#প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৩৯

0
17

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৯ (কপি করা নিষিদ্ধ)
_______________________________________

অক্টোবরে অসময়ে প্রকৃতিতে নামা বৃষ্টির রেশ ছিলো প্রায় সারারাত। রাতভর নিজের আধিপত্য বিস্তার করে শেষরাতের দিকে তলপিতলপা বেঁধেছে বৃষ্টি। আর এদিকে রাতভর বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে যেন আধিপত্য বিস্তার করেছে মেজর। বৃষ্টি আর মেজরের এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে কে জিতলো আর কে হারলো সেই ফলাফল নির্ণয়ে অবশ্য ব্যর্থ অনিল রমণী।
এমনিতে অক্টোবর চলছে তারপর আবার সারারাত বৃষ্টি। রুমের এসি না চালিয়েই বেশ শীত শীত অনুভব করে পাতলা কাঁথার আড়ালে নিজেদের শরীর জড়িয়েছে অনিল দম্পতি।

বেলা বাড়ায় সূর্যের আলো তীর্যক ভাবে মীমের চোখে লাগলে ঘুম ভাঙে তার। এদিকে প্রায় সারারাত জেগে থাকায় চোখ খুলতে বহু কষ্ট হয়। কিন্তু চোখ খুলেই নিজের খুব কাছে একদম লেপ্টে ঘুমন্ত মেজরের মুখ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকে মেয়েটা। বিয়ের বেশ কিছুদিন কেটেছে। তাদের বিয়ে হয়েছে অক্টোবরের শুরুতে আর আজ অক্টোবরের শেষদিন। মানে ৩১শে অক্টোবর। এই প্রায় মাসখানেক একসাথে এক রুমে এক বিছানায় মেজরের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে ঠিকই তবে কখনো মেজরের আগে ঘুম থেকে উঠতে পারেনি মীম। তাই কখনোই সে ঘুমন্ত অবস্থায় মেজরকে দেখতে পারেনি। মেজরের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দেখতে দেখতে তার ফর্সা চেহারায় নিজের আঙুল দ্বারা ছুইয়ে দেয় মেজর রমণী। কপাল থেকে আঙুল নেমে আসে ক্লিন সেভ করা থুতনিতে। থুতনিতে থাকা কুচকুচে কালো তিলের উপর আঙুল ছুইয়ে রাখে। সে ভাবতে থাকে এই লোক পুরুষ মানুষ তাই তার থুতনিতে থাকা এই তিল এড়ানো অসম্ভব ব্যাপার। আর যদি এই তিল কোন মেয়ের থাকে তবে সেই মেয়েকে না জানি কি পরিমাণ আকর্ষণীয় লাগবে!
ভাগ্যিস লোকটা সেনাবাহিনীর একজন তাই ক্লিন সেভ করে থাকে। না হলে এই জিনিস ঢেকে থাকতো।

এদিকে অনিলের ঘুম খুবই পাতলা। তার বউ যখন তার মুখে হাত দিয়েছে তখনই তার ঘুম ভেঙেছে। অথচ সে দারুণ ভাবে ঘুমের অভিনয় করে যাচ্ছে এই অতিরিক্ত ম্যাচিউর মেয়েটার একটু পাগলামি উপভোগ করতে। কারণ সে চোখ খুললেই বউ তার এখনকার বাচ্চা রুপ থেকে বের হয়ে সবসময়কার মতো কাঠখোট্টা হয়ে যাবে। থাকুক না একটু তার বুকের ভিতর। তার বুকে থেকে তাকেই একটু জালাক নাহয়।
সে যা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তাতে এমন মূহুর্ত তার জীবনে দ্বিতীয় বার পাবে কি না তা নিয়েই তার সন্দেহের শেষ নেই। তার দায়িত্বের দায়বদ্ধতার আবশ্যকতায় না জানি সে হারিয়েই ফেলতে চলেছে এই মেয়েটাকে। না জানি কতোখানি আঘাত করতে চলেছে প্রথমেই ভেঙে যাওয়া এই মেয়েকে!

অনিলের হালকা নড়াচড়া বুঝতে পেরেই একদম স্টিল হয়ে তার বুকে ঘাপটি মেরেছে মীম। যখন বুঝতে পারে যে অনিলের ঘুম ভাঙেনি তখন আবারও মাথাটা অনিকের বুক থেকে একটু উঠিয়ে আবারও তাকেই দেখতে ব্যস্ত হয়। নড়েচড়ে শোয়ার জন্য বুকে লাগা সেই গু*লির দাগটা মীমের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়। শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় অনিল বধূ। কি যে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে তার কাল রাত থেকে! এই যে অনিল কখনো তার সামনে শার্টলেস থাকেনি তাইতো আগে কখনো এই দাগ সে দেখেনি। অথচ কাল রাতে তাদের সীমা লঙ্ঘন করার সময় এই দাগ মেয়েটাকে যে পীড়া দিচ্ছিল তাতে তার মনে হচ্ছিল এই গু*লি মেজরের বুকে নয় তার বুকে লেগেছে।
আর শুধু যে এই একটা দাগ এমন নয়। এই মেজরের পেটানো শরীর জুড়ে এমন আরও অগণিত দাগ রয়েছে। পেটে, বুকে, পিঠে, বাহুতে, পায়ে অভাব নেই। পিঠে একটা দাগ রয়েছে কোনাকুনি ভাবে লম্বা। যা দেখেই মীমের আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। লোকটার শরীরের এই সকল দাগ যেন চেঁচিয়ে তাকে বলে, ‘দেখ মীম দেখ। তোর স্বামী নামক এই কাঠখোট্টা পুরুষের এতো অল্প বয়সে মেজরের মতো এতো বড় সম্মাননা পাওয়ার পেছনের গল্প দেখ। দেখ এই পুরুষের দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেখ।’

গভীর শ্বাস ছেড়ে বুকের এখনো অনেকটা তাজা দাগে হাত বুলিয়ে দেয় মীম। এমনিতেই পুরোপুরি ঠিক হয়নি এই ক্ষ*ত। তারপর আবার কাল রাতে ভিজেছে। আর রাতে এই ক্ষ*তে মলম লাগানোর মতো পরিস্থিতি একদমই ছিল না তাদের। তাইতো আগের চেয়েও বেশি তাজা হয়েছে পুরনো ক্ষ*ত।
মীম নিজেকে আরেকটু অনিলের বুকে সেটে নিয়ে মাথাটা নিচে করে অনিলের বুকের সেই ক্ষ*তে ঠোঁট ছুইয়ে দেয়। দিয়ে সরে আসে না সেভাবেই ঠোঁট ছুইয়ে রেখে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে মেজরের বুকে। এদিকে হালাল নারীর এমন অসহ্যকর ছোয়ায় চোখ মেলে তাকিয়ে বুকে থাকা রমণীর পানে দেখে মেজর।

এই মেয়ের মনে যে সে জায়গা করতে পেরেছে তা আগেই বুঝেছে অনিল। তাইতো কাল রাতে সব ভুলে তাকে কাছে টেনেছে। অথচ এই পাথুরে মেয়ের মনের কতটা গভীরে সে প্রবেশ করেছে তা বুঝতে পারছে এখন। আর সে পুরো ব্যবস্থা করে রেখেছে এই মেয়েকে আরও একবার ভেঙেচুরে শেষ করার। সমস্ত পার্সোনাল সম্পর্ক দূর করে সে ব্যবস্থা করেছে এই মেয়েকে কষ্টের নদীতে একা একা ছেড়ে দেওয়ার। তাইতো সম্পর্ক আগে নিয়েছে ইচ্ছাকৃত। কিন্তু এখন তার বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে তা কিভাবে নিভিয়ে দিবে মেজরের তা জানা নেই। এমন তো তার সাথে হওয়ার কথা ছিল না! সবকিছু তো তার পরিকল্পনা মাফিক এগোচ্ছে তবে সে কেন কষ্ট পাচ্ছে! এই যে তার আড়ালপ্রিয়া, তাকে কাঁদাবে বলে?
মীমকে সরে যেতে দেখে আবারও ঘুমের অভিনয় করে অনিল। আর মীম তার বুক থেকে উঠে ওয়াসরুমে চলে যায়। অনিল আবারও চোখ মেলে এবার উঠে বসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাথরুমের বন্ধ দরজা পানে চেয়ে থাকে। সে যা করতে যাচ্ছে এর পরিনতি নয়ে ভয় পাচ্ছে এখন অনিল আবরার খান।
.
.
.
.
বিকাল পাঁচটা, ৩১শে অক্টোবর। ঢাকা সেনানিবাস।
হাতে নীল রঙের একটা ফাইল নিয়ে তার সমস্ত ডিটেইলস বারংবার পড়ছে মেজর এএকে। এই ফাইল হচ্ছে চক্র খু*নে*র এখন পর্যন্ত সকল ভি*ক্টি*মে*র ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। যা ফরেনসিক থেকে পাঠানো হয়েছে। আবার আরেকটা ফাইল হাতে তার সামনে বসা ক্যাপ্টেন তাহমিদ। সেই ফাইলে ইবনাতের থেকে সরাসরি পাওয়া রিপোর্ট। দুই ফাইলের মাঝের পার্থক্য গুলো দেখছে আর আবাক হচ্ছে দু সেনা কর্মকর্তা। সর্ষের মধ্যে যে ভূত আছে তা তারা আগেই বুঝেছিল। তাইতো ফরেনসিক রিপোর্ট ছাড়াও ডাক্তার ইবনাত থেকে লুকিয়ে অথেনটিক রিপোর্ট নেয়। অথচ এই লুকিয়ে থাকা ভূতের সন্ধান তার পাচ্ছে না কোন ভাবেই।

দুই ফাইলের দুইটা পেজ বের করে ক্যাপ্টেনের সামনে রাখে মেজর। একটা পয়েন্টে চোখের ইশারায় দেখতে বলে। ক্যাপ্টেন তাহমিদ মেজরের ইশারা মতো দেখে অজস্র ভাঁজ হওয়া কপাল সোজা করে ফেলে। এতদিন ধরে যাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছিল পুরো টীম অবশেষে তাকে পেয়েছে। মনে মনে নিজের সামনে বসা তার এই মেজরের বুদ্ধির তারিফ না করে পারে না ক্যাপ্টেন তাহমিদ। মেজর এএকের মাথা ব্যতীত এই অতিক্ষুদ্র ব্যপারটা কারই বা মাথায় আসতে পারে জানা নেই ক্যাপ্টেনের।

লাস্ট মা*র্ডা*র হয় অরুপ দাস। তার ময়নাতদন্তের রিপোর্টই বের করে রাখা দুইটা ফাইলে। ফরেনসিক বিভাগ থেকে যে রিপোর্ট সাবমিট করেছে তাতে লেখা মৃ*ত্যু*র সময় আর ইবনাতের থেকে পাঠানো রিপোর্টের সময়ের রয়েছে ভিন্নতা। ইবনাত যে রিপোর্ট সাবমিট করেছে তাতে উল্লেখ আছে অরুপ দাসের মৃ*ত্যু*র সময় তাকে অ*প*হ*র*ণ করার ছাব্বিশ থেকে সাতাশ ঘন্টা পরে। কিন্তু ফরেনসিক থেকে সাবমিট হওয়া রিপোর্টে উল্লেখ আছে মৃ*ত্যু*র সময় অ*প*হ*র*ণের ঘন্টা খানেক পরেই।
ময়নাতদন্তের সময় অরুপ দাসের বডিতে পাওয়া গিয়েছে সে ছাড়াও অন্য আরও দুইজন মানুষের র*ক্তে*র স্যাম্পল। অথচ সেই খবর ও বেমালুম চেপে যাওয়া অফিসিয়াল রিপোর্টে। সেই স্যাম্পল টেস্ট করে জানা গিয়েছে ভিক্টিম ছাড়াও অন্য যে দুইজনের র*ক্ত পাওয়া গিয়েছে তাদের মধ্যে একজন মেয়ে এবং একজন ছেলে।

অঞ্জলি সাহার সু*ই*সা*ই*ড স্পট থেকে পাওয়া গিয়েছিল একটা ইনহেলার। খু*নি যে একজন নয় তা পরিষ্কার। সাথে এও পরিষ্কার হয়েছে যে এটা একটা দল। আর তাদের মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে একটা মেয়ে। অনিলের প্রেডিকশন যদি ভুল না হয় তবে সেই মেয়েকে সে খুবই ভালোভাবে চেনে। কাছে রেখেই খবর আর প্রমাণ যোগাড় করছে সে। ফরেনসিক থেকে এই গণ্ডগোল কে করছে তার সব প্রমাণ এখন ক্যাপ্টেন তাহমিদের হাতে। এখন তাকে তুলে এনে খাতির যত্নের প্রস্তুতি নিতেই বেরিয়ে গেলো ক্যাপ্টেন।

ভাগ্যিস ইবনাত শাহরিয়ার ছিল, না হলে এই সিণ্ডিকেট ধরতেই অনেক সময়ের প্রয়োজন পড়তো সেনা মেজরের। এই খু*নি দলের পেছনে যে শক্ত হাত রয়েছে তাদের সুরক্ষা দিতে তা বুঝতে বাকি নেই মেজরের। তবে সেই শক্ত হাতের মালিক বা মালিকদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি তার টীম। আর পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে সে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। কারণ যদি সে শতকরা এক ভাগ ও ভুল হয় তবে তার ভুলের মাশুল দিতে হবে না জানি কতশত নিরীহ মানুষের। তাছাড়া এই কে*স ঘাটতে যে কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরিয়েছে। এখন আর এই কেস চক্র খু*নের সীমাবদ্ধ নেই। এই খু*নের যে মেইন কাল*প্রীট সে একটা সা*ই*কো। আর তার সুযোগ নিয়েই তাকে নিরাপত্তা দিয়ে এর পেছনে বিরাট কিছু পরিকল্পনা চলছে যার ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য আছে মেজরের হাতে। কিন্তু সেই রাঘব বোয়ালের নাগাল পাচ্ছে না সে। তার নাগাল পেতে এই সা*ই*কো দলটাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তার আগে এদের এই খু*ন*খা*রাপি বন্ধ করা বেশি প্রয়োজন। সেই ব্যবস্থা অবশ্য করে ফেলেছে মেজর।

কিন্তু তার পরিকল্পনা সফল করতে গেলে তার ব্যক্তিগত জীবনে যে ঝড় উঠতে চলেছে তা কিভাবে সামলাবে জানা নেই অনিলের। চোখের সামনে বারবার মীমের মুখটা ভেসে উঠছে। কিন্তু তার সাথে সাথেই কানে বেজে চলেছে-
“সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে।”

হ্যা সকল পিছুটানের ঊর্ধ্বে, সকল দুর্বলতার ঊর্ধ্বে, তার নিজের প্রাণের ঊর্ধ্বে তার দেশ। এই শপথ বাক্যই তো প্রতিটি সেনা সদস্যরা আওড়ায় যখনই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে।
নিজের চেয়ারে চোখ বন্ধ করে শরীর এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেজর। তারপর আনমনেই বলে উঠলো,

“আল্লাহ আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে শক্তি দিন নিজের সকল দুর্বলতার ঊর্ধ্বে গিয়ে দায়িত্ব পালনে। যে ঝড় আসতে চলেছে তা সামলাতে শক্তি দিন।”

চোখ মেলে নিজের ফোন চোখের সামনে ধরে গ্যালারি ঘেটে তার আর মীমের সেদিন রাতের তোলা একটা ছবি দেখে। তাদের ফার্স্ট নাইটের রাতে যখন মীম শাড়ী পরেছিল। আর তার পরনে এই আর্মি ইউনিফর্ম। ছবিটা দেখতেই যেন তার হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে বারবার।

..
..
..
চলবে___

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here