#আমার_বোবাফুল(৪৫.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
৪৫–শেষার্ধ·
‘ আমায় বিয়ে করতে চাওয়ার কারণ?’ –কথাটি সুখ বলেছিল হাতের ইশারায়।মেহরাব বুঝল না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফ্যালফ্যাল চেয়ে বুঝতে চেষ্টা অবশ্য করেছিল।
সুখ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে অন্যত্র নজর সরায়। পুণরায় বলল ইশারায়,
‘ যাকে ভালোবাসি দাবি করছেন।বিয়ে করতে আগ্রহী। তার ভাষা-ই যদি না বুঝতে পারেন।তবে সংসার হবে?’
এবারেও সম্পূর্ণ কথা বুঝতে অপারগ হয়ে মেহরাব মাথা চুলকে লজ্জাষ্কর হাসল মৃদু।বলল অপরাধী কন্ঠে,
‘ স্যরি সুখ!আসলে…’
সুখ বোধহয় তাচ্ছিল্য হাসল।হাতের ফোনে শেষ বার বলা কথাটি কীবোর্ড চেপে লিখে মেহরাবের চোখের সামনে এগিয়ে দিল।
গার্ডেনে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে দু’জন।শীত শীত মৃদু-মন্দ হাওয়া বইছে। গায়ের ওড়নাটি মুঠোয় চেপে আরো জড়োসড়ো হয়ে বসল সুখ।দুজনকে একান্ত কথা বলার সুযোগ দিয়েছে পরিবার। সামনে এগুনোর সিদ্ধান্ত যেন বুঝে শুনে নিতে পারে।
ফোনের লেখাটি পড়ে মেহরাব বলল,
“ হয়তো এখন বুঝতে পারছি না তোমার ভাষা। কিন্তু সাথে থাকতে থাকতে এক সময় সব সহজ হয়ে যাবে, দ্যাখো!’’
সুখের কী হলো কে জানে।ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চেপে রইল। দৃষ্টি কাঁপছিল একটু-আধটু।কেন কে জানে!
‘ জামাই বাবু কমলা লেবু একলা খেও না।পালকি থেকে বউ পালাবে দেখতে পাবে না!’
টেবিলে সাজানো কমলা লেবু, অ্যাপেল, আনার সহ হরেক রকম মৌসুমী ফলাদি এবং জুস।বর্ণ কোত্থেকে এসে ধুপধাপ সুখের পাশের চেয়ারে বসে গানের সুরে কথাগুলো গেয়ে একটা কমলা লেবু মুখে পুরে। পরপরই মুখ কুঁচকে নিল।স্বাদ টক টক।
‘ গানটা কোন সিনেমাতে যেনো ছিল ডক্টর?মনে করার চেষ্টা করুন!’
এই মূহুর্তেই বিষয়টি জানা গুরুত্বপূর্ণ –তেমনি ভাব ধরেই বলল সে।দু’জনের বোঝাপড়া শেষের আগেই মাঝখানে বর্ণ’র এসে পড়াটা খুব একটা ভালো লাগল না মেহরাবের।তবু, ঠোঁটে হাসি ধরে রাখল। অসন্তুষ্ট প্রকাশ করা যাবে না!
‘ বাল্যকালে দেখেছিলাম।মনে পড়ছে না
সঠিক!’ —মনে করার অল্প চেষ্টা করে জবাব দিল।বর্ণ ভ্রু কুটি করে চায়,
‘ সামান্য একটা সিনেমার কথা মনে রাখতে পারেননি? ডক্টরেট ডিগ্রি’তে কোন ভেজাল নেই তো?’
রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোন দূর্বল মনে ভীতি জাগানোর উপযোগী স্বরের মতো সন্দিহান গলায় ফিসফিসিয়ে বলল শেষ বাক্যটি!
মেহরাব হতাশ।বলল,
‘ রকস্টার সাহেব, সিনেমা-গান সম্পর্কে আমার চেয়ে আপনার সাধনা বেশি।বলতে পারবেন –সেই সিনেমায় হিরোইনকে লাস্ট কোন হসপিটালে এডমিটেড করা হয়? অথবা কোন স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল? ’
সূচালো চোখে অল্পক্ষণ তাকিয়ে হুট করে হেসে উঠলো বর্ণ, -‘ ডক্টর!এসব ছোটো-খাটো চীজ কখনো-সখনো নজরান্দাজ হয়ে যায়।এতো সব মনে রাখতে নেই!’
থম মেরে তাকিয়ে রইল মেহরাব।ওই যে লোকে বলে, “নিজের বেলায় ষোল আনা আমার বেলায় চার আনা” –কথাটি হুবহু যেন মিলে গেলো আসফিয়ান বর্ণ’র সাথে।
সুখ চোখ-মুখ শক্ত করে কী যেনো বিড়বিড় করল।বর্ণ স্পষ্ট দেখল তা। এবং লিপ রিডিং করে নিল। বাঁ-দিকে ঘাড় কিঞ্চিৎ ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের উপর অদ্ভুত কায়দায় হাত চালিয়ে ভ্রু কুঁচকায় পুরুষটি।নিজেও বিড়বিড় করে,
‘ ফুল!তুই আমায় গালি দিলি ?ব্যাড!ভেরি ব্যাড, বাট কবুল!ছলচাতুরি করে ভালোবাসায় ফাঁসিয়ে এখন মাঝ দরিয়ায় হাত ছাড়তে চাস!তোর সব…’
•
পাত্র-পাত্রী রাজি।আযাদ সাহেব সুখের জবানে হস্তক্ষেপ করলেন না।হাসি মুখে মেনে নিলেন বরং।মেহরাব’রা ফিরে গেল সন্ধ্যা নামার পর।আজ রাতটা শিকদার নিবাসে কাটাতে বলা হয়েছিল তাদের। তারা সায় দেয়নি । কদিন পর একেবারে বিয়ের ডেট ফিক্সড করতে আসবে নাকি।বের হওয়ার আগে একটিবার সুখকে দেখার বাহানায় বার কয়েক সকলের অগোচরে উঁকি মেরে দেখেছিল মেহরাব। কিন্তু দেখা পায়নি কাঙ্ক্ষিত রমণীর।
তামিজ সাহেব সেই ক্ষণ থেকে নিরব হয়ে আছেন। সুখের সামনে যেতেও কেন যেন সংকোচ বোধ করছেন ভদ্রলোক।মেয়েটা তাদের এক লহমায় সত্যিই বড় হয়ে গেল?এই তো সেদিন হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছোট্ট সুখের হাত আঁকড়ে হাঁটা শিখিয়েছিলেন তিনি। ঘোড়া সেজে পিঠে চড়িয়ে হৈ হৈ করে ঘরময় ছুটেছেন কতশত বার।তারপর…কোলে করে স্কুলের শ্রেণী কক্ষে দিয়ে এসেছেন। সেই ছোট্ট খুকি আজ বিয়ের উপযুক্ত!
আলো-আঁধারির খেলাঘর। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বেডে চুপটি করে বসেছিল সুখ ।তামিজ সাহেব সন্তর্পণে আলো জ্বালিয়ে দেন। আব্বুকে দেখেতেই সুখ ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকে।এটিই যেন তার আশ্রয়স্থল। ঠোঁট কামড়ে মৃদু গোঙিয়ে কেঁদে ফেলল। চোখের অশ্রুরা বাঁধ মানছে না।
‘ কাঁদছে কেন আমার মা’টা?তার চোখে তো অশ্রু মানায় না!’
মেয়ের চোখের বাঁধনহারা পানি মুছে দিলেন তিনি। আব্বুর আদর পেয়ে আরো ভেঙে পড়ল সুখ। ক্রন্দনরত চোখে বলল নিজস্ব ভাষায়,
‘ এই শহরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে আব্বু। আমি এখানে আর থাকতে চাই না!’
তামিজ সাহেব মুচকি হাসলেন। চশমা’র আড়ালে চোখের জল লুকিয়ে বললেন,
‘ পাগলি মা আমার!ব্যাস এইটুকুই?’
সুখ দুদিকে মাথা ঝাঁকায়। অর্থাৎ, শুধু এটুকু নয়। তিনি বললেন,
‘ আরো কারণ আছে?’
ঠোঁট ঠোঁট চেপে উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো সুখ।তামিজ সাহেব পুণরায় জানতে চাইলেন,
‘ আব্বুকে বলা যাবে?’
অশ্রুসিক্ত ভাসা ভাসা চোখে তড়িৎ দুহাতে মুখ ঢাকে সুখ। ফুঁপিয়ে উঠে এবারে ডানে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে বুঝায়,
‘ যাবে না!’
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন রুবাইয়্যাত। তার পিছু আইজা, তুহফা।সবার মুখশ্রী কেমন যেন ফ্যাকাশে।ছোট জা-এর কাঁধে আলতো হাত চাপড়ে সরে গেলেন আইজা।উনার দেখাদেখি চলে গেলো তুহফাও। রুবাইয়্যাত ধীরে কক্ষে প্রবেশ করেন।বুকটা হু হু করছে।মনে হচ্ছে সুখ এখনই সবাইকে ছেড়ে বহুদূর সরে যাচ্ছে।হাত বাড়িয়েও মেয়েকে ছুঁতে পারবে না তিনি।
সুখের এলোমেলো চুল পেছনে ঠেলে দিয়ে কাছে টেনে নিলেন তামিজ সাহেব।
‘ সেই না বলা কারণের জন্য বিয়েটা করতেই হবে?’
‘ হ্যাঁ’ —জানাল সুখ। রুবাইয়্যাত কাছে এসে মেয়েকে আগলে নিয়ে কপালে চুমু আঁকলেন।হয়তো বলতে চেয়েছিলেন,– ‘ আমাদের ছেড়ে এভাবে অন্যের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা কীভাবে ভাবতে পারলে,আম্মা?’
বলা হয়নি স্বামীর চোখের দিকে চেয়ে।তামিজ সাহেব চোখের ইশারায় সুখকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নিষেধ করে দিলেন। মেয়ের চাওয়া তিনি অপূর্ণ রাখবেন না।
•
সুখ কিছুক্ষণ একা থাকতে চায়।তামিজ সাহেব দ্বিমত করলেন না। রুবাইয়্যাতকে বলে-কয়ে রুম থেকে নিয়ে গেলেন।
তুহফা ঢুকল ধীর পায়ে। দৃষ্টিতে বিভ্রান্তি। হাঁটুতে গাল এলিয়ে অ-দৃশ্যে তাকিয়ে থম মেরে ছিল সুখ।সে গিয়ে পাশে বসল নিঃশব্দে। নিরবতায় কাটল কিছু ক্ষণ।মুখ খুলল তুহফা,
‘ ভাইয়াকে ভালোবাসিস?’
চমকে উঠে থমকে যাওয়ার মতো দুটো শব্দ। অথচ সুখ নিশ্চল। আজকাল সে খুব একটা চমকায় না। অন্তঃকরণের হাজারো ভাংচুরের প্রতিক্রিয়া গুলো চেহারার গাম্ভীর্যতায় চুপিয়ে রাখতে শিখে গেছে কী না!
কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল নিজ ভাষায়,
‘ না তো!ভালো আমি কাউকে বাসি না।ডক্টরকে ভালো লেগেছে।তাই তো সুযোগ পেতেই হাসিল করে নিলাম!’ —জোরপূর্বক অধর কোণে হাসি টানল।
তুহফা সরাসরি তার চোখে দৃষ্টি স্থাপন করে।মনে হলো, চোখের গহীনের অব্যক্ত রহস্য উদ্ঘাটন করতে চায়। অতিদ্রুত নজর সরিয়ে নিল সুখ। কিছু লুকোতে চাইল।তুহফা বলল,
‘ ভালোবাসিস না। কিন্তু অতীতে বেসেছিলি; তাই তো?’
‘ ভুল!আমি উনাকে ভালোবাসি না।তুমি কীভাবে জানলে? মাহির ভাই বলেছে?’
মাহির নামটা ইচ্ছে করেই নিল সুখ।চক্ষু হাসল তখন।তুহফা দুদিক মাথা ঝাঁকিয়ে বালিশে মাথা এলিয়ে পিঠ করে শুয়ে পড়ল সটান। ওভাবেই বলল,–
‘ আমি কীভাবে জেনেছি দ্যাট ইজ নট ইম্পর্ট্যান্ট! তাছাড়া মাহির ভাইয়ের নাম আসছে কেন?যাক, কংগ্রাচ্যুলেশন.. বয়সে আমার ছোট হয়ে আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার সৌভাগ্য অর্জন করতে চলেছিস।কী কপাল তোর।ভোরে উঠে একবার আমার কপালের সাথে টোকা লাগিয়ে দিস তো।বলা যায় না,দুর্ভাগ্যবশত যদি আমার ভাগ্যটাও খুলে যায় !’
মুখটা আঁধারে ছেয়ে গেল পরপর।ড্রিম আলো এবং উল্টো শোয়ার ফলে তা সুখের চক্ষু-গোচর হল না।
চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বুজে তুহফা।
মাহির!মাহির!মাহির! এই নামটা সে হৃদয় থেকে,মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলতে বহু চেষ্টা করছে বিগত কয়েকমাস ধরে।তাও রোজ নিয়ম করে মনে পড়ে। স্বপ্নে আসে। মানুষটার সাথে কথা হয়না অনেকদিন। অবশ্য সে না চাইলে আগেও হতো না নির্ঘাত।এ যাবৎকাল মাহির নিজ থেকে হাতে গোনা দু’বার সংযোগ স্থাপন করেছে তার সাথে।সেসব নোট করা আছে।তবে, বাড়িতে মুখোমুখি কথোপকথনের কথা বলতে গেলে –তা অন্য হিসেব।
রাত গভীর। শহরের বুকে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। ক্ষণে ক্ষণে এক-দু-বার গাড়ির হর্ণের আওয়াজ কানে লাগে।
সুখ এক মূহুর্তের জন্যও চোখের পাতা বুজেনি এখনো।আগের মতোই হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল।সময়টা যেনো থমকে গেছে। চোখে ঘুম আসছে না। বরাবরের মতো হৃদয়ে অনূভুতির বড্ড ঘাটতি।
তুহফা’র ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছে বেডের আশেপাশে।হয়তো ঘুমে তলিয়ে গেছে। সুখের গলাটা শুকিয়ে কাঠ হল হঠাৎ।জগে পানি নেই।রাখা হচ্ছে না দু-তিন দিন হলো।
নিঃশব্দে সুখ বেড ছেড়ে নেমে আসে। করিডোরে এসে সিঁড়ির সামনে থেমে যায় আচমকা।ধীর ধীর পা চালাল ছাদের উদ্দেশ্যে। অকারণেই তেষ্টা মিইয়ে গেছে।একা একা; আলো-আঁধারে ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার শখ জেগেছে হুটহাট।
একা পথ চলতে এখন আর ভয় লাগে না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেও বুক কাঁপে না একটিবার।সে কী তবে নির্ভীক হচ্ছে পর্যায়ক্রমে?কে জানে।
ছাদে পা রেখে গা ঝেড়ে শ্বাস ফেলল সুখ।আধো-আলো আধো-অন্ধকারের লুকাচুপি চলছে ছাদজুড়ে।
একপ্রান্তে জারবেরা, ব্লু অর্কিড ,নয়নতারা এবং রাত-কী-রাণী ফুল গাছ লাগোয়া। ছাদের ওই জায়গায়টিই সুখের সবচেয়ে প্রিয়।এদিক-ওদিক পলক না ফেলে নিরবে ফুলেদের মাঝে স্থান গেড়ে নিল সুখ। রেলিংয়ে হাত ঠেসে নজর রাখল বাঁকা চাঁদের দিকে। বিশালাকার অম্বরের মাঝে একফালি বাঁকা চাঁদ যেন মুচকি হাসল তাকে দেখে। সুখের মায়া হয় বড্ড। ওই স্নিগ্ধ, কোমল আলো নাকী চাঁদের নিজস্ব নয়।
হঠাৎ মনে হলো সে ছাড়াও ছাদে আরো কেউ আছে। আস্তে করে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে চাইলো। মূহুর্তেই চমকায় সুখ।
বর্ণ রেলিং হেলে দাঁড়িয়ে। শীতল চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সুখের মুখশ্রীতে। কপালের ডানে জখমের চিহ্ন। ঘামে র/ক্ত মিলেমিশে ছুঁইয়ে পড়ছে ভ্রু-রেখার নিচ থেকে। একবিন্দু মোটা ঘাম টুপ করে ছাদের মেঝেতে পড়ল থুতনি বেয়ে। একহাতে ওয়াইনের বোতল।অপর হাত র-ক্তাক্ত।
সুখ দিশেহারা চোখে মেঝেতে তাকায়। কাঁচের গ্লাস চুরমার হয়ে পড়ে আছে। র/ক্তের ছিটা ছিটা দাগ। অচিরেই শরীর ঝঙ্কার দিয়ে উঠল সুখের। র/ক্ত দেখে পুণরায় তেষ্টা পায়।
একপল বর্ণ তো একপল মেঝেতে তাকাতে তাকাতে এক-পা দু-পা পিছিয়ে যায় সুখ। এখানে আর এক মুহূর্ত না।
বর্ণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রয় তার যাওয়ার পানে। ভ্রু-ট্রু বাঁকিয়ে।
•
দ্রুত কদমে করিডোরে চলতি পথে হুট করে লাইট অফ হয়ে গেলো। শিরশির হাওয়া এসে গা ছুঁয়ে যায়।সুখ দুহাতে কাপড় খামচে এগিয়ে যেতে ধরে।
হঠাৎ-ই আচমকা.. একটা শক্তিশালী হাতের বাহু এসে পিছু থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে গলা জড়িয়ে ধরল সুখের। টেনে হিঁচড়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।সে ছটফটিয়ে উঠে। মৃদু গোঙিয়ে নখের আঁচড়ে খামচে ধরে সেই হাত। অথচ লোকটা নিরুত্তাপ।টু শব্দটি ব্যায় করে না।
ছুঁড়ে ফেলার মতো করে রুমে ছেড়ে দেয়া হয় তাকে।দরজা আটকে যায়।শুভ্র আলোয় ভরে যায় রুম-ময়। ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে পিছু মুড়ে সুখ। বর্ণ’র চোখের সাদা অংশ রক্তিম দেখাচ্ছে। সেসব পরোয়া করল না আজ। ছুটে গিয়ে বুকে ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট নেড়ে হাতের ইশারায় বলল,
‘ কাজিন.. কাজিনের মতো থাকবেন! ডোন্ট ক্রস লিমিট। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যখন যেভাবে ইচ্ছে ছুঁয়ে…
কথা সম্পূর্ন না করেই থেমে গেল সুখ। মিইয়ে এসে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় অবিলম্বে।
বর্ণ’র দৃষ্টিতে অল্পবিস্তর হতভম্ব। সুখের ধাক্কাতে দু ধাপ পিছিয়ে গিয়ে হাতের ওয়াইনের বোতল ছিটকে পড়ে ফ্লোরে। বর্ণকে কেমন উম্মাদের মতো দেখাল। ছুটে আসে সুখের কাছাকাছি।হিসহিসিয়ে বলে,
‘ ত্_তুই আমায় ভালোবাসিস ফুল!এই আমায়!আসফিয়ান বর্ণকে!ওই ডক্টরকে বিয়ে করতে কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারিস?’
মুখটা ছুঁতে যায় বর্ণ।সুখ পিছিয়ে গেল তড়িৎ। আঙুল তাক করে বুঝাল,
‘ ডোন্ট টাচ মি!’
বর্ণ নিঃশর্তে মেনে নিল। দুহাতে চুল খামচে ধরে সজোরে মাথা দুলায়।
‘ ওই একবারই তোর মনে বেশী আঘাত দিয়েছি!এরপর তো আর দেইনি, না? সেদিনের পরও তোর চোখে আমার জন্য চমক দেখেছি। এখন দেখতে পাচ্ছি না কেনো ফুল?আর ভালোবাসিস না আমায়?’
উদ্ভ্রান্তের মতো শুনায় তার স্বর।সুখ শক্ত মুখে তাকিয়ে রয়।বর্ণ দু-ধাপ এগিয়ে আসে,
‘ তোকে ডক্টর পছন্দ করে; বিয়ে করতে চায়!এতে আমার কোন ভাবান্তর নেই।তুই তাকে বিয়েতে ‘হ্যাঁ’ বলেছিস।এতেও আমার আফসোস নেই। মাঝে-মধ্যে এমন ভুল হয়েই যায়। আমার দুঃখ একটাই –এই চোখ দুটো…
সুখের চোখে চোখ মেলায় বর্ণ।হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো বলল,
‘ এই চোখের তারায় আমার জন্য আগের সেই ভালোবাসা খুঁজে পাচ্ছি না ফুল।নিথর, নিষ্ঠুর এই দৃষ্টির অগোচরে আমার জন্য একরাশ মুগ্ধতা গুলো কোথায় হারিয়ে ফেলেছিস?বলনা, সেদিনের মতো আরেকবার –ভালোবাসিস আমায়!ফুল..
‘ ওটার নাম ভালোবাসা ছিল না।ছিল অ-মিমাংসিত একটা জঘন্য ভুল।আর সেই ভুলটা এখন আমি শুধরে নিয়েছি।আজ কোনো অনুভূতি বেঁচে নেই আমার মাঝে। বুঝেছেন আপনি রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ?আমি ভালোবাসি না আপনাকে!’
পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নেয় সুখ।বর্ণ দুলছে। স্লিপিং পিল ইফেক্ট। এখন বুঝি চোখ দুটোও বেঈমানি করবে? এতোক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে ছাইপাশ গিলার সময় তো দিব্যি তারা সতেজ ছিল।বর্ণ ধুপ করে কাউচের উপর ঢলে পড়ে। ঘুম ঘুম চোখে মৃদু হেসে তুড়ি বাজিয়ে বলে,
‘ কেউ না জানুক;তুই জেনে রাখ।তুই শুধু আমার বোবাফুল।এর আগে কারো জন্য এমন ভালোবাসার অনুভূতি হয়নি আমার হৃদয়ে।তুই নিজেই আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছিলি। এখন আমায় একলা ধোঁয়াশায় রেখে তুই পালিয়ে যাবি?নো ওয়ে!তুই..’
বাকি কথা শুনল না সুখ।দোর মেলে ছুটে বেরিয়ে আসে করিডোরে।পুরো অস্তিত্ব কাঁপছে।
বর্ণ বিড়বিড় করে সন্তর্পণে চোখ বুজে, -‘ মাই ইনোসেন্ট ফ্লাওয়ার কুইন।তুই জানিস না –ছিনিয়ে নেওয়া আমার ফ্যাশন।সেটা বেশ ভালোই রপ্ত আছে আমার।কিন্তু তোকে জিতে নিতে চাই আমি।অ্যাট এ্যানি কস্ট্!’
#চলবে🥀
|

