#আমার_বোবাফুল(৫১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
|বিবাহ স্প্যাশাল|
কনের আসনে সুখকে বসানো হলো ঘন্টা পেরিয়েছে, অথচ বরের দেখা নেই।আযাদ সাহেব মায়রার নিকট এলেন চিন্তিত মুখে।সাথে তামিজ শিকদার।মায়রার চোখে অশ্রু।এখনি হয়তো ঝরঝর কেঁদে ফেলবে।
‘ আঙ্কেল মেহরাব ফোন ধরছে না আমার।ও_ওর সাথের বন্ধুরা কেউ তুলছে না কল।ও_ওদের কিছু হয়েনি তো!’
‘ সুইচ অফ বলছে।আমিও ট্রায় করেছি!’–তামিজ সাহেব বললেন। ফাঁকে একঝলক মলিন চোখে স্টেজে বসা সুখকে দেখলেন।
‘ বর্ণকে দেখেছিস?ওকে কোনো ব্যবস্থা নিতে বল?’
বড় ভাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে ফট করে তাকালেন তামিজ সাহেব। ভাইপো এবং তার পিতাকে মিলেমিশে কিছু তিক্ত কথা শুনাতে গিয়েও দমে গেলেন।বললেন দাঁতে দাঁত চেপে,
‘ তোমার এক নাম্বার পাজিটাকে সেই ভোর রাতে একঝলক দেখেছিলাম। এরপর তার হদিসটুকুও নেই।’ —অস্ফুট স্বরে বেফাঁস মন্তব্য করলেন মুখ ফস্কে,-‘ এঁকে পয়দা কীভাবে করেছিলে আমি সন্দিহান!’
অল্প আওয়াজের হলেও কর্ণকৌঠরে ঠিকই পৌঁছে গেল পাশের জনের।খুক খুক কেশে উঠলেন আযাদ সাহেব। ঠোঁটে হাত চেপে অতিদ্রুত জায়গা প্রস্থান করলেন বুক ফুলিয়ে।
তামিজ সাহেব মায়রার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন।
‘ চিন্তা করো না মা!আমি বিষয়টি দেখছি!আ_ কোন ইঙ্গিত দিয়েছে মেহরাব?’
মায়রা প্রশ্নাতীত চোখে চায় ভেজা আঁখি পল্লবে। ভদ্রলোক বললেন,
‘ মানে কোথাও জেমে আটকেছে বা অন্যকিছু?’
‘ ন_নাহ!এমন কিছু বলেনি!’ —মেসেজের কথাটা লুকিয়ে গেল।তার বিশ্বাস মেহরাব আসবে। অবশ্যই আসবে এবং বিয়েও করবে।
গুঞ্জন উঠেছে অতিথিদের মাঝে। বরযাত্রী এসেছে ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু বর এখনো এলো না।এমন ঘটনায় অবশ্য গুঞ্জন উঠা অ-স্বাভাবিক কিছু নয়। সূর্যটাও ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে যাচ্ছে। সন্ধ্যে নামবে খানিক পরেই।আযাদ সাহেব লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন, মেহরাবরা যে রাস্তা ধরে আসবে –সেই পথে।
ঠক ঠক আওয়াজের উৎস অবলোকন করে সকলের নজর ঘুরে গেলো একটা অভাবনীয় দৃশ্যে।কনের স্টেজের মুখোমুখি ফ্লোরের মধ্যস্থে হাঁটার উপযুক্ত সরু পথ।তাতে লাল কার্পেট বিছানো।সেই পথে বীরের বেশে টগবগিয়ে ছুটে আসছে লালচে খয়েরী কেশরী ঘোড়া।তার উপর চড়ে আছে বর বেশে বসা সুদেহী পুরুষ।মুখটা টুপুরের আড়ালে বিধায় দেখা দুষ্কর।
প্রতিমায় বিষ্ময় নিয়ে দুহাতে গাউন তুলে স্টেজে থেকে আনমনেই নিচে নেমে এলো সুখ।ঘোড়াটি দিগ্বিদিক ভুলে সরাসরি তার সম্মুখে গিয়ে থমকে গেল আচানক ।ভয়ার্ত মুখে পিছিয়ে যেতে গিয়েও সুখ থম মেরে রয় ।পা দুটো অবশ,এক লহমায় সব শক্তি ফুরিয়ে এসেছে যেমন। আশেপাশের উৎসুক দৃষ্টিগুলো দ্বিতীয় দফায় ঠিক তখনই অত্যাধিক আশ্চর্যে নির্বাক তাকিয়ে রইল, যখন ঘোড়াটি সামনের দু পায়া গুটিয়ে নিচে মাথ ঝুঁকিয়ে সুখকে সম্মান প্রদর্শন করল।সেই সাথে ঘোড়ায় বরবেশে থাকা ব্যাক্তিটিও নিজের মুখ উন্মোচন করল। সুখের কানে ভেসে এলো একটি পুরুষালি মিহি কন্ঠ,
‘ সুইটহার্ট!আই হ্যাভ এরিভড!’
মায়রা ছুটে এসেছিল তড়িঘড়ি। অথচ বরের মুখোশ উন্মোচন হতেই ঠোঁট থেকে স্বস্তির হাসিটা প্রদীপের শেষ আলোর মতো নিভে গিয়ে ভর করল একঝাঁক কৌতুহল,
‘ আপনি বর বেশে? মেহরাব কোথায়?’
ঘোড়ার পিঠ থেকে এক ঝটকায় নেমে এলো আসফিয়ান বর্ণ। বাঁ হাত নেড়ে কাউকে ইশারা করতেই ভিড় ঠেলে একজন বেরিয়ে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল।হাতে হাত ঘঁষে বর্ণ বলল আড়চোখে একপল সুখকে দেখে,
‘ ডক্টরের কথা বলছিলেন?চলে আসবে এখুনি! ওয়েইট অ্যা হোয়াইল!’ —মনে পড়ার ভান করে-‘ ওহ্ হ্যাঁ!বরণ ডালা হাতে রাখুন!’
আযাদ সাহেব এগিয়ে এলেন।
‘ কী হচ্ছে কী এখানে?এমন পোশাকে এসেছো কেনো? বিয়ের শখ উঠেছে হুটহাট?’
‘ হুঁ, সেটাই!’ —ভনিতা ছাড়াই ভাবলেশহীন জবাব। ভদ্রলোক অসন্তোষ নিয়ে আহত চোখে ছেলের নির্বিকার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন অনিমেষ। চাঁদ মুখ ছেলে উনার।
সত্যিই মিনিট দুয়েক পর বরের গাড়ি এসে থামল প্রবেশ দ্বারে।কাজিনরা সব পুণরায় গেইট ধরার লক্ষ্যে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে ফেলল। কিন্তু… থেমে গেল মাঝ পথেই।
মেহরাব নেমে আসে গাড়ি থেকে।তার পাশে,ডান হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে এক বধূ বেশী কন্যা। ঠোঁটে লাজুক হেসে মাথা নত রেখেছে।উপস্থিত সকলে আরেকদফা চমকাল। মেহরাবের ঠোঁটে হাসি নেই।তবু, আশেপাশের উৎসুক দৃষ্টিদের দেখাতে জোরপূর্বক হাসি টানল অধরে।
পথের দু’পাশে সারি করে সাদা-কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ত্রিশাধিক তাগড়া যুবক সটান দাঁড়িয়ে। উপর থেকে ফুলের পাপড়ি ছিটছে রোবটের মতো। গোলাপের র-ক্তিম পাপড়ি গায়ে মেখে সদ্য পদার্পণ করা বর-কনে হেঁটে চলল সামনে।
‘ ভাই কে ও?…’ —অনেক কিছু বলতে চাইল মায়রা। উত্তেজনায়, অস্থিরতায় বেশি কিছু মুখ ফুঁড়ে বের হয়না। মেহরাব ঢোক গিলে জবাব দেয়,
‘ ও জেসি!তোর ভাইয়ের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী!বিয়ে করে নিয়েছি আমরা!’
‘ মেহরাবব!’
‘ স্যরি আপু।মাফ করে দিস আমায়!’
সে হেঁটে তামিজ সাহেবের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল। পিছু উপেক্ষা করে এলো মায়রার বাকরুদ্ধ দৃষ্টি।ভদ্রলোক কথা ভুলে বিহ্বল চোখে তখনো চেয়ে। মেহরাব আড়চোখে খানিকটা দূরে তাকায়।সুখের উপর নজর স্থির হতেই হাসে মলিন। পুণরায় নজর নামিয়ে বলল অপরাধী সুরে,
‘ আম স্যরি আঙ্কেল!আমি কখনোই চাইনি সুখের অবমাননা করতে। কিন্তু…’
‘ বিয়ে করেছো তোমরা?’
‘ হুঁ!’ —উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে স্বল্প শব্দে সায় দেয় মেহরাব।
হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে কপালে হাত রাখলেন তামিজ সাহেব। একবার মেয়েকে দেখলেন, এরপর দেখলেন আশেপাশের কোতুহলী শতাধিক দৃষ্টি সমূহ।বললেন দূর্বল গলায়,
‘ এখন আমার মেয়ের কী হবে?’
মেহরাব কিছু বলার আগে বর্ণ উপস্থিত হয় সেখানে।
‘ চাচ্চু.. তোমার মেয়ের পাশে আমায় কেমন দেখাবে বললে নাতো কখনো?’
‘ মানে?’
‘ ফুলের জন্য আসফিয়ান বর্ণকে উপযুক্ত মনে হয় না তোমার?’
‘ যা তা বলছিস?মাথা গেছে?’
বর্ণ’র স্বর ঠিক এই পর্যায়ে অত্যন্ত কঠোর এবং একনিষ্ঠ হয়,
‘ নোপ.. আম সিরিয়াস মিস্টার তামিজ শিকদার।আজকে, এই মূহুর্তে বিয়ে করবো আপনার একমাত্র মেয়ে সুখ,যে শুধুমাত্র আমার বাগানের পুষ্পরাণী হওয়ার জন্যই ফুটেছিল আজ থেকে বিশ বছর আগে। জানো, ফুলটা বড্ড জেদি হয়েছে আজকাল।অভিমান করেছে আমার উপর।ওকে রাজি করানোর দায়িত্বটা কিন্তু তোমরা কপোত-কপোতীর উপর।’
চাচ্চুর প্রতিক্রিয়া না দেখেই একবার বুকে বুক লাগিয়ে জড়িয়ে ধরে,পাশ কাটিয়ে চলে গেলো বর্ণ;রুবাইয়্যাতের নিকট।কাছে গিয়ে কাম্মাকে একহাতে জড়িয়ে নিরিবিলিতে পা চালাল।সুখ দূর থেকে নির্বাক চোখে দেখে গেল কেবল।বর্ণ কিছু একটা বুঝাচ্ছে ভদ্রমহিলাকে। অল্পক্ষণের ব্যবধানে মলিন মুখটা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে চকচক করে উঠল উনার; দুহাতের আঁজলায় বর্ণ’র মুখটা তুলে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। এরপর দ্রুত কদমে ছুটে এসে তামিজ সাহেবকে টেনে নিলেন আড়ালে।বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে সুখের কাছাকাছি এগিয়ে যায়।
‘ আরে এভাবে ছুটছিস কেনো ফুল! দাঁড়া, পড়ে যাবি!’
রাগের চোটে সুখ পথ দেখছে না দু চোখে। দুহাতে গাউন আষ্টেপৃষ্ঠে তুলে লম্বা কদমে হেঁটে গেল যেদিকে ফাঁকা দেখতে পায়। আশেপাশের অনেক অনেক মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে তাদের। তাতে কী আসে যায়?গাউনের পেছনের বড় অংশটা ফ্লোরে হুটোপুটি খাচ্ছে। বর্ণ’ ধরতে চাইলে তড়িৎ পিছু ঘুরল সুখ।
‘ খারাপ, জঘন্য পুরুষ!খবরদার ছুঁবেন না আমায় কিংবা আমার কোন জিনিস!’
‘ ওখেই ছুঁলাম না।’ — দুহাত উপরে তুলল স্যারেন্ডার করার ভঙ্গিতে,-‘ তবে এই মূহুর্তে তুই না থামলে,কোলে তুলে নিতে দু সেকেন্ড সময় নেবো না,আই সোয়্যার!’
সুখ থামল। ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ছে।বর্ণ সামনে এসে দাঁড়াতেই হামলে পড়ল আচমকা। দুহাতে কলার ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে প্রায় কেঁদেই ফেলল।বর্ণ শীতল চোখে চেয়ে দেখল সব ।টু শব্দটিও করল না।
‘ কেনো করেছেন এমন?’
‘ আমি কী করলাম?বিয়ে তো ডক্টর করে নিয়ে হাজির হলো! সবকিছু তে তুই শুধু আমার দোষটাই খুঁজিস ফুল!ব্যাড ,ভ্যারি ব্যাড!এতো অন্ধ-বিশ্বাস থাকাটাও ভালো নয়!’ —মিছে অভিমান তার কন্ঠে।
‘ কী করলাম মানে?উনি যে কাজটা করে ফিরেছেন,এর পেছনে আপনার হাত নেই? অস্বীকার করবেন?’
‘ অবশ্যই আছে।এতে স্বীকার-অস্বীকারের প্রশ্ন আসছেই বা কোত্থেকে?ডক্টর যাকে বিয়ে করেছে ওর নাম জেসি।জিসানের বোন হয়।ওর সাথে ডক্টরের বিয়ের ফায়সালা তখনই নেওয়া হয়ে গেছে; যখন সে তোকে বিয়ে করার আর্জি জানিয়েছিল,খোদ… শিকদার নিবাসে এসে।’
‘ এতোটা নিচ আপনি?চেনা-জানা ছাড়া, বোঝাপড়া বিহীন, সম্মতি ছাড়াই একটা অপরিচিত মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করলেন?’
‘ সম্মতি?’ —তাচ্ছিল্য হাসল বর্ণ। সুখের কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,-‘ তোর সম্মতি ছিল এই বিয়েতে?’
হতচকিতে তাকায় সুখ। অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে জোরে শ্বাস ছাড়ে, এরপর বুঝাল,
‘ অবশ্যই ছিল! সেদিন নিজ চোখে দেখেছেন নিশ্চয়ই?’
‘ ইয়াহ! অফকোর্স!’ —কাধ ঝাঁকাল ঠোঁট উল্টে। এ্যাশ শেরোয়ানির বুক পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বের করে বাড়িয়ে দিল,-‘ টেইক ইট!’
‘ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম ব্যর্থতা হলো
যাকে অ-কারণে মানুষ মন প্রাণ উজাড় করে
ভালোবেসে, পরে তাকে ঘৃণা করা।
…
আমি পারিনি তাকে একটিবারের জন্যও ঘৃণা করতে।আবারো হেরে গেলাম এই পর্যায়ে এসে।হে খোদা…তুমি তো জানো আমার হৃদয়ে খুব দুঃখ।সেসব কাউকে বুঝাতে পারি না।ক্ষণে ক্ষণে বুকের পাঁজরটা চিরে-ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। তবু, সবার ভিড়ে দিব্যি হেসে যায় বোকার মতো।
…
উনার পাশে অন্য নারীর সংস্পর্শ যেমন আমায় শ্বাস-রুদ্ধকর অনূভুতি দেয়;তেমনি আমিও নিজের পাশে তাকে ছাড়া দ্বিতীয় কোন পুরুষকে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না।
…
বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলো ফিকে হয়ে গেছে বহুদিন আগে।খোদা… অন্য কারো সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়ার অন্তত এক মূহুর্ত আগে নাহয় নিদারুণ শ্বাসরোধ হয়ে আসা মৃ!ত্যু দিও।আমি দুহাত ভরে তাকে গ্রহণ করে নেবো অভিযোগ ছাড়াই!’
পুরো লেখাটা পড়ে শুষ্ক ঢোক গিলল সুখ।এটা সে লিখেছিল ডায়েরী’তে। পরক্ষণে আগুনে জ্বালিয়েও দিয়েছিল।তবে.. বর্ণ’র হাতে পৌঁছাল কী করে?
‘ এটা আমি লিখিনি!’ — কাঁপা হাতে ফিরিয়ে দিল কাগজটা।খানিক পর চকিতে আঙুল তুলে হঠাৎ বলল স্ব-ভাষায়,
‘ আপনি সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন আমার রুমে?’ —রাগে, ক্ষোভে মুখ লাল হয়ে এলো সুখের। লজ্জা, জড়তা, ভয় ঘিরে ধরল একসাথে, আষ্টেপৃষ্ঠে।
এই পর্যায়ে দমে যাওয়ার ভান ধরলো বর্ণ। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা চুলকে মুখের ভেতর গুনগুন করলো কন্ঠ খাদে নামিয়ে,
‘ অবসেন্স কোন সিন দেখিনি, ট্রাস্ট মি সুইটহার্ট।বাট.. সেনসিটিভ.. ইমোশনাল…’
চোখ মুখ খিচে শক্ত করে পাথর অনুরূপ দাঁড়িয়ে গেল সুখ। ঈষৎ লজ্জায় মুখ লুকাতে ইচ্ছে হলো কোথাও?বর্ণ সুর পাল্টে নিল,
‘ মুখ লুকাবি? যাহ্, এই বুকটা তোর নামে শপে দিলাম আজ থেকে!’ — ধূর্ত হেসে বুকের বাঁ পাশে হাত রাখল।সুখ ঠাঁই চোখ খিচে দাঁড়িয়ে। চোখে চোখ রাখার সাহসটা হুট করে গায়েব হয়ে গেল যেনো।
•
‘ কী চাইছো তুমি!’
‘ ফুলকে!’
‘ চাওয়ার শুরুটা কখন থেকে ?’
অকপটে জবাব–
‘ নির্দিষ্ট কোন সময় নেই।ব্যাস, হৃদয় আপনা-আপনি চাইতে লাগছিল ওকে!’
তামিজ সাহেব স্বর গম্ভীর করলেন,
‘ যদি আমার মেয়েকে তোর হাতে না দেই,তো?’
বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। আড়মোড়া ভেঙে বলল–
‘ মিস্টার শিকদার, ফ্ল্যাশব্যাকে যাও!সেদিন তোমায় বলেছিলাম.. আন-ফরচ্যুনেটলি হৃদয় যদি একবার কারো নামে ছটপট শুরু করে। পৃথিবী তছ-নছ করে হলেও আসফিয়ান বর্ণ তাকে নিজের করে নেবে।ট্রায় টু রিম্যামভার!’
‘ ছিনিয়ে নিবি আমার মেয়েকে?’
‘ চেয়ে না পেলে,এটাই একমাত্র উপায়!’ —কাঁধ দুলিয়ে সে নিরুত্তাপ জবাব করে।
আযাদ সাহেব বললেন,
‘ সে-তো তোমায় চায়না!’
বর্ণ এক ভ্রু উঁচাল,-‘ কীভাবে বুঝলে?’
‘ তোমায় চায়না বলেই তো অন্য কাউকে বিয়ে করতে ‘হ্যাঁ’ বললো?’
‘ বুঝোয় তো ড্যাড.. অভিমানী হৃদয়!মান-অভিমান চলছে, এক্সপ্লেইন করতে হবে?’
ভদ্রলোক গলা খাঁকারি দিলেন। গুরুগম্ভীর ছেলেটা আজ হঠাৎ এতোটা বেহায়াপনা হয়ে উঠলো কীভাবে? আশ্চর্যের উপর আশ্চর্য হচ্ছেন দুভাই।
‘ শুরুতে সব ক্লিয়ার না করে এতো নাটকের আয়োজন কেনো?’
‘ ডক্টরের বিয়ে নিয়ে বলছো তো?লেমমি এক্সপ্লেইন… বেচারার বিয়ের বয়স হয়েছে, এরউপর যাকে ভালোবাসে দাবি করছে তাকে আপন করতে না পারার আফসোসে আগামী কতো বছর না জানি বিয়ে-শাদি ছাড়াই একা একা জীবন…’
‘ বর্ণ… মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার!’—আযাদ সাহেব ক্ষেপে গেলেন।এতো হেঁয়ালি বরদাস্ত করা যাচ্ছে না আর।বর্ণ শ্বাস ছাড়ল। কঠিন গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
‘ ফুলের দিকে হাত না বাড়াতে আকারে ইঙ্গিতে বহুবার তাকে বুঝিয়েছি। এখন ডক্টর যদি ইনডিরেক্ট স্পিস না বুঝে সেই ভুলটাই করে বসে; পরিণতি এমনই লেখা থাকবে!এতে আমার কী ফল্ট?’
•
বর্ণ’র সাথে একবার সুখের বিয়ে হলে সারাজীবন শিকদার নিবাসে থাকবে সে। কোথাও হারিয়ে যাবে না। চোখের সামনে থাকবে আজীবন। কথাগুলো রুবাইয়্যাতের মনে অক্ষরে অক্ষরে প্রবেশ করেছে। তিনি এক পায়ে রাজি। কিন্তু সুখ এই বিয়ে কিছুতেই করবে না।
আইজার কাছে গেলেন রুবাইয়্যাত।
‘ আপা বর্ণ যা চাইছে,তুমি সেটা মানবে?’
হাঁসফাঁস করছিলেন আইজা।ছেলের সিদ্ধান্ত যে তিনি মন থেকে মানতে পারছেন না,তা মুখাবয়ব দেখে বুঝতে পারছে রুবাইয়্যাত। বিচক্ষণ মহিলা তিনি;দুঃখ পেলেন কিঞ্চিৎ। সুখের দূর্বলতাকে যে সবাই আড়চোখে দেখছে, ঢের বুঝে গেলেন।
‘ সুখ তুই না ভাইয়াকে ভালোবাসিস?ভাইয়াও তোকে নিজের করতে চাইছে। এখানে তোর আপত্তিটা কিসের সোনা?’ —তুহফা খুব আদুরে স্বরে বুঝাচ্ছে সুখকে। কিন্তু আশানুরূপ কোন প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে না।থম মেরে আছে মেয়েটা। নিশ্চয়ই মন এবং মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে কে জয়ী এখনো হিসেব মেলাতে পারছে না।বর্ণ আসতেই রুম ফাঁকা হয়ে গেল এক ইশারায়, চোখের পলকে।
অন্যমনস্ক বসা সুখের হাত ধরে দাঁড় করাল ঝটপট,
‘ চল.. বিয়ে করব!’
শিলা-পাথরের মতো যথাসম্ভব সর্বস্ব শক্তি খাটিয়ে দাঁড়িয়ে রয় সুখ।এক তুড়িতে তাকে সেভাবে টেনে নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বর্ণ পিছু ঘুরল। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
‘ দাঁড়িয়ে পড়লি কেনো?পায়ে ব্যথা?কোলে নিবো?’
‘ কেমন পুরুষ আপনি? লজ্জা বোধ নেই? আপনার নামের সব অনুভূতি চাপা দিয়ে,সব স্মৃতির পাতা ছাই করে দিয়েছি।তাও জেদ উবেনি আপনার?’
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে খানিকটা সময় স্থির তাকিয়ে থাকে বর্ণ। এরপর বলল,
‘ জেদ? হ্যাঁ জেদ-ই!এমন এক জেদ,যেই জেদে পড়ে তোর প্রেমে হাজার বার মরণ কবুল!’—সুখের হাত ছেড়ে নিজের কপালে হাত ঘঁষে,-‘খুব শখ না শ্বাসরুদ্ধকর মৃ!ত্যুকে বরণ করার?চল আজ তুই আমি আর এক সমাজ মিলেমিশে
মৃ!ত্যুকে বরণ করে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করি!’
‘ মানে?’
‘ বুঝিসনি? ওহ্,আমি তো কিছু বুঝায়-ই নি এখনো!’ —একটা কালো ধরনের দেখতে রিমোট কন্ট্রোলার হাতে নিল।নীলচে বাটন প্রেস করতেই সুখের পেছনের দেয়ালটা জ্বলে উঠল হঠাৎ। ভয়ার্ত মুখে সে তড়িৎ বর্ণ’র নিকটবর্তী হয়ে এলো।যেন বিপদের মূহুর্তে এটিই তার ভরসাস্থল।বর্ণ হাসল। ইশারায় দেয়ালে তাকাতে বলল।
পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছে, পূর্ব-পরিকল্পিত।তাতে ফুটে উঠেছে বাহিরের স্টেজের আলাদা আলাদা কোণা।সেই কোণ গুলোয় অর্থাৎ, স্টেজের নিচে, পৃথক পৃথক টেবিলের তলদেশে বোমা’র মতো কিছু লাগানো,তাতে টাইমার ছুটছে টিক-টক টিক-টক।একেকটার ছবি দেখাতে দেখাতে বর্ণ বলল,
‘ চিনতে পারছিস?এগুলোকে কী যেনো বলে?’
‘ বোম্ব?’
‘ কারেক্ট!’ —বাহবা দেওয়ার মতো সে হাসল,-‘একবার ট্রিগার প্রেস করলেই ব্লা_স্ট! না থাকবে বাঁশ,না বাজবে বাঁশি! তোকেও বিয়ে করতে হবে না আমায়, শ্বাসরুদ্ধকর মৃ!ত্যু সাধও খুব সহজে গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছিস।সাথে আরো হাজার খানেক জান ফ্রি। বেচারি মাসুম মানুষগুলো,বিয়েতে আসাটাই এখন কাল হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে!’
বর্ণ নিজ বক্তব্য শেষে তাড়া দেখিয়ে সুখের হাত আঁকড়ে হাঁটা ধরে ফের,
‘ চল… হাতে সময় খুব অল্প!টাইম শেষের পথে’
সুখ স্তব্ধ বনে আছে।হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে পড়ে মস্তিষ্ক। ফের দাঁড়িয়ে পড়ে।
‘ আবার দাঁড়িয়ে গেলি কেনো?ডিসিশন চেঞ্জ করেছিস?করলে বলতে পারিস!তোর একটা ‘হ্যাঁ’ তে হাজার মানুষের জীবন বাঁচতে পারে!’
‘ ইটস্ অ্যা ব্ল্যাকমেইল?’
‘ সামথিং লাইক দ্যাট!’
নিথর চোখে তাকায় সুখ,
‘ এতোটা নিচে নামতে বিবেকে সায় দিচ্ছে?’
‘ শুধু তোর জন্য!
•
‘ কবুল_কবুল_কবুল!’
পুরুষালী দম্ভ মিশ্রিত তিনটি শব্দে বুক ধড়ফড় করে উঠে সুখের। শিরশির অনূভুতিতে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়।ঝরঝর করে অশ্রু গড়ায় আঁখি পল্লবে। সজোরে ঢোক গিলে মাথা নামিয়ে নেয়।বর্ণ খানিক পাশ ঘেঁষতেই হুটহাট তার কাঁধে মুখ লুকালো। কান্নাদের দাপটে শরীর কাঁপছে থরথর। কেঁদে কেঁদে কাঁধের শেরোয়ানি ভিজিয়ে ফেলল চোখের জলে।বর্ণ কাঁদতে দেয় তাকে। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘ আজকের এই মূহুর্ত থেকে আসফিয়ান বর্ণকে শুধু তার বোবাফুলের নামে লিখে দিলাম; টিল ড্যাথ!’
_____
১/প্রশ্নঃ- মেহরাবের অন্য কারো সাথে বিয়ের রিজন?
বর্ণ’র খেয়ালে এর উত্তর হবে– মেহরাব ভালোবাসে বলেছিল সুখকে।বিয়ে না হলে পরবর্তীতে সুখের জন্য অনুভূতি নিয়ে একা থাকার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।বর্ণ চায়না তার ফুলের জন্য সে ব্যতীত অন্য কেউ ভাবুক,তাকে কল্পনা করুক।তাই তার সংসার বানিয়ে দিয়েছে। মেহরাবের জায়গায় অন্য কেউ হলে ফুলকে ভালোবাসার অপরাধে হয়তো এতো দিনে শাস্তিও ভোগ করে নিতো। কিন্তু বর্ণ মেহরাবের প্রতি সন্তুষ্ট, কেননা ফুলকে সে-ই ট্রিটমেন্ট করে সুস্থ করেছিল।
২/প্রশ্নঃ – বিয়ের দিনই পাত্রী কোথায় পেলো?
উত্তর– মেহরাবের সাথে জেসির বিয়ে সেদিনি বর্ণ ঠিক করেছে। যেদিন মায়রা সুখের জন্য প্রস্তাব রেখেছিল।জেসির পরিবার আর বর্ণ ছাড়া যেটা কারো জানার সাধ্য হয়নি।
#চলবে🥀

