মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_৩৪

0
20

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৪

সেই গুমোট নিস্তব্ধতায় আরশানের গালে রিমির চড়ের শব্দটা যেন এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। থা’প্পড় খেয়ে আরশান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালো। ও ভেবেছিল, শাফিনের এই অবস্থা দেখে রিমি হয়তো মনে মনে শান্তি পাবে, হয়তো আরশানের ওপর ওর ভরসাটা আরও গাঢ় হবে। ও হয়তো খুশি হবে কিন্তু তার বদলে মেয়েটা এই প্রতিদান দিলো? আরশান ধীরে ধীরে মাথা সোজা করে রিমির দিকে তাকালো। ওর চোখে বিস্ময় আর এক অদ্ভুত ঘোর!

“I gave him a little punishment for what he did to you, and instead of being grateful, you slapped me?”

রিমির চোখের পানি তখনো বাঁধ মানছে না। ও চিৎকার করে বলে উঠল — “সামান্য শাস্তি? আপনি কি আদৌ নিজের চোখ দিয়ে দেখেছেন ওর কী অবস্থা করেছেন? আর কিছুক্ষণ ড্রামের মধ্যে ওভাবে ধরে রাখলে তো ও মা’রাই যেত! তারপর কী হতো?”

রিমির মুখে এই নীতি কথা শুনে আরশানের রাগ হলো। ওর এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, ও যার জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছে সেই মেয়েটাই উল্টে এখন ওকে অপরাধী বানাচ্ছে! রিমির কাছে যেনো আরশানের এইসব চেষ্টাই মূল্যহীন! ওর চোখ দুটো রাগে আবার র’ক্তবর্ণ হয়ে উঠল। ও এক ঝটকায় রিমির দুই বাহু নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করল। আরশানের আঙুলগুলো রিমির নরম মাংসে বসে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই। ও রিমিকে নিজের শরীরের একদম কাছে টেনে নিয়ে গরজে উঠল—

“আর ও যে তোমাকে মা’রতে চেয়েছিল, তখন তোমার এই মায়া কোথায় ছিল রিমি? নাকি মরে গেলে আমার হাত থেকে চিরদিনের জন্য বেঁচে যেতে, সেই সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল বলে এখন আফসোস করছো?”

আরশানের মুখে হঠাৎ এমন যুক্তিহীন কথা শুনে রিমি শিউরে উঠল। এই মুহূর্তে আরশানকে ওর কোনো সভ্য মানুষ মনে হচ্ছে না, বরং এক হিংস্র পশুর মতো দেখাচ্ছে ওকে। ওর চোখের সেই চাউনি এতটাই ভয়ংকর যে রিমির আত্মা কেঁপে উঠল। রিমি কাঁপা গলায় বলল — “কীসব আজেবাজে কথা বলছেন আপনি! মাথাটা একদম খারাপ হয়ে গেছে? আমি আপনার ভালোর জন্যই বলছি আর আপনি বিষয়টাকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন!”

আরশান এ কথা শুনে এক পৈশাচিক হাসি হাসল — “আমার ভালোর জন্যে?”

আরশানের অবস্থা দেখে রিমির মনে হচ্ছে সে যেনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে। ও রিমির চেহারার ওপর ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলল — “আমি নিজের ভালো-মন্দ নিজেই বুঝ নেবো, আমার জন্য তোমাকে এতো ভাবতে হবেনা”

কথাটা বলেই আরশান রিমিকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে ইয়াসিরের দিকে ফিরে তাকালো, ইয়াসির তখন গোডাউন থেকে বাইরে আসছিল!

“ওকে বাসায় নিয়ে যান”

রিমি তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করলো — “আপনি যাবেন না?”

আরশান রিমির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না, বরং ওকে টেনে নিয়ে জোর করে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে চাবি ইয়াসিরের হাতে দিয়ে রিমিকে বাসায় দিয়ে আসতে বললো। ইয়াসির শাফিনের কথা বলতেই আরশান বলবে — “I’ll handle this mess”

রিমি যখন গাড়িতে বসেছিলো ওর মস্তিষ্ক তখনো কাজ করছিল না। ইয়াসির ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেও আরশানের ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। রিমি অস্থিরভাবে নিজের নখ খুঁটছিল আর বিড়বিড় করে বলছিল — “এই লোকটা আবার কী করতে চাইছে? উনি কি ভেতরে গিয়ে আবার শাফিনকে…”

অস্থিরতা সামলাতে না পেরে রিমি গাড়ির দরজা খুলে বেরোতে চাইল। ঠিক তখনই ইয়াসির শান্ত কিন্তু সতর্ক গলায় বাধা দিল — “ম্যাডাম! প্লিজ, গাড়ি থেকে নামবেন না। স্যার এখন যে পরিমাণ রেগে আছেন, আমার মনে হয় ওনাকে এখন একটু একা ছেড়ে দেওয়া দরকার।”

রিমি বড় বড় চোখে ইয়াসিরের দিকে তাকালো…

“আরশান ভেতরে কী বীভৎস কাণ্ড করল সেটা তো আপনিও দেখেছেন! ও যদি আবারো কিছু করে, যদি সত্যি কোনো অঘটন ঘটে যায়?”

ইয়াসির একটু ম্লান হাসল। আরশানকে ও দীর্ঘ বছর ধরে চেনে। ও রিমিকে আশ্বস্ত করার সুরে বলল…

“ম্যাডাম, স্যার মানুষ হিসেবে যেমনই হোন না কেন, উনি এতটা কাঁচা কাজ করবেন না যে কাউকে মে’রে ফেলবেন। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি উনি আর কিছুই করবেন না। আপনি একদম ভয় পাবেন না।”

ইয়াসিরের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলেও রিমির মনের খচখচানি দূর হলো না। ও গাড়ির জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকালো। দূরে গোডাউনের সেই আধো-অন্ধকারে আরশানকে দেখা যাচ্ছিল। লোকটা আজ একদম অন্যরকম। আরশানের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে ও এভাবে কখনোই দেখেনি। আরশান কিছুটা অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। ছোট বাচ্চারা যেমন প্রচণ্ড রাগ করলে মাটিতে পা দিয়ে বারবার গুঁতো দেয়, আরশানকেও ঠিক তেমনটাই করতে দেখা গেল। মাঝে মাঝে ও নিজের কপালটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরছে, যেন মাথার ভেতরের তীব্র যন্ত্রণাটা কমানোর চেষ্টা করছে। আরশানের এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখে রিমির মনে হলো, ও আসলে শাফিনের ওপর যতটা না রেগে ছিল, রিমির ওই চ’ড়টা ওকে তার চেয়েও বেশি বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। রিমি এবার সিটে হেলান দিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করল। একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখল আরশান যেমনি হোক না কেনো, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার বা জীবন ধ্বংস করার মতো বোকা লোক না। পুরোটা পথ রিমি আর একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। পরে ইয়াসির ওকে বাসার গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল। আরশানই যেহেতু ওকে নিতে পাঠিয়েছিল তাই বাসায় ফেরার পর কেউ রিমিকে কোনো প্রশ্ন করেনি। যদিও ইনায়া একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো কিন্তু রিমি এসব কথা ওকে বলেনি। অন্য কথা বলে বিষয়টা সামলে নিয়েছে।
_______________________________________

বাইরে তখন প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি। কালবোশেখীর তপ্ত হাওয়ায় জানলার পাল্লাগুলো সজোরে আছড়ে পড়ছে। রাত আড়াইটা পেরিয়ে গেছে, অথচ আরশানের ফেরার কোনো নাম নেই। রিমি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে, কিন্তু ঘুম আজ ওর দুচোখের পাতা স্পর্শ করার সাহস পাচ্ছে না। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানলার ফাঁক দিয়ে আসা বিদ্যুতের চমক মাঝে মাঝে ঘরটাকে সাদা আলোয় উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে। রিমি চোখ বন্ধ করলেই বারবার সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা ভেসে উঠছে। গোডাউনের সেই টিমটিমে আলোয় শাফিনের মাথাটা ড্রামের পানির ভেতর চেপে ধরেছে আরশান। কিন্তু অন্ধকারের এই নিস্তব্ধতায় রিমির মনের ক্ষোভটা যেন ধীরে ধীরে ক্লান্তিতে রূপ নিচ্ছে। ও ভাবছে, আরশান গেল কোথায়? অস্থিরতা বাড়তে থাকায় রিমি নিজের ফোনটা হাতে নিল। আজ ও নিজেই প্রথম আরশানকে কল করল, কিন্তু ফোনটি বন্ধ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমি ফোনটা একপাশে রেখে দিল। হাতের নিচে একটা বালিশ টেনে নিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল ও। বাইরের ঝড়ের শব্দ যেন ওর মনের ভেতরের তোলপাড়ের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। হঠাৎ করেই রিমির ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। আরশানের বলা সেই শেষ কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। আরশান বলেছিল, ও প্রতিশোধ নিয়েছে। রিমি খুব মন দিয়ে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করল। এই বিশাল পৃথিবীতে বলতে গেলে ওর আপন বলতে এখন কেউই নেই। মা-বাবা হীন এই জীবনে ও কতটা একা, সেটা ওই রাতের ওই দুর্ঘটনার সময় টের পেয়েছে। সেদিন যদি সত্যিই ও পানিতে ডুবে মা’রা যেত, তবে কি কেউ খবর নেওয়ার থাকত? হয়তো দু একজন ক্লাসমেট কান্নাকাটি করতো, ভার্সিটিতে একটা মৃ’ত্যু শোক জানানোর ব্যানার লাগানো হতো। ব্যাস! অথচ যে মানুষটা জোর করে ওর জীবনে দখল নিয়েছে, যাকে রিমি প্রতি মুহূর্তে ঘৃণা করার চেষ্টা করে, সেই আরশানই সে রাতে ওকে বাঁচিয়েছিল। আবার যে ক্ষতি করতে চেয়েছিল তাকেও শাস্তি দিয়েছে। রিমির অবচেতন মন বিড়বিড় করে উঠল — “Is he a blessing for my life?”

নিজের ওপরই এক ধরণের অবাক বিস্ময় নিয়ে রিমি ভাবল, ঘৃণা আর কৃতজ্ঞতার এই জটিল রসায়ন ও কীভাবে সামলাবে? আরশানের শাসন যেমন অসহ্য লাগে তেমনি ওর এই আগলে রাখাটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক তখনই দরজার লক খোলার একটা মৃদু শব্দ হলো। রিমি চমকে উঠল। ও তড়িঘড়ি করে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করল। ও জানে, এটা আরশান ছাড়া আর কেউ নয়। আরশান ঘরে ঢুকে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। দরজার মৃদু আওয়াজে রিমির ঘুমের ভান আর টিকল না। ও ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। আবছা অন্ধকারে ফ্লোরের দিকে তাকাতেই দেখল মেঝের এখানে-সেখানে পানির দাগ। তার মানে আরশান ঝড়ের মধ্যেই ভিজে বাড়ি ফিরেছে? ও বিছানা থেকে নামতেই আরশান ওয়াশরুম থেকে একবার বের হলো, হয়তো কিছু নিতে। ল্যাম্পশেডের ক্ষীণ আলোয় আরশানের ভেজা অবয়বটা দেখে রিমি চমকে উঠল। লোকটার চুল থেকে এখনো টপ টপ করে পানি পড়ছে, শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। আরশান শুধু একপলক রিমির দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই, কোনো অভিযোগ নেই আছে শুধু এক গভীর নিস্তব্ধতা। কোনো কথা না বলে ও আবারো ভেতরে চলে গেল। রিমি থমকে দাঁড়িয়ে রইল। ও ধরেই নিল, আরশান হয়তো রিমির ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ যে কথা বলার ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। আরশান ঘরে আছে ভেবে রিমি দেয়ালের সুইচ চেপে মেইন লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। লোকটা অন্ধকারের চেয়ে আলোই বেশি পছন্দ করে, আর আজকের গুমোট রাতে অন্ধকারটা রিমির কাছেও বড্ড ভারী ঠেকছে। বেশ কিছুক্ষণ পর আরশান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। পরনে ওর কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে ও দেখল রিমি এখনো ঘরের ঠিক মাঝখানে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিমির চোখের ভাষা বলছিল ও কিছু বলতে চাইছে। আসলে রিমি ওর রাতের খাবারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাইছিল, কিন্তু সাহস সঞ্চয় করতে পারছিলো না। পরে একটু সাহস করে জিজ্ঞাসা করল — “আপনার জন্য কি কিছু খেতে আনব?”

আরশানের হাতে ভেজা তোয়ালে ছিল। ও সেটা পাশের চেয়ারের ওপর অবহেলায় ছুঁড়ে দিয়ে রিমির দিকে তাকালো। ওর সেই চাউনিতে আজ এক ধরণের সম্মোহন ছিল। আরশান কোনো উত্তর দিল না, বরং ধীর পায়ে রিমির দিকে এগোতে শুরু করল। আরশানের এমন অতর্কিত এগিয়ে আসায় রিমি ঘাবড়ে গেল। ও এক পা, দুই পা করে পেছাতে পেছাতে অস্ফুট স্বরে বলল — “আ…আমি আপনার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসছি।”

পালানোর চেষ্টা করেও লাভ হলো না। রিমির পিঠ যখন দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল, তখন আরশান এক ঝটকায় ওকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে এল। এক হাতে রিমির কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে অন্য হাতে ওর ঘাড়ের কাছে সুদৃঢ় দখল নিল আরশান। রিমির প্রতিবাদ করার সুযোগটুকুও ও রাখল না। আরশানের তপ্ত নিশ্বাস রিমির মুখে আছড়ে পড়ছিল। পরমুহূর্তেই আরশান ওর ঠোঁটে নিজের অধিকার স্থাপন করল। আরশানের সেই প্রবল আকর্ষণে রিমির হূৎস্পন্দন থমকে যাওয়ার উপক্রম। প্রথমে দমবন্ধ হয়ে আসছিল ওর, কিন্তু আজ কেন যেনো রিমির মনের ভেতর থেকে কোনো প্রতিরোধের দেয়াল তোলার ইচ্ছে হলো না। যে আরশানকে ও ঘৃণা করতে চেয়েছিল, সেই আরশানের আগলে রাখা আর এই তীব্র অধিকারবোধের কাছে ও আজ বড় বেশ অসহায়বোধ করছে। রিমি নিজের দুহাত দিয়ে আরশানকে সরানোর বৃথা চেষ্টাটুকুও করল না। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা সেই নিবিড় আর তীব্র স্পর্শের অবসান ঘটিয়ে আরশান যখন রিমিকে ছাড়ল, তখন দুজনেরই নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। রিমির ফুসফুস যেন এক বিন্দু বাতাসের জন্য হাহাকার করছে। আরশান তখন নিজের কপালটা রিমির কপালের সাথে ঠেকাল। দুজনের তপ্ত নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। সে আধবোজা চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলতে শুরু করল — “আমাকে যখন তুমি ওই চড়টা মা’রলে… তখন আমার কী করতে ইচ্ছে করছিল জানো রিমি?”

আরশানের গলার স্বরে এক ধরণের কম্পন ছিল, যা রিমিকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। আরশান থামল না, ওর দীর্ঘশ্বাসের উত্তাপ রিমির ঠোঁটে অনুভূত হচ্ছিল। ও বলতে লাগল….

“তোমার জন্য আমি কী না করছি! অথচ তোমার চোখে সেসবের বিন্দুমাত্র দাম নেই? তুমি অন্যদের জন্য কাঁদতে পারো, শাফিনের মতো জা’নোয়ারের জন্য তোমার মায়া হয় কিন্তু আমার কথা তোমার একটুও ভাবতে ইচ্ছে হয় না? আমার ভেতরের এই অস্থিরতা কি তোমার একবারও চোখে পড়ে না?”

আরশানের কণ্ঠে আজ তীব্র আক্ষেপ ও হতাশার ছোঁয়া পেলো রিমি। ও কোনো উত্তর দিতে পারল না। ওর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। আরশানের এই রূপ ওর কাছে একদমই নতুন। এই মানুষটা আজ যেন ভালোবাসার এক ভিখারি হয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আরশান এবার রিমির ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে উঠল — “I wish I could k!ll you”

কথাটা বলেই আরশান লম্বা একটা নিশ্বাস নিল, যেন ও নিজের ভেতরের সবটুকু আক্রোশ আর ভালোবাসা এক নিমিষেই বের করে দিতে চাইছে। রিমি স্থির হয়ে আরশানের দিকে চেয়ে রইল। রিমি কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, ঠোঁট দুটো কেঁপেও উঠেছিল তার। কিন্তু আরশান তাকে সেই সুযোগটুকু দিল না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিমান, রাগ আর গুমোট হয়ে থাকা ক্ষোভগুলো যেন পুষিয়ে নিতে আরশান আবারও রিমির ঠোঁট দুটোকে নিজের দখলে নিল, তীব্রভাবে, অনেকটা অধিকারবোধের দাবি নিয়ে। আজ রিমিও নিজেকে সরিয়ে নিল না বরং আরশান যেভাবে ওকে চায় সেভাবেই নিজেকে সপে দিল!

পরদিন….সকালটা বেশ শান্ত, কিন্তু পরিবেশটা খানিকটা থমথমে। জানালার বাইরে বৃষ্টির রেশ এখনো রয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিলে আরাফাত সাহেব গম্ভীর মুখে ব্রেকফাস্ট করছেন। আরশান নির্বিকারভাবে নিজের প্লেটে মনোযোগ দিচ্ছে। নিরবতা ভেঙে আরাফাত সাহেব সরাসরি ছেলের দিকে তাকালেন।

“কাল ফিরতে এত রাত হলো কেন আরশান?”

আরশান খাবারের দিকে তাকিয়েই খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল — “তোমার ঘুমের সমস্যা শুরু হয়েছে নাকি আব্বু? রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না? আমার মনে হয় তোমার এবার ভালো কোনো ডাক্তার দেখানো উচিত, প্রয়োজনে ঘুমের ওষুধ খাও।”

ছেলের এই বাঁকা জবাবে আরাফাত সাহেবের কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি হাতের চামচটা পাশে রেখে বললেন — “আমার ঘুমের চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। উত্তরটা এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? কাল অত রাতে, এই ঝড়ের মধ্যে তুমি কোথায় ছিলে?”

আরশান আর কোনো উত্তর দিল না। এরপর ও রিমি আর ইনায়াকে নিয়ে ভার্সিটির সামনে পৌঁছাল। ইনায়া বরাবরের মতোই আগে গাড়ি থামতেই সে নেমে চলে গেল। কিন্তু রিমি আজ নড়ল না। সে নিশ্চল হয়ে বসে রইল পাশের সিটে। আরশান স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে এক পলক রিমির দিকে তাকাল। তার চোখে একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্ন। রিমি সাধারণত এই সময়টা আড়ষ্ট হয়ে থাকে, কিন্তু আজ তাকে খুব শান্ত দেখাচ্ছে। হঠাৎ রিমি হাত বাড়িয়ে আরশানের হাতটা ধরল। আরশান চমকে উঠল, কিন্তু হাতটা সরিয়ে নিল না। রিমি খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলতে শুরু করল — “কাল আমি আসলে শাফিনের প্রতি কোনো মায়া দেখাচ্ছিলাম না আরশান। আমি শুধু আপনার কথা ভাবছিলাম।”

আরশান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল — “দেখুন না, আপনি রাগের মাথায় যদি ওকে কিছু ফেলতেন আর আপনার যদি জেল হয়ে যেত, তাহলে আমার কী হতো? একবার ভেবে দেখেছেন? লোকে তখন আমাকে আসামির বউ বলে ডাকত। সেই অপবাদ কি আপনার খুব শুনতে ভালো লাগত?”

রিমির কথাগুলো শুনে আরশান স্তব্ধ হয়ে গেল। ও অবাক চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। রিমির চাহনিতে আজ কোনো রাগ ঘৃনা নেই বরং এক অদ্ভুতরকম স্বাভাবিকতা রয়েছে! আরশান ভাবলো এক রাতের মধ্যেই মেয়েটার মধ্যে হঠাৎ এতটা পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব?

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1BNwkbKH5b/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here