#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২৫ (বিবাহ স্পেশাল)
_____________________________
শুক্রবার থাকায় দেরিতে ঘুম ভাঙে মৌনতার। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে উঠে যায় মীমের রুমে। তাকে কোথাও না পেয়ে আবারও নিজের রুমে ফিরে ফোন দিলে রিংটোন এর আওয়াজ আসে মীমের রুম থেকেই। তারমানে মেয়েটা ফোন রেখেই বেরিয়েছে। আগের রাতের বাবা মেয়ের মান-অভিমানের কাহিনী অবশ্য জানে না সে। তাই মীম যে রেগে বেরিয়েছে তাও অজানা। কিন্তু মেয়েটা কোথায় তা জানাও অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেশি না ভেবেই ফোন করে তার বড় পাপার কাছে।
~হ্যা মৌ বলো মামণি।
~বড় পাপা মীম কোথায় জানো কিছু? সকালে উঠে পাচ্ছি না বাড়িতে কোথাও।
~মীম সিএমএইচ এ।
~মানে? কেন? কি হয়েছে ওর? আম আমি এক্ষুনি আসছি।
~আহা মৌ পুরো কথা তো বলতে দিবে।
মীম ঠিক আছে। কিন্তু মেজর এএকের গুলি লেগেছে। অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। আর ভোরবেলা মীমই তাকে দেখে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাই তখন থেকে সেও এখানে।
~ আল্লাহ! কি বলো। এখন কি অবস্থা ভাইয়ার?
~ওটিতে আছে। অবস্থা আশঙ্কাপ্রদ। বলা যাচ্ছে না। দোয়া করছি।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। কিছু একটা মনে পড়তেই সবার থেকে কিছুটা দূরে যেয়ে আস্তে আস্তে মৌনতাকে বললেন,
~একটা সত্য কথা বলো তো মৌ, অনিল আর মীমের মধ্যে কি কিছু আছে?
~মানে?
~প্রেম ঘটিত কোনো ব্যাপার আছে কি?
~না তো! কেন?
~তোমার হার্টলেস বোন কেঁদে বে অভ বেঙ্গল বানিয়ে দিচ্ছে হাসপাতালকে তখন থেকে।
~কিহ! মীম কাঁদছে! তাও অনিল ভাইয়ের জন্য?
কিন্তু বড় পাপা ওরা তো কেউ কাউকে দেখতে পারে না। একদম সাপে নেউলে সম্পর্ক। সুযোগ পেলেই কেউ কাউকে খোঁচা মারতে ছাড়ে না।
~কিন্তু এখানে তো অন্য ব্যাপার মনে হচ্ছে। মাশফিয়া মীমের পাথর মনে অনিল আবরার ফুল হয়ে ফুটেছে। বুঝলে মৌ?
~কিন্তু বড় পাপা অনিল ভাইয়ের তো তনিমা নামের একটা মেয়ে আছে ভার্সিটিতে তার উপর কেয়ার, পজেসিভনেস, মায়া সবকিছু অনেক বেশি। এবং সকলের সামনেই এমন। কোনো লুকোচুরি নেই তাদের মাঝে। তনু পানি খাওয়ার আগেও সেই ইনফরমেশন আগে অনিল ভাইকে বলে। এদিকে অনিল ভাই গম্ভীর, চুপচাপ, রুড সবার সাথে। বিশেষ করে মীমের সাথে। কিন্তু তনুর সাথে একদম পানির মতো সোজা। তনু আর অনিল ভাই কেউই মুখে না বললেও ভার্সিটির সবাই তাদেরকে কাপল হিসেবেই জানে। আর আমারও মনে হয় তনু অনিল ভাইকে পছন্দ করে। মীম নিজেও এসব জানে। তবে?
মৌনতার কথায় শব্দহীন হেসে ফোন কাটেন হামিদুর রহমান। তার যা বোঝার সে বুঝে নিয়েছেন। এখন বাকি পথটা অনিল আবরার খান ওরফে মেজর এএকের পরিকল্পনা মতোই তাকে হাঁটতে দিলেন। দেখা যাক কোথায় যেয়ে শেষ হয় এই খেলা।
.
.
.
.
একপাশে একা বসে বসে চোখের পানি ফেলছে আরিবা। তাহমিদের নজর পড়ে তার দিকে। এদিকে তাহমিদের নিজেরই সহ্য হচ্ছে না তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুত এমন অবস্থা। কিন্তু পেশাদারিত্ব তাকে শিখিয়েছে এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে সহ সবকিছু সামলাতে। তাইতো নিজের মনের চলমান অস্থিরতা সামলে যেয়ে আরিবার পাশে বসে। ডান হাতটা উঠিয়ে মেয়েটার মাথার উপর বুলিয়ে দিয়ে থাকে। আরিবা মাথায় এক স্নেহময় হাতের স্পর্শ পেয়ে ভেজা চোখে তাকিয়ে দেখে তাহমিদ। তার দিকে তাকাতে দেখে মুচকি হেসে তাহমিদ বলে,
“কেঁদো না আরু। তোমার ভাইকে তুমি চেনো না? দেখো ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে।”
আরিবার কি হলো কি জানি। সে ওখানে বসেই তাহমিদের বুকে মুখ গুজে আরও ফুপিয়ে ওঠে। আরিবার মাথায় রাখা তাহমিদের হাত কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটু থামলেও তা আবারও ভ্রুক্ষেপহীন চলতে শুরু করে।
~এমন কেন হলো তাহমিদ ভাই? আমার আম্মুও তো এভাবেই ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো। এখন ভাইয়াকে দেখো এসব কি শুরু করেছে? আমি এসেছি যেদিন সেদিনই এমন কেন হলো? আমি এখনো দেখা করার সুযোগ পর্যন্ত পেলাম না। তবে কি আমিই অপয়া?
~এক থাপ্পড় লাগাবো আরু। এসব কি ধরনের কথা? এটা একটা পরিকল্পনার অংশ। কেউ খুবই ভয়ংকর ভাবে পরিকল্পনা করে মেজরের ক্ষতি করেছে। এখানে তোমার কি দোষ? আমি যদি আরেকবার তোমার মুখে এসব শব্দ শুনি তবে এই শক্ত হাতের থাপ্পড় খাবে তুমি ভাইয়ের বন্ধুর হাতে।
~তুমি বদলে যাওনি তো তাহমিদ ভাই। আজও আমি তোমার কাছে শুধুই বন্ধুর বোন তাইনা?
নিরব থাকে তাহমিদ। এখন এসবের সময় নয়। আগে অনিলটা সুস্থ হোক।
.
.
.
.
অনিলের অপারেশন শেষ করে ডাক্তার বেরিয়ে বলে গিয়েছে,
“গু*লি বের করা হয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষণ ক্ষত ওভাবে থাকায় তার উপর ধোঁয়া, ধুলো ময়লায় শ্বাসকষ্ট হয়েছে মেজরের অনকে। সাথে ক্ষতের অবনতি। আর গু*লি একদম হৃৎপিণ্ড থেকে হাফ ইঞ্চি উপর দিয়ে গিয়েছে। মেজরের অবস্থা খুবই অস্বাভাবিক। সত্যি বলতে তার বেঁচে যাওয়াতেই অস্বাভাবিক ব্যাপারটা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত কেউ বাঁচে না। উপরওয়ালা মেজরকে হয়তো বেশিই ভালোবাসেন আর দুনিয়ায় মেজরের ভালোবাসার মানুষদের দোয়া আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তাই এযাত্রা বেঁচে গিয়েছেন মেজর এএকে। জ্ঞান ফিরতে সময় লাগবে কয়েকঘন্টা। আপনারা শান্ত হন। শুকরিয়া করুন আল্লাহ তায়া’লার দরবারে।
মীমের মুখের ফুটে ওঠা হাসি নজর এড়ালো না হামিদুর রহমানের। মেয়ের মতিগতি বুঝতে পারছে সে। কিন্তু অনিলের মন্তব্য নিজ কানে না শোনা পর্যন্ত শান্তি পাবেন না তিনি। মেয়েটা তার কষ্ট পাক তা কোনোমতেই হতে দিবেন না তিনি। এইটুকু বয়সে কম সাফার তো আর করেনি তা মেয়েটা।
অনিলের জ্ঞান ফিরেছে। সবাই তার সাথে দেখা করতে চাইলেও সে কারো সাথেই দেখা করে না। তার একটাই কথা তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে শিফট করা হলে সে সবার সাথে একত্রে দেখা করবে। তা হলো। শুধুমাত্র কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা যেমন জেনারেল সাহেব, মেজর জেনারেলে ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সহ আরও কয়েকজনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় তার। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেখা করতে গেলেই অনিল জানায় যে তার সাথে কিছু পার্সোনাল কথা আছে।
অফিসিয়াল সাক্ষাৎ শেষ হয়। একটু স্বাভাবিক হলে অনিলকে কেবিনে শিফট করা হয়। একসাথে দেখা করতে যায় তার বাবা, বোন আর বন্ধুরা। ততক্ষণে অনিলের অনুরোধে মীম, মৌনতা আর তাদের বাবাও যায় কেবিনে। স্পেশাল পারমিশন নিয়ে সেখানে আরও আনা হয় একজন উকিল আর একজন কাজী।
সবাইকে বলে বুঝিয়ে সব ঠিক করে অনিল। আরিবা কোথার থেকে একটা পরিষ্কার ওড়না এনে মীমের মাথায় ঘোমটা দিয়ে দেয়। আবরার খান কি করবেন এমন হুট করে ভেবে না পেয়ে তার মেয়ের দিকে তাকালে আরিবা তার গলায় পরে থাকা একটা স্বর্ণের চেন খুলে বাবার হাতে দেয়। চেনটা হাতে নিয়ে,
“এটা তোমার শাশুড়ীর রেখে যাওয়া মা। এমন এক পরিস্থিতিতে সব হচ্ছে যে আমি কোনো সুযোগই পেলাম না। তাই তুমি যদি এই চেনটা নাও আমি খুশি হবো।”
মীমের কনফিউজিং চেহারা দেখে হেসে ফেলে অনিল। সে ইশারায় নিতে বললে মীম উপহারটা নেয়। তারপর অনিলের ইশারায় তার পাশে যেয়ে বেডে বসে। অনিল তার দূর্বল হাতে মীমের র*ক্ত*মাখা হাতটা টেনে আঁকড়ে ধরে রাখে।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে বাঁচার জন্য লড়তে থাকা সেনা মেজর অনিল আবরার খান আর তারই শুকিয়ে যাওয়া র*ক্তে রঞ্জিত পোশাক পরা মাশফিয়া রহমান মীম এর বিয়ে হয়ে যায় শরীয়ত ও আইন মোতাবেক। পূর্ব কথা অনুযায়ী মীম মানা করেনি। বা মেয়ের মতামত আছে আর অনিলের সাথে কথা বলার পরে না বলার মতো কিছু খুঁজে পান নি হামিদুর রহমান। আর এদিকে ছেলের চাওয়া যে মেয়ে তাকে মেনে নিতে মরিয়া হয়ে আছেন আবরার খান। আরিবাও খুশি মনে মেনে নিয়েছে ভাইয়ের সিদ্ধান্ত। বন্ধুরা কিছু বুঝেই উঠতে পারছে না তো বলবে কি। সেম অবস্থা এদিকে মৌনতার ও।
“এই বিয়ের কথা যেনো এখানে আমরা যারা আছি তারা ব্যতীত অন্য কেউ জানতে না পারে।”
অনিলের এই কথায় অদ্ভুত ভাবে তাকায় মীম। তার মনে হুট করেই তনুর মুখটা সামনে আসে। লোকটা কি তবে তনুর জন্য এই বিয়ে লুকাতে চায়? কিন্তু তাই যদি হবে তবে তাকে বিয়ে করার কি দরকার ছিলো? এমন তো আর না যে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় একপ্রকার মীমকে বাধ্য করেছে তাকে বিয়ে করতে। নিজের এতো চিন্তা লুকাতে না পেরে বলেই ফেলে মীম,
“কারণ টা কি মেজর?”
মীমের রূড ভয়েস। অনিল কি কিছু বুঝলো মেয়েটার মনের কথা? কি জানি কিন্তু সে বলে,
“প্লিজ মাই হাইনেস। It’s a humble request. One day I will tell the world about us. I will declare everywhere that my highness is my wife. Just give me some. Please!”
এরপরে আর কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না মীম। তাই চুপ থাকলো। এদিকে অনিল যে এভাবে মীমের সাথে কথা বলে তা বন্ধুমহলে আর মৌনতার কাছে স্বাভাবিক হলেও অন্য যারা ছিলো তারা হতবাক। অনিল আবরার এভাবেও এতটা নরম ভাবে কথা বলতে পারে?
..
..
..
..
চলবে___
(দিয়ে দিলাম আপনাদের অনিল ভাইয়ের বিয়ে। তবে আপনারা তনুর জন্য কষ্ট পেয়েন না। তনুকে আমি অনেক যত্নে লিখেছি। আগেও বলেছি এই কাহিনির মূল আকর্ষণ তনুই।)

