#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ২
বাইরের ব্যস্তময় সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনন্যা নিজেও ব্যস্তময় সময় পার করছে ৷ বাবা মায়ের থেকে অনুমতি পাওয়ার পরপরই ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছগাছ করা শুরু করে দিয়েছে ৷ ও অনেক আগ্রহী নিজের দেশটাকে মন ভরে দেখার জন্য ৷ ওর সাথে ওর দাদু যাবে ৷ একজন যুবতী মেয়েকে তো আর একলা ছাড়া যায় না, সাথে একজন না একজন মাহরাম থাকতেই হবে ৷ তাই আলমগীর প্রামানিক যাচ্ছেন নাতনির সাথে ৷ তাছাড়াও বুড়োরও কুরকুরি উঠেছে ঘুরে বেড়ানোর ৷
অনন্যা প্রায় সব গুছিয়ে ফেলেছে ৷ হঠাৎ বাইরে থেকে কিছু কথা কানে আসতেই ও নিজের কাজ বাদ দিয়ে সেদিকে মনোযোগ দিল ৷ কন্ঠ শুনেই বুঝতে পারল কে আসতে পারে ৷ সব বিষয়ে নাক না গলালে যাদের পেট এর ভাত হজম হয় না তারাই এসেছে ৷ অনন্যাদের প্রতিবেশী ৷
একজন মহিলা বলতেছেন,,,,,,, তা কাল দেখলাম পাত্রপক্ষ এসেছিল ৷ কি হলো? এবার পছন্দ করেছিল অনন্যাকে?
রিনা বেগম একটু সময় নিয়ে জবাব দিলেন,,, হ্যাঁ করেছিলেন কিন্তু আমরা মানা করে দিয়েছি ৷
এতোক্ষণ মহিলা তিনজন গা ছাড়া ভাব নিয়ে বসে ছিলেন ৷ এবার যেন উনাদের কৌতূহল উপচে পড়ল ৷ তাই সোজা হয়ে বসে বলতে লাগলেন,,,
সেকি! এসব আবার কেমন কথা ভাবী? মানা করে দিয়েছেন কেন?
আমার মেয়ে চায়নি তাই ৷
মেয়ের কথা কেন শুনতে হবে আপনাদের? ওই মেয়ে জীবনে আপনাদের কোনো স্বস্তি দিয়েছে? সবার কত টিটকারি শুনতে হয়েছে ওই মেয়ের বদৌলতে ৷ তবুও কেন ওর কথা শুনতে হবে? আমার মেয়ে এমন হলে তো অনেক আগেই ওই মুখপুরীকে ঝেটিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করে দিতাম ৷
উনার কথা টেনে নিয়ে আরেকজন বলতে লাগলেন,,, যা বলেছেন ভাবী ৷ এমন মেয়ে থাকলে শত্রুর অভাব হবে না ৷ ভাগ্যিস এমন মেয়ে আমার নেই! নয়তো নানান জনের নানান কথা শুনতে হতো আমাদের ৷
রিনা বেগম চুপ করে থাকলেন, কিছু বললেন না ৷ একটু পর উনি বলে উঠলেন,,,
ছেলের পরিবার ভালো ছিল না তাই মানা করে দিয়েছি ৷
ছেলের পরিবার ভালো ছিল না নাকি ছেলেকে আপনার মেয়ে পছন্দ করেনি? দেখলাম তো ছেলে টাকে ৷ অপছন্দ করার মতো তো কিছু ছিল না ৷ বেশ ভালো মানাত অনন্যার সাথে ৷ তা আপনার মেয়ে কি ভাবে ওর সাথে কোনো রাজপুত্রের বিয়ে হবে? যে চেহারা তার আবার শখ কত!
এমন সময় আলমগীর প্রামানিক খুকখুক করে কাশতে কাশতে বাইরে বেরিয়ে বলতে লাগলেন,,,
ছেলেটাকে এতো পছন্দ হয়ে থাকলে আপনার মেয়ের জন্য ডেকে পাঠাই কি বলেন?
মহিলা টা থতমত খেয়ে গেল ৷ উনি চট জলদি বলতে লাগলেন,,,
আমার মেয়ে কেন ওই ছেলেকে বিয়ে করতে যাবে?
বারে আপনি না বললেন ওই ছেলে দেখতে অনেক সুন্দর? তাহলে আপনার মেয়ের সাথে কেন বিয়ে দিতে চান না? নাকি আমার নাতনির জন্য যে সুন্দর সে আপনার মেয়ের জন্য সুন্দর না?
হ্যাঁ সুন্দর না ৷ আমার মেয়ে আপনার মেয়ের মতো কানি না ৷ আমার মেয়ে রুপবতী ৷ ওকে বিয়ে করার জন্য কত ছেলে লাইন লাগিয়ে পড়ে আছে ৷ আমি কেন যেচে অন্যের জন্য ঠিক করা পাত্রকে আমার মেয়ের ঘাড়ে চাপাব?
হ্যাঁ ঠিক ঠিক ৷ অন্যের কথায় কেন আপনি আপনার মেয়েকে এমন পাত্রের সাথে বিয়ে দিবেন?
হ্যাঁ কেন দিব? আমি কি আপনাদের খাই না পড়ি যে আপনাদের কথা আমাকে শুনতে হবে?
নাহ তা হতে যাবে কেন? তাহলে একটা প্রশ্ন ৷ আমরা কি আপনাদের খাই বা পড়ি? যদি উত্তর ‘না’ হয়ে থাকে তাহলে আমার নাতনি কাকে বিয়ে করবে আর কাকে বিয়ে করবে না সে বিষয়ে আপনাদের কথা শোনানোর তো কোনো অধিকার দেখছি না ৷
আমি তো সঠিক কথাই বলেছি ৷ এমন কানি মেয়ের এতো বাছ বিচার থাকতে নেই ৷ আপনারা যে কিভাবে এমন কানি মেয়েকে ছোট থেকে লালনপালন করছেন কে জানে!
যেভাবে আপনাদের কথা নিয়মিত শোনার অভ্যাস করছি ঠিক সেভাবে ৷
দেখুন চাচা আপনি কিন্তু এবার আমাদের অপমান করছেন ৷ এমন মেয়ে ঘরে থাকলে রোজ কথা শুনতে হবে ৷ আমার মেয়ে এমন হলে আমাকেও কথা শুনতে হতো ৷ তাই না ভাবীরা?
বাকি দুই মহিলা তাল মিলিয়ে বলল,,, হ্যাঁ শুনতে তো হতোই ৷ আল্লাহর রহমত আছে আমাদের উপর তাই এমন অলক্ষুণে মেয়ে আমাদের ঘরে নেই ৷ থাকলে যে কত মানুষের কত কথা শুনতে হতো কে জানে!
উহু শুনতে হতো না ৷ কারন আপনারা তো তখন ভিক্টিমের স্থানে থাকতেন ৷ নিজেরা তো আর নিজেদের কথা শোনাতেন না তাই না? আপনারা ব্যতীত আমাদের এলাকায় এমন কথা শোনানোর মানুষ খুব একটা নেই ৷ হয়তো আড়ালে আবডালে বলে কিন্তু সামনাসামনি অন্তত বলে না ৷
দেখুন যা সত্যি তাই আমরা বলেছি ৷ এমন কানি মেয়ের সব কথা শুনতে হবে এমন কোনো কথা নেই ৷ এমন কানি মেয়েকে যত দ্রুত সম্ভব বিদায় দিয়ে দিন ৷ কালকের পাত্রটা তো ভালোই ছিল ৷ শেষে দেখবেন ওর ভাগ্যে বিবাহিত পাত্র জুটেছে ৷
সে আপনাকে ভাবতে হবে না ৷ আমি আপনাদের দেখিয়ে দিব আমার নাতনি ঠিক কেমন পাত্র পায়!
কানি মেয়ের আবার কেমন পাত্র!
হয়তো আরো কিছু কথা চলল উনাদের মাঝে ৷ অনন্যা সেদিক থেকে নিজের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে ৷ এতো তিক্ততা ও ছোট থেকেই সহ্য করে আসছে ৷ এখন ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ৷ আর এসব সহ্য হয় না ৷ এই মহিলাগুলোর কথা শুনে ওর মা মাঝে মাঝে ওকে দুটো কর্কশ কথা শুনিয়ে দেয় ৷ এতে অবশ্য অনন্যা ওর মাকে কোনো দোষ দেয় না ৷ কারন মেয়ের জন্য এতোকিছু শুনলে একটা সময় বিরক্তি তো চলে আসবেই!
অনন্যা উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকাল ৷ এমন মন খারাপের দিনে আল্লাহর কাছেই ও একটুখানি স্বস্তি পায় ৷ আকাশের দিকে তাকালে আল্লাহর সন্নিকটে যাওয়া যায় ৷ আল্লাহ বলেছেন, “আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানো আমি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করি ৷” এমন কিছু কথাই ছিল ৷ অনন্যার হুবহু মনে নেই ৷
এভাবে অনেকক্ষন ও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ এই সময় কখন যে ওর চোখের কোনা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল সেটা ওর জানা নেই ৷ অবশ্য সেই পানিটুকু মোছার কোনো তাড়াও ওর মধ্যে দেখা গেল না ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
প্রকৃতির সৌন্দর্য অতুলনীয় কিন্তু পাহাড়ী এলাকার সৌন্দর্য যেন সব সৌন্দর্যকে হার মানাতে সক্ষম ৷ চারদিকে সবুজের সমারোহ, চারণভূমির উপর গৃহপালিত পশুদের কচি কচি ঘাস খাওয়া, দূরে পাখিদের সম্মিলিত কিচিরমিচির ইত্যাদি ৷ অলি সেই সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করতে লাগল ৷
কিছুক্ষণ পর ও বসা থেকে উঠে নিজের ছাগল তিনটার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,,,
কি মহাজান রা? আপনাদের খাওয়া হয়েছে? হয়ে থাকলে চলুন একটু গৃহে পদার্পণ করা যাক ৷
ছাগলগুলো তো ম্যা ম্যা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারল না নয়তো এমন সম্মান পেয়ে ওরা খুশিতে এই গান গেয়ে উঠত, “পানসি বানু উড়তি ফিরু মাস্ত গাগণ মে” ৷
যাক যেহেতু গান বলার ক্ষমতা ওদের নেই তাই ওরা অলির পিছু পিছু নিজেদের গৃহে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল ৷ অলি ওদের ভালো করে বাঁধতে বাঁধতে বলল,,,
আপনাদের বেঁধে না রাখলে তো বাইরে গিয়ে ইটিশ পিটিশ করা শুরু করে দিবেন ৷ সেদিন তো দেখলাম মনজু চাচার ছাগলের সাথে আপনাদের সেই পিরিত ৷ নিজের ভাগের ঘাস মনজু চাচার ছাগলগুলোকে খাইয়ে দিচ্ছেন ৷ এসব কিন্তু ভালো লক্ষণ নয়! নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন ৷ বিবেক তো আল্লাহ দেন নাই ৷
এমন সময় একটা ছাগল ম্যা ম্যা করে উঠল ৷ তা দেখে অলি বলতে লাগল,,,
ম্যাডাম আপনাকে বলিনি ৷ আমি জানি মনজু চাচার কোনো ছেলে ছাগল নেই ৷ আছে দুটো মেয়ে ছাগল ৷ যে ছাগল দুটোর প্রতি আমার সম্মানীয় রামছাগল দুটো কু নজর দিয়েছে ছ্যাহ!
এভাবে আরো কিছুক্ষণ ছাগলের ক্লাস নেওয়া শেষে অলি টিফিন বক্সে কিছু খাবার প্যাক করে নিয়ে নিজের কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগল ৷ তবে যাওয়ার আগে ছাগল তিনটার জন্য পর্যাপ্ত ঘাস, লতাপাতা রেখে দিল, সবজির বাগানের পরিচর্যা করল ৷ বাড়ির যাবতীয় কাজ শেষে ও আর একটা কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল ৷
অলি টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করে ৷ বিভিন্ন দৃশ্য আর স্থান দেখিয়ে নিয়ে বেড়ানোই ওর কাজ ৷ ওর ডিউটি সকাল দশটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ৷ তারপর বাড়িতে এসে আবারও ছাগলদের সামলায়, রান্না করে, সবজির বাগান পরিচর্যা করে ইত্যাদি ৷
আসলে সব কাজের প্রতি অলির আলাদা আকর্ষণ রয়েছে ৷ সবকিছু করতেই ওর বেশ মজা লাগে ৷ মাঝে মাঝে এলাকায় গিয়ে সবার টুকটাক কাজ করে দেয় ৷ বিনিময়ে বস্তায় বস্তায় ভালোবাসা নিয়ে আসে ৷ ওর জীবনে একটাই লোভ ৷ সেটা হচ্ছে একটু আদর, মায়া আর ভালোবাসা ৷ এগুলোর কাঙ্গাল ও ৷
অলির পরিচয় তো শেষ হলো ৷ এবার ওর যাত্রাপথ অবলোকন করা যাক ৷ মুখে সেই চিরাচরিত হাসি ফুটিয়ে ও এগিয়ে যেতে লাগল ৷ সামনে একটা বৃদ্ধ মহিলাকে হাঁটতে দেখে ও থেমে গেল ৷ উনার দিকে এগিয়ে গিয়ে ও সচকিতে উনাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বলল,,,
কি ব্যাপার নায়িকা? তোমাকে না কতবার বলেছি এভাবে হাঁটা চলা করবে না? প্রেমিকের কথা শুনবে না বলে পণ করেছো?
আমেনা খাতুন এই এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ মহিলা ৷ ছেলে আর ছেলের বউ উনাকে একদম সহ্য করতে পারে না ৷ একপর্যায়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ৷ সেই সময় অলি গিয়ে উনাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে ৷ কিন্তু অলির বাড়ি এলাকা থেকে অনেক দূরে , একেবারে পাহাড়ের কাছাকাছি তাই আমেনা বেগম সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেন নি ৷ তাই অলি উনাকে নিজের টাকা দিয়ে এলাকার মধ্যে একটা ঘর তুলে দিয়েছে ৷ সপ্তাহে সপ্তাহে বাজার করে দিয়ে যায় ৷ তাতেই বেশ চলে বুড়ির ৷ তাই বুড়ি অলিকে অনেক ভালোবাসে ৷
অলি উনাকে তার ঘরে বসিয়ে রেখে কিছুক্ষণ কথা বলে আবারও নিজের কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল ৷ এমন যাওয়ার পথে অনেকের সাথে ওর দেখা হলো ৷ যার সাহায্য দরকার তাকে সাহায্য করল আর যারা এমনিতেই বসে আছে তাদের সাথে দু একটা কথা বলে অলি এগিয়ে যেতে লাগল ৷
একটা মোড় ঘুরতেই আচমকা সামনে একটা কুকুরকে দেখতেই ও চমকে উঠল ৷ সেটা কুকুর বুঝতে পারতেই ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,,,
শালাহ এখনি জানটা বেরিয়ে যাচ্ছিল! হঠাৎ করে নিজের ছায়া দেখলেই ভয় লাগে আর সেখানে তো তুই কুত্তা রে! সর সামনে থেকে বে’য়াদব!
অলি কুকুরটাকে পাশ কাটিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল ৷ হঠাৎ একটা জিনিস মাথায় আসায় ও গতিপথ পরিবর্তন করে আবার কুকুরটার কাছে ফিরে এলো ৷ তারপর ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বলল,,,
একটা জিনিস চাব দিবি?
কুকুর টা ঘেউ করে উঠল ৷সেটাকে সম্মতি ভেবে অলি বলতে লাগল,,,
সেই জিনিসটা হচ্ছে মাফ ৷ আমি না মনে মনে তোকে গা**লি দিয়ে ফেলেছি! আমাকে মাফ করে দিবি? বল আমাকে মাফ করেছিস, বল ৷
কুকুরটা মাফ করল কিনা বোঝা গেল না ৷ তবে সেটা ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করতে করতে অলির দিকে তেড়ে গেল ৷ অবস্থা বেগতিক দেখে অলি উল্টো ঘুরে দৌঁড় লাগাল ৷ কুকুরটাও ওর পিছন পিছন ছুটছে ৷ অলি গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি খরচ করে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বলল,,,
ভুল হয়ে গেছে ভাই ৷ আর কোনোদিন গা**লি দিব না ৷ মনে মনে তো দূর স্বপ্নেও দিব না!
চলবে,,,
[বাংলাদেশে আদৌ কোনো টুরিস্ট গাইড আছে কিনা জানি না, গুগলে সার্চ দিয়ে কার্যকরী কোনো তথ্য পাইনি তাই এই বিষয়টা দেখেও না দেখার ভান করে থাকলে আমি খুশি হবো ওখে?😒]

