বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_৩২

0
15

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৩২
#লেখনীতে:_আরিবা নাওশীন

ভোরের আলোটা যখন জানালার পর্দা চিরে রিন্নির মুখে পড়ল, ও এক মুহূর্তের জন্য কাল রাতের বৃষ্টির শব্দ আর আরাভের সেই উষ্ণ মূহুর্তের কথা ভেবে মুচকি হাসল। হাত বাড়িয়ে পাশে আরাভকে খুঁজল, কিন্তু বিছানাটা আগের মতোই হিমশীতল। আরাভ নেই।

রিন্নি ধড়ফড় করে উঠে বসল। কাল রাতে মানুষটা এত প্রতিজ্ঞা করল, এত মায়া দেখাল, আর সকালেই আবার উধাও? রিন্নির মেজাজটা এবার সপ্তমে চড়ল।

সে বিছানা থেকে নেমে স্টাডি রুমের দিকে দৌড়াল। কিন্তু সেখানেও ল্যাপটপগুলো বন্ধ, শুধু একটা নীল রঙের ইন্ডিকেটর লাইট মিটমিট করে জ্বলছে।

টেবিলের ওপর একটা চিরকুট রাখা। রিন্নি কাঁপাকাঁপা হাতে সেটা তুলল। কিন্তু চিরকুটে কোনো রোমান্টিক কথা নেই, শুধু একটা এড্রেস আর নিচে লেখা “জেরি, এই ঠিকানায় চলে এসো। তোমার শৈশবের সেই সাদা-কালো ছবির রহস্য আজ এখানেই শেষ হবে। দেরি করো না।”

রিন্নি চিরকুটটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সেই ছবিটা! যেখানে রিন্নির পেছনে একটা আবছা ছায়া ছিল। ওই ছায়াটা কার? আর আরাভ কেন একা চলে গেল?

রিন্নি তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। ফাহিম সোফায় বসে হাই তুলছিল। রিন্নিকে দেখে সে বলল, “ভাবী, ভাইয়া তো ভোর চারটেয় বেরিয়ে গেছেন। আমাকে বলে গেছেন আপনাকে নিয়ে ওই ঠিকানায় পৌঁছে দিতে। গাড়ি রেডি।”

রিন্নি কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসল। ওর ভেতরে এক ধরণের আতঙ্ক আর কৌতূহল কাজ করছে। ফাহিম গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, “ভাবী, ভাইয়া গত রাতে ল্যাপটপে ওই ছবিটার ডিজিটাল রিস্টোরেশন করছিলেন। উনি নাকি ওই ছায়াটার চেহারা উদ্ধার করেছেন।”

শহরের এক পুরনো লাইব্রেরির সামনে এসে গাড়ি থামল। জায়গাটা বেশ নির্জন আর ধুলোবালি মাখা। রিন্নি ভেতরে ঢুকে দেখল একটা বড় হলরুমের মাঝখানে আরাভ দাঁড়িয়ে আছে। ওর সামনে একটা বড় প্রজেক্টর স্ক্রিন।

আরাভ রিন্নিকে দেখে ইশারা করল কাছে আসার জন্য। রিন্নি গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল স্ক্রিনে সেই পুরনো ছবিটা জুম করা।

আরাভ শান্ত গলায় বলল, “জেরি, তুমি সবসময় জিজ্ঞেস করতে এই ছায়াটা কার। আমি গত রাতে এর পিক্সেল এনালাইসিস করেছি। এই মানুষটা কোনো শত্রু নয় রিন্নি। এই মানুষটা হলো তোমার বড় আম্মু যিনি তোমার জন্মের পরপরই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।”

রিন্নি বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। “বড় আম্মু? কিন্তু মা তো বলেছিলেন উনি মা-রা গেছেন!”

আরাভ প্রজেক্টরের স্লাইডটা চেঞ্জ করল। এবার একটা পুরনো নিউজপেপার ক্লিপিং ভেসে উঠল। “না রিন্নি, উনি মা-রা যাননি। উনি ছিলেন একজন গণিতবিদ। তোমার আম্মুর ডায়েরিতে যে কোডটা ছিল, সেটা আসলে উনারই আবিষ্কার। ড্রাগন আর সোনিয়ারা জানত যে ওই কোডটা ডিকোড করার চাবিকাঠি তোমার পরিবারে আছে। আর এই ছবিটা ওরা তোমাকে পাঠিয়েছিল শুধু এটা বোঝাতে যে ওরা তোমার পরিবারের ইতিহাস তোমার চেয়েও বেশি জানে।”

রিন্নি মাথা নিচু করে বসে পড়ল। “তার মানে আমার পরিবারও এই হ্যাকিং জগতের সাথে যুক্ত ছিল?”

আরাভ রিন্নির কাঁধে হাত রাখল। ওর স্পর্শে আজ এক অদ্ভুত নিরাপত্তা। সে নিচু স্বরে বলল, “না জেরি। তোমার বড় আম্মু এই চিপটার আদি সংকেত তৈরি করেছিলেন দেশের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু একদল অপরাধী সেটা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল। উনি তোমাকে ওই বাগানে একা পাহারা দিচ্ছিলেন ওই ছবিতে। ওই ছায়াটা আসলে এক জোড়া রক্ষাকর্তার হাত ছিল।”

হঠাৎ লাইব্রেরির বাইরে কয়েকটা কালো গাড়ি এসে থামল। আরাভ দ্রুত রিন্নিকে দেয়ালের আড়ালে টেনে নিল। ওর পকেট থেকে সেই ব্ল্যাক বেরি ফোনটা বের করে বলল, “জেরি, রহস্যের জট খুলতে গিয়ে আমি মৌচাকে ঢিল মে-রে দিয়েছি। ওরা চলে এসেছে। আজ ওরা ছবি নয়, সরাসরি তোমাকেই টার্গেট করবে।”

রিন্নি কাঁপতে কাঁপতে বলল, “এখন কী হবে স্যার? আমরা কি পুলিশ ডাকব?”

আরাভ রিন্নির কপালে একটা দ্রুত চুমু দিয়ে বলল, “পুলিশ আসছে। কিন্তু তার আগে আমাকে একটা ফাইনাল ফায়ারওয়াল তৈরি করতে হবে। ফাহিমকে আমি ব্যাকআপে রেখেছি। তুমি শুধু আমার হাত ছাড়বে না। আজ আমি প্রফেসর হয়ে নয়, আজ আমি তোমার স্বামী হয়ে লড়ব।”

লাইব্রেরির দরজা ভেঙে কয়েকজন লোক ভেতরে ঢুকল। তাদের হাতে অস্ত্র। আরাভ রিন্নিকে এক কোণায় বসিয়ে দিয়ে নিজে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর চোখে তখন সেই ভয়ংকর শীতলতা, যা দেখলে যে কোনো হ্যাকারের বুক কেঁপে ওঠে।

আরাভ হাসল। “ড্রাগন! তুমি আমার ঘরের রহস্য জানতে চেয়েছিলে না? আজ আমি তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইকুয়েশনটা দেখাব যেখানে ভিলেনের মান সব সময় জিরো হয়!”

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here