#প্রিয়_নীলপদ্ম —২২.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
‘তোমার তো কোনো খবরই নেই নৌমি।এভাবে ভুলে গেছো আমায়?’
আয়রার অভিমানী কন্ঠে নড়েচড়ে বসে নৌমি।নিজের উপর কিঞ্চিৎ রাগ-ও হয়।আসলেই মেয়েটার খবর নেওয়া হয়না।নিবেই বা কিভাবে? ধ্যান-জ্ঞান সবটা জুড়ে তো ক্যাপ্টেন সাহেব।তাই নিজের হয়ে সাফাই গাইলো না।দোষ স্বীকার করে বলে,
‘আয়ু আই’ম স্যরিইই, আসলে…’
‘কিছু বলতে হবে না। আমি জানি তুমি এখন কার ধ্যানে বিভোর। নয়া নয়া প্রেম তো তাই এমন হয়।কারো প্রতি খেয়াল থাকে না,আমারও ছিলো না’
শেষ কথা বলতে বলতে হেঁসে ফেললো নিজে নিজে।কল্পনা করতে থাকে সামিদের সাথে প্রেমের সেই প্রথম দিনগুলোর কথা। যখন আশেপাশের সবকিছু ভুলে শুধু সামিদই ছিলো ওর কল্পনায়।নৌমি ঠোঁট চেপে নিঃশব্দে হাসলো।আয়রা মেয়েটা যে রাগ,অভিমান করে থাকতে পারে না তা ওর জানা।একটু ভালো করে কথা বললেই গলে যায়।নৌমি এবার বলে,
‘কেমন চলছে দিনকাল সামিদ ভাইয়ের বউ,ভাবিই?’
‘জ্বালাছো না?ওই খারুশ ব্যাটার নাম নিয়েই জ্বালাতে হবে?জানো তুমি উনি আমায় সারাক্ষণ বকে। কিছু বললেও বকে না বললেও।চুপ থাকলেও জ্বালা না বললেও।উফফ এই ব্যাটার সাথে প্রেম করে কিযে মসিবতে আছি আমি,খোদা!’
নৌমি শব্দ করে হেঁসে উঠলো।মেয়েটা এতো হাসাতে পারে!মন খারাপ ছিলো ওর,আয়রার কথায় নিমিষেই মন ভালো হয়ে গেলো।আয়রা ওদিকে ফুঁসে উঠলো।
‘তুমি হাসছো নৌমি?আমি এদিকে জ্বালায় জ্বালায় শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুমি হাসছো।হাসবেই তো! তোমার আর কি,ওমন সুইট জ্যান্টেলম্যান পেয়েছো তোমার প্রতি কতটা সফট!তাই তো অন্যের দুঃখ বোঝো না।’
‘সুইট জ্যান্টেল?ওই তূর্য?হাসালে আয়ু হাসালে।তোমার খারুশের জ্বালা তুমি বোঝো আর আমি বুঝি আমি জনের জ্বালা।’
‘তা দুলাব্রো কবে আসবে? কয়েকমাস তো হলো।কবে আসবে?’
‘জানি না।কথা হচ্ছে না প্রায় দেড় দিন।কি একটা প্রজেক্ট নিয়ে কাজে আছে একটু রেস্ট নেওয়ারও সময় পায় না।’
ওদের কথা চলতেই থাকলো।সময়ের খেয়াল আর রইলো না।তুলির ডাকে ফোন রাখলো নৌমি।পরিপাটি হয়ে নিচে নামলো।তূর্যকে কলে পাচ্ছে না গতকাল থেকে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলো খুব আয়রার সাথে কথা বলে যা একটু মন ভালো হলো। নিচে নেমে এসে দেখে তুলি বসে বসে টিভি দেখছে।নৌমি আসার শব্দ পেতেই ওকে কাছে ডাকলো।নৌমি হেঁসে ওর কাছে গিয়ে বসতেই তুলি ওর দিকে ঘুরে বসে,চিন্তিত কন্ঠে বলে,
‘হ্যা রে নৌমি?তূর্যের সাথে কথা হয়েছে তোর?ছেলেটার সাথে কথা বলতে পারছি না কাল থেকে। আজ রাতে আবার সপ্নে খারাপ জিনিস দেখেছি।মনটা ভালো লাগছে না,একটু দেখ তো ফোন দিয়ে!’
নৌমিরও যে মন বিশেষ ভালো তা নয়।সকাল থেকে ডান-চোখটা বেশি কাঁপছে।খারাপ কিছু কিংবা কান্না করার আগ মুহূর্তে ওর ডান-চোখটা বেশি লাফায়।যদিও এসব অনেকের মতে কুসংস্কার তবে মন না চাইতেও বিশ্বাস আসে এগুলোর প্রতি।তুলির কথায় আরো খারাপ লাগা শুরু করলো।তূর্য ঠিক আছে তো?মিহি স্বরে তুলিকে জানায়,
‘ফোন দিয়েছিলাম একটু আগেও রিসিভ হয়নি।’
‘আবার একটু দে মা’
‘ফোনটা ঘরে নিয়ে আসি তাহলে?’
বলে উঠে দাড়ায় ঘরের উদ্দেশ্য যাওয়ার জন্য। সিঁড়ির কাছে আসতেই মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম লাগা শুরু করলো।সামনের সবকিছু ঘোলাটে লাগছে।হাতের কাছে ধরার মতো কিছু না পেয়ে পরে গেলো মেঝেতে। কিছু পরার শব্দ হতেই তুলি মাথা তোলে।নৌমিকে সিঁড়ির কাছে পরে থাকতে দেখে আৎকে ওঠে।তরিগরি করে এগিয়ে আসতে আসতে নৌমি বলে চিৎকার করে ওঠে। তাসফি ঘরে ছিলো মায়ের চিৎকারে ঘর ছেড়ে বের হয়। বসার ঘরে আসতেই নৌমিকে মেঝেতে পরে থাকতে দেখে।তুলি অনর্গল নৌমিকে ডেকে যাচ্ছে। তাসফি দৌড়ে এসে নৌমির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে।
‘কি হয়েছে বউমণির?হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে কিভাবে?’
‘জানি না ফোন আনতে রুমে যেতে নিয়েছিলো হূট করে কি হলো বুঝতে পারছি না।তুই একটু ডাক্তারকে কল করবি?কর.. কর।’
তাসফি ওদের ফ্যামেলি ডক্টরকে কল করলো তারাতাড়ি বাড়ি আসার জন্য। বাড়ির দূরত্ব বেশি না তাই আসতেও সময় লাগবে না। তুলি ছুটে রান্না ঘর থেকে পানি নিয়ে আসে।চোখমুখে পানির ছিটে দিতে থাকে।অনবরত হাত,পা ঢলতে থাকে,গালে চাপড় দিয়ে ডাকতে থাকে।কিন্তু নৌমির হূশ ফেরে না।হাফসার পায়ে ব্যাথা তাই তিনি ঘরেই ছিলেন তাসফি,তুলির হাঁক-ডাকে তিনি ঘর ছেড়ে উপস্থিত হলেন বসার ঘরে।নৌমির অবস্থা দেখে উনি কেঁদেই ফেললেন। বড় শখের নাতবউয়ের হঠাৎ ওমন হওয়াটা তিনি মেনে নিতে পারছে না।সকলের অবস্থা যখন ভীতিকর এমন অবস্থায় আশার আলো হিসেবে ফ্যামেলি ডক্টরের ছেলে ইয়াসিন মির্জা আসলো।নৌমিকে নেওয়া হলো তাসফির ঘরে। কিছুক্ষণ ডক্টর ওকে চেক করে জানালো
‘ঘরে খুশি আসছে আপনাদের। মিসেস তূর্য মা হতে চলেছেন।’
কথাটা শোনা মাত্রই তাসফি লাফিয়ে উঠলো।হাফসা-তুলির মুখের চিন্তা সরে গিয়ে আনন্দ, খুশির ভাব ফুটে উঠলো।তাসফিকে ওমন করে লাফাতে দেখে ইয়াসিন কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলো খানিকক্ষণ। এতো বড় মেয়ে এভাবে লাফাচ্ছে?আশ্চর্য হলো ছেলেটা।তুলি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে ফ্রিজে মিষ্টি আছে।ওমন খুশির খবর শুনলো মিষ্টিমুখ না করালে হয়?ইয়াসিনকে জোর করে মিষ্টিমুখ করালো তারপর ছাড়লো।যাওয়ার আগে আরেকবার দেখে গেলো ঘুরে তাসফিকে।ফ্যামেলি ডক্টর ওর মা। তবে তিনি ব্যস্ত থাকায় সদ্য ডাক্তারি পাশ করা ওকেই আসতে হলো এ বাড়িতে। সবার সাথে চেনাজানা থাকলেও তাসফিকে আজই দেখলো তা-ও আবার ভিন্ন ভাবে!
__________
নৌমির যখন জ্ঞান ফিরলো তখন প্রায় দুপুর। পাশেই তাসফি বসে ফোন টিপছে হাফসা একটু দূরে জায়নামাজ বিছিয়ে কোরআন শরিফ পড়ছে।নৌমি নড়েচড়ে উঠতেই তাসফির মনোযোগ ওর দিকে ঘুরে। ধরে উঠায় নৌমিকে।শরীরে ভালোই ব্যাথা পেয়েছে ধরাম করে পড়ে যাওয়াতে।তবে তাসফির ঘরে নিজেকে দেখে অবাক হলো বেশ।
‘আমি এখানে কেন তাসু?’
‘তুমি এমন একটা কাজ করতে পারলে বউমণি?তুমি জানো এই কাজটা করাতে আমারা সবাই কতটা অবাক হয়েছি।ভাবতেই পারছি না এমনটা হবে।তান’দা জানলে কি করবে আমি জাস্ট সেটাই ভাবছি!’
নৌমির চোখমুখে চিন্তার ভাব ফুটে উঠলো।বুঝে উঠতে পারলো না কি করেছে ও?নৌমির চিন্তিত মুখ দেখে তাসফি ঠোঁট টিপে হাসে।হাফসাও কোরআন শরিফ বন্ধ করে ওদের দিকে ফিরে বসে।নৌমি বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
‘কি হয়েছে তাসু?আমি কি করেছি?’
‘তুমি কি-না করেছো তাই বলো!তুমি…আহ্ আম্মু ছাড়ো লাগছে’
তুলির কানমলা খেয়ে তাসফি চিৎকার করে ওঠে। তুলি দুধের গ্লাসটা টি-টেবিলে রেখে বলে,
‘জ্বালাচ্ছিস কেন তুই এভাবে?’
‘মজা করছিলাম একটু..তুমিও না!দিলে তো কানটা শেষ করে আমার। যদি কানটা ভেঙে যেতো?’
তাসফির নাটকীয় ভঙ্গিমায় সকলে হাসলো একটু।তুলি নৌমির পাশে বসে দুধের গ্লাস এগিয়ে দেয় ওর দিকে,
‘এতো খুশির খবর যে শুনতে পাবো তা ভাবিনি। এখন থেকে বেশি বেশী খাবি ঠিকআছে?শুধু তুমি নও এখন থেকে তোমার ভিতরে বেড়ে পঠা আরেকজনেরও যত্ন নিতে হবে,বুঝলে?’
প্রথমে তুলির কথা না বুঝলেও শেষের কথায় চমকে উঠলো।অজান্তেই হাতটা পেটের কাছে চলো এলো।শরীরটা কেঁপে উঠলো ওর।চোখের ইশারায় তুলির কাছে জানতে চায় আসলেই সত্যি? তুলি মাথা নাড়তেই নৌমি ঝাপিয়ে পরে তুলির বুকে। হুহু করে কেঁদে ওঠে। হঠাৎ কান্নায় তুলি একটু অবাক হলেও পরে নিজেকে সামলিয়ে নেয়।একটু হেঁসে পাগল মেয়েটার মাথায় হাত বুলায়।মা হওয়ার আনন্দের কান্না যে এটা তিনি তা বুঝতে পারলো।নিজেও তো কেঁদে ছিলো আরিফের বুকে মাথা রেখে যখন জানতে পেরেছিলো তূর্য পৃথিবীতে আসবে!
__________
নিজের ঘরে আসতে আসতে দুপুর পেরিয়ে গেলো নৌমির। তুলি তো চাইছিলোই না ওকে সিঁড়ি বাইতে দিতে।যদি পরে যায় একটু আগের মতো?তুলি বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘরে এসেছে।ওর আর তূর্যের তোলা ছবির সামনে দাড়িয়ে নিজের পেটে হাত রাখে।
‘এই যে ক্যাপ্টেন সাহেব জানেন আমার দুজন থেকে তিনজন হতে চলেছি।আচ্ছা আপনি যখন জানবেন তখন আপনার রিয়াকশন কেমন হবে?খুশি হবেন না?’
নৌমি তূর্যের ছবিটা নিজের মুখের সামনে আনে।চুমু খায় তূর্যের ছবির উপর।মুখভর্তি লাজ সমেত বললো,
‘আপনি আসবেন কবে?আপনার জন্য সুখ অপেক্ষা করছে।মিস ইউ!’
ক্রিং ক্রিং ফোনের শব্দে ছবিটা টি-টেবিলের উপর রেখে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। ফোন স্ক্রিনে তূর্যর নামটা দেখে মুখজুড়ে হাসি ফোটে। তরিগরি করে ফোনটা রিসিভ করতেই বলা শুরু করে,
‘এই যে লাটসাহেব। কি খবর আপনার, হু?কাল থেকে তো কোনো খবরই নেই আপনার।একটা কথা বলি?শুনলে আমি খুশিতে পাগল হয়ে যাবেন।কথা বলছেন না কেন?এই…হ্যালো!’
‘আমি তূর্য স্যার নই ম্যাডাম আমি সাজিদ বলছি।’
তূর্যের ফোন অপরিচিত পুরুষের হাতে দেখে কপালে ভাজ পরলো ওর।নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞেস করে,
‘আপনি…আপনি কে?তূর্য কোথায়?ওর ফোন আপনার কাছে কেন?’
‘ম্যাম আসলে আসলে’
‘কি আসলে আসলে করছেন?স্পর্শ ভাবে বলুন আপনার কাছে ওর ফোন কেনো?’
সাজিদ ঠোঁট ভিজিয়ে শক্ত হয়ে বলে,
‘ম্যাম আপনি নিজেকে শান্ত রাখুন। আমার কথাটা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।’
নৌমি শান্ত হতে পারলো না।অধৈর্য হয়ে পরলো।তূর্যের ফোন অন্যের হাতে,ওকে শক্ত হতে বলছে।মানে..মানে?তূর্য ঠিক আছে তো?চিন্তায় নৌমি ঠোঁট কামড়ে ধরলো।যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বলে,
‘কি হয়েছে তূর্যের?’
ওমন শান্ত স্বরে সাজিদ অবাক হলো কিঞ্চিৎ।জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বললো,
‘তূর্য স্যার যে গাড়ি করে বাহিরে বের হয়েছিলো।সেই গাড়িকে একটা… একটা দ্রুতগামী ট্রাক এসে ধাক্কা দেয়।গাড়িটা খাদে পড়ে যায়। আশংকা করা হচ্ছে তূর্য স্যার নে..নেই।’
‘নাআআ’
নৌমির চিৎকারে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠলো।সাজিদ ওদিকে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে তবে নৌমি কি সেসব শুনছে?নৌমির শরীরটা কেমন ছেড়ে দিচ্ছে সমস্ত ভার,শক্তিগুলো কেমন হাওয়ায় উড়ছে।তূর্য নেই… তূর্য নেই?সত্যি?নৌমি হাসফাসিয়ে উঠলো।গগনবিদারী চিৎকারে ফোনের ওপাশে থাকা সাজিদের কলজে মোচড় দিয়ে উঠলো।ও সইতে না পেরে কল কেটে দিলো।নৌমির কানের কাছে বাজছে তূর্যে বলা আদুরে কথাটা,
‘তোমার আমার সংসারের পথ পারি দেওয়া অনেক বাকি বউ।’
তূর্য যদি হারিয়ে যায় তাহলে এই কথাটা মিথ্যা হয়ে যাবে না?নৌমি ফুপিয়ে উঠলো।চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসলো ফের।জ্ঞান হারাবে বোধহয়।জ্ঞান হারানোর আগে চোখে ভেসে উঠলো তূর্যের মুখখানা।চোখ দিয়ে অনর্গল বইতে থাকা বারিপাতগুলো নৌমির কষ্ট হয়ে বের হলো।সম্পূর্ণ চোখজোড়া বোঝার আগে আওড়ালো গুটিকয়েক কথা,
‘আপনি হারাতে পারেন না তূর্য।আপনি বাবা হতে চলেছেন একথা বোধহয় আর জানানো হলো না আপনাকে!’
চলবে..?
[ঠিকঠাক রেসপন্স করছো না তো তাই ঠুসে দিলুম তূর্যকে— জাস্ট কিডিং।যাকগে কেমন হলো আজকের পর্ব?ওদের আর মাত্র একটি পর্বে পাবে তারপর…তারপর শেষ! হ্যাপি রিডিং]

