#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪৮ (কপি করা নিষেধ)
__________________________________
চট্টগ্রাম পিপলস কেয়ার হাসপাতাল। এটা প্রাইভেট একটা হাসপাতাল যা চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম সেরা একটা সেবাকেন্দ্র। সেই পিপলস কেয়ার হাসপাতালের ছাদে রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে আকাশ পানে চেয়ে আছে সাদাফ। দিনের সমস্ত আলো সরে গিয়ে প্রকৃতিকে দখল করে নিয়েছে আঁধার। কিন্তু মনুষ্য তৈরি যান্ত্রিক আলো আবার সেই আঁধারকে স্থায়িত্ব দেয়নি।
নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া বিয়ে নামক ঘটনা নিয়ে ভাবছে সাদাফ। কিন্তু কিছুতেই কিনারার দেখা পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে সমুদ্রের অতলে ডুবছে ক্রমশ। কিভাবে সে তার ভাইসম বন্ধু ইবনাতের সামনে যাবে তুরিনের বর হয়ে? সে তো দেখেছে বছরের পর বছর ইবনাত তুরিনের একে অপরের জন্য ভালোবাসা। সে তো নিজের চোখে দেখেছে তুরিনের হারিয়ে যাওয়ার পর ইবনাতের বেহাল দশা। কিভাবে সে তার প্রাণের অন্যতম এক অংশের সামনে যাবে তারই ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে?
এদিকে কখন থেকেই তার ফোন বাজছে। ডান পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনে চোখ বুলিয়ে দেখে অনিল ফোন করছে তাকে একের পর এক। কিন্তু সে কথা বলতে ইচ্ছুক নয় এখন। এক পর্যায়ে ইবনাতের কল আসে। এবার প্রচন্ড অসহায় অনুভব করে সাদাফ। কিন্তু সে তাও কল রিসিভ করে কানে দেয়।
“কিরর ব্যাটা কল ধরস না কেন?”
“…..”
“ফিরবি কবে ঢাকা?”
“……”
“ওই তোরে কি বোবায় ধরছে? কথা কস না কেন?”
“ইবনাত আমি..আমি..আ..”
“কি তখন থেকে আমি আমি করিস ব্যাটা। বাদ দে তোর তোতলামি। আমার কথা শোন ভাই। দ্রুত ঢাকা ব্যাক কর। তোরা ফিরলেই সামনের শুক্রবারে মৌনতাকে আমার বাসায় নিয়ে আসবো পারমানেন্টলি। তোরা ছাড়া তো সম্ভব না। তাড়াতাড়ি ফের।”
“আমি সরি ভাই। আমি সরি। বিশ্বাস কর ইবনাত আমি জানতাম না সেদিন যে ওই ওই মেয়েটা….
আমি একটু আগে পর্যন্ত ও জানতাম না ভাই। আমাকে ভুল বুঝিস না। আমার থেকে দূরে যাস না। আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করিস না। ইবনাত আমাকে মাফ কর ভাই।”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ইবনাত। সে জানতো ছেলেটা নিজেকে সামলাতে পারবে না এতো সহজে। তাইতো সে নিজেই কথা বলে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করছে।
“সাদাফ ধর আমার আর মৌয়ের জায়গায় তুই আর কোনো মেয়ে হতি। সেই রাতে তুই আমার মতো এমন একটা অন্যায় করতি। তারপর কি তুই সেই মেয়ের হাত ছেড়ে দিতি? তোর পেরিয়া যাওয়া জীবনের জন্য একটা মেয়ের সামনে থাকা পুরো জীবন নষ্ট করতি? ভেবে উত্তর দিবি?”
“কখনোই না। তুই যা করেছিস হয়তো তাই করতাম। তাকে সম্মানের সঙ্গে আপন করে নিতাম।”
“তবে তুই কিভাবে ভাবলি আমি ইবনাম মৌনতার হাত ছেড়ে দেবো?”
“কিন্তু তুই তো জানতিস না তুরিন বেঁচে আছে। জানলে নিশ্চয় মৌনতার সাথে বিয়ে করতে পারতি না।”
বড় করে দম ছাড়ে ইবনাত। আকাশের অন্ধকারে তাকিয়েই বলে,
“জানতাম। আমি মৌকে বিয়ে করার অনেক আগে থেকেই জানতাম তুরিন বেঁচে আছে। তাও আমি মৌকে জড়িয়েছি নিজের সাথে।
তুরিন আর আমার যে সম্পর্ক ছিলো তা এখন অতীত। সে এখন তোর ঘরণী সাদাফ। জেনে হোক না জেনে হোক তোদের বিয়ে হয়েছে আর বিয়ে কোনো মজার বিষয় নয়। তুই তোর স্ত্রীকে না দেখেই এই কয়েকটা মাস সম্মান করেছিস। তাকে মেনেছিস। তার সাথে সারাজীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিস। তবে তাতে কি এসে যায় মেয়ে টা তুরিন? আমার কথা ভাবছিস? ভাবিস না। আমি এখন অন্যকারো। এবং আমি মনে প্রাণে মৌনতাকে আমার স্ত্রী মানি। তাকে আমি জীবন থাকতে ছাড়বো না। এতে যদি এখন তোর আর তুরিনের বিয়ে না হয়ে তুরিন আগের মতো থাকতো আমি তাও মৌকে ছাড়তাম না। আমার ফেম স্টারস এর কসম। এখানে তোর কোনো ভুল নেই। কোনো অন্যায় নেই। তুই প্লিজ তোর আর তুরিনের সম্পর্ককে একটা সুযোগ দে ভাই। এভাবে হাত গুটিয়ে থাকিস না।
আর দ্বিতীয় বার যেনো কখনো না শুনি এইসব দূরে যাওয়ার কথা, সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা। এসব কথা আমাকে ম*রণ যন্ত্রণা দেয় বুঝিস তা? তোরা ছাড়া কে আছে আমার? তোদের ছেড়ে কোথায় যাবো আমি?”
“ইবনাত।”
“হুম।”
“আই লাভ ইউ ভাই।”
হেসে ওঠে ইবনাত। এদিকে কনফারেন্স কলে থাকা অনিল, তাহমিদ, রনিও মুচকি হেসে ফেলে। কল কাঁটে। বাকি তিনজন আর সাদাফকে বুঝতে দেয়না তারাও ছিলো এতক্ষণে কলে। এই ব্যাপারটা একান্ত সাদাফ আর ইবনাতেরই সমাধান করার ছিলো। তাইতো আর কেউ কোনো কথা বলেনি শুধু অপেক্ষা করেছে। বাকিরা ঢাকা হলেও অনিল সাদাফের থেকে একটু দূরে একটা পিলারের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছাকৃতভাবেই সে সামনে যায়নি। সাদাফকে চট্টগ্রাম আনার এটাই উদ্দেশ্য ছিলো তুরিন আর তার বিয়ের ব্যাপারটা সামনে আনা। সফল হয়েছে অনিল। দুই বন্ধুর নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটা হওয়া দরকার ছিলো তাও হয়েছে। এখন অনিলের দেখার পালা তার হাইনেসের উপর কে বা কারা আক্রমণ করেছে। এতো বড় কলিজা কার হয়েছে যে মেজর এএকের জানে হাত রাখার সাহস করেছে? যে কলিজায় এতো সাহস সেই কলিজার ওজন করে দেখবে এবার মেজর এএকে। এতোক্ষণ অনিল তার ব্যক্তিগত কাজে তার ব্যক্তিগত মানুষ গুলোকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলো বিধায় মেজর এএকের ভয়ংকর রুপ বাইরে আনেনি সে। সেই রুপ ঢাকাতেই রেখে চট্টগ্রাম পা রেখেছিল অনিল। কিন্তু যেখানে তার প্রাণভোমরায় আঘাত করা হয়েছে সেখানে তার চরিত্রের অনিলকে আড়াল করে মেজর এএকে কে তো বাইরে আসতেই হবে।
.
.
.
.
শাহমীর তার নিজের গড়া গোডাউনে চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। তার সামনে হাত পা বাঁধা অবস্থায় চারজন লোক পড়ে আছে। এদের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কি পরিমাণ অত্যাচার চলেছে এদের উপর দিয়ে। গোডাউনে হাজির হয় অনিল। এসেই বসে শাহমীরের পাশেই একটা চেয়ারে। সুদর্শন এক পুরুষের এমন লাল হয়ে ওঠা চোখ, তীক্ষ্ণ চোয়াল, রাগে ফর্সা চেহারার রঙ পালটে লালখয়েরী হয়ে ওঠা সবকিছু মিলিয়ে ভয়ংকর রুপ দেখেই কেঁপে ওঠে বন্দীরা। শাহমীর নিজের থেকে ছয়মাসের ছোট ফুফাতো ভাই অনিল ওরফে মেজরের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে এখন বুঝতে পারছে কেন মেজর এএকে এতটা আতংকের নাম অপরাধীদের কাছে? কেন পুরো আর্মি ব্যাটালিয়ন বলে অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও মেজরকে দেখে অপরাধীরা কেঁপে ওঠে। কেন অপরাধ জগতে মেজর এএকে এক ত্রাসের নাম।
শাহমীর স্বীকার করতে বাধ্য যে এমন সুদর্শন পুরুষ সে কখনোই দেখেনি। সাথে সে এটাও স্বীকার করতে বাধ্য যে এমন সুন্দর চেহারার ভয়ংকর মানুষও সে কখনোই দেখেনি। শাহমীর নিজেকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর, ভয়ংকর মনে করে। কারণ তার বাবা রাজনীতিতে জড়িত। তাই না চাইতেও তাকে অনেক সময় অনেক কিছু করতে হয়। কিন্তু শাহমীর এই মেজরের সামনে শিশু বাচ্চা মাত্র।
অনিল বেঁধে রাখা চারজনের উদ্দেশ্যে বলে,
“ভালো করে জিজ্ঞেস করবো তোরাও ভালো করে ভদ্রভাবে উত্তর দিবি। তোরা যদি চালাকি করার চেষ্টা করিস তবেও আমি চালাকি করবো। আর আমার চালাকি তোরা সহ্য করতে পারবি না। তাই আমাকে আমার পদ্ধতি ব্যবহার করতে বাধ্য করিস না।”
লোক গুলো ঢোক গেলে। কারণ যদি তারা মুখ খোলে তবে তারা মরবে। আর এখন যে অবস্থা দেখছে মুখ না খুললেও যে খুব একটা ভালো পরিস্থিতিতে থাকবে না তাও স্পষ্ট।
“আমাদের উপর আক্রমণ করার কারণ কি? কে পাঠিয়েছে তোদের? কার হয়ে কাজ করিস?”
“…..”
“তোরা আমার পেশেন্সের পরিক্ষা নিস না। আমি নিজের ফর্মে ফিরলে কেঁদে কূল পাবিনা।”
“…..”
“আবার জিজ্ঞেস করছি, কে পাঠিয়েছে তোদের? কেন আমাদের উপর আক্রমণ করলি?”
“….”
এবারে বিরক্ত হয়ে গিয়েছে শাহমীর। কিন্তু অনিলের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। দেখে বোঝার উপায় করেও বুঝলো না শাহমীর যে তার ছোট ভাইয়ের মনে কি চলছে। অনিল নির্বিকার ভঙ্গিতে বাঁধা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সেই চোখে চেয়েই প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার অবস্থা সবার। এতো তীক্ষ্ণ চাহনি হতে পারে কারো তা যেন অজানা ছিলো এতকাল। তবুও প্রাণের মায়ার কেউই মুখ খুলতে রাজি নয়।
“শাহমীর তোকে যেসব ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম করেছিস?”
“ইয়েস ব্রো। সব রেডি। তুই বললেই চলে আসবে।”
এবার বেশ মজা পেয়েছে যেন শাহমীর। সে তো এতক্ষণ ভাবছিলো তার আর্মি ভাই না আবার এগুলোকে ধরে থানায় দিয়ে দেয়। কিন্তু তাকে হতাশ না করে কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা যে করেছে তাতেই সে খুশি।
“তবে ফর্মুলা ওয়ান এপ্লাই করার ব্যবস্থা কর।”
“এই সাদ্দাম রে ব্যবস্থা কর।”
নিজের লোককে ডেকে বলে ওঠে শাহমীর। সে বলার সাথে সাথেই সাদ্দাম নামের ছেলেটা আরও কিছু ছেলেপেলে নিয়ে চারটা বড় বড় ড্রাম আনে খালি। তারপর পাইপের সাহায্যে তা পানিতে ভরে ফেলে। ঠান্ডা পানিতে। এরপর অনিলের হাতের ইশারায় বেঁধে রাখা চারজনকে সেই পানি ভরা চারটা ড্রামে হারনেস বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হয় হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই।
এদিকে হাত পা বাঁধা থাকায় নিজেদের কিছুতেই বাঁচাতে পারে না লোকগুলো। অনিলের ইশারায় তাদের পানিতে চুবিয়ে রাখা হচ্ছে। একে তো ঠান্ডা পানি তারউপর আবার দম বের হওয়ার ঠিক আগেই নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। লোকগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। তবুও মেজরের মনে বিন্দুমাত্র মায়া জন্মায় না। একই অবস্থা চালু রাখার নির্দেশ দেয় সে।
এরপরেও যখন লোকগুলো মুখ না খুলে এবার অনিল বলে ঠান্ডা পানির পরিবর্তে গরম পানির ব্যবস্থা করতে।
শাহমীরের লোকেরা গরম পানি ভরা ড্রামের ব্যবস্থা করে।
যা দেখে হতবিহ্বল হয়ে যায় লোকগুলো। এই মানুষ যে তাদের শুধু শুধু ছেড়ে দিবে না তা তার কাজেই প্রকাশ পাচ্ছে। উভয় সংকট এখন লোকগুলোর।
..
..
..
চলবে____

