বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৪৪

0
11

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৪

আরাভের গাড়িটা যখন অন্ধকার রাজপথ চিরে তার ব্যক্তিগত বাগানবাড়ির সামনে থামল, রিমি তখন শান্ত হয়ে গেছে। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। সে যেন বুঝতে পারছে না, এই রহস্যময় মানুষটা কেন তাকে নিজের জিনিস বলে দাবি করছে।

গাড়ি থেকে নামার পর আরাভ রিমিকে সোজা তার আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নিয়ে এল। এখানে নয়না আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। আরাভ রিমিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নয়নাকে ইশারা করল।

নয়না একগুচ্ছ মেডিকেল রিপোর্ট আর একটি বিশেষ স্ক্যানার নিয়ে এগিয়ে এল। রিমি ভয়ে ভয়ে বলল, “আপনারা আমার সাথে কী করতে চাইছেন? আমি বাড়ি যাব!”

আরাভ ওর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর চোখে এখন সেই মাফিয়া সুলভ কাঠিন্য নেই, আছে এক গভীর অনুসন্ধিৎসা। ও বলল, “রিমি, তোমার চোখের রঙ কেন বেগুনি, তা কি কখনো জানতে চেয়েছো? ডক্টর জামান কেমিক্যালের কথা বলেছেন, কিন্তু সত্যটা তার চেয়েও ভয়ংকর।”

নয়না একটি লেজার স্ক্যানার রিমির চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে রিমির চোখের মণির এক বিশাল ডাইমেনশনাল ইমেজ ফুটে উঠল। নয়না বলতে শুরু করল:

নয়না স্ক্রিনের দিকে নির্দেশ করে বলল, “ভাইয়া, রিন্নির চোখ ছিল কুচকুচে কালো। কিন্তু রিমির চোখে আমরা যা দেখছি, তা মেডিকেল সায়েন্সে অত্যন্ত বিরল। একে বলা হয় আলেকজান্দ্রিয়া জেনেসিস বা এক ধরণের জিনেটিক মিউটেশন। তবে রিমির ক্ষেত্রে এটা প্রাকৃতিক নয়, এটা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।”
রিমি অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল। নয়না আরও ব্যাখ্যা করল– পাঁচ বছর আগে ড্রাগন রিন্নিকে যে বিষ বা কেমিক্যাল ইনজেকশন দিয়েছিল, তা সরাসরি ওর চোখের আইরিসে (Iris) আঘাত করে। ওই কেমিক্যালে ছিল উচ্চমাত্রার সিলভার নাইট্রেট এবং এক ধরণের নিউরোটক্সিন। ওই টক্সিন রিন্নির চোখের মণির মেলানিন পিগমেন্টকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ডক্টর জামান যখন রিন্নিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি এমন কিছু ড্রাগ ব্যবহার করেন যা চোখের মণির কোষে এক ধরণের মিউটেশন ঘটায়। বৈজ্ঞানিকভাবে, যখন আইরিসে কোনো মেলানিন থাকে না এবং রক্তনালীগুলো খুব পাতলা হয়ে যায়, তখন আলোর প্রতিসরণের ফলে (Tyndall scattering) চোখের রঙ নীল বা বেগুনি দেখায়। রিমির ক্ষেত্রে ওই কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের পর চোখের টিস্যুগুলো স্থায়ীভাবে বেগুনি রঞ্জক ধারণ করেছে। এটি কোনো লেন্স নয়, বরং ওর ডিএনএ-তে হওয়া একটি রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলাফল।

আরাভ রিমির খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস রিমির গালে লাগছে। আরাভ রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “রিন্নি, ওই বিষ তোমার স্মৃতি মুছে দিয়েছে, তোমার চোখের মণির রং বদলে দিয়েছে, এমনকি তোমার পরিচয়ও পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু ওই চোখের ভেতরে যে মায়াটা আছে, ওটা ড্রাগন বা ডক্টর জামান কেউ বদলাতে পারেনি।”

রিমি বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে নিজের চোখের প্রতিচ্ছবি দেখছিল স্ক্রিনে। ও তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কিন্তু… কিন্তু আমার কিছু মনে নেই কেন?”

আরাভ ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “স্মৃতি ফেরানোর যুদ্ধটাই এখন আমাদের আসল লড়াই। ডক্টর জামান তোমাকে যে নীল বড়ি খাওয়াতেন, তা আসলে স্মৃতি ধরে রাখার স্নায়ুগুলোকে অবশ করে রাখত। আজ থেকে তুমি আর ওই বিষ খাবে না।”

রিমি এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বুঝতে পারছে না সে কার ওপর ভরসা করবে যে বাবা-মা নাকি এই রহস্যময় মানুষের ওপর যে তাকে নিজের প্রাণ বলে দাবি করছে।

আরাভ নয়নার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল, “নয়না, ডক্টর জামানকে নজরবন্দি করো। আর শিশ… ওর ওপর আক্রমণ আসতে পারে। ও নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছে আমি রিন্নিকে তুলে নিয়ে এসেছি।”

আরাভ রিন্নিকে নিয়ে তার ম্যানশনের সেই বিশেষ ঘরটির সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তালাবন্ধ ছিল, কিন্তু প্রতিদিন নিয়ম করে আরাভ নিজ হাতে এটি পরিষ্কার করেছে। সে ধীরলয়ে দরজাটা খুলল।

রিন্নি ঘরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত সুগন্ধ তার নাকে এল–ল্যাভেন্ডার আর পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ। ঘরটা যেন একটা স্বপ্নের জগত। দেয়ালগুলো হালকা ঘিয়ে রঙের, যাতে রুপোলি কারুকাজ করা। সিলিং থেকে ঝুলছে এন্টিক ঝাড়লন্ঠন, যার মৃদু আলোয় পুরো ঘর মায়াবী হয়ে আছে। ঘরের এক কোণে বিশাল এক বুকসেলফ, যেখানে রিন্নির প্রিয় সব লেখকদের বই সারিবদ্ধভাবে সাজানো। জানালার পাশে একটা ধবধবে সাদা ডিভান, আর তার পাশেই রাখা ছোট একটা টেবিল, যেখানে অর্ধেক পড়া একটা বই আর শুকনো কিছু গোলাপের পাপড়ি এখনো রাখা আছে। রিন্নি বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে ঘরটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার অবচেতন মন বলছে, এই প্রতিটি ইটের সাথে তার কোনো গভীর যোগসূত্র আছে।

আরাভ রিন্নির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। রিন্নির কাঁধে হাত রেখে খুব নরম স্বরে বলল, “তুমি এখানে এসে বসো রিন্নি। এই ঘরটা ঠিক তেমনই আছে, যেমনটা তুমি পাঁচ বছর আগে গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলে।”

রিন্নি চমকে তাকাল। আরাভ তাকে তুমি করে বলছে! এই গম্ভীর মানুষটার কণ্ঠে এত মধু থাকতে পারে, ও তা ভাবেনি। রিন্নি ভাঙা গলায় বলল, “আপনি আমাকে তুমি করে কেন বলছেন? ”

আরাভ ম্লান হাসল। “তুমি ছাড়া আর কাউকেই তো আমি কোনোদিন এই অধিকার দিইনি জেরি।”

ঠিক সেই সময় নিচতলায় বাইকের ব্রেকের তীব্র শব্দ শোনা গেল। আরাভ নিচে নেমে আসতেই দেখল শিশ গেটের সামনে পা-গলের মতো চিৎকার করছে। বডিগার্ডরা তাকে ঘিরে ধরলেও শিশের চোখে আজ খু-নের নেশা। শিশ তার হেলমেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আরাভের দিকে এগিয়ে এল।

আরাভ শান্ত ভঙ্গিতে শিশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শিশ গর্জে উঠল, “রিমিকে ফিরিয়ে দিন আরাভ সাহেব! ও আপনার এই খ-ুনিদের ডেরায় থাকার মেয়ে নয়। ওকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে এক ফোঁটা রোদেও পুড়তে দিইনি!”

আরাভ ওর সামনে গিয়ে শান্তভাবে দাঁড়াল। শিশের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আরাভ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে ঝট করে শিশের চোখের খুব কাছে নিজের আঙুল নিয়ে গেল। শিশ পিছিয়ে যাওয়ার আগেই আরাভ দেখল শিশের সেই মায়াবী নীল আভাটা আসলে একটা নিখুঁত কন্টাক্ট লেন্স। লেন্সের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জোড়া সাধারণ বাদামী চোখ।

আরাভ নিচু স্বরে বলল, “শিশ, তোমার এই নীল চোখের মায়া তো আসলে নকল। তুমি কি ভেবেছিলে ওই রঙ বদলালেই রিন্নি তোমাকে ভালোবাসবে?”

শিশ থমকে গেল। শিশ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি লেন্স পরি! কারণ আমি চেয়েছিলাম ও যখন আয়নায় নিজেকে দেখবে, তখন যেন আমাকে দেখে ভয় না পায়। আমি ওকে একতরফা ভালোবেসেছি আরাভ সাহেব। ডক্টর জামান যখন ওকে নিয়ে পালিয়েছিলেন, আমি সব ছেড়ে ওর ছায়া হয়ে ছিলাম। আমি জানতাম ও আমাকে কোনোদিন ভালোবাসবে না, তবুও আমি ওর জন্য নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। আমার গত পাঁচ বছরের প্রতিটা নিঃশ্বাস ওর জন্য ছিল। আর আপনি? আপনি তো শুধু কেড়ে নিতে জানেন!”

শিশের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। সে আসলেই এক জেদি, প-াগল প্রেমিক যে নিজের পরিচয় বিসর্জন দিয়ে রিন্নির ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছিল। সে জানে রিন্নি তাকে কোনোদিন ভালোবাসবে না, তবুও সে রিন্নির আশেপাশে থেকে শান্তি পায়।

আরাভ কঠোর গলায় বলল, “ভালোবাসা মানে মায়ার জালে কাউকে আটকে রাখা নয়, শিশ। তুমি ওর স্মৃতিভ্রমের সুযোগ নিয়ে নিজের নীল চোখের মিথ্যে পরিচয় দিয়ে ওর সামনে হিরো সেজেছিলে। কিন্তু সত্য হলো তুমি ছিলে, আছো এবং থাকবে একজন বহিরাগতই।”

আরাভ আবার রুমে ফিরে আসল। রিন্নি ততক্ষণে ঘরের প্রতিটা কোণা দেখছে। সবকিছুই চেনা তাও কিছুই চিনতে পারচ্ছে না। আরাভ দরজা পাশে দাড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার জীবনের সেই ভ্রুবতারার দিকে, যেটার জন্য এই ৫ বছর তত ছটপট করল। তত হাহাকার তা হয়তো এইরুমে দেয়াল গুলো ছাড়া আর কেউ কখনও জানতে পারবে না। কত চেয়েছে আল্লাহ্ কাছে একবার ফিরে দিতে তার জেরিকে। কখনও ভেবে নি সৃষ্টিকর্তা তাকে এভাবে ফিরিয়ে দিবে। আরাভ পরাণ ভরে দেখল তার বিশ্বসুন্দরীকে। তারপর একটা মুচকি হাসি দিয়ে তাকের ভিতর থেকে একটা ডায়েরি বের করে রিন্নির দিকে আগিয়ে দিল। রিন্নি হঠাৎ একটা পুরনো ছবি খুঁজে পেল ডায়েরির ভাঁজে। ছবিতে আরাভ আর রিন্নি বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। রিন্নির মাথায় হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। কান ফেটে যাওয়ার মতো শব্দ টায়ারের ঘর্ষণ, রিন্নি আর ফাহিমের চিৎকার, তারপর এক বুক অন্ধকার।

“তুমি কি কিছু চিনতে পারছো রিন্নি?”
রিন্নি ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ একটা পাতায় আঁকা ছোট একটা স্কেচ দেখল। একটা পাহাড় আর তার নিচে একটা ছোট ছেলে আর মেয়ে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা “স্যার আর জেরি।”

রিন্নির মাথাটা হঠাৎ ভোঁ করে উঠল। কানের কাছে যেন বহু মানুষের চিৎকার আর একটা গাড়ির ব্রেকের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে যন্ত্রণায় নিজের মাথা চেপে ধরল। আরাভ ওকে আগলে ধরে বলল, “তুমি ভয় পেও না জেরি। আমি আছি। সব মনে পড়বে তোমার ধীরে ধীরে। চাপ দিও না নিজের ব্রেনকে।”

রিন্নি অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি… তুমি কি সেই স্যার? যে আমাকে বৃষ্টির দিনে বকেছিলে কারণ আমি ভিজতে চেয়েছিলাম?”

আরাভ স্তব্ধ হয়ে গেল। রিন্নি ওকে আর আপনি বা মাফিয়া বলছে না, সে তার পুরনো সম্বোধনে ফিরে যাচ্ছে। আরাভ রিন্নির কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।

“হ্যাঁ জেরি, আমিই সেই বদমেজাজি স্যার। যাকে তুমি শান্ত নদী থেকে অশান্ত সাগর বানিয়ে দিয়েছিলে।”

বাইরে তখন শিশের বাইকের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। এক ব্যর্থ প্রেমিকের বিদায় আর এক পূর্ণ প্রেমিকের নতুন যুদ্ধের শুরু হলো এই রাতের গভীরে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here