#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২৮ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________
~ক্যাপ্টেন তাহমিদ what was that?
নিজেদের মধ্যকার অদ্ভুত আবেগের মুহূর্তে গম্ভীর কণ্ঠে উক্ত বাক্য শুনেই অনিল সহ বাকিদের জড়িয়ে ধরে ঝুঁকে থাকা তাহমিদ পিছনে ফিরে দেখে কয়েক জোড়া বিষ্ময়কর চোখ তাদের দিকে এমন ভাবে দেখছে যেন এখানে টম ক্রুজের কোন সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিন চলছে। পলক ফেললেই সেই সিন মিস হয়ে যাবে। হুট করেই সবাইকে ছেড়ে ছিটকে দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে তাহমিদ। নিজের সিনিয়রদের সম্মান করে চুপচাপ ভদ্র ছেলে হয়ে থাকে। এদিকে বাকিরাও একে অন্যকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছে। রনি অনিলের পাশেই ছিল একদম। আড়চোখে একবার তাহমিদকে দেখে নিয়েই বিড়বিড় করে বলে,
~হারা*মজা*দা তাহমিদ টাকে দেখ মনে হচ্ছে সদ্য মায়ের পেট থেকে টপকে পড়েছে দুনিয়ায়। ওর মতো নাদান বাচ্চা নেই গোটা জগতে।
এদিকে সাদাফ আর অনিল স্পষ্ট শোনে রনির বিড়বিড় করে বলা কথা। বহু কষ্টে নিজের হাসি আটকে রাখে সাদাফ। এদিকে অনিল আধশোয়া হয়ে বসে সিনিয়রদের বলে,
~আপনারা হয়তো জানেন না যে ক্যাপ্টেন তাহমিদ শুধু অন ডিউটিই ক্যাপ্টেন আর আমি তার সিনিয়র। এছাড়া ডিউটির বাইরের সে এবং এখানে থাকা এই চারটা ছেলেই অনিল আবরার খানের জীবনের অর্ধেকাংশ।
একটু নড়ে সে আবারও বলে,
~আমরা ছোট্ট বেলা থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। We are theb“Fem stars” sir. (সুইডিশ ভাষায় ফেম অর্থ পাঁচ।)
এই গল্পটা সবার জানা যে প্রত্যেকেই এরা প্রত্যেকের জীবনের কতটা জুড়ে রয়েছে। তাও অনিল আর ইবনাত চুপচাপ মুখচোরা মানুষ। এরা কখনোই জাহির করে বলে না নিজেদের মধ্যে জমিয়ে রাখা ভালোবাসার কথা। তাইতো এই দুজনের মুখে কিছু উচ্চারিত হলেই বাকিরা হাজার জানা সত্য হলেও মায়াময় নজরে তাঁকিয়ে থাকে। এই যেমন এখন অনিলের এই সামান্য একটা কথাতেই সেনা কর্তাদের সাথে অনিলের চারটা কলিজার টু*করা তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাঁকিয়ে আছে।
ইবনাতের ব্যাপারটাও একই। তুরিনকে হারানোর পরে বাঁচার জন্য আর কোন কারণ বলতে এই চারটি ছেলেই তো আছে তার। এদের জন্যেই তো সে বেঁচে আছে আজও। থাকবেও যতদিন উপর ওয়ালা রাখেন। এই যে দুনিয়ায় এখন তার এই ‘fem stars’ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তবুও সে কি আনন্দেই না আছে! শুধু যদি তার তুরিনটা থাকতো!
সেনা কর্তারা আসলেই অবাক হয়েছে। কারণ কখনোই কাজের সময় অনিল বা তাহমিদের কথায়,কাজে বা আচরণে কেউ বুঝতে পারেনি এদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে। ডক্টর শাহরিয়ার অর্থাৎ ইবনাত শাহরিয়ার এর সাথে সেনাবাহিনীর কাজ করতে হয় প্রতিনিয়ত। তাদেরই ফরেনসিক ডাক্তার সে। সেও আর্মি। কই কখনো তো তার সাথেও অতিরিক্ত কোন কিছু দেখেনি কেউ! আবার এই যে দেশ সেরা ক্রাইম রিপোর্টার সাদাফ আদনান তার সাথেও তো এর আগে কাউকেই কেউ দেখেনি। পাশের ছেলেটা ইদানিং বাংলাদেশের হট টপিক কল্লোল হাসান রনি। এই বছর দেশের সেরা ব্যাবসায়ী নির্বাচিত হয়েছে। এরা প্রত্যেকেই কিভাবে নিজের জায়গায় একেকজন এমন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলছে তা আসলেই বুঝে আসে না কারো!
এই যেমন সাদাফ আদনান দেশের সেরা ক্রাইম রিপোর্টার নিঃসন্দেহে। কল্লোল হাসান রনি ব্যবসায় জগতের রাঘববোয়ালদের অন্যতম একজন। ইবনাত শাহরিয়ার আর্মির সবচেয়ে কমবয়সী সফল ফরেনসিক ডাক্তার। ক্যাপ্টেন তাহমিদ অকুতোভয়, দুঃসাহসী, আস্তার প্রতীক। আর মেজর এএকের কথা তো আর বলাও লাগে না। এরা আসলেই পাঁচটা তারা। উহু শুধু তারা নয়। আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল পাঁচটা নক্ষত্র। যারা আলোকিত করছে চারপাশ। এদের গ্রুপের নামটা একদম পারফেক্ট ‘ফেম স্টারস’।
অথচ এসব দেখে জেনেও অবাক হয়নি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। কারণ সে তার বাবার কোম্পানির কাজ করে এখনো মাঝে মাঝে। সেই সূত্রে এদের সবার পরিবারকে সে ব্যক্তিগত ভাবে চেনে। তাই সে সেই কবে থেকেই এদের ব্যাপারে জানে। তাছাড়া না জেনেশুনে তো আর নিজের মেয়েকে একটা ছেলের হাতে তুলে দেয়নি সে।
অনিল সবার কনফিউজড চেহারায় দেখে নিয়ে সুক্ষ্ম হেসে ওঠে। জেনারেল সাহেব ভ্রু কুচকে তাঁকিয়ে আছে। এই মেজর যে হাসতে পারে তা তাদের অজানা কি না! জেনারেলের কানের কাছে হালকা শব্দ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন,
~এরা পাশে থাকলে অনিল আবরারের ভিতর থেকে এএকের সত্তা ঘুমিয়ে পড়ে। ছেলেগুলো ম্যাজেশিয়ান।
.
.
.
.
অঞ্জলি সাহা গুলশানের একটা ফ্ল্যাটে বসে চোখের পানি ফেলছে আর জীবনের হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে। স্বামী, ফুটফুটে একটা সাড়ে তিন বছরের মেয়ে, শ্বশুর শ্বাশুড়ি কি নেই তার! অথচ তার অতি আধুনিক চলাফেরার জন্য কখনোই সংসার বা স্বামী সন্তানের খেয়াল রাখেনি সে। সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে হয়তো তিন বেলাও গালে তুলে খাইয়ে দেয়নি। বিয়ের পরে স্বামীকে কখনো এক গ্লাস শরবত বানিয়েও কখনো খাওয়ায়নি। কখনো শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে ভদ্র ভাবে কথা বলেনি। তার একটাই রাগ ছিলো যে তাকে তার প্রেমিকের সাথে বিয়ে না দিয়ে তার বাবা মা নিজেদের পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে। এই রাগেই সে হয়েছে অবাধ্য, অশ্লীল। নাইট ক্লাব, পার্টি, প্রায়শই বিভিন্ন ছেলের সাথে সময় হোটেলে যাওয়া এগুলোই তার জীবন হয়ে উঠেছে।
এতদিন না হলেও আজ এসব তার রিয়েলাইজ হচ্ছে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া অরুপের সেই ভিডিওতে তার সাথে অ*ন্ত*র*ঙ্গ যে নারীকে দেখা গিয়েছে সেই নারী সে নিজেই। অঞ্জলি সাহা। এই ভিডিও দেখার পরে তার আর সাহস হয়নি স্বামীর ঘরে ফেরার। সাহস হয়নি ওইরকম একটা ভদ্রলোকের মুখোমুখি হওয়ার। সাহস হয়নি নিজের সাড়ে তিন বছরের পুতুলের চোখে দেখার। তাইতো এখানে এসে ঘাপটি মেরেছে। এও ফ্ল্যাট তার নামে তার বাবা লিখে দিয়েছিল তার বিয়ের সময়। এখানেও সে অনেক অনেক ছেলেকে এনে সময় কাটিয়েছে। এখানকার বেডরুমে তার করা কাজগুলো আজ তাকে যেন গলা চেপে ধরেছে। অনুশোচনায় পাগলপ্রায় অবস্থা তার।
.
.
.
.
রাত হয়েছে বেশ। সমগ্র নগরী ঘুমে বিভোর। অথচ ঘুম নেই তনুর চোখে। আজ শুক্রবার থাকায় ভার্সিটি যেতে পারেনি। আর না পেরেছে অনিল ভাইয়ের সাথে কোন যোগাযোগ করতে। কিভাবেই বা করবে? তাদের মধ্যে তো আএ তেমন কোন সম্পর্ক এখনো হয়নি। ভার্সিটিতে দেখা হয় তাই কথা হয় একসাথে থাকা হয় তাদের। এছাড়া অনিল ভাই তো বিজনেসে নতুন তাই সামলে উঠতে পারেনি ভালো করে জানা তার। সেখানে প্রচুর পরিমাণে সময় দিতে হয় তাকে। তাইতো চাইলেই যোগাযোগ সম্ভব নয়। এসব জানা তনুর। তবুও আজ তার বুকের মধ্যে এক অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে। এর কারণ জানা নেই তার। তবে এখন যেভাবেই হোক অনিল ভাইয়ের সাথে কথা বলতে না পারলে ঘুম আসবে না তার।
দুরুদুরু বুক নিয়ে বালিশের পাশে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করে ‘Anil Bhai’ লেখা নাম্বারে। একবার রিং হয়ে কেঁটে যায় কল কিন্তু রিসিভ হয় না। পরের বার আবার কল দিবে কি না ভাবছে। ভাবতে ভাবতে দিয়েই দিয়েছে।
এদিকে কড়া ডোজের মেডিসিনের প্রভাবে ঘুমিয়ে আছে অনিল। তার বোন আরিবা রয়েছে তার সাথে রাতে। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে মীম আবার হাসপাতালে আসলেই তাকে ধমকে ধামকে আবার পাঠিয়েছে অনিল। কারণ মেয়েটার উপর দিয়েও কম কিছু যায়নি সারাদিন। একটু বিশ্রাম তো তার সিংহিনীর প্রয়োজন।
তাই প্রথম বার নিজের দ্বিতীয় ফোনে কল আসলেও কিছুই বুঝতে পারে না অনিল। দ্বিতীয়বার কল করলেই নিভু নিভু চোখে ফোনের স্ক্রিনে তনু নামটা দেখেই সাথে সাথে রিসিভ করে অনিল।
~উম হ্যালো তনু।
তনুর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা অনিলের ঘুম জড়ানো কন্ঠে। কোন মানুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠ এতো মোহনীয় হতে পারে তা তনুর জানা ছিলো না। এদিকে অনিল বার বার হ্যালো বলেই যাচ্ছে তনুর উত্তর দেওয়ার কোন তাড়াই নেই।
~কথা বলবে নাকি ফোন কেঁটে দেবো?
হুশ ফেরে তনুর। তড়িৎ বেগে সে উঠে বসে শোয়া থেকে। দ্রুত দুইপাশে মাথা নাড়াচ্ছে যেন অনিল তার সামনে বসে আছে।
~অ..অনিল ভাই আপ..আপনার ঘুমকা..কাতুরে কণ্ঠে কি বি…ষ মিশিয়ে রে..রেখেছেন? আমার মনে হচ্ছে আমি ম..ম..রে যাচ্ছি আ..আপনার এমন কণ্ঠে। এটা আপনি কি কর..করলেন আমার স..স..সাথে!
.
..
..
..
চলবে___

