#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১৫
(শব্দসংখ্যা ১১৫০+)
লিলি বিগত কয়েক রাত যাবত ঘুমাতে পারছে না। তার মাইগ্রেনের ব্যথাটা আবার বেড়ে গিয়েছে। অ্যান্টি ডিপ্রেশনের ওষুধ গুলো ঠিকঠাক কাজ করছে না। ক্লান্ত শরীরটাকে কোনোমতে টেনে সে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু ব্যাগে হাত দিতেই বুঝলো ফ্ল্যাটের চাবি হারিয়ে গিয়েছে। সে আবার ধীরে ধীরে তিনতলায় নামলো। তিন তলা সম্পূর্ণটা নিয়ে মেঘলারা থাকে। দ্বিতীয়বার কলিং বেল বাজাতেই মিহির এসে দরজা খুললো। লিলি কিছুটা ইতস্তত করে বললো,
“আসলে আমারে ফ্ল্যাটের চাবি হারিয়ে ফেলেছি। যদি কষ্ট করে এক্সট্রা চাবিটা এনে দিতেন।”
“জি অবশ্যই।”
মিহির তার মায়ের রুম থেকে চাবি এনে লিলিকে দিতেই লিলি কিছু না বলেই তড়িঘড়ি করে দ্রুত উপরে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেলো।মিহির যতই এই মেয়েটাকে দেখছে তত বেশি অবাক হচ্ছে। লিলি নামক এই মেয়েটা যেন মনে হয় পুরো রহস্য দিয়ে ঘেরা। তার মধ্যে খুব কৌতূহল হয় এই মেয়েটাকে নিয়ে। কিন্তু অপরিচিত একজনকে কিছু জিজ্ঞেস করলে কি না কি মনে করবে তাই সে তার কৌতূহল নিজের মধ্যেই দমিয়ে রাখছে।
—————–
আজ নাবিলের বিয়ে মেঘলা কাল রাতেই ফেসবুক ফিডে নাবিলার তানিয়ার হলুদের অনুষ্ঠানের ছবি দেখছে। নাবিলকে তো সে সেই কবেই ব্লক করে রেখেছে কিন্তু তাদের কিছু মিউচুয়াল ফ্রেন্ড আছে তারাই হয়তো ফটোগুলো ফেসবুকে আপলোড করেছে। সত্যি মানুষের ভাগ্য কত আলাদা। এক সময় সে আর নাবিল একসাথে এরকম একটি দিনের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন তারা দুজন দুই পথের যাত্রী। সকাল সকাল রেস্টুরেন্টের ক্যাশে বসে মেঘলা এসব কথাই ভেবে চলেছিল। তার ভাবনার মাঝেই নীরা এসে রেস্টুরেন্টে ঢুকলো।
” কিরে কি নিয়ে এত বেশি ভাবছিস? ”
” কই কিছু নাতো।”
“শোন আমি তোর সেই ছোটকালের ফ্রেন্ড তাই আমি তোকে দেখে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারি যে তুই কখন কি ভাবিস। নাবিলের বিয়ে নিয়ে ভাবছিলি তাই না?
নীরার কথা শুনে মেঘলা তার দিকে কিছু না বলে তাকিয়ে রইলো।
” শোন তুই না বোকা। দেখ নাবিল যদি তোর আগে বিয়ে করে ফেলে তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ায় যে তুই এখনো নাবিলের থেকে মুভ অন করতে পারছিস না তাই তুই বিয়ে করছিস না। ”
” আমি তো অলরেডি নাবিল এর থেকে মুভ অন করে ফেলেছি। এক্সিডেন্টলি তো বিয়েও করে ফেলেছি। যদিও সেটাকে আসলে বিয়ে বলে কিনা আসলে সেটা আমি জানিনা। ”
” এক্সাক্টলি তুই অ্যাক্সিডেন্টলি বিয়ে করিস আর যেভাবেই বিয়ে করিস তুই সামাজিকভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত পুরুষকে বিয়ে করেছিস। যে কিনা নাবিলের থেকে হাজারগুন বেশি যোগ্য। এটা তো এখন নাবিল কে ও জানানো উচিত তাই না। ”
নীরার কথা শুনে মেঘলা তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
” তুই কি বলতে চাচ্ছিস আমি এখন আমার অ্যাক্সিডেন্টলি হওয়া হাসবেন্ডকে নিয়ে নাবিলের বিয়েতে যাবো? ”
” অবশ্যই তোর যাওয়া উচিত। প্রতিবেশী হিসেবে তোর ফ্যামিলির তো সবাই যাচ্ছে ওই বিয়েতে। এখন যদি তুই একা না যাস তাহলে ওরা মনে করবে যে তুই ওর থেকে এখনো মুভ অন করতে পারিস নি। কিন্তু জাস্ট ভাব তুই যদি আজকে আরশাদ ভাইয়াকে নিয়ে ওখানে যাস, বেচারা নাবিল শকড হয়ে ওর বিয়েটাই পুরো ভেস্তে যাবে। ”
” তোর এই আইডিয়াটা ভালো, কিন্তু ভাই একটা ঝামেলা আছে। একচুয়ালি ওই পুলিশের সাথে আমি খুবই খুবই বাজে বিহেবিয়ার করে ফেলেছি। এখন কোন মুখে গিয়ে ওকে বলব আমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের বিয়েতে যাওয়ার কথা।”
” ধ্যাত এজন্যই আমি তোকে বোকা বলি। এখান থেকে সোজা ভালো একটা শাড়ির শোরুমে যাবি। নিজের জন্য একদম বেস্ট সুন্দর দেখে একটা শাড়ি কিনবি। তারপর যাবি হচ্ছে স্যালনে। একদম টিপটপ হয়ে ডিরেক্ট চলে যাবি আরশাদ ফরাজীর অফিসে। তোর এত সুন্দর রূপ দেখে না সে না করতে পারবেই না। ”
” কিন্তু এখানে তো আমার এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। রেস্টুরেন্টের এই সপ্তাহের কোন হিসাব এখনো করাই হয়নি।”
” তো আমি আছি কি করতে? সব আমাকে দিয়ে যা। আমি শেষ করে দেব। ”
” তুই শিওর সব শেষ করতে পারবি তো? ”
” ভাই আমি জানি আমি ছোটবেলা থেকে অঙ্কে একটু কাঁচা। তাই বলে এভাবে অপমান করিস না।”
—————-
সাব ইন্সপেক্টর সাদাত এসে আরশাদের কেবিনে ঢুকলো।
” স্যার একজন মেয়ে এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে ।”
” কারো সাথে তো আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না। কে এসেছে? ”
” স্যার মেয়েটার নাম বলল মেঘলা। বললো আপনার সাথে দেখা করা খুব জরুরি। ”
মেঘলার নাম শুনে আরশাদ কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেল। সে হয়তো কানে ভুল শুনেছে তা ভেবে সে সাদাতকে জিজ্ঞেস করল,
” কি নাম বললে আবার বলো তো?
” স্যার,মেঘলা। ”
” ওকে ওকে।তাড়াতাড়ি ভিতরে পাঠাও।”
কিছুক্ষণ পরেই মেঘলা এসে দরজা ঠেলে আরশাদের কেবিনের ভিতরে ঢুকলো। মেঘলা কে দেখে আরশাদ আরেক দফা অবাক হয়ে গেলো। মেয়েটাকে আজ একদমই আলাদা লাগছে। সিকুয়েন্স এর কালো রংয়ের শাড়িতে মেঘলার সৌন্দর্য যেনো আরো কয়েক গুন বেড়ে গিয়েছে। আরশাদ নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘলাকে বলল,
” তুমি হঠাৎ এখানে? ”
” আপনি কি নেক্সট ৪/৫ ঘন্টার জন্য ফ্রি আছেন? ”
” হ্যাঁ কিন্তু কেনো ?”
এবার মেঘলা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
” আসলে আপনাকে সত্যিটা বলা উচিত। আমার দীর্ঘ দশ বছর যাবত একটা সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আসলে আমি মানুষ চিনতে পারিনি। তাই ঠিক কিছুদিন আগে ওই ছেলেটা আমাকে চিট করেছে। এবং এখন মানে আজকে আমাদের এলাকার আরেক মেয়েকে বিয়ে করছে। ওর ওপর রিভেঞ্জ নিতে আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন। ”
” কি সাহায্য? ”
” আমার হাসব্যান্ড হিসেবে আপনাকে আজকে আমার সাথে ওর বিয়েতে যেতে হবে। আমি জানি এ বিষয়টা আপনার কাছে একটু উইয়ার্ড লাগছে। তারপরও যদি মনে হয় যে আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন তাহলে একটু ভালো হতো। ”
” জাস্ট এইটুকুই? ”
” হ্যাঁ শুধু এটুকুই। ”
” বিয়েতে তো যেতে সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই পোশাকে কিভাবে যাবো? শত হলেও তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের বিয়ে তোমার হাজব্যান্ডকে তো সেরকম মানানসই লাগতে হবে তাই না? ”
” না না পোশাক নিয়ে চিন্তা করবেন না আমি অলরেডি আপনার জন্য স্যুট নিয়ে এসেছি। কথাটা বলেই মেঘলা নিজের হাতে থাকা ব্যাগের দিকে ইশারা করলো। ”
” তুমি আমার সাইজ কিভাবে জানলে? ”
” আদিবকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম। অ্যাকচুয়ালি সরি,আমার জন্য আপনাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ”
” না না ইটস ওকে আমি চেঞ্জ করে আসছি। তুমি চা কফি কিছু নেবে। ”
” না না। আপনি একটু দ্রুত চেঞ্জ করে আসুন তাহলেই হবে।”
আরশাদ মেঘলার হাত থেকে স্যুট নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো। ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই মেঘলার কেনা ব্ল্যাক স্যুট পড়ে আরশাদ ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে এলো। এতদিনে মেঘলা এবার প্রথম খেয়াল করলো আরশাদ দেখতে বেশ সুদর্শন।
————-
সাদাত আর অনন্যা রাবেয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান নিয়ে কথা বলতে আজ ডাক্তার সিনথিয়া জামানের কাছে এসেছে। কথা শুরু করার আগে সিনথিয়া জামান একটু ইতস্তত করে চারপাশে তাকালেন, যেন কথাটা বলার আগে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন।তারপর নিচু স্বরে বললেন,
“একটা ব্যাপার আপনাদের জানানো দরকার…”
সাদাত ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
“কি ব্যাপার?”
ডাক্তার এবার গম্ভীর মুখে বললেন,
“রাবেয়ার মাথার আঘাতটা,এটা কারো দ্বারা দেওয়া বলে মনে হচ্ছে না।”
অনন্যা অবাক হয়ে বললো,
“মানে? তাহলে?”
ডাক্তার সিনথিয়া জামান ধীরে ধীরে বললেন,
“আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ও নিজেই নিজেকে আঘাত করেছে।”
এক মুহূর্তে পুরো চেম্বারটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সাদাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠাণ্ডা গলায় বললো,
“ আপনি কি নিশ্চিত? ওর মাথায় এত জোরে আঘাত।এটা কেউ না মেরে ও নিজে করবে, এটা কীভাবে সম্ভব?”
ডাক্তার শান্তভাবে বললেন,
“দেখুন, মাথার ক্ষতটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। আশেপাশে কোনো ডিফেন্স ইনজুরি নেই মানে আত্মরক্ষার কোনো চিহ্ন নেই। আর দেয়ালে যে রক্তের হাতের ছাপ পেয়েছেন, সেটাও মনে হচ্ছে ও নিজেই আঘাতের পর দেয়ালে ভর দিয়ে ছিল ।”
অনন্যা অবিশ্বাসের সুরে বললো,
“কিন্তু ঘরটা তো এলোমেলো ছিল! চেয়ার উল্টানো, জিনিসপত্র ছড়ানো একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা।”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন,
“ওগুলো স্টেজড হতে পারে। অনেক সময় পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে মানুষ এমন কিছু করে, যেন ঘটনাটা অন্যরকম দেখায়।”
সাদাতের চোখে এবার তীব্র সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠলো।
“আপনি বলতে চাইছেন, ও নিজেই সব সাজিয়েছে? নিজের মাথায় আঘাত করেছে, তারপর নিজেকে মৃতের মতো ফেলে রেখেছে?”
ডাক্তার একটু থেমে বললেন,
“আমি বলছি এটা সম্ভাবনা। আরেকটা বিষয় ওর রক্তে আমরা কিছু ট্রেস পেয়েছি।”
“কিসের ট্রেস?”
“হালকা ড্র্যাগস । খুব বেশি না, কিন্তু এটা এমন একটা ড্র্যাগস যে মানুষ মানসিক ভাবে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।”
“মানে কেউ ওকে আমরা যাওয়ার আগেই এই ড্র্যাগস দিয়েছে?”
ডাক্তার বললেন,
“এটা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ও নিজেও নিতে পারে, আবার কেউ দিয়েও থাকতে পারে।”
ডাক্তারের কথা শুনে সাদাত আর অনন্যা একে অপরের দিকে হতাশাগ্রস্ত চোখে তাকালো। কেসটা এতো জটিল কেনো? যখনই একটা দিক সলভ হয় তখনই আবার আরেকটা দিকে প্যাচ লেগে যায়।
চলবে……
(অনেকদিন পড়ে লিখলাম। ঈদের ছুটিতে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। সম্পূর্ণ গল্পের লিংক কমেন্টে দেয়া আছে।)

