বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি #সূচনা_পর্ব (১ম অংশ)

0
67

“দেখতে আসলেই কি বিয়ে হয়ে যায়? ওরা এমনিতেই দেখে চলে যাবে।”

কিন্তু….কিন্তু….এই কথাটা বললেও সামান্য দেখতে আসা থেকেই পুনমের বিয়েটা হয়ে গেল। ওরা এমনি এমনি দেখেই চলে গেল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লেকচারার মানবটির দিকে একপলক তাকিয়েও চোখ নামিয়ে ফেললো। ইচ্ছা নেই লোকটাকে দেখার। দেখতে শুনতে ভদ্র হলেও আদোতে ভদ্র নাকি কে জানে? ভদ্র হলে তো একবার ওর মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করতো নাকি? ওর পরিবার-বাই কেমন? জানা নেই, চেনা নেই, পরিচয় নেই এমন একটা লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো। হয় নাকি সংসার ওভাবে? কিভাবে সম্ভব? পুতুলখেলা মনে হয়? ঘুম থেকে উঠলাম, রাঁধলাম, খেলাম, ঘুমিয়ে গেলাম– দিনশেষ! অতঃপর কাটিয়ে দিলাম জীবন। এইসব ভাবতেই যেন পুনমের চিনচিনিয়ে বুক ব্যথা করছে।

এইযে পুনমের পাশে পাথরের ন্যায় বসে থাকা নওশাদ বিন নাসির পুনমের বড়ভাই প্রতীকের কলিগের শ্যালক। সপ্তাহখানেক আগে ঘরে এই নাম নিয়েই একটু গুঞ্জন উঠেছিল। পুনাম শক্ত গলায় সাফসাফ জানিয়ে দেয় ও এখন পড়াশোনা শেষ না করে কিছুতেই বিয়ে করবে না, কিছুতেই করবে না। প্রতীক তাও ইতিউতি করে। ছেলেটা ভালো, ভদ্র, শিক্ষিত। প্রিতমও তাল মেলায়। এতো ভালো ছেলে হাতছাড়া করলে ভুল হবে। পুনম দুই ভাইয়ের সাথে পেরে উঠে না। শেষমেশ ওর আম্মু পাপিয়া বেগমকে বোঝায়। পাপিয়াও মেয়ের পক্ষে কথা বলে ছেলেদেরকে বোঝায়। পড়াশোনা করতে চাচ্ছে করুক না! যাকে বিয়ে দিবে সে-ই তো রাজি না। কি করার আর!

কিন্তু সমস্যা বাঁধে গত পরশু রাতে। পুনম বুধবারে ভার্সিটি থেকে ওর এক ছেলে বন্ধু তন্ময় আর ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সিরাতের সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলো। সিরাত মাঝখানো ওয়াশরুমে যায়। পুনম আর তন্ময় বসে তখন গল্প করছিলো এবং সেটাই দেখে প্রিতমের বন্ধু। প্রিতমের সেই বন্ধু তৎক্ষণাৎ প্রিতমকে জানিয়েছে এবং সেটা নিয়েই প্রিতম বুধবার রাতে বেশ ঝামেলা করেছে।

নেহাৎ-ই বন্ধু, অন্যকিছু নয়। পুনম বারবার বলেছে ছেলেটা শুধুমাত্র ওর ভার্সিটির বন্ধু, অন্যকিছু না, ওদের সাথে সিরাতও ছিল। কিন্তু কেউ-ই বিশ্বাস করলো না। উল্টো ফোঁড়ন কেটে প্রতীকের বউ নিশা বলে,

“যদি শুধু বন্ধু-ই হয় তাহলে তুমি বিয়ে করতে রাজি হচ্ছো না কেনো? বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলে তো কেউ আর সন্দেহ করবে না। বয়স বাইশ, কদিন পরে তেইশ হবে। এটাই তো একটা মেয়ের বিয়ের উপযুক্ত সময়। সম্পর্ক না থাকলে তো দ্বিমত করার কথা নয়।”

পুনমও তেজ দেখিয়ে বলেছে, “রাজি না হওয়ার কারণ হিসেবে আমার কারো সাথে সম্পর্ক আছে এমনটা ভাবার পিছনে যুক্তি আছে কোনো? একটা সাধারণ কথা বলেছি আমার এখন বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত নই। অন্তত অর্নাসটা শেষ করতে চাচ্ছি।”

পরিপেক্ষিতে প্রিতম রেগেমেগে যা ইচ্ছে বলেছে। পুনমের জন্য ওকে কথা শুনতে হয়েছে, এটা সেটা। পুনম উচ্চস্বরে নিজের হয়ে সাফাই গেয়ে প্রতিবাদ করার বিনিময়ে প্রিতমের হাতে থাপ্পড়ও খেয়েছে। প্রতীকের দিকে অশ্রুসিক্ত নজরে তাকিয়েও লাভ হয়নি। প্রতীক সেদিন রাতেই ওর কলিগের সাথে কথা বলে সবটা ঠিকঠাক করে ফেলে। অর্থাৎ, বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করে ফেলে। কিন্তু পুনমকে কিছু জানানো হয়নি।

আজ সকাল আনুমানিক নয়টার দিকে নিশা একটা লাল শাড়ি দিয়ে বলেছে তৈরী হয়ে নিতে। আজই ওর বিয়ে। পুনম স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল অনেকক্ষণ। পরিবারের লোকজনেরাই এতটা অবিশ্বাস করে? কখনো কি তারা দেখেছে ওর কোনো উশৃংখল আচরণ যে এমন করতে হবে? পুনম কেঁদেছে; অনেকটা সময় ধরে, হাউমাউ করে। রাগ সবার উপরই, এমনকি পাপিয়ার উপরও। ওর আম্মুও ওকে জানায়নি এটাই পুনম মানতে পারছে না। অথচ পুনম পাপিয়াকে নিজের বেস্টফ্রেন্ড মনে করে। সব কথা শেয়ার করে। উনি তো জানতো মেয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তাও ছোট ছেলের মিথ্যা অভিযোগ শুনে উনিও পাল্টি গেয়ে গেলেন কি করে! পুনম লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে। জেদের বশে আর টু শব্দ পর্যন্ত করেনি, নিজের হয়ে সাফাই গায় নি, কিচ্ছু বলেনি, কিচ্ছু না। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে–এই যে আজ এই বাড়ি থেকে বেরুবে, মরলেও ফিরবে না। কখনো না।

ভাবতে ভাবতেই পুনমের চোখে পানি চলে আসে। সন্তপর্ণে সকলের অলক্ষ্যে মুছেও নেয়। পুনম চোরা চোখে তাকিয়ে দেখে প্রিতম, প্রতীক দুজনে নওশাদ বিন নাসিরের দুলাভাইদের সাথে কথা বলছে। নওশাদের সাথে ওর মেজো আর সেজো বোন, চার দুলাভাই, বড় বোনের ছেলে আরিফ এসেছে। খুবই ঘরোয়াভাবে বিয়েটা হয়েছে। পুনম এমন বিয়ে চায়নি। সবসময় একটা জমজমাট বিয়ে চেয়েছিলো।

পুনমের এখন হুট করেই এই নওশাদ বিন নাসিরের উপর রাগ হচ্ছে। ওর বিয়েতে মত আছে কিনা লোকটা একবারও জানতে চেয়েছে? চায়নি। পুনমের একটা মায়াভরা, সুন্দর সংসার, সুন্দর দাম্পত্যের স্বপ্ন ছিল। সবাই মিলে সবটা ধ্বংস করে দিলো। একদম ধূলিসাৎ করে দিলো। এই নওশাদের পরিবারে কয়জন সদস্য পুনম জানে না। নওশাদের গলার স্বর কেমন পুনম তাও জানে না। নওশাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন পুনম জানে না। নওশাদ পুরুষ মানুষ হিসেবে কেমন পুনম জানে না। শুধু জানে অদ্বিতীয়া মাহনূর পুনমের স্বামী নওশাদ বিন নাসির। যার সাথে ভালো, মন্দ যাই হোক না কেনো পুনমকে সারাজীবন থাকতে হবে। কারণ ও আর এখানে আসবে না। যদি জীবনে এমন পরিস্থিতি উপস্থিত হয় পুনমকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঠকে গিয়ে ভাইদের আশ্রয়ে আসতে হতে পারে, তাহলে তার আগেই পুনম ফাঁস দিবে। তবুও এখানে ফিরবে না।

বিকালের আগে আগেই পুনমকে বিদায় জানানো হলো। সকলে ঢংয়ের কাঁদা কেঁদেছে। পুনমকে জড়িয়ে ধরে পাপিয়ার সে কান্না! পুনম টু শব্দও করেনি। মেয়েকে অবিশ্বাস করে তার মতের তোয়াক্কা না করে জোর করে বিয়ে দিতে পারলে বিদায়ের সময় তো ওভাবে ঢংয়ের কান্না না কাঁদলেই হয়। প্রতীক বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে কেবল শান্ত গলায় বলে,

“ভাইয়া যা করেছি তোর ভালোর জন্য করেছি।”

পুনম মনে মনে ব্যঙ্গ করে। কারো সাথেই কোনোরকম বাক্য বিনিময় করে না। সব ঢংয়ের কথা। নিজেদের মতো থাকার জন্য ওকে ইচ্ছে করে ঘর থেকে সরিয়েছে। প্রিতম তো বানোয়াট কাহিনি বলে অযথা ঝামেলা বাড়িয়ে ওকে বাড়ি থেকে বিদায় করলো যাতে ওর প্রেমিকাকে ঘরে তুলতে পারে। ওই মেয়ে তো বলেছেই বোনকে বিয়ে দিয়ে বিদায় না করলে ও প্রিতমকে এখন বিয়ে করবে না। ননদের হ্যাপা ওই মেয়ে সামলাতে পারবে না তাই প্রিতম এই কাজ করেছে। পুনম কি জানে না নাকি? সবই জানে। সবই ছলাকলা।

____________________

নওশাদ বিন নাসির বাবা মায়ের ষষ্ঠ তথা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। পাঁচ মেয়ের পর অবশেষে প্রাপ্ত মানিক। নওশাদের আব্বু নওশাদের আট বছর বয়স থাকতেই মারা গিয়েছে। নওশাদের আম্মু হোসনেআরাও গত হয়েছেন বছরখানেকের বেশি হবে। তাই বড় বোন হাসনাহেনা ভালো একটা পরিবারের মেয়েকে নওশাদের বউ হিসেবে আনতে চেয়েছে। বোনেদের সংসার আছে। ভাইয়েরও তো গতি করা দরকার। বয়স তো কম না। একা থাকবে, তা তো হয় না। প্রায় একবছর ধরে অনেক মেয়ে দেখেছে। কোনটাই মনমতো হয় না। ওরা নওশাদের জন্য বিশ্ব সুন্দরী চায়নি। চেয়েছে নম্র, ভদ্র পরিবারের মেয়ে যে ওনার ছোট ভাইকে আদরে, যত্নে রাখবে। প্রকৃত স্ত্রীর মতো সাথে থাকবে, সুখ-দঃখের সাথী হিসেবে। পুনমকে দেখে পাঁচ বোনের তেমন ধাঁচের মেয়েই মনে হয়েছে।

হাসনাহেনা নওশাদের চেয়ে বয়সে সতেরো বছরের বড়। একেএকে বেলী, বকুল, জবা, জুঁই তারপর নওশাদ। জুঁইয়ের স্বামী তারেকের কলিগ প্রতীক। তারেক শ্যালকের জন্য মেয়ে দেখছিলো, প্রতীকও পাপিয়ার কথামতো ভালো একটা ছেলের খোঁজ করছিল, কেননা বিয়ে দিবো বললেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। দেখতে শুনতেও তো বছর দু-তিনেক পার হয়ে যায়। এভাবেই একে একে মিলে হয়ে গেল দুই।

নওশাদ বউ নিয়ে এসেছে সন্ধ্যার দিকে। এখন সময়টা সাড়ে আটটার মতো। পুনম বিয়ের শাড়ি পাল্টে লাল রঙের সুতি শাড়ি ওড়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে পুতুলের মতো বসে আছে। পুনমকে ঘিরে ওর ভাগ্নিরা বসা। পুনমের সমবয়সী বকুলের ছোট মেয়ে রুমঝুম কড় গুণে গুণে বলছে,

“আমার বড় খালামণি মানে তোমার হাসনাহেনা আপার মেয়ে হলো ইসরাত আপু। আপু তোমার থেকে তিন বছরের বড়। আর আরিফ ভাইয়া হলো মামার চাইতে দু বছরের ছোট। সেই হিসেবে তোমার চেয়ে ছয় বছরের বড়।”

পুনম ইসরাতের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। রুমঝুম নিজের মতো বলতে লাগলো,

“বেলী খালামণি মানে তোমার বেলী আপার তিন ছেলে। মাহতাব ভাইয়া তোমার বড়। মাহাদী তোমার সমবয়সী আর মুমিন তোমার ছোট। আমার আম্মু মানে তোমার বকুল আপার বড় মেয়ে হলো রিমি আপু। আপু তোমার চেয়ে দু’বছরের বড়, আর ওনার ছোট মেয়ে হলাম আমি রুমঝুম। তুমি আর আমি সমবয়সী। জবা খালামণি মানে তোমার জবা আপার দুটো জমজ মেয়ে। জেরিন, জাইমা। ওরা তোমার চাইতে দু বছরের ছোট। মানে ভার্সিটির প্রথম বর্ষে পড়ে। ওদের ভাই হলো জিসান, এসএসসি দিবে এইবার। জুঁই খালামণির দুটো ছেলে, এক মেয়ে। তাহিয়া ইন্টারে পড়ে, ছেলেদের মধ্যে বড়জন তিহান ক্লাস সিক্সে পড়ে, আরেকজন তুহিন ক্লাস ফোরে পড়ে।”

ইসরাত পুনমের মুখ ভালো করে দেখে বলে, “কিছু মনে আছে আদো তোমার?”

পুনম দুদিকে মাথা নাড়ায়। রিমি হেসে বলে, “প্যারা নিও না। এতগুলো ভাগিনা, ভাগ্নি তোমার! দেখতে দেখতেই চিনে যাবে। নাম মুখস্থ করতে হবে না।”

রুমঝুম বাবু হয়ে বসে বলে, “এত কষ্ট করে সব বললাম, অন্তত আম্মু, খালামণির নাম মুখস্থ রাখো?”

পুনম মাথা কাত করে। জাইমা গালে হাত দিয়ে বলে,

“তুমি কি ইন্ট্রোভার্ট নাকি লজ্জা পাচ্ছো আমাদেরকে দেখে?”

পুনম জবাব দেয় না। জাইমা গালে হাত দিয়ে রেখেই বলে,

“আমি শুধু ভাবছি তুমি যদি সত্যি সত্যিই ইন্ট্রোভার্ট হয়ে থাকো তাহলে দুই ইন্ট্রোভার্টের সংসার ঠিক কেমন হবে?”

রিমি কপাল কুচকে বলে, “আনইজি ফিল করো না প্লিজ। আমরাই তো। হতে পারে ভাগ্নিরা তোমার চেয়ে বয়সে বড়, তবে তোমার ভাগ্নিরা খুব ভালো। অন্যান্য ভাগ্নিদের মতো কুটনামি কেউ করবে না।”

রুমঝুম রিমির কানে কানে বলে, “কুটনামি করলে মামা চড় মেরে সোজা করে দিবে।”

রিমি রুমঝুমকে চোখ রাঙালো। ইসরাত মজা করে বলে, “আমরা বউটা ভালোই পেয়েছি তাহলে! কথাবার্তা কম বলে, মুখ বুজে থাকবে। ছেলের জন্য তো এমন বউই খুঁজেছিলাম।”

জাইমা পাশ থেকে গলার স্বর মোটা করে বলে,

“আমরা তোমার শ্বাশুড়ি কিন্তু মাহনূর। মান্যগোন্য করবে, আমরাও তোমাকে ভালোবাসবো। তা কি যেন বলছিলে?”

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “ফুলের নামগুলোই কি আপাদের ভালো নাম?” পুনমের ক্ষীণ কণ্ঠ।

“জ্বি।” ইসরাত বলে।

“একটা কথা বলি?”

“পারমিশন নিচ্ছো কেনো? বলে ফেলো! আসল শ্বাশুড়ি ভাবছো নাকি? আমাদের তোমার শ্বাশুড়ির মতো শেষ বছরে ছেলে জন্ম দেওয়ার মতো এনার্জি নেই।” জাইমা বলে।

ইসরাত এমন কথা বলায় ধমকে উঠে। জাইমা মুখ কুচকে ফেলে। রুমঝুম পুনমকে বলে, “তুমি বলো!”

পুনম সবার মুখ দেখে বলে, “ছোটজনের নামটা শিমুল বা শাপলা রাখলেই তো পারতো!”

ইসরাত সরু চোখে তাকিয়ে বলে, “মামার কথা বলছো?”

পুনম মাথা ঝাঁকায়। জেরিন মুখটা কেমন করে বলে,

“শেষ বয়সের লাঠি, বংশের বাতির একটা জম্পেশ নাম রেখেছে। অবশ্য আম্মুদেরটাও খারাপ না। তবে মামার নাম শিমুল হলে পারফেক্ট হতো। পাঁচ বোন চম্পা, আমি এক আদরের নিরামিষ ভাই শিমুল।”

জাইমা হাসতে হাসতে বলে, “শেষ বয়সের বাচ্চার নাম শাপলা হলেই ভালো হতো। জাতীয় ফুল শাপলা।”

ইসরাত চাপা স্বরে ধমক দিয়ে বলে, “জেরিন! জাইমা! এভাবে বলতে নিষেধ করেছি না একবার? নানিকে নিয়ে, মামাকে নিয়ে এইসব কি কথা!”

জাইমা কপাল কুচকে বলে, “ধূরর! তোমাকে মাঝেমাঝে আমার মামার মতো লাগে। নানি তো ছেলের আশা করতে করতেই পাঁচ মেয়ে জন্ম দিয়েছে নাকি?”

“দিলেও তোর কি? এভাবে বলবি না। ভালো দেখায় না।”

“এই টোনে কথা বলাটা মামা ছাড়া আর কাউকে মানায় না।”

রিমি বলে, “মামার সাথে ফাজলামো করো না মামি। সাবধান!”

রুমঝুম বলে, “মামা একটা সাংঘাতিক মানুষ। আমরা সবাই, ইভেন আরিফ ভাইয়া পর্যন্ত মামার হাতে চড় খেয়েছে। মামাকে দেখলে মনে হতে পারে খুব ঠান্ডা, শীতল কিন্তু তুমিও যদি এমন ভেবো থাকো তাহলে জীবনের চরম বোকামি করবে। মামা ভীষণ রাগী, ভীষণ গরম একটা মানুষ।”

জেরিন তাল মিলিয়ে বলে, “কথায় আছে না মামারবাড়ি রসের হাঁড়ি? আমাদের জন্য হলো ‘মামারবাড়ি, মামার হাতের চড়ের বারি।’ একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই কান বরাবর একটা চড়। তোমাদের বিয়ে তো এমনি কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া হয়েছে। গান বাজনা বাদ দিলাম। ইসরাত আপুর হলুদে বড় খালু কিছু বলেনি, কিন্তু মামা রাত সাড়ে এগারোটার পর আর গান চালাতে দেয়নি। এটা কোনো কথা?”

ইসরাত হামি দিয়ে বলে, “ভালোই হয়েছে। আমার ঘুম পাচ্ছিলো অনেক। মামা ভাগ্যিস সাউন্ড বক্স বন্ধ করেছে নইলে আমি স্টেজেই ঘুমিয়ে যেতাম।”

জাইমা বলে, “তুমি আর আরিফ ভাইয়া হুবাহু মামার মতো। এমন রসকষহীন হলে চলে? দুলাভাই থাকে কিভাবে তোমার সাথে?”

“জিজ্ঞাসা করে আয় কিভাবে থাকে।”

রুমঝুম বলে, “জানো মামি মামা আজকেও তুহিনকে চড় মেরেছে।”

পুনম চোখ বড় করে বলে, “আজকে?”

জেরিন মাথা দুলিয়ে বলে, “তুহিন তো সবার ছোট আমাদের। তুহিন সম্ভবত তিহানকে ফা*ক বলেছে। সেটা আবার মামা শুনেছে। ওটা শুনেই মামা তুহিনকে ঠাটিয়ে একটা চড় মেরেছে।”

ইসরাত বলে, “ঠিক কাজ করেছে। ক্লাস ফোরে পড়ে সবে, নাক টিপলে দুধ বের হবে, এখনই গালিগালাজ দেয়। থাপ্পড় দিবে না তো কি করবে?”

সবাই আবারও কপাল কুচকে ফেললো। ইসরাত ওর বেণী ঠিকঠাক করে বলে, “আচ্ছা তোরা কন্টিনিউ কর।”

জাইমা হেসে বলে, “ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে বর বেশে, বিয়ের পাঞ্জাবি পড়ে চড়টা মেরেই গাড়িতে উঠেছে।”

জবা তখন রুমে আসে। একজোট হয়ে গল্প করতে দেখে প্রশ্ন করে, “কি নিয়ে কথা হচ্ছে?”

“তোমাদের ভাইয়ের মেজাজ নিয়ে। মামিকে আগে থেকেই সর্তক করছে যাতে একটু সাবধানে মামার সাথে কথা বলে। মামার বেশ ভালোই বদনাম করছে ওরা।” ইসরাত বলে।

জবা মুখ কুচকে বলে, “ওকে এইসব বলছিস কেনো? মেয়েটা নতুন, বাবুর সাথে দুটো কথা হলো না এখনও! এর আগেই ভয় ঢুকাচ্ছিস কেনো?”

“ধরো আম্মু মামা যদি মামিকেও থাপ্পড় মারে?” জারিন বলে।

“কি বলিস এগুলো! বাবু পুনমকে মারবে কেনো? বউকে মারার মতো ছেলে ও?”

“তুমি তোমাদের ভাইকে বিশ্বাস করো খালামণি? আমি, আমরা কেউ করিনা। বলা নেই, কওয়া নেই, কি থেকে কি? মাইর খেয়ে বসলাম। এটা কেমন কথা? আমাদের মধ্যে সবাই মামার হাতের স্পেশাল থাপ্পড় খেয়েছি।”

“তোরা দোষ করিস বলেই চড় খাস। বাবু মেজাজি ঠিক আছে, বাবুর মাথা গরম হতে পারে, তবে ও বদমেজাজি না। ও কারণ ছাড়া কিচ্ছু করে না। ওর সামনে অযথা শয়তানি করিস কেনো? তোদের তো দু-তিনবার ওয়ার্নিং দেওয়া হয়, তারপর সিধে না হলে চড় দিবে না তো কি করবে? ও যা যা অপছন্দ করে তাই তাই করতে হয় তোদের না?”

ইসরাত তাল মিলিয়ে বলে, “সেটাই! মামা বাসার বাইরে গেলেই তো করতে পারে। মামা বাসায় থাকাকালীন লুকিয়ে আকাম করে পরে ধরা খেয়ে মাইর খায়।”

“মামা বেশি নিরামিষ। তাই এমন করে। তুমিও ওমন নিরামিষ। দুলাভাইয়ের মনের অবস্থা কেমন জানো?” জেরিন বলে।

“কেমন?” ইসরাত সরু চোখে তাকিয়ে বলে।

“আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাইহাও করিতে পারিনা চিৎকার।”

ইসরাত জেরিনের মাথায় একটা গাট্টা মারে। এদের কাহিনী দেখে পুনমের মাথা ঘোরাচ্ছে রীতিমতো। জবা তাড়া দিয়ে বলে,

“আয় খেতে আয়। পুনম তুমিও আসো।”

ইসরাত বিছানা থেকে নেমে বলে, “আরিফ ভাইয়া, মাহতাব ওরা কোথায়?”

“ঘর সাজায়।”

জেরিন হেসে বলে, “নানি সেই একটা কাজ করেছে আম্মু। আমরা ভাগিনা, ভাগ্নিরা তাই মামার বিয়ে খেতে পারছি, বাসর সাজাতে পারছি।”

জবা চোখ রাঙিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পুনমকে ডাইনিং টেবিলে নেওয়া হলো। নওশাদ আগে থেকেই বসে ছিল টেবিলে। পুনমকে ওর পাশে বসানো হলো। সবাই সুবোধ বালক, বালিকা হয়ে রইলো। এতক্ষণ লুকিয়ে, পিঠ পিছে এত যে বদনাম করা হচ্ছিলো তা বোঝার উপায় নেই। জুঁই খাবার শুরু আগেই শর্ত দিয়েছে নওশাদ বা পুনম কেউই নিজের হাতে খেতে পারবে না। পুনম নওশাদকে খাইয়ে দিবে, নওশাদ পুনমকে। নওশাদের মুখে হালকা বিরক্তির ছাপ। তবে অগ্রাহ্য করলো না। পুনমও একরাশ সংকোচ নিয়ে নওশাদকে দু’লোকমা খাইয়ে দিলো। তারপর যে যার মতো নিজের হাতেই খেলো।

খাওয়া শেষ হতেই জেরিন আমতা আমতা করে বলে,

“মামা একটা ছবি তুলবো।”

“তোল।” নওশাদ হাতের ঘড়ি খুলে বলে।

“বলছিলাম কি তোমাদের দুজনের একটা ছবি তুলবো।”

“তোল।” ভ্রু কুচকে বলে।

“মামির আরেকটু পাশে গিয়ে বসো।” জাইমা বলে।

নওশাদ বিনাবাক্য ব্যয়ে পুনমের দিকে একটু চেপে বসে। ইসরাত বলে,

“মামির কাঁধে একটু হাত রাখো।”

নওশাদের ভ্রু আরো কুচকে গেল। জেরিন আমতাআমতা করে বলে, “ছবিটা ভালো উঠতো তাহলে।”

নওশাদ বাম হাত আলতো করে পুনমের বা কাঁধে রাখে। এতে পুনমের ডান বাহু নওশাদের বুকের সাথে লেগে যায়। পুনম শক্ত হয়ে যায় যেন। মাথা নত করে ফেলে। আতরের মারাত্মক সুঘ্রাণ নাকে লাগে।

চলমান….

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি
#সূচনা_পর্ব (১ম অংশ)
#সমৃদ্ধি_রিধী

(২য় অংশ রাতে দিবো।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here