#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১১
আদিবাসী গ্রামে সকলের সময় বেশ ভালোভাবেই কাটছে ৷ অলির সময় খারাপ কাটত যদি ও অনন্যার দেওয়া গা*লিটা শুনত ৷তবে শোভনের সময় যে সবার থেকে ভালো কাটছে সেটা বলাই যায় ৷ এই প্রথমবার ও বোনকে বিরক্ত করার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছে ৷
ওর নজর ক্ষণে ক্ষণে হেনিনের দিকে ছুটে যাচ্ছে ৷ ওর এই অবস্থা দেখে সানা চোখমুখ কুঁচকে বলতে লাগল,,
এভাবে হাসবি না ৷ তোর দাঁতের মানচিত্র ভালো না ৷ জোকারের মতো লাগছে ৷
বোনের করা অপমান একটুও গায়ে লাগল না ওর ৷ বরং বোনের বকবকানিও আজ মধুর বলে মনে হচ্ছে ৷ ইচ্ছা করছে সানাকে একটা বিশেষ কিছু কিনে দিতে ৷ অবশ্য আশেপাশের সবাইকে ওর কাছে প্রিয়জন মনে হচ্ছে ৷
অলি বড়দেরকে আদিবাসী সম্প্রদায় সম্পর্কে টুকিটাকি তথ্য দিতে লাগল ৷ আর বাকিটা ওরা আদিবাসীদের থেকেই শুনে নিল ৷ অলি এক দায়িত্ব শেষ করে আরেক দায়িত্ব পালন করার জন্য এগোতে লাগল ৷ এগোতে এগোতে ও অনন্যার কাছাকাছি চলে আসল ৷
অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,, এ কেমন দেশ? বাংলাদেশের মানুষের এমন অধঃপতন তো মেনে নেওয়া যাচ্ছে নাহ!
অনন্যা কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল ৷মুখের কাছে অনেক কথা এসে জমা হলো কিন্তু সেগুলো বের করতে ইচ্ছা করছে না তাই শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল ৷ অন্যদিকে অলি হেলতে দুলতে শিস বাজিয়ে সামনের দিকে যেতে লাগল ৷
যেতে যেতে ওর নজর অদ্ভুত ক্যারেক্টারের দু ভাই বোনের দিকে গেল ৷ ও ওদের পাশে খানিকটা বসল ৷ সানার চোখেমুখে বিরক্তি আর শোভন এখনও ক্যাবলার মতো দাঁত করে হাসছে যেটা দেখতে সানার কাছে বি*শ্রী লাগছে ৷ অলি একপলক দু ভাইবোনের মুখের মানচিত্র পরখ করল ৷ অতঃপর গলা খাকারি দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,,,
আজ কি বিশেষ কোনো দিন?ফাইটিং হোয়াই অফিং?
সানা বিরক্ত মুখে বসে থাকলেও অলির ভুল ইংরেজি শুনে হেসে ফেলল ৷ ও হাসি অব্যহত রেখে বলল,,,
অলি ভাইয়া এসব ইংরেজি কার থেকে শিখেছো?
আমি নিজে নিজে বানিয়েছি ৷ ইংরেজদের থেকেও ইউনিক আর ইন্টারেস্টিং হচ্ছে আমার বানানো ইংলিশ ৷
সানা হাসতে হাসতে বলল,,, তা তো দেখতেই পাচ্ছি ৷
পরে দেখো ৷ আগে বলো তোমরা আজ এতো ভদ্র কেন? মাথায় কোনো সমস্যা হয়েছে?
সম্ভবত একজনের হয়েছে ৷ দুজনের মধ্যে একজনের মাথা খারাপ হলে তো আর ঝগড়া জমে না ৷ তাই বসে আছি ৷
কার মাথায় গন্ডগোল হয়েছে?
সানা ভ্রু কুঁচকে অলির দিকে তাকিয়ে বলল,,, এটাও বলে দিতে হবে? আমি তো দিব্যি তোমার সাথে কথা বলছি ৷ তাহলে নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় জনের সমস্যা ৷
তার মানে শোভন?
সানা ভ্রু কুঁচকে রেখেই বলল,,, হ্যাঁ ৷ আচ্ছা তোমার কমনসেন্স কোথায়?
অলি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে বলল,,, বাড়িতে রেখে এসেছি ৷ আসলে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে আসতে হয়েছে তো ৷ তাই কমনসেন্স নেওয়ার জায়গা ছিল না ৷
সানা আবারও হাসতে লাগল ৷ও হাসতে হাসতে বলল,
তোমার রসিকতা করার ক্ষমতা বেশ ভালো ৷ যাক গে গলা শুকিয়ে গেছে ৷ একটু পানির ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ভাইয়া?
কেন পারব না? কমনসেন্স রেখে আসলেও পানির ব্যবস্থা করার মতো ক্ষমতা সাথে করে নিয়ে এসেছি ৷
সানা আরও এক দফা হেসে নিল ৷ অন্যদিকে অলি গলা উচিয়ে বলল,,,
চিতা এক গ্লাস পানির ব্যবস্থা করতে পারবি?
সানা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, চিতা? দারুন ইন্টারেস্টিং নাম তো ৷
শোভন বিরবির করে কয়েকবার নামটা উচ্চারণ করল তারপর বিরবির করেই বলল,,,
চিতা নাম যার সে তো আমাকে এক ঝলকেই ধরাশয়ী করবে তাই নয় কি?
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে ও মুচুর মুচুর করে হাসতে লাগল ৷ অনন্যা হেনিন বলে ডাকলেও অলি ওকে চিতা বলে ডাকে ৷ অলি ডাকার এক মিনিটের মধ্যেই হেনিন এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে উপস্থিত হলো ৷ সানা মুচকি হেসে পানির গ্লাস টা নিয়ে বলল,,,
ধন্যবাদ ৷ বাই দা ওয়ে তুমি অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে ৷
জবাবে হেনিন মিষ্টি করে হাসল ৷ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে শোভনের হৃৎপিন্ড লাফাতে লাগল ৷ আড়চোখে ভাইয়ের অবস্থা খেয়াল করে সানা খুব জোরে ওর পেটে একটা গুতা মা*রল ৷ সেই গুতাও শোভনের কাছে ভালোবাসার প্রকাশ বলে মনে হলো ৷ ও মনে মনে বলল,,,
আমার বোন আমাকে এতো ভালোবাসে সেটা তো জানতাম নাহ! না না আজ থেকে ওকে আর কোনো প্রকার ক*ষ্ট দেওয়া যাবে না ৷
মনে মনে কথাগুলো বলে শোভন আবারও হেনিনের দিকে তাকাল ৷ ওর মুখে বোকা বোকা হাসি ফুটে আছে ৷ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে হেনিনের গা জ্বলে গেল ৷ বিরক্তিতে ওর মুখ ছেঁয়ে গেল ৷ তাই ও গ্লাস নিয়ে দ্রুত জায়গা প্রস্থান করল ৷ ও চলে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও শোভনের বুকে অদৃশ্য এক ব্যাথা হতে লাগল ৷
ওরা তিনজন এখন চুপচাপ বসে আছে ৷ অলি মনে মনে মাফের বিষয়টা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে আছে তাই কথাবার্তা বলছে না নয়তো ও একাই গল্প চালিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে ৷ এমন সময় পিকু কাঁদো কাঁদো মুখে অলির কোলে গিয়ে হুট করে বসে পড়ল ৷ এতে করে অলি নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসল ৷ ও চিন্তিত স্বরে বলে উঠল,,,
কি হয়েছে পিকু সোনা? তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?
পিকু মাথা ডানে বায়ে ঘুরিয়ে বলল,,, নাহ ৷
তোমার আম্মু বকাঝকা করেছে বা মে*রেছে?
নাহ ৷
তাহলে তোমার মন খারাপ কেন?
পিকু অলির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলতে লাগল,, বিল্টু ভাইয়া খারাপ হয়ে গেছে ৷ আমাকে দেখলেই শুধু পালায় ৷ খেলতে চায় না আমার সাথে ৷
অলি ফিক করে হেসে ফেলল ৷ পর মুহূর্তে মুখটা ইচ্ছাকৃতভাবে গম্ভীর করে বলল,,,
ব্যাপার টা সিরিয়াস মনে হচ্ছে ৷ তুমি মন খারাপ করো না পিকু ৷ যে তোমার সাথে খেলতে চায় না তার সাথে খেলার দরকার নেই ৷ তুমি বরং চিতার সাথে গিয়ে খেলো ৷
পিকু চোখ বড় বড় করে বলল,,, চিতার সাথে? তুমি কি আমাকে মা**রতে চায়? বোকা ছেলে চিতা আমাকে মড়মড় করে খেয়ে ফেলবে না?
অলি প্রাণখোলা হাসি হেসে বলতে লাগল,,, এটা মানুষ চিতা, পশু চিতা না ৷ মেয়েটার নাম চিতা ৷
এমন নাম রেখেছে কেন ভাইয়া? মানুষ তো আসল চিতা ভেবে ভয় পাবে তাই না?
এমন নাম কেন রেখেছে সেটা তো চিতার বাবা মা বলতে পারবে পিকু ৷ তুমি বরং তাদেরকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখো ৷
আচ্ছা ৷
শোভন গা ঝাড়া দিয়ে বসা থেকে উঠে বলল,,, পিকু চল আমি তোকে চিতার কাছে নিয়ে যাচ্ছি ৷ দুজনে গিয়ে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করা যাবে ৷
পিকু মহাখুশি হয়ে ভাইয়ের হাত ধরে যেতে লাগল ৷ ওদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে অলি বলতে লাগল,,,
শোভন বেশ ভালো একটা ছেলে দেখছি ৷ বোনের কত খেয়াল রাখে ৷
সানা হাই তুলে বলতে লাগল,,, পিকুর জন্য না নিজের স্বার্থে গিয়েছে বাঁ*দর টা ৷
অলি কপাল কুঁচকে সানার দিকে তাকাল ৷ সানা মুখ বিকৃত করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
শোভন পিকুকে নিয়ে হেনিনের মুখোমুখি দাঁড়াল ৷ হেনিন মুখ গম্ভীর করে শোভনের দিকে তাকাল ৷ ওর মুখশ্রীকে পাত্তা না দিয়ে শোভন হাসিহাসি মুখে বলতে লাগল,,,
আপনার মতো মিষ্টি মেয়ের সাথে আমার বোনের পরিচয় করিয়ে দিতে এলাম ৷
হেনিনের চোখ সবেমাত্র পিকুর দিকে গেল ৷ পিকুকে দেখতেই অবশ্য ওর মুখের বিরক্তি হারিয়ে গেল ৷ ও হাসিমুখে পিকুর গাল টেনে দিয়ে বলল,,,
অনেক কিউট তো তুমি ৷ তোমার নাম কি?
আমার নাম সারা ৷ তবে সবাই আমাকে পিকু বলে ডাকে ৷
তুমি যেমন কিউট তোমার নামও তেমন কিউট ৷ কেমন লাগছে আমাদের গ্রাম?
ভালো লাগছে ৷ কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে ৷
কি প্রশ্ন?
তোমার নাম চিতা কেন রেখেছে? তুমি জানো আমি একটু একটু ভয় পেয়েছিলাম ৷
হেনিন হেসে ফেলে বলল,,, ভয় পেয়ো না ৷ আমাদের নাম একটু অন্যরকম হয় ৷ আমার নাম হেনিনচিতা ৷
পিকু ক্ষণকাল চুপ থেকে বলল,,, এটা অনেক বড় নাম ৷ আমি তোমাকে হেতা বলে ডাকব ৷
আচ্ছা যা ইচ্ছা ডাকতে পারো ৷ তোমার কথাগুলোও অনেক কিউট ৷ তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে ৷
শোভন তখন থেকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ৷ ওকে পাত্তা দিচ্ছে না দেখে ও ক্রমাগত গলা খাকারি দিতে লাগল ৷ এক পর্যায়ে হেনিন ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল ৷ তা দেখে শোভন বলতে লাগল,,,
আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবেন চিতা ম্যাডাম?
হেনিন কন্ঠের স্বর কঠিন করে বলল,,, জ্বি ৷
ও ভিতরে চলে গেল ৷ কিছুক্ষণের মধ্যে এক গ্লাস পানি হাতে ফিরে এলো ৷ শোভন হাস্যজ্জ্বল মুখে সেই গ্লাস নিয়ে একটা চেয়ারে বসে পানি খেয়ে নিল ৷ পানি খাওয়া শেষে ও গ্লাস ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল,,,
ধন্যবাদ ৷ আর হ্যাঁ আমিও পিকুর মতোই দেখতে এবং ওর মতোই কিউট ৷
হেনিন কপাল কুঁচকে ক্ষণকাল শোভনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ শোভন সেই তখন থেকে একটা মার্কামারা হাসি হেসে চলেছে ৷ ওর হাসির দিকে তাকালে হেনিনের মেজাজ আরও বেশি করে খারাপ হচ্ছে ৷ ও কাটকাট গলায় শোভনকে বলল,,,
আপনি একটা বং ৷
কথাটা বলে ও পিকুকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল,,, চলো পিকু তোমাকে মজার মজার জিনিস দেখাই ৷
পিকু হাসিমুখে হেনিনের সাথে চলে গেল ৷ অন্যদিকে শোভন আহাম্মক হয়ে বসে আছে ৷ হেনিন ওকে কি বলে গেল সেটা ও বুঝতে পারছে না ৷ কয়েক মিনিট নিশ্চুপ থাকার পর ও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে লাগল,,,
হয়তো কোনো প্রশংসা করেছে ৷ পিকুর সামনে বলতে হয়তো লজ্জা পাচ্ছিল ৷
শোভন লাজুক হেসে বলল,,, যাহ দুষ্টু এভাবে কেউ প্রশংসা করে? অলি ভাইয়ার থেকে শুনতে হবে তুমি আমাকে কি বলে প্রশংসা করলে ৷
শোভন অলিদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ৷ ওর মুখে লাজুক হাসি এখনও ফুটে আছে ৷ একটু পরপর ও বিরবির করে ‘বং’ বলছে ৷ দেখতে দেখতে ও অলিদের কাছে চলে আসল ৷ ওর হাসিমুখের দিকে অলি আর সানা চকিতে তাকাল ৷ সাথে সাথেই দুজনের ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ সেটাকে পাত্তা না দিয়ে শোভন বলতে লাগল,,,
আচ্ছা অলি ভাইয়া বং মানে কি?
অলি কপাল কুঁচকে বলল,,, কে বলেছে?
যেই বলুক তোমার তাতে কি? নাকি আমার প্রশংসা তোমার সহ্য হয় না?
প্রশংসা?
তা নয় তো কি? বং মানে নিশ্চয়ই ভালোবাসা টালোবাসা রিলেটেড কিছু হবে ৷
বলে শোভন লাজুক হাসতে লাগল ৷ ওর হাসি বেশিক্ষণ থাকতে না দিয়ে অলি তৎক্ষণাৎ গড়গড় করে বলল,,,
বং মানে গরু ৷
শোভনের লাজুক হাসি ফুরুৎ করে জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল ৷ ওর চোয়াল ঝুলে পড়েছে, পুরো বিষয় টা মস্তিস্কে পৌঁছাতে একটু সময় লাগছে ৷ অন্যদিকে অলি সর্বোচ্চ ভাবে হাসি আটকানোর চেষ্টা করতেছে ৷ সানা পুরোটা সময় ভ্রু কুঁচকে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এবার জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ ওর হাসি দেখে অলি হাসি আটকা আটকি বাদ দিয়ে নিজেও হেসে ফেলল ৷ হাসতে হাসতে বলল,,,
আহারেএএএএএএএ ছেলেটা! কিভাবে বোকা বনে চলে গেল!
শোভনের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেছে ৷ ও কাটকাট গলায় বলতে লাগল,,,
আমি অন্তত তোমার মতো বোকা না ৷ বল ছুঁড়লাম আমি আর দোষ পড়ল রোবট আপুর উপর ৷ তবুও ধরতে পারলে না ছিহ!
অলির হাসি তৎক্ষণাৎ থেমে গেল ৷ ওর মাথায় মনে হয় বাজ পড়ল ৷ আজ ও কি কি করেছে সব এক এক করে মনে পড়ে গেল ৷ সেই সাথে ওর মনের কোথাও যেন বেজে উঠল,,,
“ছলছল নয়নে হাসিমাখা বদনে”
চলবে,,,,

