আমার_বোবাফুল(২৪) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
66

#আমার_বোবাফুল(২৪)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

দেড় বছর আগের বর্ণ’র সাথে দেড় বছর পর ফিরে আসা বর্ণ’র মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক।সে ফিরেছিল নির্লিপ্ত এক ভিন্ন চরিত্রে; দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার অযুহাতে তার মাঝে কোন উচ্ছ্বল,কোন কৌতুহল ধরা দেয়নি।যেনো সে হাসতেই ভুলে গিয়েছিল, এরপর পরিবারের সবার থেকে নিজেকে আলাদা করে অনেকদিন রুম বন্দী ছিল,খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বেরই হতো না।কথা বলতো মেপে মেপে।

অথচ দেড়‌ বছর আগের বর্ণ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। অভ্র’র মতো চঞ্চল না হলেও তার চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।তামিজ শিকদারের সাথে তার ভাব ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। কথায় কথায় পরষ্পরকে মজার ছলে পচাঁতো খুব। আবার খানিক পর উভয়ে একই ঘাটের জল হয়ে মিলেমিশে যেতো।আযাদ শিকদার অর্থাৎ বাবা ছেলের সম্পর্কও ছিল মিষ্টিমধুর।

অভ্র তখন আরো ছোট,নূরা ছিল কোলের শিশু।দুই ভাইয়ের(অভ্র+বর্ণ) বয়সের ফারাক অসামান্য হলেও বাড়ি থাকাকালীন সময়ে তারা চলতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।বর্ণটা তখন সুখকে ইচ্ছে করেই বেশি বেশি খাটাতো।এই যেমন রুবাইয়্যাতের অগোচরে সময় নির্ধারণ করে দিয়ে গায়ের শার্ট ধোঁয়ার আদেশ দিতো,অথবা রুম পরিস্কার করার, অথবা কাভার্ড গুছিয়ে দেওয়া;আরো কতো কি!

সুখের এখনো মনে পড়ে কোন কাজে বর্ণ’র কথামতো সায় না দিয়ে চলে আসতে নিলেই পিছু থেকে লম্বা চুল টেনে ধরতো পুরুষটা। অতঃপর তার ইচ্ছের বিরোধ করে জোরপূর্বক কাজটি হাসিল করিয়েই ছাড়তো। অবশ্য তার পুরষ্কার স্বরূপ চকলেট, আইসক্রিম খাওয়াতো নয়তো সকল ভাই বোন নিয়ে বেরিয়ে পড়তো অজানা ঠিকানায়। দিনভর ঘুরেফিরে নিড়ে ফিরে আসতো বিকেলে।ভুলের শাস্তি হিসেবে কানে ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতো।তা মাথা পেতে নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।আম্মুকে বলে দেওয়ার হুমকি দিলে শাস্তি দ্বিগুণ বেড়ে যেতো।

নতুন বর্ণ’র এই নির্লিপ্ততা সুখের সহ্য হচ্ছিল না।সে চাইতো বর্ণ আগের মতো তাকে জ্বালাক।কেনো চাইতো নিজেও তখনো বুঝতে পারেনি।তাকে বর্ণ এড়িয়ে গেলে কেনো যেনো কান্না এসে ভিড় করতো চোখে।গলা ধরে আসতো।অগোচরে সে কাঁদতো। কখনো কখনো কেঁদে আঁখিদ্বয় রক্তিম করে ফেলতো। বর্ণর আশেপাশে গিয়ে ঘুরঘুর করতো; এই বুঝি লোকটা শার্ট খুলে আদেশ করলো,

“ ফুল পনেরো মিনিটের মধ্যে এই শার্ট ধুয়ে এনে রোদের তাপে দে, ফাস্ট!”

অথচ আগের মতো বর্ণ বলেনা আর।আজও না।সময় সময় সে বর্ণ’র সামনের গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে থাকতো। পুরুষটি তখন শীতল চোখ তুলে তাকাতো। তাকিয়েই থাকতো অনেক্ষণ। অতঃপর আবারো নির্বিকার , নির্লিপ্ততা। একবার জিজ্ঞেস করেছিলো স্বল্প ভাষায়,

“ কাঁদিস কেনো ফুল?”

টলটলে চোখের অশ্রু অবাধে গড়িয়ে পড়ার আগে সুখ নিজেকে আড়ালে নিয়ে এসেছিল। ছুটে চলে এসেছিল বর্ণ’র সামনে থেকে। তখন খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল,

“ আপনি একটুও ভালো নয় বর্ণ ভাই! আপনার মাঝে আগের বর্ণ ভাইকে আমি খুঁজে পাইনা এখন!”

সে ভীতু।মনের গহীনে তুলপাড় খাওয়া কথাগুলো ভাষায় প্রকাশ করার দুঃসাহসের অধিকারিণী ছিল না তখনো।তাই চুপ ছিল সেদিন।

তার এই অনূভুতি শূন্য চলাফেরা বাড়ির সকলকে যেমন চিন্তিত করে রেখেছিল তেমনি ব্যাথিতও করেছে।
আইজা ছেলের নির্লিপ্ততা সইতে না পেরে তার সামনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল একদিন। সেদিনের পর থেকে আজও বর্ণ তার পুরোনো রুপে ফিরে আসার জন্য নিজের সাথেই একান্ত প্রতিযোগিতায় নেমেছে।যদিও সে অসফল।

বলা বাহুল্য, বর্ণ’ সেদিন একা ফিরেনি।তার পিঠজুড়ে ছিল কালো রঙা গিটার।মাহিরের ভাষ্যমতে যেটা আজ পর্যন্ত বর্ণ’ কাউকে ছুঁতে দেয়নি। অথচ ভুলক্রমে অভ্রর হাত থেকে পড়ে আজ ভেঙে গেছে। এবং সে ফিরে এসে এও বলেছিল ,

“ এতো গুলো দিন সে দেশের বাহিরে ছিল!”

কেনো ছিল;কোথায় ছিল –তার উত্তর অজানা! ছেলে যেহেতু ফিরে এসেছে বাড়ির কেউ আর তাকে জোর করেনি জবাবদিহি করতে।এই স্বাধীনতা আযাদ শিকদার তাকে দিয়েছে ।কেননা উনার দৃঢ় বিশ্বাস বর্ণ আর যাই করুক কোন ভুল পথে হাঁটবে না।আজ মনের কোণে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে সুখের,

“ সত্যিই কী বর্ণ বিদেশে ছিল?যদি থেকেও থাকে তবে পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন করার কারণ কী?”

সুখ এসবি ভাবতে ভাবতে নিজের কক্ষে ফিরতে গিয়েও পা ঘুরিয়ে আম্মুর শোবার ঘরে চলে এলো।

হানিফা বেগমকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছিল আযাদ শিকদার। কিন্তু বৃদ্ধা এখন সন্দিহান।নূরার কাছে জানতে পেরেছে –‘ ড্রয়িং রুমে আসর বসেছে’।তাকে ছেড়ে কী কথা বলছে সবাই?নূরাকে রেখেই তিনি ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন।

“ তোরা সবাই আছস দেখি এখানে?কী নিয়া সভা বসাইছস?আমারে তো বলছিলি তেমন কিছু হয় নাই, ছুটু দাদুভাই সিঁড়ি থেকে পইরা গিয়া ব্যথা পাইছে! সত্যিই তো?”

“ জ্বী আম্মা!এটাই সত্যি! চলুন আপনার সাথে কথা আছে।”

আযাদ শিকদার উঠে একহাতে বৃদ্ধাকে জড়িয়ে নিজ কক্ষের অভিমুখে হাঁটা দিলেন। সত্যিটা জানালে নিশ্চয়ই আম্মা এখন হায় হায় করে উঠবে। তাছাড়া কীবা বলবে?ওটা তো ভাষায় বর্ণনা করার মতো দৃশ্য ছিল না!
.
তামিজ শিকদার ফিরলেন সন্ধ্যার পর। সারাদিন প্রচুর ব্যস্ততা সমেত উদ্দীপনায় কেটেছে। ব্যবসায়িক পথে এই প্রথম সবচেয়ে বেশি টাকার বিনিময়ে ঢিল করেছেন। পরিমাণ – সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
গাড়ি থেকে নেমে প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়েন তিনি।প্রিয় মুখগুলোর দেখা পেলে এখুনি হয়তো শরীরের সকল ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যাবে।বাড়ি প্রবেশের পূর্বে আযাদ শিকদার গার্ডেনে ডাকলেন। ভদ্রলোক এতোক্ষণ ভাইয়ের জন্য সেখানেই অপেক্ষারত ছিলেন।

আজকের ঘটে যাওয়া দৃশ্যপটের বর্ণনা শুনে এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তামিজ সাহেব।উনার ভাবনায় প্রথমেই হানা দেয় একটি কথাই,

“ যুগ যুগ ধরে আমরা দুভাই একসাথে বসবাস করেও যেখানে সামান্য মনোমালিন্যটুকুও হয়নি অথবা হলেও আচরণে কেউ কাউকে বুঝতে দেইনি সেখানে এখন থেকেই তাদের ছেলেরা পরষ্পরকে আঘাত করার যাত্রায় নেমেছে?”

পরবর্তীতে আযাদ শিকদার বর্ণ’র ডিসঅর্ডারের কথাটিও উল্লেখ করলেন।তামিজ শিকদার দ্বিতীয় দফায় চমকালেন।ডিসঅর্ডার?নাম ইতোপূর্বে বার কয়েক শুনেছেন।এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও অল্পবিস্তর অবগত।আযাদ শিকদার বললেন,

“ তোর সাথে ওর ভালো বন্ডিং!হয়তো জিজ্ঞেস করলে তোকে বলবে ও কী নিয়ে এতো পরিমাণ ডিপ্রেস্ড যার কারণে…!”

ভদ্রলোক হতাশ মিশ্রিত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কপালে হাত ঘঁষলেন।
.
ভেতরের অস্থিরতা কমছে না সুখের। কী এমন ব্যাপার থাকতে পারে যেটা বর্ণকে এতোটা প্রভাবিত করেছে? এতোটাই যে -নিজেকে কন্ট্রোল রাখা-ই দায় হয়ে পড়ছে?প্রতিনিয়ত ভেতরে ভেতরে তার মনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে অথবা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে!সুখের মন বলছে আগুনই ধরিয়ে দিচ্ছে –যার বহিঃপ্রকাশে বর্ণ এতোটা উগ্র, হিংস্র আচরণ করে।

দুহাত মুঠোবন্দী করে চোখ খিচলো সুখ।সে কেনো এতো ভাবছে ওই নিষ্ঠুর পুরুষ নিয়ে?

দরজায় টোকা পড়ে।তুহফা এসেছে।সুখ ইশারায় ভেতরে প্রবেশ করতে বলে মুখ কুঁচকে বসে রইলো।মন খচখচ করছে খুব। শ্বাসটাও শান্তিতে টানতে পারছে না।ফোঁস করে শ্বাস ফেলে তুহফা বেডে বসলো।

“ আমি যা ভাবছি তুইও কী তাই ভাবছিস?”

সুখ ইশারায় জিজ্ঞেস করে,
“ তুমি কী ভাবছো?”

সে বললো,
“ এটাই যে ভাইয়ার এমন অ্যাগ্রেসিভ হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?”

দুজন ভাবলো অল্প কিছুক্ষণ। অথচ কিছুই বের করতে পারলো না।করবে কীভাবে? ইতোপূর্বে যে বর্ণ কোন সংকেত ই দেয়নি কাউকে!
.
অভ্র’র জ্বর উঠেছে। ছেলেটা ভয় পেয়েছিল প্রচুর। তখন মনে হয়েছিল আজকেই তার জীবনের শেষ দিন। ভাগ্যিস সুখ আপি পৌঁছেছিল সময়মতো।

ভাইয়ার প্রতি অভিমান জমেছিল আকাশ সম যা আবার নিমেষেই গলতে শুরু করেছে মাহিরের কথায়।সেতো বললো ভাইয়া অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে।এই এক ভুলের জন্য এতো বছরের ভালোবাসা ভুলে যাবে? কিন্তু তার অভিমান পুরোপুরি যায়নি। ভাইয়ার কাছাকাছি আর যাবেই না কখনো।

জ্বরের ঘোরেই তার মনে পড়ে গিটার ফ্লোরে পড়ার পর-মূহুর্তেই বর্ণ তড়াক করে কাউচ থেকে ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়েছিল।একবার ফ্লোরে নির্জীব পড়ে থাকা গিটারের দিকে তাকিয়ে পরপর তার দিকে তাকাচ্ছিলো অদ্ভুত তিক্ত চাউনিতে। এভাবে বার কয়েক দেখে জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘাড় ম্যাসাজ করছিলো। তখন না বুঝলেও অভ্রর এখন বুঝতে বাকি নেই -ভাইয়া মস্তিষ্কে ধপধপ জেগে উঠা হিংস্র ভাবটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল।

অভ্র হাঁসফাঁস করে উঠে। চোখের তারায় ভাসছে কীভাবে বর্ণ ঝড়ের বেগে তেড়ে এসেছিল;আর কীভাবে তার গলা চেপে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ঢোক গিলে অভ্র।পাশ হাতড়ে আম্মুকে খুঁজলো তৎক্ষণাৎ।ভয় করছে –যদি ভাইয়া আবার এসে গলা চেপে ধরে?আইজা এতোক্ষণ এখানেই ছিল।খানিক আগেই আযাদ শিকদারের তলবে সেদিকে গেছেন।
.
সময় দুটোর ঘরে।অভ্রকে ঘুম পাড়িয়ে পুণরায় নিজেদের শোবার ঘরে ফিরে এলেন আইজা। অন্যদিন বর্ণ’র জন্য চিন্তামুক্ত থাকলেও আজ তা হচ্ছে না।

“ বর্ণটা এখনো ফিরছে না কেনো? একবার মাহিরকে কল করে দেখো না?”

আযাদ শিকদার শীতল চোখে চাইলেন। স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন,

“ আজকে যা ঘটিয়েছে এরপরো তারজন্য অস্থির হচ্ছো?”

আইজা রেগে গেলেন মূহুর্তেই, ধুপধাপ পায়ে হেঁটে গিয়ে বেডে বসতে বসতে বললেন,

“ ও আমার ছেলে! আমার বুকের ধন!মা হই ওর!যা কিছু করুক আমি মুখ ফিরিয়ে নেবো ভাবলে কী করে? মাহির তো বললো সবকিছু?এরপরো অভিমান করে চুপ করে থাকবো?তুমি আমার আর আমার ছেলের ব্যাপারে এতো কথা বলার কে?”

থমকে গিয়ে চেয়ে রইলেন ভদ্রলোক।কী বুঝাতে চাইলেন আর কী প্রতিক্রিয়া পেলেন?তিনি মৃদু স্বরে বললেন,

“ করেছি কল!মাহিরের ফোন তুলছে না তোমার গুণধর ছেলে।আমি তো কল দেবো না;আর না তুমি দেবে । চেতনায় করুক বা অচেতনায় -তার মাঝে অনুশোচনা বোধ জাগাতে হবে!ওর প্রবলেমের এটাই অন্যতম মেডিসিন!”
.
সময় চলছে হুরহুর। ঘড়ির কাঁটা তিনটে পেরিয়ে গেছে। পিচঢালা রাস্তা তখন শুনসান।ক্ষণে ক্ষণে আবার গুটি কয়েক ছোট বড় যানবাহনও চোখে পড়ে। রাত্রির মধ্যভগে এই শুনসান রাস্তায় ফুল স্পীডে বাইক ছুটে চলছে বর্ণ’র। কোথা থেকে আসছে জানা নেই।সে নিজেও অবগত নয়। দুচোখে যেদিকে রাস্তা দেখেছে সেদিকেই ছুটে চলেছে।

দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে তার।চোখ খিচে দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে পুণরায় সামনে তাকালে ফের ঘোলাটে দেখায় দৃশ্য। মস্তিষ্কে কেবল ভাসছে আম্মুকে আঘাত করতে যাওয়ার কথা।একসময় বাইক থেকে হাত তুলে নিলো সে। দুহাতে মাথা চেপে ধরে চোখ বুজে নিলো আলগোছে। বিড়বিড় করে,

‘ ওহ্ গড!এতো বড় ভুল কীভাবে করতে পারি আমি?’

খানিক পর ভয়ঙ্কর একটা শব্দ হয়। কিছু একটার সাথে টক্কর লেগে বাইক উল্টে গেলো বর্ণ সমেত। রাস্তায় ছিটকে পড়ে সে।চোখ নিভু নিভু।হাতের তালুতে তরল কিছুর অনুভব হচ্ছে।হবে হয়তো র-ক্ত!

#চলবে🥀
[এ্যাক্সিডেন্টে 🥹💔]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here