মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_৩৭

0
26

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৭

দুপুরের কড়া রোদটা যে এভাবে হুট করে ঘন কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাবে, তা আরশান কল্পনাও করেনি। হাইওয়ের ধারের এক ছিমছাম হোটেল থেকে লাঞ্চ সেরে ওরা যখন আবার বাইকে উঠেছিল, তখনও আবহাওয়া ছিল বেশ ভালো ছিল। কিন্তু মাইলখানেক যেতেই আকাশ ভেঙে নামল ঝুম বৃষ্টি। চারপাশ যেন এক নিমেষেই ঘোলাটে হয়ে গেল। কোনো উপায় না দেখে আরশান বাইকটা রাস্তার ধারের এক যাত্রী ছাউনির নিচে দাঁড় করাল। ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখা গেল আরশানের শার্টের কাঁধ আর বুকের বেশ খানিকটা অংশ ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে আছে। সে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিজের শার্টের হাতা থেকে জল ঝাড়তে লাগল। তার চোখেমুখে তখন একরাশ বিরক্তি। ও তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে ক্ষোভের সুরে বলল….

“ঠিক এই কারণেই আমি বাইকটা বের করতে চাইনি। গাড়ি নিয়ে এলে অন্তত এভাবে ভিজে এই ভাঙা ছাউনির নিচে আটকে থাকতে হতো না!”

রিমি তখন এক হাত ছাউনির বাইরে বাড়িয়ে বৃষ্টির ঝাপটা অনুভব করছিল। ওর গালে বৃষ্টির কয়েকটা শীতল ফোঁটা এসে পড়েছে, যা এই গরমে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছে। ও আরশানের বিরক্তি দেখে একটু মুচকি হাসল।

“দেখুন না আরশান, কী চমৎকার বৃষ্টি হচ্ছে! কোথায় এই সুন্দর পরিবেশটাকে একটু উপভোগ করবেন, তা না করে একগাদা অভিযোগ নিয়ে বসে পড়েছেন।”

আরশান ওর দিকে একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সটান উত্তর দিলো…

“I don’t like rains, Rimi! আর এই রাস্তাঘাটের কাদা-পানি…এসব মোটেও উপভোগ করার মতো কোনো বিষয় নয়। Just disgusting!”

রিমি এবার আর কোনো তর্কে গেল না। ও বুঝতে পারল এই মানুষটার মুখে রোমান্টিক কথা শোনা আর মরুভূমিতে ফুল ফোটানো একই কথা। ও নিজের লং ড্রেসটার সাথে জড়িয়ে রাখা পাতলা হাফ-সিল্কের স্কার্ফটা খুলে নিল। তারপর আরশানের দিকে একটু এগিয়ে এসে নরম সুরে বলল….

“একটু আমার দিকে ঘুরুন তো। আপনার চুল আর ঘাড় ভিজে গেছে, ঠান্ডা লেগে যাবে।”

আরশান কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রিমি ওর কোনো কথা শুনল না। ও আরশানের একটা হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল — “একদম নড়বেন না, আমি মুছে দিচ্ছি। এদিকে তাকান।”

আরশান যেন আজ অবশ হয়ে গেল। রিমির হাতের সেই স্নিগ্ধ পরশ আর স্কার্ফ থেকে ভেসে আসা মৃদু সুগন্ধ ওর সমস্ত বিরক্তিকে এক নিমিষেই ভুলিয়ে দিল। রিমি খুব যত্ন করে আরশানের কপাল, ঘাড় আর চশমার পাশের জলবিন্দুগুলো মুছে দিচ্ছে। আরশান পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির সেই একটানা শব্দের মাঝে আরশান অনুভব করল, রিমির এই ছোট্ট যত্নটুকু ওর বুকের ভেতরে জমে থাকা সবটুকু কঠোরতাকে গলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করেই ওর মনে হলো হয়তো এই বৃষ্টিটা খুব একটা খারাপও নয়। অন্তত রিমির এত কাছাকাছি আসার সুযোগ তো করে দিল! চারপাশটা তখন বৃষ্টির এক ঝাপসা চাদরে ঢাকা পড়েছে, যেন পৃথিবীর এই এক চিলতে জায়গায় শুধু ওরা দুজনই অবশিষ্ট আছে। রিমি যখন খুব মন দিয়ে আরশানের ঘাড়ের কাছটা আলতো হাতে স্কার্ফ দিয়ে মুছে দিচ্ছিল, তখন আরশানের সেই তপ্ত নিশ্বাস রিমির কপালে আছড়ে পড়ছিল। হঠাৎ আরশান রিমির হাতটা হালকা করে ধরে ফেলল। রিমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশান বিদ্যুৎ গতিতে ওর খুব কাছে ঝুঁকে এল। রিমির কোমল ঠোঁটের ঠিক কোণ ঘেঁষে আরশানের উষ্ণ অধর জোড়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক গভীর স্পর্শ রেখে গেল।
রিমি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! ওর হাতের স্কার্ফটা প্রায় পড়ে যাওয়ার জোগাড়। ও একটু সরে গিয়ে বড় বড় চোখ করে আরশানের দিকে তাকিয়ে গলায় একরাশ আতঙ্ক আর লজ্জা নিয়ে বললো….

“আরশান! আমরা খোলা রাস্তার একটা ছাউনির নিচে বসে আছি, খেয়াল আছে আপনার?”

আরশান খুব শান্তভাবে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করল। ওর চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই, ও স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল — “তো?”

“তো মানে? আরে লোকে দেখলে কী ভাববে বলুন তো একবার?”

রিমির দুশ্চিন্তা দেখে আরশানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা একটা হাসি ফুটে উঠল। ও দরাজ গলায় বলল — “তোমায় স্পর্শ করতে কি এখন আমার রাস্তার লোকেদের পারমিশন নিতে হবে নাকি?”

“না, কিন্তু তাই বলে এমন প্রকাশ্যে…”

আরশান ওর কথা শেষ করতে না দিয়ে ইংরেজিতে খুব অবলীলায় বলল — “একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে পাশাপাশি বসা দেখলেও লোকে মন্তব্য করে। People will talk anyway, Rimi. There’s no point in listening to them”

বৃষ্টির তীব্রতার কারণে আশেপাশে তখন কোনো জনপ্রাণীর চিহ্ন ছিল না। দূরে দু-একটা মালবাহী ট্রাক ঝাপসা হয়ে চলে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের নজর এদিকে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। রিমি একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে হাফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু আরশানের এই চরম উদাসীন আর ডোন্ট কেয়ার মনোভাব দেখে ও মনে মনে শিউরে উঠল।

রিমি মনে মনে ভাবল — “এই লোকটা তো দেখছি মারাত্মক বিপজ্জনক! লজ্জা-শরমের তো লেশমাত্র নেই-ই, আবার সেটাকে রীতিমতো যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করছে! না না, একে আর বিশ্বাস নেই। এর পর থেকে আমাকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কখন যে কী করে বসে, তার কোনো ঠিক নেই!”
______________________________________

ইনায়ার আজকের সন্ধ্যাটা যেন একরাশ স্নিগ্ধতায় মোড়া। বৃষ্টির পর আকাশটা যেমন পরিষ্কার হয়ে যায়, তানভীরের সাথে দেখা করার পর ওর মনটাও তেমন অনেকটা হালকা লাগছে। তানভীর ছেলেটা বেশ মার্জিত আর ভদ্র তবে ইনায়া এবার আর কোনো আবেগপ্রসূত ভুল করতে চায় না। শাফিনের বেলায় ও বড্ড তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকোয়নি। এবার ও স্থির করেছে আগে তানভীরকে ভালোভাবে চিনবে, মানুষটার মন বোঝার চেষ্টা করবে, তারপর অন্য কিছু।বাসায় ফিরতেই ড্রয়িংরুমে দেখা হলো বাবা আর মায়ের সাথে। সুরভী বেগম তখন আরাফাত সাহেবকে চা দিচ্ছিলেন। ইনায়াকে দেখেই আরাফাত সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন…

“দেখা করলে তানভীরের সাথে? কেমন লাগল ছেলেটাকে?”

সুরভী বেগম একটু বিরক্তি নিয়ে বললেন — “আহা! তোমার সবকিছুতেই এত তাড়া কেন বলতো? মেয়েটা এইমাত্র ফিরল, একটু হাত-মুখ ধুয়ে জিরিয়ে নিতে দাও।”

আরাফাত সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন — “এইসব কথা ফেলে রাখতে নেই সুরভী। তানভীরের জন্য কত দিক থেকে সম্বন্ধ আসছে তোমার ধারণা নেই। শুনি তো মেয়ের কী মত।”

ইনায়া একটু ইতস্তত করে বলল — “আব্বু, ওর সাথে কথা বলে ভালোই লেগেছে। বেশ চমৎকার মানুষ।”

আরাফাত সাহেব খুশিতে গদগদ হয়ে উঠলেন — “অতি উত্তম! তাহলে আমি কালই ওর বাবার সাথে কথা বলে তোমাদের আংটি পরানোর ব্যবস্থাটা সেরে ফেলি।”

ইনায়া চমকে উঠল! — “কিন্তু আব্বু, আমি এত তাড়াতাড়ি এসবের মধ্যে জড়াতে চাই না! মাত্র একবার দেখা হলো আর এখনই আংটি বদল?”

আরাফাত সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন….

“ভালো ছেলে হাতছাড়া হলে আর পাওয়া যায় না। তাছাড়া বিয়ের পরেও তো তুমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে, কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। আমি কথা বলে নেব।”

ইনায়া আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবার অনড় মনোভাব দেখে দমে গেল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপ করে নিজের ঘরে চলে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে বাইকের পরিচিত ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল। আরাফাত সাহেব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাইক কে বের করেছে আজ? আরশান তো গাড়ি নিয়েই বেরোয়।”

সুরভী বেগম মৃদু হেসে বললেন, “আজ রিমিকে নিয়ে আরশান ঘুরতে গিয়েছিল। বাইকটা ও-ই বের করেছে।”

একটু পরেই আরশান আর রিমি ভেতরে ঢুকল। দুজনের পোশাকই বৃষ্টির ছাঁটে কিছুটা ভেজা, অবিন্যস্ত। রিমি কারো চোখের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের ঘরে চলে গেল। আরাফাত সাহেব ছেলেকে দেখে কড়া গলায় বললেন — “এই বৃষ্টির দিনে বাইক নিয়ে বেরোনোর কী প্রয়োজন ছিল? গাড়ি তো ছিলই।”

আরশান গ্লাভসগুলো খুলতে খুলতে খুব নির্বিকারভাবে উত্তর দিল….

“যার জন্য এই বাইকটা কিনেছিলাম, আজ আবদারটা সে-ই করেছিল। তাই না বলতে পারিনি।”

আরাফাত সাহেব এবার অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। এতদিনে তিনি বুঝলেন, নিজের দামী গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আরশান কেন হুট করে এই শখের বাইকটা কিনে গ্যারেজে সাজিয়ে রেখেছিল। উনি একটু গলা খেঁকিয়ে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বললেন…

“তা ঠিক আছে, কিন্তু আবহাওয়ার অবস্থাও তো দেখতে হবে।”

আরশান সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে ঘাড় ঘুরিয়ে শান্তভাবে বলল— “আবহাওয়া যা-ই হোক, রিমির আবদার আমার কাছে বেশি জরুরি”

ছেলের মুখে এমন প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি শুনে সুরভী বেগম আঁচলে মুখ চেপে মৃদু হাসলেন। আরশান ওপরে চলে যেতেই আরাফাত সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিস্ময় আর কিছুটা কৌতুক নিয়ে বললেন — “এই আরশানের এখন এমন দশা হয়েছে যে পুরো পৃথিবী একদিকে আর রিমি একদিকে! আমি কি খুব ভুল কিছু বলেছি?”

সুরভী বেগম টিপ্পনি কেটে বললেন — “ভুলই বলেছ। যারা নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসে, তাদের কাছে স্ত্রীর ছোট ছোট আবদারই সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি হওয়া উচিত। এটাই তো স্বাভাবিক।”

আরাফাত সাহেব এবার ভ্রু কুঁচকে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

“তুমি কি পরোক্ষভাবে আমাকে খোঁচা দিলে সুরভী? আমি তোমার কোন আবদার পূরণ করিনি শুনি?”

সুরভী বেগম চায়ের ট্রে গুছাতে গুছাতে বললেন — “থাক ওসব! তার লিস্ট করতে গেলে আজ রাত কাবার হয়ে যাবে।”

আরাফাত সাহেব এবার জেদ ধরে বসলেন।

“না না, তুমি বলো কোন আবদারটা আমি অপূর্ণ রেখেছি। লিস্ট করো আজ! এখন তো কাজকর্ম কম, হাতে অখণ্ড সময়। আজ তোমার সব না রাখা আবদার আমি পূরণ করব, দেখি কত লিস্ট হয়!”

স্বামীর এই বয়সে এসেও এমন ছেলেমানুষি জেদ দেখে সুরভী বেগম না হেসে পারলেন না!
____________________________________

বিকেলের মিঠে রোদ ড্রয়িংরুমের কার্পেটে আছড়ে পড়েছে। ঠিক সেই সময়ে কলিংবেলটা বেজে উঠল। আয়ান দরজা খুলে দিতেই সামনে ডক্টর জুবায়েরকে দেখে একটু অবাক হলো। বহুদিন পর উনি এলেন এ বাড়িতে। আরশানের রিসিপশনে উনি থাকতে পারেননি কারণ তখন উনি দেশের বাইরে মেয়ের কাছে ছিলেন। দেশে ফিরতেই আরশান ওনাকে দাওয়াত দিয়েছিল, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আজ এতদিন পর আসা হলো।আরশানের জীবনের এক অন্ধকার সময়ে যিনি মেন্টর এবং চিকিৎসক হিসেবে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তাই নিজের কোনো শুভকাজে আরশান ওনাকে দাওয়াত দেন। ড. জুবায়েরকে দেখেই আয়ান সালাম দিল, উনিও আয়ানের সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করলেন। আজ বাড়িতে আরাফাত সাহেব আর সুরভী বেগম নেই। স্ত্রীর কয়েক দশকের পুরনো না রাখা আবদারের লিস্ট শুনে আরাফাত সাহেব যেন হঠাৎ করেই রোমান্টিক হয়ে উঠেছেন। তাই সব কাজ ফেলে ওনাকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য শহরের বাইরে ঘুরতে গেছেন। আয়ান ওর ভাই ভাবীকে ডাকে, পরে আরশান ও রিমি নিচে এসে ওনাকে দেখে বেশ বিনয়ের সাথে অভ্যর্থনা জানাল। আরশানের আচরণে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে যা জুবায়ের সাহেবের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ালো না। আরশান ওনাকে সরাসরি নিজের স্টাডি রুমে নিয়ে গেল, কারণ ও জানে জুবায়ের সাহেবের সাথে কথা বলতে গেলে নিরিবিলি জায়গার প্রয়োজন। রিমি ওনাকে সালাম দিয়ে চটপট রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। ওনার জন্য বিশেষ কিছু বানানো দরকার। রিমি যখন রান্নাঘরে চায়ের লিকার চড়িয়েছে, ঠিক তখনই ইনায়া মুখ ভার করে সেখানে এসে দাঁড়িয়েই গিয়ে রিমির পাশে দাঁড়ালো। রিমি ওর দিকে তাকিয়ে আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল — “কী রে ইনায়া? মনটা এত খারাপ করে আছিস কেন?”

ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল — “আব্বু কী বলছে তুই শুনিসনি? আমি এখনই এসবের মধ্যে জড়াতে চাইছি না। অথচ আব্বু যেন আমাকে এখনই বিদায় করতে পারলেই বাঁচে! এখনই আংটি পড়ানোর কথা বলছে”

রিমি চায়ের কাপগুলো গুছিয়ে নিয়ে ইনায়ার দিকে ফিরে তাকাল। ও খুব ধীরস্থির কণ্ঠে বলল — “আরে পাগলী, এত চিন্তা করছিস কেন? আব্বু একটু সেকেলে মানুষ তো, তাই হয়তো ওরকমভাবে ভাবছেন। কিন্তু আরশান থাকতে তোর কোনো চিন্তা নেই। আমি ওর সাথে কথা বলে দেব, ও ঠিকই আব্বুকে বুঝিয়ে বলবে।”

ইনায়া রিমির দিকে তাকিয়ে একটু স্বস্তি পেল। রিমি আবারও বললো — “আপাতত তুই এসব আংটি বদল বা বিয়ের টেনশন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। তানভীরের সাথে কথা বল, ওর সাথে সময় কাটা। আগে দুজনের মধ্যে একটা সুন্দর বোঝাপড়া তো তৈরি হোক? তানভীর যদি সত্যিই ভালো মনের মানুষ হয়, তবে সে-ই তোকে সময় দেবে। তোর পড়াশোনায় সে-ই হবে তোর সবচেয়ে বড় সাপোর্টার। তাই স্ট্রেস নিস না একদম।”
___________________________________

স্টাডি রুমের ভারী পর্দাগুলো টানা। ঘরের ভেতরটা মৃদু আলোয় ছেয়ে আছে। আরশান সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, আর তার ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারে ডক্টর জুবায়ের। দীর্ঘ আট বছর ধরে এই মানুষটি আরশানের মনের অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন। আরশানের শৈশব, তার মনের জটিল জটগুলো জুবায়ের সাহেবের নখদর্পণে। ডক্টর জুবায়ের কিছুক্ষণ আরশানের মুখটা পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করলেন — “রিমিই সেই মেয়ে ছিল না আরশান? যার কথা তোমার ডায়েরিতে বা আমাদের সেশনে বারবার উঠে আসত? যার জন্য তুমি বারবার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলে?”

আরশান একটুও দ্বিধা করল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বীকার করল — “Yes, she is the one”

জুবায়ের সাহেব একটু হাসলেন। সেই হাসিতে এক ধরণের প্রশান্তি ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন — “তো কেমন আছো এখন আরশান? নিজের পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার পর জীবনটা ঠিক কেমন কাটছে?”

আরশান এবার একটু নীরব হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর ও দিল — “জেদ বা জোর খাটানো ছাড়া আমি কোনোদিন সহজে কিছু পাইনি। আর ওকে পাওয়ার জন্যেও আমি সেই পথই বেছে নিয়েছি। “I married her by force”

জুবায়ের সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন — “কেন আরশান? তুমি তো ওকে ভালোবাসো।”

আরশান অস্ফুট স্বরে বলল — “I don’t know if it’s my obsession or what, but I just want to be with her”

“ও তো তোমার সঙ্গেই আছে, ওকে দেখে তো বেশ খুশিই মনে হলো। তবে সমস্যা কোথায়?”

“ও আমাকে ঘৃণা করত। কিন্তু আজকাল ও আমাকে খুশি করার জন্য অনেক কিছু করছে। কিন্তু আমার সবসময় মনে হতে থাকে যে, ও কোনো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসব করছে। হয়তো সুযোগ পেলেই ও পালিয়ে যাবে। আমার মাথা থেকে এই ভাবনাটা কিছুতেই বের হচ্ছে না।”

জুবায়ের সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আরশানের ভেতরের সেই অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। তিনি বললেন — “সবকিছুতে নেতিবাচক ভাবনা আনার দরকার কী আরশান? ওর যদি যাওয়ার ইচ্ছে থাকত, তবে ও আগেই যেত”

আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ও অস্থির হয়ে বলল — “কিন্তু ও যে আমায় ছেড়ে যাবে না, তার গ্যারান্টি তো নেই! ও যদি কোনোদিন ছেড়ে চলে যায়, তবে আমি ওকে ঠিকই আবার ফিরিয়ে আনব। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে হয়তো আমি ওর সাথে এমন কিছু করে ফেলব, যা ও কোনোদিন ভুলতে পারবে না। ও আমায় সারাজীবন ঘৃণা করবে।”

“আরশান, এত নেগেটিভ চিন্তা কোরো না। স্বাভাবিকভাবে সবটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করো। তুমি আগের চেয়ে অনেকটা বেটার আছো। এই ভয়টাকে জয় করতে শেখো।”

আরশান জুবায়ের সাহেবের সাথে নিজের মনের সব কথা শেয়ার করে, চিকিৎসার খাতিরে শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত সব ছোট ছোট যন্ত্রণার সাক্ষী এই মানুষটি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। ডক্টর জুবায়ের আরও কিছুক্ষণ ওকে জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বোঝালেন, যেন আরশানের মনের অস্থিরতা একটু কমে। দরজার ওপাশে ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে ছিল রিমি। ও ডক্টর জুবায়েরের জন্য নাস্তা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ও সবটা শুনে ফেলেছে। রিমির হাতের ট্রে-টা কেঁপে উঠল। ও ভাবত আরশান হয়তো ওকে সন্দেহ করে কিন্তু আজ ও বুঝতে পারল এটা সন্দেহ নয়, এটা একটা গভীর ভয়। হারিয়ে ফেলার তীব্র এক আতঙ্ক আরশানকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। যে মানুষটা বাইরে পাথরের মতো শক্ত, তার ভেতরটা যে এতটা ভঙ্গুর হতে পারে, তা রিমি আজ প্রথমবার উপলব্ধি করল। রিমি দরজার বাইরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মনের ভেতর তখন আরশানের জন্য অদ্ভুত মায়া কাজ করতে শুরু করেছে। এই মানুষটাকে ঘৃনা করা কি সত্যিই সম্ভব?

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1EAsbRJxhW/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here