#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩৫(ক)
#সমৃদ্ধি_রিধী
সময় খুব তাড়াতাড়িই চলে যায়। চোখের পলকে পাঁচ বছরের মতো সময় চলে গিয়েছে। সবাই সবার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সম্পর্ক বলদেছে, বয়স বেড়েছে। মনিং শিফটের ছুটি হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। পুনম, প্রথার হাত ধরে অফিসরুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদ সামনেই একটা মেয়েকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে। প্রথা বেশ বিরক্ত করছে পুনমকে। হাত ছাড়াতে চাচ্ছে, উদ্দেশ্য এক ছুটে নওশাদের কাছে চলে যাওয়ার। কিন্তু পুনম হাতই ছাড়ছে না। ছোট্ট মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে আছে।
প্রথা? নওশাদ, পুনমের চার বছর নয়মাস বয়সী মেয়ে। মেয়ের পুরো নাম ‘আশনূহা মাহরীন প্রথা’। নামটা নওশাদই পুনমের নামে সাথে মিলিয়ে রেখেছে। পুনম চেয়েছিল নওশাদের সাথে মিলিয়ে একটা হলেও নাম রাখতে। কিন্তু নওশাদের কথা হলো মেয়েকে নয়মাস পেটে ধরে কষ্ট করেছে পুনম আর নাম মিলিয়ে রাখবে নিজের সাথে? এতটাও খারাপ নওশাদ নয়। তবে সার্টিফিকেটের নাম পুনমের সাথে মিলিয়ে রাখলেও নওশাদ যে মেয়েকে কত নামে ডাকে তার হিসেব নেই।
কখনো ডাক দেয় “আমার ইন্দুবালা কই রে?” মেয়েও বুকে হাত দিয়ে দুধের দাঁত বের করে হেসে বলে,
“এইতো এখানে।”
আবার ডাক দেয়। “আমার চাঁদ কই রে?” মেয়ে আবারও হেসে ডাক “এইযে আমি।”
“আমার আম্মা কই রে?”
নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে বলে “এইযে?”
নওশাদ মেয়ের গালে গাল ঘষে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে ব্যথা পেয়ে মেয়ে মুখ কুচকে ফেলে। নওশাদ মেয়ের হাত চেপে ধরে চুমু খায়। প্রথাও নওশাদের গালে চুমু খায়। পুনমের এইসব দেখলে গা জ্বলে যায়। বিয়ের প্রথম পাঁচ মাস নওশাদের কাছ থেকে অনেক দাম পেয়ে গিয়েছিল। এখন আর নিজেকে এদের দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
টানাটানিতে বিরক্ত হয়ে পুনম প্রথার হাত ছেড়ে দিলো। প্রথা এক দৌঁড় দিয়ে এক ছুটে নওশাদের কাছে চলে যায়। নওশাদের পা জড়িয়ে ধরে। নওশাদ ওদেরকে আগেই দেখেছিল, প্রথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মেয়েটিকে পড়া বুঝিয়ে দিলো। প্রথা একবার পায়ে ঝুলে, আরেকবার নওশাদের চারদিকে ঘুরে, আরেকবার পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। নওশাদকে যতভাবে বিরক্ত করা যায় সব করে। কিন্তু নওশাদ বিরক্ত বোধ করে না। এই অবস্থা যদি ভাগ্নিরা দেখতো তাহলে পুনমের কাছে এসে চিৎকার করে বলতো,
“তোমার স্বামী যে নিজের মেয়েকে কিছু বলে না? আমরা হলে তো আমাদেরকে ঠাসঠাস করে দিতো কানের গোড়ায়।”
বলতো না কথাটা ভুল। ওরা বলেও। পুনম তখন শুধু হাসে। তিনবছর আগেও ওদের এইসব শুনতে বিরক্ত লাগতো। তবে মজাই পায় এখন। জেরিন, জাইমার সংসার হয়েছে। আগের মতো ওভাবে কথা হয় না, তবে যখনই কথা হয় তখন ঘন্টা পার হয়ে যায়। জেরিনের ছেলে হয়েছে ছয়মাস হবে। বাচ্চা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। জাইমার বিয়ের হয়েছে একবছর হবে। পুনম জেরিন, জাইমার সাথে কাটানো সময়গুলোকে এখন বড্ড মিস করে। ওদের সাথে কাটানো মজার মুহুর্তগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও কাজের ফাঁকেই হেসে উঠে। বিয়ের আড়াই বছরের মাথায় রিমির ছেলে হয়েছে। মাহতাবের বিয়ে হয়েছে বছর গড়িয়েছে, মাহাদী একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, মুমিন মাস্টার্স দিচ্ছে। তাহিয়া অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষে। তিহান ইন্টারে আর তুহিন নাইনে।
আরিফ রুমঝুমের একটা দারুণ সংসার হয়েছে। দুজনের যত বাচ্চামো ছিল তা আর নেই বললেই চলে। খুব বুঝদার বাবা মা হয়েছে তারা। ছেলেকে সবসময় আগলে রাখে। আরাফাত থাকা সত্ত্বেও আরিফের প্রথার প্রতি দারুণ একটা দুর্বলতা আছে। তার কারণ মেহা। প্রথার যখন দশ মাস বয়স তখন আরিফ, রুমঝুমের মেয়ে হয়। আরিফ আগে থেকেই ভালো নাম ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু কখনোই মেহা বলে ডাকতো না। আরিফ তো রুমঝুমির সাথে মিলিয়ে ঝুমঝুমি ডাকতো। তবে মেহার জন্ম থেকেই কিছু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। চারমাসে পড়ার পর একদিন প্রচণ্ড জ্বর আসে। সেই জ্বরেই শ্বাসকষ্ট উঠে বাবা, মাকে ফাঁকি দিয়ে জান্নাতের ফুল হয়ে যায়, কিছু বুঝে উঠার আগেই।
আরিফ, রুমঝুম কেউই এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। মেহার যখন শ্বাস কষ্ট উঠেছিল তখন ও আরিফের কোলে ছিল। রুমঝুমকে ডাকলো, মাহতাবকে কল দিলো। রুমঝুম মেহাকে বুকে নিতেই মেহা একদম চুপ যায়। হাসপাতালে নিতে নিতে আর বাঁচানো যায়নি। একমাত্র আরিফ, রুমঝুমই জানে ওরা কি সময় পার করেছে, একে অপরকে কিভাবে সামলেছে। রুমঝুম মা, সন্তান হারিয়েছে। আরিফ রুমঝুমকে সামলাতো কিন্তু মেহার জামাকাপড়, খেলনা, ফিডার ধরে আরিফ রাতের আঁধারে কত যে কেঁদেছে!
তার একমাস পরেই আলামীন রাস্তায় স্ট্রোক করে ওখানেই মারা যায়। যে আরিফ নিজের প্রোফেশনাল লাইফ ছাড়া আর কিছু নিয়েই সিরিয়াস ছিল না, সে একদম পাথর হয়ে গিয়েছিল। রিজাইন নিয়ে ফেলে। আলামীনের ব্যবসার হাল ধরে। দুই, তিনমাসের ব্যবধানে আরিফের জীবনের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। আরিফ যখনই প্রথাকে দেখতো তখনই ওর মেহার কথা মনে পড়তো। রুমঝুমেরও তাই। এখন আরাফাতের বয়স প্রায় দুই বছর। মাঝের দেড় বছরের মতো যে সময় ওরা পার করেছে তা ওরা কখনোই ভুলবে না। আরাফাত হওয়ার পর ক্ষত কমেছে ঠিকই তবে মুছে যায়নি।
পুনম বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটি চলে যেতেই নওশাদ প্রথাকে কোলে নিয়ে অফিস রুমের ভিতর চলে যায়। পাঁচ মিনিটের মাথায় ফিরে আসে। পুনমকে জিজ্ঞাসা করে,
“রাস্তায় কোনো সমস্যা হয়েছিল?”
“না।”
পুনম, প্রথা দুদিন আগে শনি আখড়া গিয়েছিল। প্রথার নানুবাড়ি খুব ভালো লাগে। ওখানে অর্কর সাথে ওর দারণ ভাব। আজ ওখান থেকেই সোজা নওশাদের কলেজে এসেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নওশাদ প্রথার গাল টিপে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“আমার টিয়া পাখি নানুবাড়িতে কেমন মজা করেছে?”
দুহাত প্রসারিত করে বলে, “অনেক মজা করেছি। বড় মামা চিপস, চকলেট দিয়েছে। অর্ক ভাইয়ার সাথে খেলা করেছি। ছোট মামার সাথে ঘুরতে গিয়েছি।”
নওশাদ আবারও প্রথার গাল টিপে দেয়। প্রথা নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে বিচার দেয়,
“কিন্তু আমাকে মা বকা দিয়েছে।”
“কেনো বকা দিয়েছে?”
“আমি সোফার উপর উঠে অর্ক ভাইয়ার মতো লাফ দিচ্ছিলাম, তাই বকা দিয়েছে।”
নওশাদ মেয়েকে বুঝিয়ে বলে, “সোফার উপর থেকে লাফ দিতে হয় না আম্মা। ব্যথা পেলে কি হতো?”
“ব্যথা পেতাম?”
“হুম। কখনো এভাবে লাফ দিবে না। ঠিক আছে?”
প্রথা মাথা নাড়িয়ে বলে, “আমি এখানে আসার পর তোমার কাছে আসতে চেয়েছিলাম মা দেয়নি। হাত ধরে রেখেছিল।”
পুনম চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বাপকে সামনে পেলেই বিচার দেওয়া শুরু হয়৷ নওশাদ প্রথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“সেইজন্য কি তুমি রাগ করেছো?”
প্রথা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, “না। রাগ করিনি।”
নওশাদ প্রথার মাথায় চুমু দিয়ে বলে, “আমার লক্ষ্মী মেয়ে।”
“বাবা আমরা ঘুরতে যাবো না?”
“যাবো তো। আজকে বিকালে আমরা বড় ফুপ্পির বাসায় যাবো না?”
“দাদা ভাইয়ার কাছে যাবো?”
দাদা ভাইয়া হলো আরিফ। নওশাদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “হুম যাবো তো।”
পুনম শুধু রং ঢং দেখে। নওশাদ একটা সিএনজি ডাক দেয়। পুনমকে বলেছিল বাইরে থেকে খাবার কিনে নিতে। পুনমই চায়নি। দুই দিন বাইরের খাবার অনেক খাওয়া হয়েছে। এবার মা মেয়ে দুজনেরই পেট খারাপ হয়ে যাবে।
সারা রাস্তায় বাপ বেটি মিলে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করলো। নওশাদ পুনমকে আগে বলতো ও নাকি বেশি কথা বলে। এখন নিজে? মেয়ের সাথে তালে তাল মিলিয়ে কথা বলে। পুনম হলফ করে বলতে পারবে নওশাদ জীবনে ওর সাথেও এত কথা বলেনি মেয়ের সাথে যেভাবে বলে। পুনম কোণা চোখে বাপ বেটির দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদের সাথে বেশ কয়েকবার পুনমের চোখাচোখি হয়। পুনমের এহেন দৃষ্টি দেখে নওশাদ না হেসে পারে না।
____________________
নওশাদ গোসল করে বের হয়ে দেখে প্রথা বিছানায় বসে গাড়ি নিয়ে খেলছে। নওশাদ চুল মুছে তোয়ালে বারান্দায় মেলে দেয়। প্রথার সামনে বসে। প্রথা নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ ভ্রু নাচায়। প্রথা নওশাদের কোলে এসে বসে। মুখ ছোট করে বলে,
“খিদা লেগেছে।”
“মা রান্না করছে। একটু পরেই দিবে আম্মা। বিস্কিট খাবে?”
দুদিকে মাথা নাড়ায়। নওশাদ বলে, “বাবার চুল মুছে দাও তো।”
“কি দিয়ে?”
পাশেই পুনমের ওড়না পড়ে ছিল। নওশাদ তা নিয়ে বলে, “এটা দিয়ে।”
প্রথা চুল মুছলো, কম এলোমেলো করলো বেশি। নওশাদ তাতেই খুশি। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আমার আম্মা কত কাজ পারে!”
প্রথা গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করে বলে, “বাবা আমাকে বল কিনে দিবে?”
“দিবো।”
“পানিতে দিলে বড় হয়ে যায় সেই বল?”
“কোথায় দেখেছো ওগুলো?”
“অর্ক ভাইয়ার কাছে,” হাত প্রসারিত করে বলে, “অনেকগুলো আছে।”
“আচ্ছা দিবো।” নওশাদ প্রথার মাথায় চুমু খায়।
“বাবা?”
“হুম?”
“বেলুন কিনে দিও?”
“আচ্ছা দিবো।”
নওশাদকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমার ভালো বাবা।”
“আমি একটু ভালো না বেশি ভালো?”
নওশাদের গালে চুমু দিয়ে বলে, “বেশিইইইইই ভালো।”
“আমার বুলবুলিও বেশিইই ভালো।”
প্রথা চুপ করে যায়। নওশাদ বলে, “আমরা সামনের বছর থেকে স্কুলে যাবো।”
অবুঝ গলায় প্রশ্ন করে, “মজা হবে?”
“অনেক মজা হবে। আমরা নতুন নতুন জিনিস শিখবো, জানবো।”
প্রথা পুতুল নিয়ে খেলতে থাকে। নওশাদ প্রথার চুল গুছিয়ে দিয়ে বলে,
“তুমি এক থেকে ত্রিশ পর্যন্ত বলতে পারো না?”
“পারি তো।”
“বলো তো, শুনি।”
প্রথা মনে করে করে বললো। পুনম তখন রুমে আসে।
“এই দুইজনই খেতে আসো।”
বলে ওয়াশরুমে চলে যায়। নওশাদ প্রথাকে বিছানা থেকে নামায়। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খেলনাগুলো গোছাতে থাকে। পুনম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে প্রথাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায়৷ নওশাদ খেলনাগুলো জায়গা মতো রেখে বিছানা ঝাড় দিয়ে রুম থেকে বের হয়। বিছানা অগোছালো করে রাখা নওশাদের পছন্দ না।
পুনম প্রথাকে খাইয়ে দিচ্ছে। ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে নওশাদ চেয়ার টেনে বসে। তবে খায় না। পুনম পাবদা মাছের দোপেয়াজা রান্না করেছে। প্রথা পছন্দ করে। প্রথা খাওয়ার সময় জ্বালায় না৷ পুনমের জন্য আরেকটা ব্ল্যাসিং এটা। ওর পছন্দ মতো রান্না করে দিলে যা দেয়, তাই খায়। প্রথার খাওয়া শেষ। পুনম যখন প্রথার মুখ ধুইয়ে দিচ্ছিস তখন কলিংবেল বেজে উঠে। নওশাদ দরজা খোলে।
জিসান একটা বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদকে দেখে বাটি এগিয়ে দেয়। নওশাদ বাটি হাতে নিয়ে বলে,
“বাসায় আয়।”
জিসান অন্যসময় হলে আসতো না। শুধু প্রথা আছে বলেই এলো। নওশাদ বাটিটা টেবিলে রাখে। ঢাকনা উঠিয়ে দেখে সর্ষে ইলিশ। জিসান হাত বাড়িয়ে ডাক দেয়,
“বইনা?”
প্রথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে দৌঁড় দিয়ে জিসানের কাছে আসে। জিসান প্রথাকে কোলে তুলে নেয়।
“মামা নিয়ে যাই ওকে?”
“বড় আপার বাসায় যাবো একটু পরে আমরা।”
“আমিও বাইরে যাবো কিছুক্ষণ পর। তখন দিয়ে যাবো।”
“যাহ।”
জিসান প্রথাকে কোলে নিয়ে বের হয়ে গেল। পুনম দরজা লাগিয়ে হাত ধুয়ে দুটো প্লেটে খাবার বাড়ে। নওশাদ পুনমের পিছনে দাঁড়ায়। গালে গাল ঘষে বলে,
“কি অবস্থা? মন খারাপ মনে হচ্ছে?”
“খেতে বসো তো।”
নওশাদ পুনমকে নিজের দিকে ফিরায়৷ ভ্রু উঠিয়ে বলে, “কি হয়েছে?”
“কি হবে?”
“আম্মুর কি অবস্থা?”
“আছে আরকি। বড় ভাবি আর ছোট ভাবির মধ্যে কিছুক্ষণ পর পর গন্ডগোল লাগে এইসব নিয়েই আছে।”
নওশাদ চেয়ার টেনে বসে। “তোমার ছোট ভাইয়া আলাদা হয়ে গেলেই তো পারে। ঝামেলা শেষ। কদিন পর পর শুনি ঝামেলাই হয়।”
“সেটা আমারও কথা। আলাদাও হবে না, আবার ঝগড়াও করবে। বড় ভাবি ওই লামিয়া থেকে হাজার গুণে ভালো। ওই লামিয়া আমাকে সহ্যই করতে পারে না। অথচ বড় ভাবিকে যেভাবে জ্বালিয়েছি ওর ঘরে আসার পর আমার মেয়েই ছিল। বাচ্চামো তো করিইনি। তাও আমরা গেলে কেমন করে। ছ্যাতছ্যাত করে শুধু। মন চায় দেই কয়টা। আমার বাপের বাসায় আমি যাবো ওর বাপের কি? ফালতু মহিলা একটা।”
“মাথা ঠান্ডা করো।”
পুনম পানি খায়। বলে, “ছোট ভাইয়া বলছিলো ওদের মেয়ে না থাকলে ডিভোর্স দিয়ে দিতো।”
“ডিভোর্স কোনোকিছুর সমাধান না। তোমার ভাই বউকে সামলাতে পারছে না সেটা ওর ব্যর্থতা। এইযে এত এত অশান্তি কিসের জন্য? সেগুলো সলভ আউট করা উচিত। তাহলেই সব সমাধান।”
“যে ঝামেলা করে সে নিজেও জানে না এত অশান্তি কিসের জন্য। বড় ভাইয়াকে বললাম আলাদা হয়ে যেতে। আম্মু আবার তা চায় না। হাঁড়ি আলাদা হওয়ার ব্যাপারটা আম্মু মানতে পারছে না।”
“আলাদা হলেই তো ভালো। অশান্তি কমবে।”
“আমার বড় চাচার ফ্যামিলিতেও সেম কাহিনি ছিল। বড় চাচাতো ভাই আলাদা হওয়ার পর দেখি এখন চাচির খবরই নেয় না। ওইজন্য আম্মু আসলে ভয় পায়, ভাইয়াও যদি খবর না নেয়?”
“তোমার বড় ভাবি কি চায়?”
“ভাবির কিছু চাওয়া নেই। অর্ক আম্মুকে ছাড়া যাবে না। আবার ছোট ভাইয়ার মেয়েও ছোট। ওই লামিয়া আবার চাকরি করে, ভাইয়া দোকানে থাকে। লামিয়ার অফিস টাইমে আম্মুর কাছেই তো মেয়ে থাকে। সব মিলিয়ে হযবরল অবস্থা। হিসেব করতে গেলে মাথা ব্যথা করে।”
“বাদ দাও।”
খাওয়ায় মন দেয় দুজনেই। নওশাদ বেশ কয়েকবার পুনমের দিকে তাকায়৷ পুনমের খাওয়া আগে আগে শেষ হয়ে যায়। ও এঁটো প্লেট নিয়ে কিচেনে চলে যায়৷ নওশাদও খাওয়া শেষ করে এঁটো প্লেট নিয়ে কিচেনে যায়। পুনম ব্যবহৃত বাসনপত্র ধুচ্ছিলো। নওশাদ এঁটো প্লেট বেসিনে রেখে হাত সাবান দিয়ে শুয়ে পুনমকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
পুনম ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “কি চাই?”
নওশাদ পুনমের কোমরে হাত রেখে বলে,
“তোমাকে।”
“এইসব করার জন্য মেয়েকে জিসানের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছো না?”
“বুদ্ধি হয়েছে।”
পুনম আড়ালে হাসলো। নওশাদ পুনমের গালে চুমু দিয়ে বলে, “বাবা মা হলে সময় পাওয়া যায় না, সময় বানিয়ে নিতে হয়।”
“আহা সিনেমাটিক ডায়ালগ।”
“তোমার সাথে মুভি দেখার ফল।”
“আমার কথা পড়ে তোমার?”
“পড়বে না কেনো? তুমি কি পাড়া প্রতিবেশী যে ভুলে যাবো?”
“মেয়েকে সময় দিয়েই পার পাও না আবার আমার কথা।”
গালে গাল ঘষে বলে, “গা জ্বলে কেনো?”
“জ্বলবে না? আগে সবসময় আমার জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এখন আমার ভাগের সময়ও আমি পাই না।”
“হুদা কথা।”
পুনম নিজেকে ছাড়িয়ে টেবিল মুছে। ফের কিচেনে এসে বলে, “সত্যি কথা বললে হুদা কথা বলাই হয়।”
“আসলেই হুদা কথা।”
পুনম লাইট নিভিয়ে বেরিয়ে যায়। গ্লাসে পানি ঢালে। খাওয়া সময় নওশাদ বাঁকা হাসে। নকল করে বলে,
“আমাকে মাফ করে দিয়েন।”
পুনম ভ্রু কুচকায়। গ্লাস রেখে বলে, “কেনো? কি বিষয়ে মাফ?”
“নয় মাস আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। পারলে মাফ করে দিয়েন।”
পুনম টেবিলে থাবা মেরে বলে, “তুমি যে আমাকে খোঁচা মেরে কথা বলো, তাতে আমার কিন্তু গা জ্বলে যায়।”
“শোনো গাধা তোমার বলা দুটো টাইমের কথা আমি কখনোই ভুলবো না। এক. আমার সময় লাগবে, বেশি না, একসপ্তাহ দিলেই হবে। দুই. আমাকে মাফ করে দিয়েন। এই নয়মাসে আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, মাফ করে দিয়েন। আপনার মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে মনে রাখবেন না। আমি না থাকলেও বাচ্চার খেয়াল রাখবেন। বেশি কষ্ট দিয়ে থাকলে মাফ করে দিয়েন।”
পুনম নওশাদের টিশার্টের কলার খামচে ধরে বলে,
“লেবার পেইন উঠলে বুঝতে কত কষ্ট। তোমার তো সবসময়ই সুখ, মেয়েকে নিয়ে পরে কি মাতামাতি! এখন আমাকে আবার নকল করছে।”
পুনমের হাতের উপর হাত রেখে ভেঙ্গিয়ে বলে, “কষ্ট দিয়ে থাকলে মাফ করে দিয়েন আমাকে, আমার সময় লাগবে বেশি না, একসপ্তাহ দিলেই হবে।”
পুনম নওশাদের চুল টেনে ধরে। নওশাদ চুল ছাড়িয়ে বলে, “কোথা থেকে শিখো এইসব?”
“তোমার মেয়ের কাছ থেকে।”
“দুইটাই পাগল।”
পুনম ফুঁসতে থাকে। নওশাদ বলে, “মাফ করে দিয়েন কিন্তু।”
“তুমি স্বীকার করো তুমি ভয় পেয়েছিলে।”
“ভয় পাবো কেনো? নরমাল জিনিসপত্র।”
“মুখ তো শুকিয়ে এইটুকু হয়ে ছিল। ভুলে গিয়েছি?”
“যেভাবে কাঁদছিলে, মরে যাচ্ছিলে মুখ শুকিয়ে যাবে না?”
“ভয় পাওনি কিন্তু এমনিতেই মুখ শুকিয়ে গিয়েছে না?”
“চুপ করো গাধা।”
যেই নিজের গায়ে কথা আসতে লাগলো, ওমনি পুনমকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলো।
“মা হওয়া কত কষ্টের যদি তোমরা ছেলেরা বুঝতে! আমি আর বাপের জন্মেও আম্মুর সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না। আল্লাহ! এক মেয়ে আমাকে কত তামাশা দেখিয়েছে, কত শিক্ষা দিয়েছে!”
“ভালো তো। মেয়ে জন্ম নিয়েই মাকে শিক্ষা দিলো।”
“নয়মাস আমি যে কষ্ট করেছি। আল্লাহ!”
“বয়স কম ছিল, প্রস্তুত ছিলে না, ম্যাচিউরিটি আসেনি তাই।”
“হতে পারে।”
নওশাদ হাসে। “প্রথাকে সবাই অনেক আদর করে তাই না?”
পুনম মাথা ঝাঁকায়। “তুমি আদর পাওনি, আর দেখো তোমার মেয়ে? সবার আদর পায়।”
নওশাদ ম্লান হাসে। পুনমকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে, “তোমরা ভালো থাকো।”
_______________
প্রথা জিসান গলা ধরে পিঠে ঝুলতে ঝুলতে বলে,
“গেমস খেলবো।”
“না, গেমস খেলা ব্যাড জব।”
“তুমিও তো খেলো।”
“আমি তোর থেকে সাড়ে আঠারো বছরের বড়, তুই আমার সাথে জোড়া দিস?”
প্রথা বুঝলো না। গলা ধরে বলে, “কি?”
“কচু। লিলিপুট নাকি গেমসও খেলবে।”
প্রথার জোরে চিৎকার করে ডাক দেয়, “ফুপ্পি!”
“ফুপ্পির নানি আসলেও মোবাইল দিবো না।”
জিসানের চুল টেনে বলে, “কেনো?”
জিসান প্রথার গাল টেনে বলে, “তোর বাপ আমার দুই, দুইটা মোবাইল নিয়ে গিয়েছিল। তুই শুধু বড় হয়ে পাবলিকে চান্স পাওয়ার আগে মোবাইল হাতে পা। দেখবি কি করি।”
জিসানের চুল ধরে রেখেই কিউট গলায় বলে, “কি করবে?”
প্রথার গালে চুমু দিয়ে বলে, “হামানদিস্তা দিয়ে ভর্তা করে ফেলবো।”
প্রথাও জিসানের গাল টেনে বলে, “আমিও হাম্বা দিস্তা দিয়ে ভর্তা করে ফেলবো।”
“হাম্বা দিস্তা না রে! হামান দিস্তা।”
প্রথা শরীর বাঁকিয়ে চাকিয়ে বলে, “না হাম্বা দিস্তা।”
“হো এবার বল ছাগল দিস্তা।”
প্রথা হাসে। “আলু দিস্তা।”
জিসান প্রথাকে কাতুকুতু দেওয়া শুরু করে। প্রথা হাসতে হাসতে বলে,
“মাইর দিবো কিন্তু।”
জিসান কাতুকুতু দেওয়া থামিয়ে দেয়। প্রথার গাল টিপে বলে,
“তোর উপর আমাদের কত ক্ষোভ জানিস?”
“কি?”
“তোদের ঘরের কর্তা আমাদের কত জ্বালিয়েছে জানিস? আমরা যদি প্রতিশোধ নেই তুই রেহাই পাবি?”
হেসে বলে, “পাবো।”
গাল টিপে দিয়ে বলে, “ওরে কিউটের ডিব্বা রেএএ! তুই ছেলে হলে দিতাম এক আছাড়। বোন হওয়ার বেঁচে গেলি।”
প্রথা হাসা শুরু করে। কি বুঝে হাসলো কেবল প্রথাই জানে, তবে প্রথার হাসি দেখে জিসানের মুখেও হাসি ফুটে। এতো আদর, এতো আদর লাগে দেখলেই। জিসান গাল টেনে বলে,
“কুটুস বইনা আমার।”
প্রথাও জিসানের গাল টেনে দেয়। “কুটুস ভাইয়া।”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং..)

