আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১৭

0
40

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১৭

নিজের সাথে থাকা বড় ট্রলি ব্যাগটাকে টেনে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে আনলো ডাক্তার সিনথিয়া জামান। অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার আগে আশেপাশে বেশ ভালো মতো দেখে নিয়েছে। বলা তো যায় না কখন কার চোখে পড়ে যায়। ট্রলি ব্যাগটাকে সে তার বাসার স্টোর রুমে নিয়ে আসলো। ট্রলি ব্যাগটার চেন খুলে ভিতর থেকে মোতালেব সর্দারকে বের করে আনলো। সাথে সাথে তাকে চেয়ারের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে বেধে দিলো । চেয়ারের সাথে ইলেকট্রিক শকের লাইনগুলো ও সেটআপ করে দিল। ক্লোরোফর্মের ইফেক্ট কেটে যেতেই মোতালেব সর্দার জেগে উঠলো। প্রথমে জেগে উঠে সে বুঝতে পারল না সে এখন কোথায় আছে। তবে সামনে বসে থাকা সিনথিয়া জামান কে দেখে সে আরও বেশি অবাক হল। এই মহিলা এখানে কি করছে? একে তো সেদিন সে পুলিশ স্টেশনে দেখেছে।

” ওহ তার মানে আপনারা পুলিশ?আপনারাই আমাকে এখানে এনেছেন? কতবার বলবো আমার নিরাপত্তার কোনো দরকার নেই। তারপরও আমাকে বেহুশ করে এখানে নিয়ে এসেছেন। কোন শয়তানের এত সাহস আছে যে মোতালেব সর্দারকে মারবে? ”

এবার ডাক্তার সিনথিয়া কিছুটা বাঁকা হাসি হেসে বললো,

” তা ঠিক বলেছিস তুই। কোন শয়তান আছে আবার যে তোর থেকেও বেশি নিকৃষ্ট? ”

সিনথিয়া কে এভাবে তুই-তোকারি করতে দেখে মোতালেব সর্দার কিছুটা ভড়কে গিয়ে বললো,

” এই মেয়ে তুমি কে এরকম তুই-তোকারি করছ কেন? সেদিনের সেই স্যার কে ডাকো। রাত বিরাতে আমরা সাথে এসব কেমন ফাজলামি?”

” তোর স্যার অলরেডি তোর কিডন্যাপ হওয়ার খবর পেয়ে গেছে। ”

” কিডন্যাপ মানে? মানে কি?”

” তুই ভুল ভাবছিলি এতক্ষণ ,আমি কোন পুলিশের লোক না। আমি তোর যম। তোর করা সব পাপের শাস্তি তোকে দিতে এসেছি।”

” এই মেয়ে তুমি এসব কি বলছ আমি কবে কোন পাপ করেছি। ”

” আহা ভুলে গেলি এত তাড়াতাড়ি? চট্টগ্রামের বদরুল হাসানের নাম মনে আছে তোর? ”

” মানে? মানে কি? এই তুই কে?তুই এসব কিভাবে জানিস? ”

” আহা তুমি থেকে তুই তে এসে পড়লি। আস্তে আস্তে সব বলব তোকে।তোর বাকি সাথীদের ও বলেছিলাম। একদম তোর মৃত্যুর আগে তোকে সব কিছু বলব যে আমি কে? ”

সিনথিয়া জামান নিজের হাতে থাকা ইনজেকশনটা মোতালেব সর্দারের শরীরে পুশ করে দিল। ইনজেকশনটা পুশ করতেই মোতালেব সরদার ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পরল। ঠিক পর মুহূর্তে সিনথিয়া জামানের ফোনটা বেজে উঠলো। অপর পাশ থেকে এক নারী কণ্ঠ বলে উঠলো,

” সব কাজ ঠিকঠাক ভাবে হয়েছে? ”

” হ্যাঁ সব ঠিক আছে। ”

” শয়তানটা কি করে এখন?”

” ইনজেকশন দিয়েছি। অচেতন হয়ে আছে। ”

” গুড। এখন ওকে কোনো টর্চার করো না কাল সকালে আমি আসি,তারপর যা হবার হবে। ”

” কিন্তু একে এতক্ষণ রাখলে পুলিশ যদি আমাদের খোঁজ পেয়ে যায়। ”

” পাবে না। তোমাযর অ্যাপার্টমেন্টে সব ভিআইপি পার্সন থাকে। পুলিশ ভুলেও ধারণা করতে পারবে না যে ও এখানে আছে।”

” ওকে,রাখছি আমি।

——————–

মাছ ভাজা শেষ করে ইরিনা তরকারির জন্য মসলা কষাচ্ছিল। এর মধ্যেই আদিব তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল।

” কি করছে আমার বউটা? ”

” তার জামাইয়ের জন্য রান্না করছে? ”

” প্রায় দুইটা বাজে। রান্না করতে এত দেরি আজ? ”

” আর বলো না বাসায় সেই সন্ধ্যা থেকে গ্যাস নেই। চিন্তা করলাম ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করব তখন দেখি হুট করে কারেন্ট চলে গিয়েছে। আধাঘন্টা আগে কেবল আসল। ”

” কি বলো তুমি এতক্ষণ যাবত না খেয়ে আছো? ”

” আরে না ফ্রিজে কিছু ফ্রুটস ছিল সেগুলো খেয়েছি। তুমি তো হসপিটাল ঠেলে কেবল ফিরলে তোমাকেও কিছু ফ্রুটস কেটে দেই? ”

” আরে না। আটটার দিকে কলিগদের সাথে কাচ্চি খেয়েছিলাম। রান্না শেষ করো তারপর একবারে ভাত খাবো। ”

ইরিনা আর আদিবের বিয়ের পড়ে তাঁরা আদিবের হসপিটালের কাছাকাছি এই ফ্ল্যাট এ শিফট হয়েছে। যদিও তাঁরা দুইজনে প্রতি শুক্রবার বাসা থেকে গিয়ে ঘুরে আসে। তাঁদের আলাদা সংসার নিয়ে এই যুগের টিপিক্যাল শাশুড়িদের মতো মিতু ফরাজীর কোনো আপত্তি নেই। বরং সে আরো খুশি। সে ইরিনাকে তার সংসার নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে বলেছে। আলাদা সংসার হলেও প্রায় কয়দিন পর পরই সে ইরিনার জন্য বাসা থেকে এটা সেটা রান্না করে পাঠাতে থাকে।

——————

নাবিলের মা লাজু বেগম নাবিলের রুমের দরজা বেশ জোরে জোরে ধাক্কাতে লাগলো। তানিয়া দরজা খুলে তাকে জিজ্ঞেস করল,

” এত জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছেন কেন মা? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর প্রাইভেসি বলেও তো কিছু একটা আছে? ”

এবার নাবিলের মা কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বলল,

” ইশ, তোমাদের যে কত প্রাইভেসি লাগে। যে ছেলেকে নিজের পেটের নয় মাস রেখেছি তার আবার প্রাইভেসি কিসের। আমাদের সময় তো রাতের বেলাও দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে পারতাম না। ”

তানিয়া বুঝতে পারলো যে এনার মতো অশিক্ষিত মানুষের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। এবার লাজু বেগম নিজের হাতের মুঠো থেকে একটা স্বর্ণের চেন বের করে এনে তানিয়াকে বললো,

” এটা তো তোমার বাবার বাসা থেকে এনগেজমেন্টে নাবিলকে দিয়েছে তাই না? ”

“জি, মা।”

” এটা কত ক্যারেট? ”

লাজু বেগমের প্রশ্ন শুনে তানিয়া কিছুটা ভড়কে গেল। সে ইতস্তত করে উত্তর দিলো,

” ২২ ক্যারেট মা। ”

” বোকা বানাও আমাকে।এটা ১৮ ক্যারেটের চেন। আমি কেবলমাত্র মহল্লার সামনের ওই স্বর্ণের দোকানটা থেকে চেক করিয়ে আনলাম।”

লাজু বেগমের উচ্চকণ্ঠ শুনে নাবিল ও ইতোমধ্যে রুম থেকে বের হয়ে এসেছে। সে ঘুমঘুম চোখে জিজ্ঞেস করল,

” কি হয়েছে মা সকাল সকাল চেঁচামেচি করছো কেন?”

” সব আমার কপাল। তোকে তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে ঠকিয়েছে। ২২ ক্যারেটের কথা বলে ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ দিয়েছে। ”

মায়ের কথা শুনে নাবিল এবার তানিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখল সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নাবিলের আর বুঝতে বাকি রইল না যে স্বর্ণ নিয়ে নয় ছযয়ের ব্যাপারে তানিয়া আগে থেকেই জানতো। সে তার মায়ের হাত থেকে চেনটা নিয়ে তানিয়ার হাতে দিয়ে বলল,

“তোমরা বলেছিলে ২২ ক্যারেটের চেইন দিয়েছো। তাহলে এটা ১৮ ক্যারেট হলো কিভাবে? যাই হোক এখন তুমি তোমার বাবার বাড়ি যাবে, আর ১৮ ক্যারেটের বদলে ২২ ক্যারেটের চেন নিয়ে আসবে। ”

নাবিলের কথা শুনে তানিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিয়ের পর প্রথম দিন সকালেই তার মনে হতে লাগলো যে সে একটা ভুল মানুষকে বিয়ে করেছে।

——————

রওনক আজ ও মেঘলা রেস্টুরেন্টে এসেছে। রওনক রিলাক্স এ খাচ্ছিল আর মেঘলা তার সাথে বসে গল্প করছে। এই কয়দিনে ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তাইতো রওনক এখন অনলাইনে অর্ডার না করে প্রায়ই রেস্টুরেন্টে আসে।

আরশাদের আজ মেঘলার রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি একটা জায়গায় কিছু কাজ ছিলো। দুপুরের খাবারের সময়ও হয়ে গিয়েছে তাই সে চিন্তা করল বাঙালিয়ানাতেই আজকে সে খাবে। এই সুযোগে নিজের সুন্দরী বউটাকে কিছুক্ষণ মন ভরে দেখেও নেবে। কিন্তু রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই তার চোখ কপালে উঠে গেল। এই সিঙ্গারের সাথে তার বউ এত হেসে হেসে কথা বলছে কেন? এত সুন্দর করে তো তার বউ তার সামনেও কখনো হাসে নি। সে বেশ নিঃশব্দে হেঁটে মেঘলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। রওনক তাকে দেখে বলল,

“আরে অফিসার আপনি এখানে? আবার যেতে হবে নাকি ইনভেস্টিগেশন এর জন্য?”

রওনকের বলা কথা কথা শুনে মেঘলা আরশাদের দিকে তাকালো। সে কৌতূহলের সাথে আরশাদ কে জিজ্ঞেস করল,

” আরেহ আপনি এখানে? আর আপনারা একজন আরেকজনকে চেনেন নাকি? ”

” হ্যাঁ কেসের ব্যাপারে একবার দেখা হয়েছিল। বাট জানতাম না যে রওনক হাসানের আমার বউয়ের সাথেও পরিচয় আছে।”

আরশাদের কথা শুনে এবার রওনক অবাক হয়ে বলল,

” আপনি ওনার হাজবেন্ড? আসলে উনার মুখে কখনো আপনার কথা শুনিনি তাই জানতাম না। বাট বলতে হবে আপনার একদম পারফেক্ট একটা জুটি। দুইজনেই ট্যালেন্টেড। ”

আরশাদের মুখে বউ ডাকটা শুনে বা মেঘলা তার দিকে কটমট করে তাকালো। মেঘলা মনে মনে ভাবলো, এই লোকটা কালকে থেকে কি লাগিয়েছে? নিজেকে আমার স্বামী প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here