#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_২১
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ_দুআ
[🚫কপি করা নিষেধ ]
আপনি আমাকে সিডিউস করছেন?অবশ্য না করলেও আমি তো হচ্ছি।এভাবে শেয়ালের সমানে মুরগীর ভঙ্গিতে ভুলেও তাকিয়ে থাকবেন না।ভুল টুল হয়ে গেলে তখন?
কি বললো লোকটা এটা।কি ছিলো কথাটার ভিতরে।শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো প্রিয়ার।নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো এক মূহুর্ত।চোখ বড় বড় করে তাকালো।
আকাশের চোখে চোখ রাখতেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।এ চোখে সে কখনোই তাকাতে পারেনা।আগেও পারেনি,আজও পারছে না।চোখ সরিয়ে নিলো।শরীরটা ঘেমে ভিজে গেছে,জামাটা আটকে আসছে শরীরের সাথে। কি সমস্যা! লোকটা সরছে না কেনো ওপর থেকে।ধাক্কা দিয়ে সোজাও করতে পারছে না,নিজের গায়েই শক্তি পাচ্ছে না।হাত পা অবশ হয়ে গেছে পুরো।
আকাশ আরেকটু ঝুঁকলো নিচের দিকে।প্রিয়ার ইচ্ছে হচ্ছে মাটি খুড়ে ভিতরে চলে যেতে।
প্রিয়া তাকতে চাইলো আকাশের দিকে।পারলো না।চোখ নামালো।চোখ আটকে গেলো সুন্দর শিল্পির আকা শিল্পের মতো পেটানো ছয় খন্ড ওয়ালা শরীরের দিকে।
মনটার ভিতর একপ্রকার ঝড় উঠেছে,এই অসভ্য মনটা এবার আরেকটা কথা বলছে।দুষ্টু কথা বলছে।হাত ছোঁয়াতে ইচ্ছে হচ্ছে পেশিগুলোতে।দু হাতে আকড়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে মানুষ টাকে।বুকের ঝড় থামানোর উপায় তো ওই একটাই,মানুষ টার মাথাটা বুকের বা পাশটায় চেপে ধরা।কিন্তু সেটা তো পারছে না সে।কি করবে এখন।প্রিয়ার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে কেনো এখন আবার।
আকাশ পলকহীন তাকিয়ে আছে প্রিয়ার মুখ খানায়।তিরতির করে কাপছে পাতলা ঠোঁট জোড়া।চোখের পাতা বুজে বুজে আসছে।ভুলেও তাকাচ্ছে না তার চোখে।এদিক সেদিক দৃষ্টি রাখার বাহানা করছে।চুলগুলো ছড়িয়ে আছে তার বিছানায়।মেয়েটা আজকাল তাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে। এমন চললে বেশিদিন সে নিজেকে কনট্রোল করতে পারবে না অসম্ভব। সেও তো মানুষ। পুরুষ মানুষ। দিনের পর দিন প্রিয় নারী যদি সময় অসময় এমন কাছে এসে নারীত্বের প্রকাশ করে সে কিভাবে আটকে রাখবে নিজেকে।দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।চট করে সোজা হয়ে দাড়ালো।
“উঠে এসো।”
“হ্যা?”
প্রিয়ার কাঁপা গলায় আকাশ দারুন মজা পেলো।মুখে আসা টুকু সযত্নে গিলে নিলো।
স্বাভাবিক গলায় বললো,”বললাম উঠে এসো।নাকি বেড টা পছন্দ হয়েছে।এখানেই থাকতে চাও?”
প্রিয়া ঝটপট উঠে বসলো।গায়ের ওড়না ঠিক আছে কিনা দেখে নিলো।এক হাতে ঠিক করে নিলো ওড়নাটা।মুখের ওপরের চুলগুলো আলতো হাতে কানে গুঁজলো।
“সরুন রুমে যাবো।”
“আমি জোর করে এনেছিলাম?নাকি একা একাই এসেছো?”
“আ…আ..আমি..আসলে…”
আকাশ ভ্রু তুলে তাকিয়ে রইলো।
“আমি কি?”
“আপনি খেয়েছেন দুপুরে? এসময় তো বাসায় আসেন না।এসেছেন যখন খেয়েছেন কি না তাই জানতে এসেছিলাম আরকি।” মিনমিন করে কথাগুলো বলে থামলো প্রিয়া।
আকাশের বুকের ভিতর ধকধক শব্দ গুলো জোরালো হলো।মেয়েটার এতটুকুন খেয়ালেই তার কেমন একটা প্রশান্তি হচ্ছে।
এদিক ওদিক তাকালো কিছুক্ষণ। কিছু একটা খুঁজলো বোধহয়।চোখে পরলো একটু দূরে।দু পা এগিয়ে শার্টটা হাতে নিলো।সোজা হয়ে শার্ট টা গায়ে জড়ালো।এক মূহুর্তও প্রিয়ার দিক থেকে চোখ সরালো না।প্রিয়া একেবারে লজ্জায় জবুথবু হয়ে আছে।তওবা করছে আর জীবনে যদি এই অসভ্য লোকটার সামনে আসে।
প্রিয়া উঠে দাড়তেই আকাশ সরে দাড়ালো।প্রিয়া অবাক হয়ে গেলো,কি ব্যাপার, লোকটা আজ এতো সহজেই আগ বাড়িয়ে যেতে দিচ্ছে।এ লোকের তো অল্প সময়ে নখড়া তে মন ভরে না।দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে যেতে গিয়ে টান পরলো ওড়ানাটায়।চোখ বড় বড় করে থমকে দাড়ালো প্রিয়া।খপ করে গলার কাছটায় চেপে ধরলো।কিছু বলার আগেই ঘাড়ের কাছটায় গরম নিঃশ্বাস এর অস্তিত্ব টের পেলো।শিরশির করে উঠলো পাতলা শরীরটা।পেটের ভেতর হাজারটা প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে।আকাশ স্পষ্ট মেয়েটার কাঁপন টের পেলো।মুখটা প্রিয়ার কানের কাছে নিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“শেষ ওয়ার্নিং দিচ্ছি মেয়ে, আমার সামনে হুটহাট এমন চুল খুলে একদম চলে আসবে না।আর তোমার ঠোঁট টা কামড়াকামড়ির স্বভাব আপাতত পারমানেন্ট মালকিন এর অধিকার আমি না পাওয়া পর্যন্ত মুলতুবি রাখো।”
এ লোকটার কোনো কথাই প্রিয়ার মাথা ঢুকতে চায়না।কি বলে কিচ্ছু সহজে বোঝে না সে।অথচ হা পা ছেড়ে দেয় কেমন জানি,শক্তি পায় না হাতে পায়ে।এইযে স্বাভাবিক একটা কথা বললো অথচ তার মাথাখানা ঘুরে উঠলো কেমন জানি।
মিনমিনিয়ে বললো,” হ্যা?বুঝলাম না।”
” কম যে বোঝো সেটা আমি খুব ভালো করে জানি।তোমাকে জিন্দেগী ভর খাতা-কলমে স্বরবর্ণের উচ্চারণ শেখাতে নাহলেই হয়।”
কি আশ্চর্য, সে তাকে স্বরবর্ণ শেখাবে কেনো।আজ বাদে কাল হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করবে।সে কি স্বরবর্ণ পারে না নাকি।লোকটা আসলেই যা তা।
গাল ফুলালো প্রিয়া,”স্বরবর্ণের উচ্চারণ এখন তিন বছরের ছোট বাচ্চাও জানে।”
আকাশ বাঁকা হাসলো।ঘুরে থাকার দরুন সে হাসি প্রিয়া দেখতে পেলো না।স্পষ্ট আকাশের অস্তিত্ব খুব কাছে টের পাচ্ছে।
আকাশ হাস্কিস্বরে বললে,”উহু,এ উচ্চারণ সে উচ্চারণ নয়।মাখরাজের মতো টানের ব্যাপার আছে।”
মহা সমস্যা। এখানে আবার মাখরাজ আসলো কোত্থেকে।সে তো মাখরাজও জানে।লোকটার বাংলা নিয়ে এতো আগ্রহ কেনো হুট করে।
“আপনি কি বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন?”
আকাশ প্রিয়ার বোকামি বুঝলো।
“নাহ তো।তবে ম্যাডাম, এই টান শিখতে বাংলা নিয়ে ডিগ্রি থাকা লাগে না।যে আপনাকে শেখাচ্ছে তার পারফরম্যান্স এর ব্যাপার থাকে।তাছাড়া সময় এলে এ শব্দ আপনাআপনিই উচ্চারণ করবে।চাপ নেই।ও তুমি বুঝবে না।উচ্চারণ করা হয়নি তোমার মুখ থেকে এখনো।”
প্রিয়া মনেপ্রাণে বোঝার চেষ্টা করছে কথাগুলোর মানে।মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তাকে পড়াশোনা নিয়ে খোটা দিচ্ছে নাকি!
“কি যা তা বলছেন।আমাকে অশিক্ষিত মনে হয়।বলবো অ আ?”
” বললাম তো টানের ব্যাপার আছে বিষয়টায়।”
প্রিয়া এবার মুখ বাকালো।গলার আওয়ার দৃঢ় করলো খানিকটা।
“শেখান দেখি তাহলে।”
আকাশের শব্দ করে হেসে ফেলতে ইচ্ছে হলো।
“ক্ষেপেছো!নাকি আমাকে পাগলা কুকুরে কামড়েছে।এই ক্লাসের জন্যেও টাইমিং এর দরকার হয়।যেখানে সেখানে দাড়িয়ে সেখানো যায় নাকি।আমার হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে চাও নাকি!”
এ কি কথা!এখানে হার্ট অ্যাটাকের সম্পর্ক কি!
“আপনার থেকে ভালো উচ্চারণ পারবো আমি।”
“সাবাস,এটাই তো দরকার। প্র্যাকটিস করতে থাকো বোকাপাখি…যেদিন পড়া ধরার ঠিক ধরবো।তারপর ডেইলি তালিম দেওয়াবো।”
ওড়না ছেড়ে দিলো।ঘাড়ের ওপর থেকে নরম নিঃশ্বাস সরে যেতেই হাফ ছাড়লো।থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো।
“যাও।খেয়ে নাও।”
প্রিয়া দাড়ালো না আর। টালমাটাল পায়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।আকাশ শব্দ করে দরজা আটকালো। এবার শব্দ করে হেসে ফেললো আকাশ।মেয়েটা ওর সামনে আসলেই জব্দ হয়ে যায়।দারুণ লাগে তখন ওর।
প্রিয়া খেতে নামলো না।এতকিছুর পর খাওয়ার ইচ্ছা থাকে নাকি! ইশশ কান দিয়ে গরম ধোয়া বের হচ্ছে।
পড়াশোনা তো লাটে উঠেছেই এই অসভ্য লোকটার জন্যে। এমন চলতে থাকলে পরীক্ষায় পাশ নাম্বার ও তোলা মুশকিল,এক্সাম হলে প্রশ্নের বদলে এই লোকটার মুখ ভেসে উঠবে,অক্ষর গুলো নড়াচড়া শুরু করবে।একশ পার্সেন্ট সম্ভাবনা আছে তার
।এই ভূত আপাতত কিছুদিন এর জন্য মাথা থেকে না নামালে সবকিছুর বারেটা বেজে যাবে নিশ্চিত।
***
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। খালি মাথায় খোলা আকাশের নিচে দাড়ালে নিমিষেই শরীর ভিজিয়ে দিতে সক্ষম।শিয়া সেই বৃষ্টি তে দু ঘন্টা যাবৎ হাঁটছে। আকাশ এর সাথে কথা বলার পর রেস্তোরাঁ থেকে বেড়িয়ে থেকে হেঁটে যাচ্ছে। গায়ে ডার্ক ব্লু কালার একটি চুরিদার।মাথার চুলগুলো আলগা করে বেণি করে রাখা।বৃষ্টির তোড়ে জামাকাপড় ভিজে একসাড়।গাড়ির তীব্র হর্ণে চমকে তাকালো সে।প্রায় মাঝরাস্তায় চলে গেছিলো সে।এতক্ষনে ঘোর কাটলো তার।রাস্তার কিনারায় যাত্রী ছাওনির সিটে বসলো।হাতের ঘড়িটার দিকে তাকালো।বিরক্তিতে কপাল কুচকে আসলো।ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে।নিশ্চয়ই বৃষ্টির পানি ঢুকেছে।মনটা খারাপ হয়ে গেলো সাথে সাথে
ঘড়িটা গত জন্মদিন এ প্রিয়া গিফট করেছিলো।বোনটা বারবার করে বলে দিয়েছিলো যাই হোক না কেনো,যত দামি ঘড়িই আবার সে কিনুক বা উপহার পাক এটা যেনো হাত থেকে কখনো না খোলে।মেয়েটা তার স্কলারশিপ এর টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছিলো কি না।ঘড়িটা দোকানে নিয়ে ঠিক করে ফেলতে হবে,প্রিয়াটা জানলে নিশ্চয়ই মন টা খারাপ করবে।ঘড়িটা হাত থেকে খুলে ব্যাগে রেখে দিলে।ব্যাগ টা ওয়াটারপ্রুফ হওয়ায় পানি যায়নি।ব্যাগ হাতড়ে ফোনটা বের করে সময় দেখে নিলো।
সাড়ে তিনটা বাজে।এতক্ষণ খেয়াল না হলেও এখন প্রচন্ড ঠান্ডা লাগছে। অনেকক্ষণ ভেজার ফল এটা।প্রিয়ার কল ভেসে উঠতেই তাড়াহুড়ো করে কল ব্যাক করলো শিয়া।অনেকক্ষণ আগে বেশ কয়েকবার কল এসেছিলো।কোনো দরকার কিনা।
দু বার রিং হতেই কল তুললো প্রিয়া।জানালো রিমির বাসায় যাওয়ার জন্য কল করেছিলো।বোনের সাথে কথা শেষ ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে দু হাত সিটে রেখে বসলো শিয়া।দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা।বৃষ্টির গতি বেরেছে,সাথে বাতাসও।রাস্তায় খুব একটা গাড়িঘোড়া চোখে পড়ছে না।এ রাস্তাটাই এমন।রাস্তাটা বললে ভুল হবে,এ এলাকা টাই এমন।আজ সারাদিন অফিস গেলো না,এর কৈফিয়ত কি দেবে সে।যাও দেবে সেটা দিতে হবে অয়নের কাছে।বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠলো।
চোখের সমানে ভেসে উঠলো পুরানো ছবি গুলে।কি দারুণ ছিলো সে মূহুর্তেগুলো।এক জীবনে এতো সুখ তার কপালে আসবে কখনো কল্পনা করেনি সে।আর না তো কল্পনা করেছিলো যেটা শেষে ঘটেছিলো।সেদিন এর পর জীবনটাই বদলে গেলো কেমন একটা।বাবা মা তাদের দু বোনের নিরাপত্তার কথা ভেবে চলে আসলেন এখানটায়,যোগাযোগ বন্ধ করলেন পুরানো সবার সাথে। সে নিজেও আর না করেনি তখন,না করার মুখ তার ছিলো কি!ছিলো না।তার ভালোবাসার অন্ধ বিশ্বাসে যদি তার বোনটার গায়ে কলঙ্ক লেগে যেতো,কি করে ক্ষমা করতো সে নিজেকে।
বাচ্চা ছিলো তখন প্রিয়া টা।ওইদিন এর পর মানসিক ট্রমা তে অয়ন কে একপ্রকার ঘৃণার খাতায় ফেলে দিয়ে ভুলতে চেয়েছিলো সে।
কিন্তু… শিয়া চোখ দিয়ে টপটপ করে কয়েকফোটা পানি কোলের ওপর পরে।আকাশের কথা গুলো একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়।সে মুখে যতই না করুক,তার মনটা তো অন্য কথা বলে সবসময়। একদম উল্টো কথা বলে।মনের বিচারে সে অয়নকে ভুলতে পারেনি,না তো ঘৃণা করতে পেরেছে।সত্যিই তার মন বলেছে যা হয়েছে, যা সে দেখেছে সবটা মরিচীকা ছিলো।কিছু একটা চোখে পড়েনি না।কি সেটা!
শিয়া দু হাত মুখ চেপে ধরলো।চোখের পানি মুছে ফেললো।জোরে জোরে শ্বাস নিলো।যা নিজের চোখে দেখেছে সেটা অবিশ্বাস করবে সে?পরমুহূর্তেই আবার মন একই কথা বললো।সেটা যদি মরিচীকাই হয়,তাহলে নিজের চোখে দেখা না দেখার কি সম্পর্ক!
চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।কি করা উচিত। কাকে বলা উচিত তার এ পরিস্থিতি। কি সিদ্ধান্ত নেবে সে।এতবছরেও সে একবিন্দু বেড়িয়ে আসতে পারেনি ওই সম্পর্কটা থেকে।একটা সময় যখন অয়নের প্রেম, বিয়ের কথা কানে এসেছিলো সেদিন দারুণ হেসেছিলো সে।দুঃখের হাসি,হেরে যাওয়ার হাসি,ঠকে যাওয়ায় হাসি।ভেবেছিলো সেও এক না একদিন বেড়িয়ে আসবে সব থেকে।
বাবা মা বিয়ের জন্য চাপ দিলেও সে সময় চেয়ে নিয়েছে বারবার। আজ সবটা আবার ধোয়াসা।অয়ন বিয়ে করেনি,আবার তার কাছে এসেছে ক্ষমা চাইতে,ফিরিয়ে নিতে,অন্য কোনো নারী ছিলো না।এসব কি হচ্ছে তার সাথে। শিয়া উঠে দাড়ায়।পা টলমল করে ওঠে।সারাদিন না খাওয়া,তার ওপর এতো এতো মানসিক, শারিরীক চাপ।
বড্ড ক্লান্ত লাগে আজকাল।বাবা মা চলে যাওয়ার পর তো আরও।আগে তাও সারাদিন এর ক্লান্তি শেষে মায়ের কোলে মাথাটা রাখতে পারতো দু বোন।এখন!এখন সে একা হয়ে গেছে একদম। প্রিয়া টা এখনো ছোট।ইমম্যাচুয়র,তার ওপর সামনে ওর জীবনের এতো বড় লড়াই,এর মধ্যে নিজের তিক্ত ব্যাক্তিগত সমস্যায় মেয়েটা কে একদম জড়াতে চায়না সে।একটা রিকশা ডেকে উঠে পরে শিয়া।আগে অফিসে গিয়ে একবার সবটা ম্যানেজ করতে হবে,তারপর বাসায় ফিরবে।
****
“কি সমস্যা! চোখের কি মাথা খেয়েছেন নাকি।পায়ে পারা দিলেন কেনো”
একটা মেয়ের তীক্ষ্ণ চিৎকার এ চমকে উঠলো রাতুল।এ কি মেয়ে।একটু ভুলে পায়ে না হয় একটা পারাই লেগেছে।এভাবে চিৎকার করার কি আছে।তবে মুখে সেসব বললো না কিছু।হুড়মুড়িয়ে একটু দূরে সরে গেলো,বিনয় নিয়ে ঘুরে তাকালো ক্ষমা চাওয়ার জন্য।
“সরি আপু।আমি আসলে…”
রাতুল এর কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার মুখঝামটা দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা।“কি সরি,কি সরি হ্যা?আমার নতুন জুতাটা… দিলেন তো কাঁদায় মাখামাখি করে!”
রাতুল অগ্নি দৃষ্টির মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো।মেয়েটাকে কোথায় একটা দেখেছে সে।কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না।দেখতে মায়াবী একটা মেয়ে।শ্যামলা গায়ের রং,তবে অসম্ভব মায়া চোখেমুখে।
“আমি সত্যিই সরি।একদম দেখিনি।”
“তা দেখবেন কেনো।রোদ নাই তাও চোখে তো দিয়ে রেখেছেন এত্তো বড় একটা ঢাকনা।আজব মানুষ জন।”
রাতুল অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটাকে।এটা মেয়ে নাকি আরকিছু।এতো অল্প একটা বিষয়ে এভাবে কথা শোনাচ্ছে।
“আচ্ছা তাহলে আর কি।চলুন একটা জুতা কিনে…”
এবারও কথা শেষ হতে দিলো না রাতুলের।কথার মাঝখানেই তেতে উঠলো মেয়েটা।
“আমাকে ভিখিরি মনে হয় নাকি?”
“আরেহ্ আমি সেটা কখন..”
“বলেছেন,একশোবার বলেছেন।মুখে না বললেও মনে মনে বলেছেন।”
“বাহ্ মনটন পারো দেখছি।যেটা বলিনি সেটাও বুঝছো,যেটা মনের মধ্যে নেই সেটা বানিয়ে বানিয়ে বুঝে নিচ্ছো।”
কোমড়ে হাত দিয়ে চোখ গরম করলো মেয়েটা।
“আপনারা বড়লোক রা একটা যা তা। গাড়িতে চলাফেরা করেন সবসময়। পায়ে হেটে চলা মানুষ দের সমস্যা বুঝবেন কিভাবে।আর না তো বোঝেন কিভাবে নিজেদের হাঁটা চলা করা উচিত। অথর্বো একেকজন।গাড়ি থেকে নামেনই আরেকজনের পায়ে পারা দেওয়ার জন্য। “
রাতুল ভাড়ি অবাক হচ্ছে মেয়েটার পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা দেখে।এতটুকুন একটা মেয়ে,কত হবে আর বয়স।সতেরো-আঠারো,অথচ ঝগড়ার স্কিল গ্রামের ঝগড়াটে মধ্যবয়স্ক মহিলাদের মতো।
“নাক টিপলে দুধ বের হবে,তোমার কত বড় আমি আন্দাজ আছে!বললাম ভুলে হয়ে গেছে তার পরও ঝামেলা করছো।”
“কে বাচ্চা,কাকে বাচ্চা বলছেন।আমি মোটেই বাচ্চা নই।”
“বাচ্চা নও তাহলে এমন ছেলেমানুষ এর মতো ঝগড়া করছো কেনো।”
মেয়েটার চোখ টলমল করে উঠলো।পানি জমে গেছে চোখে।রাতুল অপ্রস্তুত হলো।কেঁদে ফেলবে নাকি মেয়েটা আবার।কি সমস্যা, কি এমন বললো সে।যা বলার তা তো মেয়েটিই বলছে।আর সে এতটুকু বলাতেই চোখে পানি এসে গেলো! মেয়ে মানুষ এর এই এক সমস্যা।
“আরেহ্ মহা সমস্যা তো।আমি তো বকিনি তোমাকে।দোষ আমার।স্বীকার তো করলামই।বাচ্চা নও তুমি।হয়েছে এবার?আমার ভুল সরি।দেখে হাঁটা উচিত ছিলো আমার।”
রাতুল এর বারবার সরি বলায় মনটা এবার নরম হলো বোধহয় মেয়েটার।নাক টানলো,এক হাতে চোখ মুছলো।
“ঠিক আছে।অ্যাকসেপ্ট করলাম সরি।কিন্তু দোষ টা কিন্তু আপনারই।”
রাতুল হেসে ফেললো। “ঠিক আছে,আমারই দোষ।বললামই তো।”
মেয়েটা নিজেও হাসলো এবার।অল্পে রেগে যাওয়ার স্বভাব থাকলে যা হয় আরকি। এতোটা রিঅ্যাক্ট করার মতো আসলেই কিছু হয়নি।
রাতুল ঘুরে নিজের গাড়ির দিকে যেতেই কি ভেবে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো একবার মেয়েটাকে।হাতে দুটো দিস্তা খাতা। নরমাল কামিজ সালোয়ার, আর মাতায় সুতির ওড়না দেওয়া।এদিক সেদিক তাকচ্ছে বারবার।যথাসম্ভব রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে।আকাশের দিকে তাকালো রাতুল।যেকোনো সময় ঝুম বৃষ্টি নামলো বলে।মেয়েটার হাতে ছাতা নেই।এগিয়ে আসলো মেয়েটার দিকে।
“কিছু মনে না করলে লিফট দিতে পারি।”
“চিনি না জানি না আপনার লিফট নিবো কেনো আমি।”
রাতুল কপাল কুচকে নিলো।মেয়েটা বড্ড খ্যাটখ্যাট করে।স্বভাবই এমন।এটা সে খুব টের পাচ্ছে।তবে মেয়েটাকে তার মনে ধরেছে,কথায় কথায় এ মেয়ে ঝগড়া করবে,পায়ে পা দিয়ে করবে।তার নিজের সাথে এমন মেয়েই যাবে।কথার লড়াই না হলে সে আবার কিসের কাপল।মনে মনে খানিক হাসলো সে।মুখে বললো,”তুমি একটা মেয়ে।সন্ধ্যা হয়ে আসছে,ফাঁকা রাস্তা,তার ওপর বৃষ্টি নামলো বলে,তোমার কাছে আবার ছাতাও নেই।”
মেয়েটা চোখ তুলে তাকিয়ে রইলো,”তো?”
“পায়ে ভুলে পা দিয়ে ফেলেছি ঠিকই।কিন্তু মানুষ টা খারাপ নই।মেয়েদের সম্মান করতে জানি।উঠে এসো।পৌছে দিচ্ছি।”
মেয়েটা তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তবে এসে উঠলো গাড়িতে।
“নামটা জানা হলো না তোমার।”
“নাম দিয়ে কি কাজ।বিপদে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করছেন।আমি তো চাইনি।লিফট দিচ্ছেন, পৌছে গেলে ঝামেলা শেষ।”
“তবুও।নামই তো, বলতে তো বাধা নেই। বাই দা ওয়ে তুমি বলতে না চাইলেও আমার সমস্যা নেই।আমার নাম রাতুল। নাহিয়ান মির্জা রাতুল।”
মেয়েটা একবার তাকালো রাতুল এর দিকে।মানুষ টাকে রেগে গিয়ে এমন ব্যবহার উচিত হয়নি।ভালো মানুষই মনে হচ্ছে।
সোজা হয়ে বুকে হাত গুঁজে বসলো।গলা কেশে পরিষ্কার করে নিলো খানিকটা।
“আমার নাম আতিয়া জাহান রিমি।সবাই রিমি বলেই ডাকে।”
“রিমি…সুন্দর।কোন ক্লাসে পড়ো তুমি।”
কথাটা জিজ্ঞেস করেই আবার দাঁতে জিভ কাটলো রাতুল।ক্লাসের কথা বলায় আবার না ক্ষেপে ওঠে।তবে রিমি এবার কিছু বললো না।স্বাভাবিক গলাতেই বললো,”এইচএসসি দিবো এবার।”
রাতুল শব্দ করে হেসে ফেললো। “ঠিক ধরেছিলাম। “
“কি? “
“আমার থেকে বয়সে ছোট তুমি।তাই আরকি।”
রিমি রাগতে গিয়েও রাগলো না।”আপনার বয়স কতো।”
রাতুল আড়চোখে তাকালো একবার।রিমি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
“আঠাস”
“ও ব্যাপার না।”
রাতুল ভ্রু তুলে তাকালো,”কি ব্যাপার না?”
রিমি অপ্রস্তুত হলো খানিক,”মানে তেমন বড় নন আমার থেকে তাই বললাম।মাত্র দশ বছরের বড়।এ আর এমন কি”
রাতুল হতভম্ব হয়ে গেলো এ মেয়ে বলে কি।দশ বছরের বড়কে বড় মনে হয় না!
মুখে আর কিছু বললো না।বাসার সামনে আসতেই থামতে বললো রিমি গাড়ি।নেমে এগিয়ে আসলো।
“থ্যাংক ইউ।বাসায় আসতে বলবো না।ছেলে মানুষ বাড়িতে নিয়ে এসেছি দেখলে আম্মু আমাকে বের করে দেবে আরকি।”
রাতুল হেসে ফেললো। “ইটস ওকে।বাই”
রিমি নিজেও হেসে চলে গেলো বাসার ভিতর।ঘুরে তাকালে দেখতে পেতো রাতুল কি মুগ্ধ চোখেই না তাকিয়ে আছে তার দিকে।
চলবে ইনশাআল্লাহ….
[বানান রি চেক দেওয়া হয়নি।ভুল হলে সরি]

