাজেহাল অবস্থার ধার ধারলো না ইভান,সে শীতল স্পর্শে নিজের ঠোঁটের উপর থেকে তুলে নিলো চিত্রার কোমল হাত,তারপর আচমকা একটা শুখনো চুমু আঁকলো চিত্রার হাতের উল্টো পিঠে,নেশাময় কন্ঠে বললো,
“রেডি হও,আজ সারা রাত তোমার শরীরের প্রত্যেকটি লোম গুনে গুনে দেখবো আমি।”
অজানা এক অনূভুতিতে ফুফিয়ে উঠলো চিত্রা,নৈস্বর্গিক সুখ জিতে নেওয়ার মতোই অদ্ভুত আনন্দে উল্লাস করে উঠলো তার নয়নজোড়া, অবিরত অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতেই বিগলিত হাসলো সে, প্যাচপ্যাচ করে নাক টেনে বললো,
“লজ্জায় মরেই যাবো।”
ইভান শ্লেষ হেসে বৃদ্ধাঙুল দিয়ে মুছে দিলো চিত্রার চোখের পানি,পুনরায় আরেকটি চুমু আকঁলো চিত্রার কানের লতিকায়,মাদকিয় কন্ঠে আওড়াল,
“চোখের পানি জমা করে রেখো,রোমান্সের সময় প্রচুর কাঁদতে হবে আজ।চোখের পানির দূর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।”
____
এতোদিন জেসমিন বেগম নিজের তাগিদে ফোন করতে সেই অজ্ঞাত লোককে,অথচ আজ ঘটলো ভিন্ন ঘটনা,জেসমিনের ফোনে একের পর এক কল আসতে শুরু করলো সেই ব্যাক্তির।এটাই তো চেয়েছিলো জেসমিন,দাবায় জিতে যাওয়ার মতো অনন্দ হচ্ছে আজ।
হোটেলের সেকেন্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা,কানে ফোন চেপে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে,দেশের নাম করা মন্ত্রী এবং সংসদের অনেক সদস্যই এসেছে বিয়েতে,সবার হৈ হুল্লোড় এক শীতল চাহনিতে দেখছে সে,
“হ্যালো।”
“নিজের জালে নিজেই ফেসে যাওয়ার ব্যাপারটা ইঞ্জয় করছো তো?”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো জেসমিন বেগমের উপহাস মিশ্রিত কন্ঠ।অথচ অজ্ঞাত লোকটা বিস্মিত হবে দূর নড়লোনা অব্দি,তার ছায়াটা তখনও পকেটে হাত গুজে স্থির দাঁড়িয়ে,সে চাপা স্বরে ভণিতা করে বললো,
“কে কার জালে ফাসলো বুঝতে পারলাম না।”
“তুমি ছাড়া কার কথা আর বলবো?”
জেসমিন বেগমের প্রত্যুত্তরে বেশ মজা পেলো লোকটা,কপটতা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“ফাসিয়ে মজা পাচ্ছেন তাই না?”
ওপাশ থেকে শোনা গেলো জেসমিন বেগমের হাসির ঝংকার,বললো,
“হাসিতে আঁচ করতে পারছো নিশ্চয়ই।”
“কিন্তু আমি তো কারো জালে ফাঁসি না, বরং ফাঁসাই।”
অজ্ঞাত ব্যাক্তির উত্তাপহীন কন্ঠে ক্ষানিকটা দমলো জেসমিন বেগম,ভারিক্কি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলতে চাইছো তুমি?”
অজ্ঞাত লোকটা নৈঃশব্দ্যে বিস্তৃত হেসে বক্র কন্ঠে বললো,
“এডভোকেট ত্রিজয় তেজের বিশ্বস্ত পিএ-র বিয়ে, ইনভিটেশন পেয়েছেন নিশ্চয়ই?”
জেসমিন ভ্রুকুটি তুলে সহাস্যে বললো,
“তাতে কি?আমরা তো পার্টনার।”
লোকটা আবারও হাসলো, সেই হাসিতে খেলে গেলো অব্যাক্ত বিদ্রুপ,হুশিয়ার করে বললো,
“সাবধানে থাকবেন।আগেরবার কিন্তু বাঁচতে পারেন নি,তাই এবারে কি হবে বলা মুশকিল।”
জেসমিন বেগম কম যায় না,কন্ঠে দাপট দেখিয়ে, আত্মবিশ্বাসী দীপ্তি স্বরে বললো,
“আমাকে তো তোমার বাঁচিয়ে রাখতেই হবে,নয়তো এমপির চেয়ার যে হারাতে হবে তোমার।”
অজ্ঞাত লোকটা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করলো না,মোবাইল থেকে সিমটা খুলে মুখে ঢুকিয়ে দিলো দ্রুত,তারপর অদ্ভুত ভাবে ছোট্ট বস্তুটাকে দাঁতের নিচে পিষতে পিষতে আওড়াল,
“ক্ষমতা ক্ষমতা আর ক্ষমতা। আর কি চাই,এতটুকুই তো।ব্যাপার না।”
_______
যথারীতি সময়ে ইভানের বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছে কিয়ান আর অনু।সেদিনের পর থেকে অনু গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে,এক ছাদের নিচে থাকছে খাচ্ছে কিন্তু কিয়ানের সঙ্গে একটা শব্দ অব্দি বলেনা।জীবনের সবচেয়ে নির্মম আঘাতে একেবারে ভেঙে চূড়ে নিরব হয়ে গিয়েছে মেয়েটা।
কিয়ান আজ এক প্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছে ইভানের বিয়েতে,গাড়ি থেকে নেমেছে পর্যন্ত অনুর প্রতি দেখাচ্ছে এক্সট্রা কেয়ার,
“আস্তে হাঁটো।দেখে।”
কিয়ানের এরকম অতিরিক্ত আহ্লাদে বিরক্ত অনু,যেই মানুষটার প্রতি মন থেকে ভালোবাসা উঠে যায় সেই মানুষ টার করা সব কাজই হয়তো বিরক্তই লাগে,এই যেমন অনুর লাগছে।
“এখানে আসাটা কি খুব প্রয়োজন ছিলো?”
অনুর প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর না দিয়ে কিয়ান উল্টো প্রশ্ন করে বললো,
“সুন্দর করে সেজেছো তো?”
অনু অসন্তোষ কন্ঠে বললো,
“এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়।”
কিয়ান হেয়ালি করে বললো,
“আমি তো উত্তর দেই নি, প্রশ্ন করেছি।”
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“থার্ডক্লাস প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না।”
অনু দমলো না,বরং গলার স্বর ভারি করে বললো,
“এটা ইভানের বিয়ে,কি দরকার ছিলো আমাদের আসার?”
“ইনভিটেশন ছাড়া তো আসি নি।”
“এখানে যা খাবেন বাড়িতেই রান্না করে দিতাম আমি।”
“খাওয়ার জন্য এসেছি কে বললো তোমাকে?”
“বিয়ে বাড়িতে মানুষ কেন আসে তাহলে?”
“আমি তো এসেছি মিস্টার ইভানকে থার্ডক্লাস বিরহে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখতে।”
কিয়ানের বিদ্রুপ মাখা স্বরে রাগে ফুসলো অনু,মনে পরে গেলো ইভানের করা পাগলামি গুলোর কথা,মনে মনে বড্ড অনুশোচনা হলো তার,বিধাতা কিয়ানের বদলে ইভানের সাথে তার ভাগ্যটা জুড়ে দিলে কি এমন ক্ষতি হতো?তারপর নিজে নিজেই ভাবলো, হয়তো হতো।ক্ষতি আর আক্ষেপ ছাড়া একজীবনে তার পাওয়ার কিইবা থাকতে পারে।হয়তো কিয়ানের মতো ইভানও রঙ পাল্টাতো,ধোকা দিতো আরও চরম ভাবে।মানুষ পাল্টালে ভাগ্য তো আর পাল্টে যাবে না।
কথাগুলো ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অনু,কিয়ানকে বললো,
“অন্যের জ্বলার কথা না ভেবে নিজের পাপের কথা স্মরণ করুন।যত পাপ করেছেন জাহান্নামের আগুনও কম পড়ে যাবে।”
“আমার মৃত্যু চাও?আমি কিন্তু তোমার সন্তানের বাবা।”
“শাস্তি চাই।আপনার কি মনে হয় না আপনি যত পাপ করেছেন তার জন্য আপনার আরও সাত জন্ম প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।”
“পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে তো আগামী সাত জন্ম মৃত্যু দিয়েই প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে আমার।আগামী সাত জন্ম বিধবা হতে রাজি আছো তো?”
“আপনার সাথে দেখা হওয়াটা এজন্মের ভুল আমার,পরবর্তী জন্ম চাই না,যদি ভুল করেও হয়ে যায় তবে আপনার থেকে দুরত্ব চাইবো।”
কিয়ানের বুকটা মুষড়ে এলো,মুমূর্ষু কন্ঠে বললো,
“এতো ঘৃনা করো আমায়?”
অনু একটা শুস্ক হাসি দিলো,মলিন কন্ঠে বললো,
“করাটা কি উচিত নয়?নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন। ”
কিয়ান অনুতাপে ভরা কন্ঠে বললো,
“উত্তর তো অপরাধীই প্রমাণ করবে।”
“তাহলে এ জীবনটা এভাবেই যাক।কিছু তো করার নেই।”
“কেন?”
অনু আলতো করে নিজের হাতটা নিয়ে রাখলো মেদুর পেটের উপর,নিস্পৃহ কন্ঠে বললো,
“এই যে এই নিস্পাপ বাচ্চাটার জন্য বিচ্ছেদ চাচ্ছি না,বড় হয়ে যদি কারণ জানতে চায় আমি নিরুপায় মা কি জবাব দেবো?”
কিয়ানও আলতো করে নিজের হাতটা নিয়ে রাখলো অনুর হাতের উপর,আহত কন্ঠে বললো,
“আর যদি আমি মরে যাই?তখন তো সমস্যা হবে না,একটা সুন্দর বিচ্ছেদও হবে আর উনি কারণও জানতে চাইবে না।”
“উঁহু। আমি চাই আমার গর্ভে যে আছে সে মেয়ে হোক।নিস্পার মতো সুন্দরী হোক।আর নয়তো নিস্পার পূনর্জন্ম হোক আমার গর্ভে।”
কয়ান ভড়কালো, অনুর পেটের উপর রাখা হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে এনে বললো,
“এমন অদ্ভুত চাওয়ার কারণ কি?”
অনু তাচ্ছিল্য করে বললো,
“পর নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিজের রক্ত ভুলেছেন,সেই নারী যদি আপনার নিজের রক্ত হয়ে জন্ম নেই তখন কি করতেন সেটাই দেখতাম।
কিয়ানের মুখটা চুপসে গেলো ওমনি,ভ্যাবাচেকা খেয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে অসন্তুষ্ট কন্ঠে বললো,
” মাপ কর আমার মা।মরে যাওয়াটাই বেটার অপশন।”
“মরে যাওয়াটা সহজ,কিন্তু সেটা আপনার শাস্তি হতে পারে না।খোদা না করুক এটাই না যানি আপনার শাস্তি হিসেবে চিরস্থায়ী হয়।”
“আমার খেয়ে আমার পড়ে আমার বাচ্চা গর্ভে নিয়ে আমার পিঠে ছু/ড়ি বসানোর মতো থার্ডক্লাস দোয়া করবে আমি ভাবতেই পারি নি।”
“থার্ড ক্লাস মেয়ে বলে কথা,আপনার মতো ফাস্ট ক্লাস মানুষের চিন্তা ভাবনায় বিলম করি না।”
কিয়ান অনুর উপর রুষ্ট হলো বেশ,অনুর হাত ধরে তপ্ত কন্ঠে বললো,
“হয়েছে এবার পা চালিয়ে এগোও।”
অনু খোচা মেরে বললো,
“নিস্পাকে দেখার তড় সইছে নাহ তাই না?আপনি যান আমি আস্তে করে আসছি।”
কিয়ান নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।অনুর দিকে তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আলগা করলো হাতের মুঠি,অনুর হাতটা ছেড়ে দিয়ে ভেতরের দিকে এগোতে এগোতে বললো,
“থার্ডক্লাস কথাবার্তা শোনাতে শোনাতে মেরে ফেলবে আমায়।”
অনু ম্লান হাসলো,গলা চাপা যন্ত্রনায় ঝাপসা হয়ে এলো চোখ,তবুও সেই অসচ্ছ দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলো কিয়ানের যাওয়ার পানে,একরাশ হতাশা নিয়ে আওড়াল,
“আপনি মরে গেলেও বোধহয় আফসোস হবে না আমার।
___
এই কয়েক দিনের মধ্যে ফুলমতির মৃত্যু শোক থেকে বেড়িয়ে এসেছে নিস্পা।ত্রিজয়ের কাছ থেকে সত্যি ঘটনাটা জানার পর, আর তাকরিমের ওই ভিডিও টা দেখার পর ফুলমতির মিথ্যা মায়া কাটিয়ে উঠতে প্রায় অনেকটাই সহজ হয়েছে নিস্পার জন্য।
ইভানের বিয়ে উপলক্ষে আজ একটা টকটকে লাল শাড়ি পরেছে সে।
“লাল শাড়িতে কেমন লাগছে?
ত্রিজয় অপলক দৃষ্টিতে সেই তখন থেকেই নিস্পাকেই দেখছিলো,তাই হটাৎ প্রশ্নে অপ্রস্তুত হলো রিতীমত,তবে নিজের মুগ্ধতা চুপিসারে চেপে গিয়ে নাক সিটকে বললো,
“শাড়িতে এই মূহুর্তে সবচেয়ে বিশ্রী লাগছে তোমাকে।”
নিস্পার হাস্যজ্বল মুখটা চুপসে গেলো ওমনি,নারাজ হয়ে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,ভস্মকরা একটা লুক দিয়ে বললো,
“আপনার রুচির দূর্ভিক্ষ হয়েছে।আমি তো শুনেছি শাড়িতেই মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে।”
ত্রিজয় ঠোঁট টিপে হাসলো,নিস্পাকে আরেকটু রাগানোর জন্য বললো,
“তোমার মাথা।বোন হিসেবে একটা এডভাইস দেই শোন,এসব শাড়ি টাড়ি অপশনাল, সত্যি কথা হলো নারী সুন্দর নাইটিতে।লাইক ইলিশ মাছ, সৌন্দর্যেই স্বাদ বাড়ে বহুগুণ।”
নিস্পা সত্যি সত্যিই রেগেছে এবার,ত্রিজয়ের অসভ্য কথা যখন তখন মেনে নেওয়া সম্ভব নয়,এবারেও অসম্ভব মনে হলো তার কাছে,দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“ভাই হিসেবে আপনাকেও একটা এডভাইস দেই শুনুন,এখন থেকে প্রতিদিন লুঙ্গি পড়বেন,প্যান্টের চিপায় পড়ে মৃগল মাছের মৃগি রোগ শুরু হয়েছে সেদিকে নজর দিন।”
নিস্পা রেগে গেলে নাকটা টমেটোর মতো লাল হয়ে যায়,এবারেও তাই হলো,ত্রিজয় নিজের মিডেল ফিঙ্গার নিস্পার নাকের ডগায় চেপে ধরে বললো,
“নজর যা দেওয়ার তুমিই দেও,আমার নজর তো তোমাকে দেখেই নাজেহাল।অন্যকিছু দেখার সময় নেই।”
নিস্পা ঠোঁট প্রসারিত করে নাটকীয় হাসলো ,ত্রিজয়ের হাতটা নিয়ে ধরলো ত্রিজয়ের চোখের সামনে,হাতঘড়িটার দিকে ইঙ্গিত করে বললো,
“সময় এমনিতেও নেই।কটা বেজেছে দেখেছেন?”
ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“তো?”
একটু আগে রেহানার মেয়ে সালমার পেইন উঠেছে,হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে এখানে এসেছে নিস্পা,যদিও আসতে চায় নি কিন্তু ত্রিজয়ের জোরাজোরি তে আসতেই হলো।তাই কোন কিছুতেই মন দিতে পারছে না এখন,মেয়েটার চিন্তায় দায়সারা হতে পারছে না কিছুতেই,স্বস্তিও পাচ্ছে না এসেছে পর্যন্ত।তাই ত্রিজয়ের হাত ধরে নরম গলায় বলল,
“এখানকার ঝামেলাটা দ্রুত সেড়ে ফেললে ভালো হতো না?বয়স্ক মহিলা একা মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যদি ভয় পায়?যদি কোন কিছুর দরকার পরে।”
ত্রিজয় তখন থেকে এড়িয়ে যেতে চাইছে এসব উটকো ঝুটঝামেলা, অথচ নিস্পা বারকে বার একটা সুন্দর মূহুর্তে এসব টেনে এনে বিরক্ত করছে তাকে,তাই সে বিরক্তমাখা কন্ঠে বললো,
“এতো প্যারা নিচ্ছো কেন?ওরা তোমার কে হয়?কেউ তো নয়,তাও এতোগুলো টাকা খরচ করে হাসপাতালের ভি আই পি কেবিনে শিফট করে দিয়েছি শুধু তোমার কথা রাখতে। এখন এখানে এসেও সুন্দর মূহুর্তটা ইঞ্জয় না করে চিন্তা করে যাচ্ছো।”
ত্রিজয়ের এমন কঠোর কঠোর বাক্যে অভিমান হলো নিস্পার,বিরাগী কন্ঠে বললো,
“এতো স্বার্থপরের মতো বলতে পারলেন আপনি?আজ যদি ওই মেয়েটার যায়গায় আপনার মা থাকতো? আর আজ ওই গর্ভের বাচ্চাটা যদি আপনি হতেন?বলতে পারতেন এসব?”
ত্রিজয় রীতিমতো হতভম্বের ন্যায় তাকালো নিস্পার দিকে,আকাশ থেকে ধুপ করে মাটিতে পড়ার মতো ফেস বানিয়ে হাত জোড় করে মাথা ঠুকলো নিস্পার সামনে, খিটখিটে কন্ঠে বললো,
“মাপ কর বইন।বলে মহা অন্যায় করে ফেলেছি আমি,তার জন্য সোজা জ্বলজ্যান্ত মানুষটাকে মায়ের গর্ভে পাঠিয়ে দিতে চাইছো।”
নিস্পা তখনও রুক্ষ স্বরেই বললো,
“আপনি মজা নিচ্ছেন,অথচ চিন্তায় আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে।”
নিস্পার মাথা থেকে হাসপাতালের ভূত সরাতে না পেরে নিরাশ হলো ত্রিজয়,হতাশ কন্ঠে বললো,
“বোন হিসেবে একটা কথা রাখবে?”
নিস্পা ঠোঁট ফুলিয়ে কটমট করে বললো,
“বউ মনে করে বলুন,বারবার নিজেকে আপনার বোন মনে করতে ভাল্লাগে না।”
“আচ্ছা বউ মনে করে না হয় কথাটা রাখো, প্লিজ উটকো চিন্তা গুলো আগামী এক ঘন্টার জন্য মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেও।”
“কিন্তু,,, ”
“কোন কিন্তু নয়,আমি সব ব্যাবস্থা করে দিয়েছি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সি সেকশনে নিয়ে যাওয়া হবে ওনাকে।ডোন্ট ওয়ারি।ওকে।
নিস্পা এতটুকুতেও স্বস্তি পেলো না,কিন্তু কিছুই করার নেই,বিয়েটা এট্যান্ড করাও জরুরি, শত হোক ইভান তার ভাই,আর ত্রিজয়েরও তো ভাইয়ের চেয়ে কম নয়।তাই বাধ্য হয়েই সম্মতি দিতে হলো,ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,
” ওকে।”
______
খাওয়া দাওয়ার পালা শেষ।উপরে বউ সাজানো হচ্ছে চিত্রাকে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে বিয়ের কাজ।ইভান ছুটে ছুটে তদারকি করছে সবার,ত্রিজয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“খাবার খেয়েছেন স্যার?”
ত্রিজয় টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে সিরিয়াস ভঙিতে বললো,
“কেশ পনেরো লাখ টাকা দিয়েছি সেই পরিমাণ খাবার যায়গা হয় নি পেটে।”
ইভান ঠোঁট উল্টো ইনিয়েবিনিয়ে বললো,
“এটা তো আপনি আমার বিয়েতে গিফট করেছেন স্যার।”
“তাতে কি?আগামী দুই বছর বীনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে উশুল করে নিবো।”
এপর্যায়ে ইভানের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো পুরোপুরি,ত্রিজয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে দিলো অভিশাপ,
“শালা কিপ্টার বাচ্চা,তোর জীবনেও ভালো হবে না দেখিস।”
ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বললে নাকি ইভান?”
ত্রিজয় ধ্যান ভেঙে নড়েচড়ে দাঁড়ালো,দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বললো,
“না স্যার আসলে বলছিলাম উশুল করলে সেটা আর গিফট রইলো কই।দু বছর যদি কোন বেতন না পাই বউকে খাওয়াবো কি।”
“দু বছর বউ খাওয়ানোর চিন্তা না করে আজকে রাত হ্যান্ডেল করার জন্য হেলমেট কিনবে কি দিয়ে সেটা চিন্তা করা উচিত তোমার।”
ইভান দাঁতে দাঁত চেপে শ্বাস বন্ধ করে তাকালো ত্রিজয়েত মুখের দিকে, ত্রিজয়ের তাতে হেলদোল নেই অথচ বেচারার রাগে ভেতর ফেটে যাচ্ছে,
“শালা কিড়ে পড়ুক তোর মুখে।”
“মনে মনে গালাগাল দিচ্ছো দেও,কিন্তু হেলমেট কেনার এক পয়সাও পাবে না।”
ইভানও কম যায় না,ত্রিজয়ের হুমকির প্রতিবাদ করলো দাপটিয় কন্ঠে,
“প্রয়োজন নেই স্যার। এক্সিডেন্টের ভয় নেই,তাই হেলমেটও লাগবে না।”
“নিজের ফিডার খাওয়ার বয়সে বাচ্চাকে ফিডার খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে চাইছো, ভেরি স্যাড।”
কথাটা বলেই ইভানের কাঁধ চাপড়ালো ত্রিজয়,ইভান দাঁত মুখ খিচে উত্তর দিলো,
“আমার ফিডার খাওয়ার বয়স আরও আটাশ বছর আগেই পাড় হয়ে গিয়েছে স্যার।”
মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো ত্রিজয়,নিজের হাতের টিস্যুটা ইভানের পকেটে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললো,
“এই ফিডার সেই ফিডার নয় বোকা।আবেগ দিয়ে না ভেবে বিবেক দিয়ে ভাবো।”
কথাটা বলে আর দাঁড়ালো না ত্রিজয়,হেলেদুলে চলে গেলো অন্যদিকে। এদিকে ইভান থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে তখনও,পকেট থেকে ত্রিজয়ের ঢুকিয়ে দিয়ে যাওয়া টিস্যুটা হাতের মুঠোয় দলা পাকাতে পাকাতে ত্রিজয়ের কথাটা একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলো,পরক্ষণেই বুঝতে পারলো ত্রিজয়ের কথার ডাবল মিনিং,মনে মনে কিড়মিড় করে আওড়াল,
“শালা ঠোঁট কাটা তোর প্যান্টের চিপায় বোমা পড়ুক।”
_____
খাওয়াদাওয়া শেষে কর্নারের একটি টেবিলে বসে বিশ্রাম করছিলো নিস্পা,ঠিক তখনই ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসতে দেখলো কিয়ান আর অনুকে।প্রায় অনেক দিন পর বান্ধবী কে দেখতে পেয়েই খুশিতে ছুটে গেলো নিস্পা,একপ্রকার দৌড়ে এসে অনুকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“অনু কেমন আছিস?”
হটাৎ নিস্পাকে এভাবে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো অনু পরক্ষণেই বিস্ময় চেপে নিজেও দু’হাতে জড়িয়ে নিলো নিস্পাকে,হাস্যজ্বল কন্ঠে বললো,
“এইতো ভালো তুই?”
নিস্পাও হেসে জবাব দিলো,
“যেমন দেখছিস।”
অনু নিজের হাত বুলালো নিস্পার মাথায় খুশি মনে দোয়া করলো,
“দোয়া করি ভালো থাক।”
নিস্পা আবেগাপ্লুত হয়ে চুমু খেলো অনুর কপালে,বললো,
“হুম তোকেও।খুব দোয়া করি।”
তারপর পাশেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তো ডক্টর কিয়ান তোকে ঠিকঠাক লাভ কেয়ার করছে তো?”
অনু মুমূর্ষু দৃষ্টিতে তাকালো কিয়ানের দিকে,সুটবুট পড়ে লোকটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে,তাকাচ্ছেও না তার দিকে,অনু বুঝতে পেরেছে, ভীষণ ভাবে বুঝতে পেরেছে কিয়ান দৃষ্টিভ্রষ্ট হয়েছে,কালো সানগ্লাসের নিচে কিয়ানের মুগ্ধ দু চোখ অবলীলায় দেখছে নিস্পাকে।
অনুর উত্তর না পেয়ে তাড়া দেখালো নিস্পা,অনুর বাহু ঝাকিয়ে ডাকলো,
“কিরে কিছু বলছিস না যে?”
অনুর চোখ ঝাপসা হতে শুরু করলো, জ্বলাপোড়া শুরু হলো বুকে,নিজের ভালোবাসার মানুষের চোখে অন্য নারীর প্রতি মুগ্ধতা কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না হৃদয়,ছিন্নভিন্ন হতে শুরু করলো অবশিষ্ট অনুভূতি,যন্ত্রণা টা পাল্লা দিয়ে বাড়ার আগেই নিজের কষ্ট আড়াল করতে চাইলো অনু,মাথায় হাত রেখে মিথ্যা বাহানা বানিয়ে বললো,
“তোরা কথা বল, আমার মাথাটা ঘোরাচ্ছে, আমি আসছি।”
অনু আর এক মূহুর্ত দাড়ালো না,চোখ ভেজার আগেই চপল পায়ে ত্যাগ করলো স্বীয় স্থান।
অনু চলে যেতেই অস্বস্তিতে আইঢাই করলো নিস্পা,কিয়ানের সাথে কথা বলতে বিব্রতকর অনুভব হচ্ছে তার।তবুও সৌজন্যতা দেখাতে বললো,
“আপনি লাকি অনুর মত একটা মেয়েকে পেয়েছেন।ওকে যত্ন করে আগলে রাখবেন।”
কিয়ান সত্যি সত্যিই এক ধ্যানে তাকিয়ে ছিলো নিস্পার দিকে,নিস্পা কথা বলা মাত্রই ধ্যান ছুটলো তার,হুশে ফিরতেই তাড়াহুড়ো করে আওড়াল,
“হু অবশ্যই।”
নিস্পা আর কোন কথা খুঁজে পেলো না,একহাতে শাড়ির আঁচল টা পেছন থেকে টেনে এনে সামনে চেপে ধরে ছোট্ট করে বললো,
“আচ্ছা যাচ্ছি আমি।”
“শোন।”
নিস্পা চলে যেতে নিতেই পিছু ডাকলো কিয়ান,নিস্পা ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে বললো,
“হু?”
কিয়ান একটু এগিয়ে এলো,দুরত্ব কমিয়ে ঘনিষ্ঠ হতে চাইলো বোধহয়,মুগ্ধতা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
ভীষণ রকম অস্বস্তিতে গলা শুখিয়ে এলো নিস্পার,জোর করে একটা শুখনো হাসি টেনে বলতে চাইলো,
“ধন্য,,,”
“বউ রেখে অন্য মেয়েকে সুন্দর বলছেন?বিশ্রী ব্যাপার হয়ে গেলো না?”
নিস্পার কথাটুকু শেষ করার আগেই ভেসে এলো এমপি তাওসিফ তাকরিমের কন্ঠ।ওপাশের কর্নারে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ নিস্পাকেই দেখছিলো তাকরিম,তারমাঝেই কিয়ানের সাথে নিস্পার এমন হেসে হেসে কথা বলাটা বড্ড পীড়া দিলো তাকে,তাই সহ্য করতে না পেরে চলেই এলো বাগড়া দিতে।
নিস্পার সাথে দুটো কথা বলার সুযোগ হাত ছাড়া হতেই রাগে ফাটলো কিয়ান,তপ্ত কন্ঠে তাকরিমকে বললো
“তাতে আপনার সমস্যা টা কোথায়?”
তাকরিম নিজের বুকের বা পাশে হাত রেখে বললো,
“এইখানে।এই মেয়েটাকে আমি ছাড়া অন্যকেউ সুন্দর বলুক এটা মেনে নিতে হার্টে প্রবলেম হয় আমার।”
কিয়ান উপহাস করে বললো,
“বেশি প্রবলেম মনে হলে আমার কাছে আসবেন হার্ট ফুটো করে সব সমস্যা বের করে দেবো।কি বলুন তো আপনার উপকারে আসতে পারলে আমার ডাক্তারি পেশা স্বার্থক হবে।”
“এমপির হার্টে হাত দেওয়া এতো সহজ না মশাই,,, ”
“কারণ তার হার্ট আমার কাছে।”
ত্রিজয়কে নিজেদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই মুখ বিকৃত করলো তাকরিম,ভেতর ভেতর ক্ষিপ্র স্বরে বিরবির করে বললো,
“শালা জা/উ/রা চলে এসেছে।”
ত্রিজয় এসেই অধিকারবোধ দেখিয়ে একহাতে জড়িয়ে ধরলো নিস্পার বাহু,রাগে কিয়ানের ভেতরটা ঝাঝড়া হওয়ার মতো অনুভব হলো,কোনরকম চাপা রাগ সংবরণ করে হেসে বললো,
“আরে ত্রিজয় সাহেব যে। আপনাকেই মিস করছিলাম। তা আপনি চাইলে আমি আপনার হার্টটাও ফুটো করে দিতে পারবো, দেবো নাকি?”
বিনিময়ে দাঁত কেলিয়ে হাসলো ত্রিজয়,কৌতুকমিশ্রিত স্বরে বললো,
“কিন্তু আমার হার্ট তো আমার কাছে নেই সেটা তো নিস্পার কাছে।”
নিস্পা ঠোঁট উল্টে তাকালো ত্রিজয়ের মুখের দিকে,তারপর একটা যুতসই জবাব খুঁজে নিয়ে কিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“বাদ দিন আপনি নিজের হার্ট সার্জারি করুন।এখানে সবার হার্ট দৌড়াদৌড়ি করে কাবাডি খেলছে।”
অপমান বোধে একটুও নরম হলো না কিয়ান, বরং পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য উদ্যোত হতেই শোনা গেলো একটা বিকট শব্দ। ঠিক শব্দ না, যেন মনে হলো আকাশ ছিঁড়ে পড়েছে মাটিতে।
এক সেকেন্ড। এক সেকেন্ডে থমকে গেলো সব।একটা সুন্দর উৎসব মুখর পরিবেশ পরিনত হলো ধ্বংস স্তুপে।
ভয়ংকর একটা বোমা ব্লাস্ট।আর ছিন্নভিন্ন করে দিলো সমস্ত স্বপ্ন। ধরনী কাপানো শব্দের নিচে চাপা পড়লো মানুষের হাহাকার। কারো শাড়িতে আগুন,
কারো কণ্ঠে আর্তনাদ,
কারো শরীর নিথর হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে।বিয়ে বাড়ির রঙ বদলে গেছে রক্তে,।
রঙিন বাল্বগুলো একে একে ফেটে গিয়ে নেমেছে অন্ধকার।
যেখানটায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি প্রান নিজেদের অকাল মৃত্যু স্মরণ অব্দি করেনি, সেই সেখানটাতেই পড়ে রইলো তাদের ছিন্নভিন্ন সুখ আর নিথর শরীর।
আগুনে দগ্ধ সবাই,জীবন বাঁচানোর জন্য কেউ হয়তো শেষ চেষ্টা টুকুও করার সুযোগ পায় নি।কিয়ান ছিটকে গিয়ে পড়েছে অন্যত্র।পুরো শরীর ঝলসানো তার,কোনরকম চোখটা মেলে খুঁজছে অনুকে,হিতাহিত জ্ঞানশুন্য মস্তিষ্ক টা, নিজের মৃত্যু মুখে এসেও প্রভুর নিকট প্রার্থনা করে বললো,
“খোদা অনু যেন ঠিক থাকে,ও যেন বাইরে থাকে,ওর যেন কিচ্ছু না হয়।আমার সন্তানকে বাঁচিও খোদা,পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ টুকু দিও দয়া করে।”
ত্রিজয়ের পুরো শরীর রক্তে রঞ্জিত, সে কোনরকম হামাগুড়ি দিয়ে এসে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার হাত,দগ্ধ কন্ঠে ডাকলো,
” কলিজা!”
“কলিজা!
বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী, পোড়া কাপড় আর রক্তের কাঁচা গন্ধ মিলেমিশে শ্বাস নিতে কষ্ট হলো তাকরিমের, জীবনের একটা করে শ্বাস ফুরিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকা শরীরটা সে টেনে টেনে এগিয়ে আনলো নিস্পার কাছে,নিস্পার আরেকটি হাত আঁকড়ে ধরে ডাকলো,
“আলেকজান্দ্রা আমার আলেকজান্দ্রা।কিচ্ছু হয়নি না তোমার?”
যন্ত্রণায় জমে গিয়েছে নিস্পা,বন্ধ চোখ দুটো খুললো অল্প, কিন্তু দেখছে না,কিচ্ছু দেখার ক্ষমতা নেই, বিস্ফোরণের সাথে উড়ে গেছে সব।সে কেবল অস্পষ্ট গোঙালো,
“উউউ,,,উউউউম।খোদা,,,”
ত্রিজয় অনেক কষ্টে নিজের থেতলে যাওয়া মাথাটা টেনে এনে লাগালো নিস্পার মাথার সাথে,নিভু প্রাণ বুকে নিয়ে বুকভরা আশ্বাস দিতে চাইলো নিস্পাকে,
“কলিজা আছি আমি, কিচ্ছু হবে না তোমার।”
নিজের চেয়েও বেশি নিস্পাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে তাকরিম নিজের রক্তে ভিজে থাকা কপালটা আলতো করে ঠেকালো নিস্পার মাথার সাথে,ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বললো,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ কিচ্ছু হবেনা।”
ত্রিজয়ের মস্তিষ্ক সজাগ,মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসেও তাকরিমকে নিস্পার সান্যিধ্যে মেনে নিতে পারলো না ত্রিজয়,শরীরে সবটুকু শক্তি দিয়ে কন্ঠ চড়াও করার চেষ্টা চালিয়ে বললো,
“ওর হাতটা ছাড়ুন এমপি মশাই, বউ আমার।”
নিস্পার সাথে মৃত্যু অব্দি থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলো না তাকরিম,ম্রিয়মাণ কন্ঠে কুকিয়ে কুকিয়ে বললো,
“শক্তি থাকলে সরিয়ে দেখা।উপরওয়ালা তোর শক্তি কেড়ে নিয়েছে।আহত তুই আর কিছুক্ষণের মধ্যে মরবি।”
ত্রিজয় পাল্টা উত্তরে বললো,
“শক্তি থাকলে আগামী এক ঘন্টা এই হাত এভাবেই ধরে দেখান,উপরওয়ালা যেন আপনাকে শক্তি ঢেলে দিয়েছেন?আপনিও তো মরবেন।”
রক্ত, ধোঁয়া আর আর্তনাদের ভিড়ে দুজনের বিতর্কিত শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে পৌছালো নিস্পার কানে,নিস্পা অসহায়ের মতো অনুযোগ করে বললো,
“থা,,থা,,মুন।মৃত্যু নাকের ডগায় নিয়েও ঝগড়া করছেন?”
তাকরিম নিঃশ্বাস ভারি করে কাঁপা কন্ঠে বললো,
“ওর হাতটা ছেড়ে দেও আলো,মৃত্যুর সময় অন্তত ভরসা করে শান্তির ঘুম দেও আমার সাথে।”
ত্রিজয় গোঙিয়ে উঠলো, নিভু প্রাণ বুকে চেপে বললো,
“শালা তোমাকে উস্কে দিচ্ছে কলিজা,আমার এই বুক ছাড়া কোথাও শান্তি মিলিবে না তোমার।”
নিস্পার দুচোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো উষ্ণ জল,তবে নিজের হাতটা ছাড়ানোর মতো শক্তি তার শরীরে অবশিষ্ট নেই,সে কেবল কাতর কন্ঠে বললো,
“হাত ছাড়ুন এমপি মশাই, উনি আমার স্বামী।”
তাকরিমের বুকের ভেতরের সব দেয়াল একসাথে ভেঙে গেলো, ভীষণ আফসোস নিয়ে ছেড়ে দিলো চোখের পানি।অসহায়ের মতো কাতরাতে কাতরাতে বললো,
“আফসোস, যদি ইতিহাস বদলাতো,যদি খাঁ খাঁ মরুভূমিতে হটাৎ বৃষ্টির মতো তুমি সবার প্রথম আমার প্রেমে পড়ে যেতে।”
নিস্পার কন্ঠে ভাঙন ধরেছে,সে কান্না গিলে নিয়ে আওড়াল,
“মৃত্যু সন্যিকটে এমপি মশাই।অথচ এবারেও আপনি নিজের অপূর্ণ ইচ্ছের দলিল দিলেন।আমার মনে হচ্ছে ইতিহাস সত্যিই পাল্টাবে।”
ত্রিজয় মুখ হা করে নিঃশ্বাস নিলো,নিজের উপস্থিতি বোঝাতে নিস্পার মাথার সাথে হাল্কা ঘষলো নিজের রক্তাক্ত মাথাটা,অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়ো না কলিজা।ইতিহাস যদি হাজার বার পাল্টায় আমি হাজারবার তোমাকে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করবো।আগামী সাত জন্মে আরও হাজার খানেক বাসর আমার নামেই নিলাম হবে কথা দিলাম।”
“মৃত্যুকে স্মরণ করুন।”
রক্তিম কন্ঠে কথাটা বিরবির করে বলতেই চোখের পানি ছেড়ে দিলো ত্রিজয়,আহত কন্ঠে বললো,
“আমাদের আর সংসার হইলো না কলিজা।”
নিস্পা নিজেও কেঁদে ফেললো,মনে পড়ে গেলো তাকরিমের বলা সেই কথাটা,অসহায় হয়ে আওড়াল,
“সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল খসে যাওয়ার মতো অনাচার বুঝি আমার দ্বারাই হয়ে গেলো এমপি মশাই, আপনার রুহ এর অভিশাপ আমাকে একটা সংসার দিলো না।”
তাকরিম মুখ হা করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে অনুতাপ ভরা কন্ঠে আওড়াল,
“পরজন্মে ফুল হবো, এজন্মের সমস্ত অভিশাপ ভুল ভেবে তুলে নিবো তখন।কথা দিলাম তোমাকে ভালোবাসার দুঃসাহস দেখাবো না আর।”
কয়েক সেকেন্ড কাটলো নৈঃশ্বব্দে, হৃদস্পন্দনটা টিপটিপ করছে নিস্পার।নিস্তেজ মেয়েটা আত্মমগ্নতায় বিভোর, চোখ বুঝে এলো তার,খুব কষ্টে একটা শ্বাস টেনে রিক্ত শূন্য কন্ঠে বললো,
“যন্ত্রণা হচ্ছে।মৃত্যু যন্ত্রণা।”
মৃত্যু যন্ত্রণা সবার এক,ত্রিজয়ের হাতের বৃদ্ধাঙুলটা কাঁপছে,অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ভারি হয়ে এসেছে চোখের পাতা,তবুও নিস্পাকে একটু সাহস যোগাতে রুগ্ন সরলতায় মোড়ানো কন্ঠে ডাকলো,
“এ্যাই মিসেস চাটনি!”
প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়া শীতল এক ডাকে ঝলসে যাওয়া বক্ষপটের এক পাসে হালকা শীতলতা অনুভব হলো নিস্পার,সিক্ত কন্ঠে অস্পষ্ট গোঙাল,
“হু?”
ত্রিজয়ের কোমল দুটো ঠোঁট ঝলসে গিয়ে ফুলে উঠেছে, উপরের চামড়া পুরোপুরি উঠে গিয়ে ধারণ করেছে অদ্ভুত ভয়ংকর রুপ,রক্ত গড়িয়ে পড়ছে দুই ঠোঁটের ফাঁক গলে,সে নিঃসার কন্ঠে বললো,
“একটু হাসো।”
নিস্পার পুরো মুখটা ঝলসে গিয়েছে, পরিধেয় শাড়িটা পুড়ে শরীরের সাথে গলে গিয়েছে প্রায়,সে নিঃশ্বাসহীন কণ্ঠে বললো,
“মৃত্যু যন্ত্রণায় কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে আমার।কি করে হাসি?”
ত্রিজয়ের নীল চোখ ঝাপসা ধূসর রঙ ধারণ করেছে,চোখের সুতোর মতো চিকন রগগুলো ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে,অস্বচ্ছ চাহনিতে ছড়িয়ে পড়েছে অসহায়ত্ব।নিস্পাকে একটু ধরতে না পারার অসহায়ত্ব তাকে মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়েও বেশি পুড়িয়ে দিচ্ছে।শেষ মুহূর্তে এসেও প্রিয় মানুষটাকে নিরাপদ আশ্রয় দিতে না পারার ব্যার্থতা কি করে সহ্য করবে সে?
একজীবনের অপূর্ণতা আর একবুক আক্ষেপ নিয়ে সে নিভে আসা কণ্ঠে বললো,
“বোন ভেবে একটা শেষ চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।”
ত্রিজয়ের এই একেকটি শব্দ শুধু শব্দ নয় ব্যথা হয়ে এসে লাগলো নিস্পার বুকের ভেতর,যন্ত্রণায় ফুফিয়ে কাঁদতেও পারলো না বেচারি,শুধু ঠোঁট দুটো হাল্কা নেড়ে আওড়াল,
“এখনও?”
ত্রিজয়ের চোখের ধূসরতায় তখন মৃত্যু দাঁড়িয়ে,অথচ সে কি নিপুণ হিসেব কষে আওড়াল,
“আগামী তেতাল্লিশ বছরে পনেরো হাজার ছয়শো পঁচানব্বই টা বাসর মিস হয়ে গেলো কলিজা।”
নিস্পা অসীম ব্যাথা কন্ঠে চেপে আওড়াল,
“কীসব বলছেন?”
একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলো ত্রিজয়,বুকটা হাপড়ের মতো উঠলো, আবার নামলো ধিরে ধিরে। ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা নড়াচড়া হলো,
হাসি বলা যায় না,হয়তো মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে এটুকুই তার শেষ স্বস্তি।ক্লান্তি মাখা কন্ঠে আওড়াল জীবন নিয়ে কষে রাখা তার দীর্ঘ হিসেব,
“বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাহাত্তর বছর। সেখান থেকে ঊনত্রিশ বছর মাইনাস করলে আমাদের হাতে আরও তেতাল্লিশ বছর থাকতো।সব ভেস্তে গেলো কলিজা,বড্ড আফসোস হচ্ছে।”
নিস্পার আঙুলগুলো শুধু হালকা কেঁপে উঠলো,বিবষ কন্ঠে বললো,
“কীসের?”
ত্রিজয় হাসতে পারলো না,দুই ঠোঁট প্রসারিত করার সাধ্যে কুলোলো না তার,সে অনুশোচনা করে ফ্যাসফ্যাস করে আওড়াল,
“বাসর করতে না পারার।”
অবশেষে হাসলো,মেয়েটার যন্ত্রণায় নীল হয়ে আসা দুই ঠোঁট প্রসারিত হয়ে ঝড়লো মুক্তোর মতো হাসি।সে অমায়িক হাসি দেখার সৌভাগ্য হলো না ত্রিজয়ের, তবে স্পর্শের শীতলতায় বুঝে নিলো নিস্পা হাসছে, শরীরের প্রায় আশিভাগ ঝলসে যাওয়া জ্বলা যন্ত্রণা নিয়ে কলিজায় হটাৎ করে বরফের মতোই ঠান্ডা অনূভুত হলো, যেন মনে হলো কেউ একজন বুকের ভাঙা হাড়ের ফাঁকে আলতো করে হাত বুলালো তার।
ত্রিজয়ের মাথাটা ঠিক যেভাবে নিস্পার মাথার সাথে ঠেকে আছে,ঠিক সেই একই ভঙ্গিতে তাকরিমের মাথাটাও মিশে আছে নিস্পার মাথার আরেক পাশে।
মাঝখানে নিস্পা।দুই পাশে দুই ভিন্ন পৃথিবী,দুই ভিন্ন দায়,দুই ভিন্ন ব্যথা।।তিনটি ছিন্নভিন্ন ঝলসে যাওয়া রক্তাক্ত শরীর, পা থেকে মাথা অব্দি পুরো পুরি অবশ তাদের,শুধু চোখ দুটো টিপটিপ করছে,আর জবানটা চলছে কোনরকম।
ত্রিজয় নিস্তেজ স্বরে ডাকলো,
“এমপি মশাই?”
তাকরিমের শ্বাস খুব ধীরে উঠানামা করছে।
প্রতিটা নিঃশ্বাসে আগুনের গোলা ঢুকে যাচ্ছে বুকের ভেতরে।ঠোঁট দুটো ঝাকুনির মতো করে কাঁপলো,অস্পষ্ট শব্দ করল,
“হু?”
ত্রিজয় কৌতুক করে বললো,
“বাহ!এখনো বেঁচে আছেন?”
তাকরিমের চোখ বেয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু,রুদ্ধশ্বাসে আওড়াল,
“তোর মৃত্যুর আগে আমি মরছি না।তোর চেয়ে একমিনিট বেশি হলেও আলেকজান্দ্রার হাতটা ধরে থাকবো আমি।”
হঠাৎ—
আরেকটা বিস্ফোরণ।
এক ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠলো পরিবেশ, আগুনের দেয়াল ছুটে এলো ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে।হাওয়ার চাপ এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেললো অবশ শরীরগুলো।বেঁচে যাওয়া অবশিষ্ট শরীর গুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো মূহুর্তেই,কালো ধোঁয়ার ভেতর শোনা গেলো দুটো অসহায় গাঙচিলের চিৎকার,
“কলিজা,,,,,,”
“আলেকজান্দ্রা,,,,”
রক্ত, ধুলো আর আগুনে মানুষগুলোকে আর মানুষ চেনার কোনো চিহ্ন রইলো না।যে চোখগুলো একটু আগে টিপটিপ করে নড়ছিল,সেগুলো নিভে গেলো চিরতরে,ভালোবাসা, অনুশোচনা, আর আক্ষেপ
সব শব্দ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো একসাথে।ধ্বংস স্তুপের নিচে দেখা গেলো তিনটি শরীর।একে অপরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা টুকু করেছিলো বোধহয়।
তিনটি হৃদয় ভিন্ন ভিন্ন গল্প নিয়ে অবশেষে মৃত্যুর সামনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।এই মুহূর্তে কেউ বীর নয়,
কেউ ক্ষমতাবান নয়,কেউ প্রেমিক নয়,কেউ রাজনীতিবিদ নয়।
আর?আর কেউ রূপসীও নয়।
তারা শুধু তিনজন এখন কেবল লাশ। ধোঁয়া আর ধ্বংসের মাঝখানে নিথর পড়ে থাকা মৃতদেহ।চিরতরে স্থির হয়ে যাওয়া দেহ গুলোর এই স্থিরতা কেবল মৃত্যু নয়,এটি জীবনের নির্মমতার চূড়ান্ত প্রতিফলন।
পুরো হোটেল ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়েছে,হাতে লাল মেহেদী, পা আলতা আর গায়ে লাল শাড়ি জড়িয়ে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ শুভক্ষণের অপেক্ষারত মেয়েটাও বোধহয় চাপা পড়েছে, হয়তো বা বিস্ফোরণে ঝাঝড়া হয়েছে তার লাল শাড়ি,বা হতে পারে তার হাড়গুলো ভেঙে ছিন্নভিন্ন হয়ে লুটিয়ে আছে কোথাও।কে নেবে কার খোঁজ?এখানে সবাই লাশ,জীবন বাঁচানোর তাগিদে মৃত্যু থেকে দৌড়ে পালানো অসহায় জীব।এই ধ্বংসস্তূপেস্বপ্নের দাম নেই,শুভক্ষণের মূল্য নেই,ভালোবাসার কোনো অগ্রাধিকার নেই।
হোটেলের বাইরব থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে অনু,তিনজন পুলিশ জোড় জবরদস্তি ধরে রেখেছে তাকে,এতোক্ষণ ধরে ভেতরে যাওয়ার জন্য তড়পাতে থাকা আত্মাটা বিকল হয়ে পড়েছে,দ্বিতীয় বিস্ফোরণ টা শেষ করে দিয়েছে কিয়ানকে ফিরে পাওয়ার শেষ আশা টুকুও।
ইতিমধ্যে উদ্ধারকর্মী যতজন ভেতরে গিয়েছে বেঁচে ফিরতে পারে নি কেউ,দ্বিতীয় বিস্ফোরণে প্রাণ গিয়েছে অর্ধেকেরও বেশি কর্মীর।তাই এখন ভেতরে ঢুকতেও ভয় পাচ্ছে সবাই।
অনু হাত পা ভেঙে ধপ করে বসে পড়েছে মাটিতে,শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু শ্বাসফেলা মনে হচ্ছে ব্যর্থ।বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে,মনে হচ্ছে পায়ের তলা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত একটা অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ফেলেছে তাকে।
হাত দুটো অজান্তেই কাঁপছে।ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না,নিস্ক্রিয় মস্তিষ্ক টা এতোটাই আঘাত পেয়েছে যে ঠিকমতো মনেই করতে পারছে না কিয়ানের মুখটা,শেষবার, শেষবারের জন্য লোকটাকে কেমন দেখাচ্ছিলো তাও মনে করতে পারলো না সে।
বড্ড রাগ হলো,নিজের উপর বড্ড বেশি রাগে দু’হাতে খামচে ধরলো মাথার চুল,আফসোস আর আফসোস করে ভাবলো কেন সে চলে এলো?কেন আরও পাঁচটা মিনিট থেকে গেলো না,কেন মন ভরে দেখলো না ভালোবাসার মানুষ টাকে।
সামনের টং দোকানের বেঞ্চিতে আরামে বসে আছে ইভান,তার হাতে একটা টোস্ট বিস্কুট, সে নির্লিপ্তে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপে ডুবিয়ে দিলো বিস্কুট টা,তারপর তুলে মুখে দিয়ে শান্ত মুখভঙ্গিতে অনুভব করলো চায়ের উষ্ণতা ।
সামনের এই ধ্বংসলীলা ভীষণ স্বস্তি দিচ্ছে তাকে,শান্তিতে জুড়িয়ে এলো তার কলিজা।পৈশাচিক আনন্দে উল্লাস করলো তার ভেতরে লুকিয়ে রাখা পিচাশ স্বত্ত্বাটা,সে বিস্কুটের গায়ে পরবর্তী কামড় বসাতে বসাতে বিরবির করে বললো,
“টাটা গুড বাই স্যার।”
তারপর ‘চ’ সূচক শব্দ করে তাচ্ছিল্যের সুর তুলে বললো,
“এতো কিপ্টামি করে লাভ কি হলো স্যার?যাওয়ার সময় কিছুই তো নিয়ে যেতে পারলেন না।”
দোকান পাট সব খালি,সবার উত্তেজিত দৃষ্টি আপাতত বিস্ফোরণের স্থানে,ইভান যেই দোকানে বসে আছে সে দোকানীরও একই হাল,ইভানের ওমন অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি সে।
ইভানের পায়ের কাছে গোল হয়ে বসে আছে ন্যাক্সোরা,তার সামনেও এক কাপ ধোঁয়া উঠা চা,কিন্তু সাপ কি আর চা খায়?তাই ন্যাক্সোরাও খেলো না,ফনা তুলে তাকিয়ে রইলো ইভানের দিকে।
ইভান ন্যাক্সোরার দিকে তাকিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে খিটখিটে কন্ঠে বললো,
“তুই কি শুনছিস?খা খা, পেট ভরে খা।”
ইভান ন্যাক্সোরার মাথাটা মুঠোবন্দি করে চুবিয়ে ধরলো গরম চায়ের কাপে,মূলত ন্যাক্সোরার সেদিন অদ্ভুত আচরণ করার পেছনে ইভানেরই হাত ছিলো।ত্রিজয়ের সাথে থেকে সাপকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল ভালোই রপ্ত করে নিয়েছিলো সে,ত্রিজয়ই বিশ্বাস করে শিখিয়েছিলো তাকে।সেদিন ফুলমতিকে ভয় দেখানোর জন্য ত্রিজয় যখন ন্যাক্সোরাকে ডেকেছিলো তখন ন্যাক্সোরা ত্রিজয়ের ডাকে আসে নি বরং ন্যাক্সোরাকে নিজের কন্ট্রোলে এনে ইভানই পাঠিয়েছিলো ফুলমতির কাছে।
শুধু তাই নয় এই ইভানই সেই সহজ সরল ইমরান যাকে তার সব ভাইয়েরা বোকা এবং সহজ সরল ভাবতো।আর এই ভেবে ভেবেই কোন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হতো না তাকে,নাতো গুরুত্ব দেওয়া হতো তার মতামতের।
এই নিয়ে মনে মনে নিজের পরিবারের সবার প্রতি ভীষণ ক্ষেপেছিল ইমরান।মনে মনে ঠিক করলো বড় কিছু করে দেখাবে তাদের।সেদিন যখন গঞ্জ বাসি ব্রিটিশ মহলে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলো তখন ইমরান ছক কষে তার নিজ পরিকল্পনার,সে ফ্লোরেন্সাকে বাঁচানোর নাম করে সবার আগে যেতে চেয়েছিলো ব্রিটিশ মহলে,তারপর ফ্লোরেন্সা সমেত আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলো পুরো ব্রিটিশ মহিল।
কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তার মাথায় আসে অন্য পরিকল্পনা, সে ভাবে ব্রিটিশ মহলে নিশ্চয়ই অনেক সোনাদানা মোহর থাকবে, আর সে যদি আগুন লাগিয়ে দেয় তাহলে তো এতো সম্পদ সব আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে।তাই সে সীদ্ধান্ত নিলো আগুন লাগানোর আগে কিছু সম্পদ নিজের জন্য রেখে দিবে,যেন সে পরবর্তীতে ভাইদের চেয়ে নিজেকে বেশি ক্ষমতাভান প্রমাণ করতে পারে।
পরিকল্পনা মোতাবেক ব্রিটিশ মহলে ঢুকতেই ধরা পড়ে সে,প্রিন্স জোসেফের হাত থেকে বাঁচার জন্য বানায় মিথ্যা নাটক,বলে সে ফ্লোরেন্সার জন্য এসেছে।
তারপর মাঝরাস্তায় জোসেফের জিপগাড়ি থামিয়ে ইমরান যখন নাবহাকে বাঁচানোর বাহানা করে পুনরায় ফিরে এসেছিলো ইমরান,কিন্তু আসল উদ্দেশ্য নাবহা ছিলো না উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ দের সম্পদ।
সে রাতে শুধু নাবহাকেই বাঁচায় নি ইমরান, সাথে বাঁচিয়েছিলো রানী ক্যাথরিন কেও।রানি ক্যাথরিন আগুন থেকে বাঁচার বিনিময়ে ওয়াদা করেছিলো ইমরানকে,বলেছিলো ক্ষমতা আর অধিপত্য দিবে তাকে।ভেবেছিলো কিছুদিনের মধ্যে যদি রাজা হয় তাহলে একজন রানীরও তো প্রয়োজন পড়বে,ততদিন না হয় খোঁজার বদলে রেডিমেড সাজিয়ে রাখবে নাবহাকে।
ক্ষমতার লোভে মনুষ্যত্ব হারানো ইমরান যখন দেখলো ফ্লোরেন্সা ফিরে এসেছে,পরিবারের সকলে মিলে শুরু করেছে তার বিয়ের উৎসব।তখন সে বুঝে গেলো খুব শীঘ্রই সব হারাবে তার।তাকরিম জ্ঞানি গুনি ছেলে,পরিবারের সকলে এমনিতেই মান্য করে তাকে এখন যদি ফ্লোরেন্সার সাথে তার বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তো তার আর কোন দাম থাকবে না।
মনের মধ্যে এমন হাজারটা ভ্রান্ত ধারণা উদয় হতেই ইমরান আরও একটা জঘন্য পরিকল্পনা করলো।ঠিক করলো পুরো বিয়ে বাড়ি তৈরি করবে মৃত্যু পুরিতে।আর সেদিন প্ল্যান করে সেইই বিষ মিশিয়েছিলো খাবারে।
সেই বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে মেরে ফেললো রানী ক্যাথরিনকেও কারণ তার আর কোন প্রয়োজন ছিলো না।পুরো বিয়ে বাড়িকে শ্মশানে পরিনত করে বেঁচে রইলো শুধু ফুলমতি আর ইভান।
কিন্তু ফুলমতি সুফির মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলো না কিছুতেই।যেহেতু সে কালো যাদু জানে তাই সে ইভানকে মন্ত্র তন্ত্র করে সেই ক্ষনেই বলি চড়ালো,ইভানের মাথার বিনিময়ে বাঁচিয়ে নিলো সুফিকে।এতো কিছু করেও ক্ষমতা পেয়ে হাত ছাড়া হলো ইভানের, আর সেই ক্ষমতা পাওয়ার অপূর্ণ আক্ষেপ নিয়ে পূনর্জন্ম হলো তার।
জেসমিন বেগমের একমাত্র ছেলে সে।ছোট থাকতেই বাবা মারা গিয়েছে তার,জেসমিন বেগম দেশের ক্ষমতাধর এমপিকে ভালোবাসার জালে ফাসিয়ে বিয়ে করলেন,হত্যা করলেন তার প্রথম স্ত্রী অর্থাৎ তাকরিমের মাকে।শুধু সেখানেই থামলেন না,নিজেকে নিঃসন্তান যুবতি প্রমান করতে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিলেন তাকে।সেখানেই ত্রিজয় কুড়িয়ে নিয়ে নিজের ভাইয়ের মতো বড় করে তাকে, নাম দেয় ইমতিয়াজ আহমেদ ইভান।
কিন্তু কুকুরের লেজ কি আর সোজা হয়?ক্ষমতার লোভ আবারও ভর করে ইভানের মাথায়।যেখানে সে নিজের ভাইকেই ছাড়ে নি সেখানে পালিত ভাইয়ের এক পায়সাও দাম ছিলো না তার কাছে।টাকা পয়সা নিয়ে ত্রিজয়ের করা কৃপণতা চরম রাগাতো তাকে,ভেতর ভেতর পুষতো ত্রিজয়ের প্রতি চরম ক্ষোভ।
কথাগুলো ভেবেই বাঁকা হাসলো ইভান,তরল কন্ঠে বিরবির করে বললো,
“মন্ত্রি, মিনিস্টার, এমপি,উকিল, ডাক্তার সব শেষ।এখন শুধু আমার রাজ।এমপি ইমতিয়াজ আহমেদ ইভানের রাজ।”
“বলেছিলাম না?আগের জন্মে নীল রঙের মৃত্যু ছিলো আর এজন্মে হবে লাল রঙের মৃত্যু।মিললো তো?মিললো তো আমার কথা?”
ইভান পায়ের উপর পা তুলে চোখ বন্ধ করলো,দুই ঠোঁট গোল করে অবিকল সুর তৈরি করলো ত্রিজয়ের মতো,তারপর আবার আওড়াল,
“ক্ষমতা, আর ক্ষমতা। ক্ষমতা এখন আমার হাতের মুঠোয়।”
______
অপারেশন সাকসেসফুল।কিছুক্ষণ হলো ওটি থেকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে রেহানার মেয়ে সালমা কে।সদ্য জন্মানো শিশুর কান্নায় মুখরিত আকাশ বাতাস,গলা ফাটিয়ে কাঁদছে পুচকে ছেলেটা।রেহানা রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়েছে বাচ্চার কান্না থামাতে।
প্রায় কয়েক ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরেছে সালমার,চোখ খুলেই আগে দেখতে চেয়েছে নিজের সন্তানকে,
“আমার বাচ্চা কই মা?”
রেহানা হেসে দুইহাতে আলতো করে সালমার পাশে শুইয়ে দিলো ছোট্ট শিশুকে,খুশিতে গদগদ হয়ে বললো,
“এই যে মা,দেখ আমার নাতি কি সুন্দর দেখতে হইছে।
সালমা দূর্বল চোখে পাশ ফিরে তাকালো একনজর,তারপর কাঁপা হাত ছোট্ট বাবুর গালে বুলাতে বুলাতে মুগ্ধ কন্ঠে আওড়াল,
“মাশাল্লাহ মা,কি সুন্দর দুইখান নীল চোখ।”
বিধাতার কি নির্মম পরিহাস,একদিকে ধ্বংস হয় তো আরেকদিকে মৃত্যু।কি অদ্ভুত নিয়ম,মৃত্যু দিয়েই জন্ম নেয়,নতুন রুপে, নতুন পরিচয়ে।এই জন্মচক্র এভাবেই চলবে বাকি সাত জন্ম।চলতেই থাকবে।
সম্মোহনী সেই দু’খানা নীল চোখ,যার গভীরতা আকাশের মতো অজানা,সে ফিরবে বারবার,সে সত্যিই ফিরবে, আবারও করবে হিপনোটাইজ।
তার প্রতিটি দৃষ্টিতে জমে থাকবে পীড়া, প্রেম, ধ্বংসের মিশ্রণ।সে সম্মোহন করবে,হিপনোটাইজ এর জাদুতে জড়াবে আবার,হয়তো আমাকে, হয়তো তোমাকে, হয়তো বা তার নিষ্ঠুর প্রেয়সীকেও।
সমাপ্ত______
🚫আপনাদের মনে কিউরিসিটি রাখার জন্য গল্পটার শেষে এই ধাপটা লিখলাম।এটা মোটামুটি হ্যাপি এন্ডিংও বলা চলে।ওদের কিন্তু মিলন হয়েছে,শুধু হয়নি সংসার।আর তাকরিমের জন্য এটাই সেরা ছিলো, তার সাথে অন্যকাউকে দিলে মেনে নেওয়া যেত না।তার ভালোবাসা কেবল তার আলেকজান্দ্রার জন্যই সুন্দর।
নিরব পাঠিকারা এবার অন্তত গল্পটা সম্পর্কে কিছু বলুন।ভালো লাগলেও বলুন,খারাপ লাগলেও বলুন।
আর আমার রেগুলার পাঠকরা গল্পটা সম্পর্কে প্লিজ সবাই গল্পের গ্রুপ গুলোতে একটি করে রিভিউ দিয়ে সবার কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য হইরো।
এবার আসি যারা সিজন টু চেয়েছেন তাদের উত্তরে।
উত্তর হলো এটার এন্ডিং এখানেই শেষ।ফেসবুকে আর এই গল্প আসবে না।এখন আপনারা যদি চান আমি বাচ্চা ত্রিজয় এবং নিস্পার পূর্ণতা নিয়ে লিখতে পারি।অনুর মেয়ে থাকবে নিস্পা,আর ত্রিজয় থাকবে গরিবস পকেট মার বা এমন কিছু টাইপ যে হিপনোটাইজ করে লুটপাট করবে।
এখন মতামত আপনাদের আপনারা ভোট দিলে ই-বুক লিখবো নয়তো সেটাও লিখবো না।আরেকবারও আপনাদের মতামত চেয়েছিলাম আমি তখন অনেকে পরে আনতে বলেছেন তাই আর লিখি নি,যদি এখনও বলেন তাহলেও লিখবো না।আপনাদের মতামত আমার কাছে ভেলু করে।
আর দ্বিতীয়ত এক শ্রেণির পাঠকদের মনে হতে পারে গল্প নিয়ে ব্যাবসা করবো।যদি তাই ভাবেন তাহলে বলবো তাইই।নিজের মেধা ইনভেস্ট করে দু পয়সা ইনকাম করতে পারলে দোষ তো আর হবে না।এমন তো নয় গল্পটা শেষ না করেই ই-বুক লিখবো।গল্পটা কিন্তু আমি শেষ করেছি।তাই প্লিজ কটুক্তি শোনাবেন না। আমি নিতে পারি না,আর এই ভয়েই তিন বছর হতে চললো লেখালেখির আমি কোন ই-বুক বা বই কিচ্ছু আনি নি।
এবার বাকিটা আপনাদের মতামত।🚫

