#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১৫-১৬
এখন বৈশাখ মাস। বর্ষার কোলাহল বিতারিত হয়েছে, স্বস্তি পেয়েছে ভাটি অঞ্চলের মানুষ। গরম পড়েছে বৈশাখের শেষে। সপ্তাহের পর মাস কেটে গিয়েছে। কত পরিকল্পনা, কত আহাজারি জমা হয়েছে। মাহাদ আসবে কথা দিয়েও আসেনি। দেড় মাস হয়ে এলেও কোনো খোঁজ মিলেনি। আসেনি কোনো চিঠি কিংবা আশ্বাস। কথা দিয়ে কি তবে কথা রাখলো না?
“ সখী মাস পেরিয়ে গেলো তবু আসলো না। তবে কি আসবে না? শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চইলা গেলো অচিন মানুষ? আমার হৃদয় পুড়ানো কি তার খুব দরকার ছিলো?”
শিউলির বিষাদ কন্ঠে মালা ওর পানে চাইলো। মেয়েটার চোখে জল টলমল করছে। কত অপেক্ষা মাস শেষ হতেই। আঙ্গুলে দিন গুনছিলো কবে মাস পুরোবে আর তার ডাক্তার সাহেব আসবে। ওরা এখন নদীর পাড়ে টঙের উপর বসে আছে। শিউলির দৃষ্টি নদীর জলের দিকে। জল কিছুটা শুকিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে চর ও বাহির হবে কিছু প্রান্তে। মালা অনেকটা সময় ধরে শিউলির দিকে তাকিয়ে রইলো। কি উত্তর দিবে, কিভাবে শান্তনা জানাবে তা বুঝতে পারলো না। শিউলি উত্তর না পেয়ে আবারো শুধালো,
“ অপেক্ষা কি অপেক্ষায় রইয়া যাবে? অপেক্ষা ফুরিয়ে আসবেন না তিনি?”
মালার এবার মুখ খুলল। আশ্বস্ত করতে শিউলির হাত চেপে ধরলো।বলল,
“ ধৈর্য ধর শিউলি। দাদি কয় অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়। মাস পেরিয়ে গেছে বছর নয়। হইতেও তো পারে ডাক্তার সাহেব কোনো কারণে আসতে পারতাছে না। উনি বড় ডাক্তার কাজের কি অভাব আছে? সময় সুযোগ ও তো বুঝবারতে হইবে।”
শিউলি শুনলো। খানিকটা আস্বস্থ হলো। চোখের কোনে থাকা জল দু’হাতে মুছে নিলো। বলল,
“ আস্থা রাখলাম আরো কিছুদিন। বিশ্বাসের মর্যাদা রেখে আসুক তিনি এই গ্রামে।”
মালা হাসলো। শিউলি কে বুঝাতে এই মিথ্যে হাসি প্রয়োজন ছিলো। নাজির বাড়ি থাকলে তার সঙ্গে কথা বলে কিছু একটা করতো কিন্তু সে তো নেই চলে গেছে শহরে। এই তো সপ্তাহ আগে জিহান ভাই আর নাজির একসাথে রওনা দিলো। যাওয়ার আগে হাসিমুখে বলে গিয়েছে, “ ফিরে এলে তোমায় ঘরে তুলবো মালা।”
এই কথা ওর কাছে স্বপনের মতোন। যেদিন সত্যি হবে সেদিন বিশ্বাস করবে। তবে শিউলির জন্য খারাপ লাগছে। কিশোরী মনের প্রেম ভয়ংকর রোগ, যা সারানো কঠিন। মালা সিদ্ধান্ত নিলো নিধির সঙ্গে কথা বলবে। নাজির কে একটা চিঠি পাঠাবে। মাহাদের ঠিকানা জানা নেই নয়তো ওখানেই পাঠাতো। আফসোস পথ যেন অন্ধকার কালকুট। যেদিকে যাই সেদিকেই দরজা বন্ধ পায়।
__________
পাপিয়া সালেহা বেগমের পায়ের গোড়ালিতে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। পড়ে গিয়ে আজই ব্যথা পেয়েছে ভীষণ। গোড়ালি ফুলে উঠেছে। সালেহা বার,বার মানা করলেও পাপিয়া শুনেনি। বসে পড়েছে খেদমত করতে। তিনি এবার জোর করে পা সরিয়ে নিলেন। শোয়া থেকে উঠে বসলেন। মোলায়েম কন্ঠে কৃতজ্ঞতা মিশিয়ে বললেন,
“ আর কত করবে মা? তুমি আমার নিজের মেয়ের চেয়ে কম না। কিন্তু আফসোস তোমার জন্য কিছু করতে পারিনা। তোমার মতো লক্ষীর কদর করতে পারে না পশুটা। জানো নিজের গর্ভ কে মাঝে মধ্যে গালি দিই। কেন ওমন সন্তান দিলো কোলে?
ওমন সন্তানের চেয়ে নিঃসন্তান থাকা ভালো। ”
শাশুড়ির হতাশার সুর পাপিয়াকে ব্যর্থিত করলো। এই মানুষটাই ওর একমাত্র সম্বল। মা হারা মেয়ে ভালোবাসা পেলো এই বাড়ি এসেই। হ্যাঁ যন্ত্রণা ও পেলো দ্বিগুণ তবে তা মানুষের আড়ালে।পাপিয়া শাশুড়ির দিকে চেয়ে হেসে উঠলো। ব্যথা যেন নেই এটা প্রমাণ করলো। তার পর উনার উত্তরের পরিপেক্ষিতে বলল,
“ নিঃসন্তান হলে এই সমাজ,আপনজন আপনাকে কথার আঘাতে মারতো আম্মা। আমি মরে গেছি বহুদিন আগে। কথার আঘাত বড্ড কড়া। গায়ে না লাগলেও ভেতরে লাগে। দুমড়ে মুচড়ে দেয় ভেতরের বেঁচে থাকার আগ্রহ।”
সালেহা বেগম পাপিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিলো।বলল,
“ একদিন সব ভালো হবে।”
পাপিয়া চাপা হাসলো। সে হাসি বিষাদের।
‘আমার জীবনের সব ভালো ফুরিয়ে গিয়েছে, এখন শুধু দুঃখ আর কষ্টই ভাগে আছে।’
কথাগুলো নিঃশব্দে নিজের ভাবনাতেই রাখলো। মুখ ফুটে বাহির করলো না। তবে এই কথা সত্যি হয়ে ধরা দিবে তা সে কল্পনাতেও ভাবেনি।
সময়টা এখন সন্ধ্যা। আলো ফুরিয়ে এসেছে। রান্ধন দুপুরে শেষ করেছে এজন্য রাতে আর করতে হবে না। সালেহা আর পাপিয়ার আলোচনার মাঝে একজন মহিলা যে ওদের বাড়ি কাজ করে সে হ্যারিকেন হাতে দৌঁড়ে ঘরে প্রবেশ করলো। পাপিয়া এবং সালেহা এহেন কান্ডে বিচলিত হলো। এতো তাড়াহুড়ো এবং অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ভয় জাগালো মনে। কারো কিছু হলো কিনা জানতে সালেহা আগে শুধালো,
“ কি হয়েছে এভাবে দৌড়ে আসলি কেন?”
হাফাতে হাফাতে মেয়েটা বলল,
“ আম্মা ভাইজান বিয়া কইরা নতুন বউ নিয়া আইছে।”
পাপিয়ার বুক ধুক করে উঠলো। মুহূর্তে অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল বুক। সালেহা বিস্ময় নিয়ে শুধালো,
“কোন ভাইজান? নাজির?”
” না আম্মা বড় ভাইজান।”
মেয়েটার একটা কথায় ঘর স্তদ্ধ হলো। পাপিয়ার মাথায় বাজ পড়লো। সবকিছু যেন ফাঁকা লাগলো,মনে হলো পায়ের তলার মাটি সরে গেলো।অজানা ভয় সত্যি হলো তবে। দুচোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো। সালেহা ওর হাত জড়িয়ে ধরলো। ভাষাহীন হয়ে পড়লো। মেয়েটাকে দেওয়ার মতো শান্তনা বানী খুঁজে পেলো না। পাপিয়া হাত ছাড়িয়ে উঠে পড়লো। চোখের জল মুছে নিলো। নিজেকে অন্য রুপে জাহির করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। সালেহা ও পিছু নিলো।
“ শিউলি শুনেছিস সাহেল ভাই বিয়ে কইরা নতুন বউ আনছে।”
শিউলি চমকে উঠলো। এমন কথা শুনবে ভাবেনি কখনো। সে তো সবে খেয়ে ঘরে এসেছিলো। ঘুম না আসলেও শুয়ে থাকতো, ভাবতো মাহাদ কে নিয়ে। এটা তার নিত্যদিনের কাজ, মাহাদ কে নিয়া ভাবা আর অপেক্ষা করা।
মালা দৌড়ে এসে এই খবর দিলো। শিউলি বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে ভুল শুনলো কিনা যাচাই করতে আরেকবার শুধালো,
“ কি বলতাছিস? সাহেল ভাই?”
“ হ তারই কথা কইতাছি। ইসস পাপিয়া ভাবির জন্য কষ্ট লাগতাছে!”
মালার ব্যর্থিত কন্ঠে শিউলির ও খারাপ লাগলো। এমনিতে নিজের মন ভালো নেই তার মধ্যে আশেপাশে কত কি ঘটে যাচ্ছে।
“ চল শিউলি মাতবর বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসি। গ্রামের সকলে নতুন বউ দেখতে ভীড় করেছে মাতবর বাড়ির উঠোনে।”
শিউলি আর মালা বেরিয়ে গেলো। আমেনা শুনেও আফসোসের সুরে কিছু কথা বলতে বলতে চলল।
মাতবর বাড়ির উঠোনে মানুষের ভীড়। গ্রামের মানুষ নতুন বউ দেখতে এসেছে। অসম্ভব সুন্দরী অবিবাহিত নারীকেই পেয়েছে এ নিয়ে কতজনের প্রশংসা। কেউবা বলছে, ‘ বউ থাকতে আরেক বউ, ইসস বউটার কপাল পুড়লো। পাশ থেকে আরো কিছু জন আবার মুখ বেঁকিয়ে উত্তর দিচ্ছে, ‘ বন্দ্যা হলে বিয়ে করবে না? মাতবরের এতো জমিজমা, সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে হবে না।”
পাপিয়া মানুষের ফুসুরফুসুর সবই শুনছে। দেখছে অপলক ভাবে চেয়ে। সামনে নিজের মানুষটা অন্য এক নারীর পাশে বসে আছে, হেসে কথাও বলছে। পাপিয়ার অঝরে কাঁদার কথা অথচ সে কাঁদছে না। কেবল র্নিলিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এ নিয়েও ফুসুরফাসুর হচ্ছে। এ্যাও তার কানে আসছে।
এর মধ্যে সাহেল এবার এক পলক তাকালো পাপিয়ার দিকে। মুহূর্তেই বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের কিছু দেখে ফেলেছে।
নুরুল আলম তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সকলের সামনে তার মোলায়েম হাসি আর সম্মান। এবার তিনি হুঙ্কার ছেড়ে ডাকলেন,
“ সালেহা এদিকে আসো। অনেক আদর যত্ন করেছো তার মূল্য তো দিতে পারেনি এবার নতুন বউ কে নিয়ম মেনে ঘরে প্রবেশ করাও।”
সালেহ স্বামীর দাপটের জন্য বাঁধ্য হয়ে এগুলো। যাওয়ার আগে এক পলক পাপিয়ার দিকে তাকালো। সারাজীবন শুধু মাথা নিচু করে আদেশ পালন করে গেছে আজও তাই করতে হচ্ছে।
নিধি রাগে গিজগিজ করছে, এতো মানুষের সামনে কিছু বলতেও পারছে না। সে এবার পাপিয়া কে বলল,
“ এতো অবহেলা, অত্যাচার সহ্য করে না থেকে চলে যাও বাবার ঘরে।”
পাপিয়া ফিচেল হাসে। শুধায়,
“ বিয়ের আগেই তো বাবার বাড়ির বোঝা ছিলাম এখন আবার সেখানে বোঝা বাড়াতে যাবো? সম্পতি দেখে দিয়েছে সুখ খেতে খাই সুখ নামক দুঃখ।”
পাপিয়া কে শক্ত দেখে নিধি অবাক হলো। তার চেয়ে বেশি খারাপ ও লাগলো। উপরে শক্ত থাকলেও ভেতর তো কাঁদছেই। যা সকলের নজরে পড়লো না।পাপিয়া নিধির আবাক চাহনি দেখে বলল,
“ আর কত কাঁদবো বলো? চোখের জল শুঁকিয়ে গেছে।”
“ চলে যাও জিহান ভাইয়ের কাছে।”
“ নষ্টা উপাধি পেতে? দ্বিতীয় বিয়ে এই সমাজে অহরহ হয়। সন্তান জন্ম দিতে পারিনা অথচ দেমাগ দেখিয়ে চলে যাবো এ নিয়েও মানুষ কথা শুনাবে। তাছাড়া লোভে যাকে সঙ্গী করার কথা বলতে পারিনি এখন কেন তার কাছে যাবো? যে সুখ একজন কে দিতে পারিনি আরেকজন কে কিভাবে দুঃখী করবো?”
নিধি আর উত্তর করলো না। তারও মধ্যে বিষাদের বসবাস। সাঈদ কে মনে পড়ে আজও। চিঠিটা যত্নে রেখেছে এখনো পড়ে মাঝে মধ্যে।
নুরুল আলম এগিয়ে আসলেই নিধির দৃষ্টি ছুটে। বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“ আব্বা আপনি এটা কিভাবে করতে পারলেন?
কাউকে না জানিয়ে ভাইজানের বিয়ে দিলেন।”
নুরুল আলম মেয়ের এমন গরম চোখে প্রশ্ন করা মোটেও পছন্দ করলেন না। কন্ঠ কঠোর করে বলল,
“মেয়ে মানুষের কন্ঠ নিচু হতে হয়। আর দ্বিতীয় বিয়ে কোনো পাপ নয়, ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি আছে।”
নিধি আরো ক্ষিপ্ত হলো। বলল,
“ চার বিয়ের অনুমতি আছে কিন্তু প্রথম স্ত্রীর মতামত নিয়েছেন? ধর্মের জ্ঞান পুরো জানা উচিত আব্বা। অল্প বিদ্যা ভয়ংকর।”
নুরুল আলম ভেতরে রাগলেও উপরে শান্ত রাখলো। পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“ সে আছে থাকুক, সমস্যা নেই। সতীনের সঙ্গে সংসার করতে হবে। সন্তান জন্ম দিতে পারলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।”
নরুল আলম চলে গেলে নিধি সামনে নতুন বউয়ের দিকে তাকালো। যার সঙ্গে নীরা রসিয়ে গল্প জুড়েছে। নিধি আরো ফুলল। পাপিয়া ওকে বলল,
“ শান্ত হও। চলো তোমার ঘরে আমায় আজ আশ্রয় দিবে। ”
“ তুমি তোমার ঘরও ছাড়বে?”
নিধি ওর হাত আঁটকে প্রশ্ন ছুঁড়ে। পাপিয়া দলা পাকিয়ে আসা কান্না চেপে উত্তর দিলো,
“ মানুষ ছাড়লাম ঘর আর এমন কি? মানুষ ছাড়া ঘরের মূল্য আছে নাকি?”
পাপিয়া হাঁটতে শুরু করলো। নিধিও ওর পিছু নিলো। পুরো বাড়ি যখন আনন্দে হই হুল্লোড়ে মত্ত তখন কেউ ঘরের কোনে সকলের আড়ালে চোখের জল ফেললো। মুখ চেপে কান্নার আওয়াজ কেউ শুনলো না। জানলো না তার কষ্ট। সে আর্তনাদ কেবল ঘরবন্দী হয়ে রইলো।
১৬.
মাসের পর মাস এভাবে কেটে গিয়েছে আরো চার মাস। এর মধ্যে কতকিছু পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের তালে মানুষ, সম্পর্ক, পরিচয় সবই পরিবর্তন হয়।
কারো আবার সময়ের অপেক্ষায় জীবন ক্ষয় হয়।
কেউ বা অপেক্ষার আশা ছেড়ে নিরালয়ে বসে কাঁদে। কেউ আবার নতুন সংসার বাঁধে। সুখ,দুঃখ সব নিয়েই কতকিছু ঘটে গিয়েছে।
মাহাদ আসবে বলে আজও আসেনি। শিউলি আশা ছেড়ে দিয়েও রাতের পর রাত তারই কথা ভাবে। কিশোরী মনে ভালোবাসা জাগানো প্রথম পুরুষ কে ভোলা শুধু কঠিন নয় অসম্ভবও বটে। প্রকৃতিতে জোছনার আলো ছড়িয়ে থাকলেও তাট হৃদয় আঁধারে নিমজ্জিত থাকে, হু হু করে। পরাণ পুড়ে ডাক্তার সাহেবের জন্য।
সাহেল নতুন বউ বিয়ে করে আনার তিন মাস পরই পাপিয়া কে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বাহির করে দিয়েছে। সকলে বলছিলো নতুন বউয়ের কথায় এমন টা করেছে। রুপসি নামের মতোই তার রুপ তবে মন জঘন্য কুৎসিত। পাপিয়া সালেহের পা ধরে কান্না করেছিলো বলেছিলো, ‘ আমার কিছু লাগবে না দাসির মতো বাড়ির এককোণে পড়ে থাকবো তবুও তালাক দিবেন না।’
সাহেল শোনেনি। মায়া করেনি। নতুন বউয়ের প্রেমে মজে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। তাদের নতুন সংসার আপাতত সুন্দরই কাটছে। দুদিন আগে খবর পাওয়া গেছে রুপসি সন্তানসম্ভবা হয়েছে। এতে সাহেল আরো আনন্দিত হয়ে পড়েছে। নুরুল আলমের মুখের হাসি দেখে কে। এ খবর পাপিয়ায় কাছেও পৌঁছায়। নিজের ব্যর্থতা বুঝতে পারে। নিজেকে দোষারোপ করে ঘরের কোনে পড়ে থাকে। ভাইয়ের সংসারে তার বউয়ের কথা এবং অবজ্ঞা টের পায় তবুও থাকতে হয়। কোথায় যাবে সে?
জিহান অবশ্য একবার এসেছিলো, প্রস্তাব ও রেখেছিলো কিন্তু পাপিয়া পুরো কথা না শুনে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো। বলেছিলো,
“আপনার প্রতি আর আমার কোনো অনুভূতি বেঁচে নেই, আমার প্রতি আপনার অবজ্ঞা দেখতে পেলে খুশি হবো।”
এদিকে মালা আর নাজিরের বিয়ে হয়েছে তিনদিন হলো। নাজির যখন বাড়ি এসে সালেহের বিয়ে এবং পাপিয়া কে তালাক দেওয়ার কথা শুনলো তখন প্রচন্ড রেগে গেলো। নুরুল আলম, সাহেল, নাজির মিলিয়ে তুলকালাম কান্ড বেঁধে গেলো। নুরুল আলম বুঝতে পারলো নাজির এভাবে হাতের বাহিরে চলে যাবে, আরো কিছু জিনিস নজরে পড়ায় ওকে না জানিয়েই পশ্চিম পাড়ার মুন্সি বাড়ির মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলো। পরে নাজির জানতে পেরে রাগে ফেটে পড়লো। সকলের সামনে জানালো, ‘ আমি মালাকে ভালেবাসি এবং তাকেই বিয়ে করবো।’
নুরুল আলম রেগে আগুন হলো। ছেলের দিকে তেড়ে এসে বলল, ‘ ওমন কালো মেয়েকে আমি বাড়ির বউ কিছুতেই মানবো না। আমি যার সঙ্গে ঠিক করেছি তাকেই বিয়ে করতে হবে এবং কালই।”
নাজির ও কম না। বাপের দিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসাবে দাঁড়াতে কথা ছুড়লো, ‘ খুব শিগগিরই দেখতে পাবেন কাকে বিয়ে করি আমি।’
নুরুম আলম আর সাহেল রাতের মধ্যে বুদ্ধি পাঁকায়। মালার বাবা মকবুল হোসেন কে হুমকি দিয়ে আসে সাথে অপমান তো আছেই। তার মেয়েকে ছেলের দিকে লেলিয়ে দিতে বাড়ি যেত, আর যেন কখনো এমন সাহস না করে, নাজিরের বিয়ে অন্য কারো সাথে দিবে। এমন আরো নানান কথা বলে আসে। মকবুল মিয়া অপমানিত হয়ে মাথা নিচু করে সবটা শুধু শুনে যান। মালা নিরবে চোখের জল ফেলে। ওর মা কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দেয় তাকে।
সে রাতেই এই খবর নাজিরের কানে পৌঁছায়। কোনোভাবে জানতে পেরেছিলো। এজন্যই নাজির মধ্য রাতে মসজিদের ইমাম সাহেব কে নিয়ে মালা দের বাড়ি হাজির হয়। সঙ্গে করিম মিয়া, শিউলি আমেনা ও ডেকে নিয়ে আসে। এতো রাতে সকলকে দেখে মকবুল মিয়া অবাক হয়। পরে সবটা বুঝতে পারে। নাজির সে রাতেই মালা কে বিয়ে করবে বলে প্রস্তাব রাখে এবং করেও। যদিও মকবুল মিয়া রাজি হতে চায়নি, মালাও বাবার অপমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। নাজির অনেক বুঝিয়ে রাজি করায়। তার সঙ্গ দেয় শিউলি ও শাহিন। অবশেষে দোনা মোনা করে বিয়েটা হয়ে যায়। তবে মাতবর বাড়িতে মালার উঠা হয়নি। নুরুল আলম এই বিয়ে এবং মালা কে মেনে নিবে না, ও বাড়ি উঠতেও দিবে না। তাই নাজির বাঁধ্য হয়ে মালার হাত ধরে মাতবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তার দাদার দেওয়া জমির ওপর ছোট একটা বাড়ি তুলতে কিছুজন কে নিয়ে কাজে লেগেও পড়ে। বিয়ের দুটো দিন শশুড় বাড়ি থাকলেও তিনদিনে মোটামুটি থাকার উপযোগী একটা বাড়ি গড়ে তুলে। দুটো ঘর আর চারপাশে ঘেরাও করা তালপাতা।
_________
শিউলি মালার পাশে বসে ওর নতুন সংসার সাজাতে সাহায্য করছে। মাটির চুলা বানাবে বলে নাজির গর্ত খুঁড়ছে। কাজের মাঝে শিউলির দিকে তাকালো। মেয়েটা কেমন চিন্তায় থাকে সব সময়। চোখদুটো গভীরে চলে গেছে। নাজির হাতের খুন্তি রেখে ওদের কাছে এসে বসলো উঠোনের পাশে।
শিউলি নেপা দিয়ে দিবে বলে পাট দিয়ে নোতা তৈরি করছে। হঠাৎ নাজিরের কন্ঠে তাকায় সে।
“ মাহাদের অপেক্ষায় আছো আজও? আসার হলে হয়তো আসতো। শহুরে মানুষ খনিকের মোহ ভুলে গেছে হয়তো। আমার বিশ্বাস ও ফিকে হয়ে গেছে।”
শিউলির মুখ আরো আঁধার হলো। নাজির নিজেও কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না তবে কি বা বলবে? এর মধ্যে মাহাদের খোঁজ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে কিন্তু শহরে যাওয়া হয়নি, তার উপর ঠিকানাও জানা নেই যাবে কোথায়? সে আবার বলে,
“ এবার আশা ছেড়ে দাও শিউলি। দুঃখ পুষে লাভ নেই, তুমি আমার বোনের মতোন ভালোর জন্য বলছি।”
শিউলির মনে পড়লো মাহাদের বলা নদীর ঘাটে বলে যাওয়া প্রতিশ্রুতি। সে সময়টা কতই না সুন্দর ছিলো তবে এখন সবই মিথ্যা। হুট করে শিউলি বলে উঠলো,
“ ভাইজান উনি তো বলেছিলো উনি আসবেনই, যদি কখনো না আসে তবে সে….
শিউলি উচ্চারণ করতে গিয়ে থেমে গেলো। নাজির তাকিয়ে রইলো আগ্রহে। মালা বুঝতে পারলো শিউলির অবস্থা। তাই সে ওর কথা টেনে নিয়ে বলল,
“ ডাক্তার সাহেব বলেছিলো সে যদি না আসে তাইলে যেন প্রতারক যেন না ভাবে, মৃত্যু ছাড়া আটকাতে পারবে না কেউ তাকে। ”
নাজিরের দৃষ্টি শিউলির দিকেই রইলো। মালা কথা শেষ করতেই শিউলির চোখে জল টলমল করলো। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে। বিচলিত দুটো চোখ ভারি হয়ে আসছে। নাজিরের কপাল জড়ে আসে। চিন্তার রেখা দেখা যায় তারও মাঝে। বলে,
“ শিউলি তোমার মন কি বলে? আল্লাহ যা ভাগ্যে রেখেছেন তাই হচ্ছে। একমাত্র আল্লাহ জানে মাহাদ কি অবস্থায়, কোথায় আছে। তুমি বরং দোয়া করো আর তাকে নিয়ে ভাবনা মুছে ফেলো।”
“ স্বপ্ন কি মুছে ফেলা যায় নাজির ভাই? ”
নাজির থমকে গেলো। ছোট মেয়েটা বড় একটা প্রশ্ন করে ফেললো। এর উত্তর তার জানা নেই তাই সে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গেলো বাহিরে কাঁদা মাটি আনতে। শিউলি আর মালা ও নিজের কাজে লেগে পড়লো।
_______
জিহান মাত্র বাহির থেকে আসলো। উঠোনে চেয়ারে বসে থাকা ওর বাবা শফিকুল কে নজরে আসলো। চোখ মুখ বেচার করে তার দিকে তাকালো। জিহান নিরবে উঠোন বেয়ে ঘরে যেতে নিলো। তবে ঘরে প্রবেশ করার আগেই শুনতে পেলো,
“ তোমার বিয়ে ঠিক করতে চাই আমি। করিম মিয়ার মেয়ে শিউলি খুব ভালো মেয়ে তার সঙ্গে তোমাকে মানাবে। করিম মিয়ার সঙ্গে আজই কথা বলেছি। সে মেয়ে, বউয়ের মতামত নিয়ে জানাবে বলেছে। আশা করছি তারা অমত করবে না। ”
জিহানের কপাল কুঁচকে আসলো। পিছনে ফিরে ধীর পায়ে বাবার সামনে এসে দাঁড়ালো। স্থির দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করে এক কথার জবান দিলো,
“ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন একবারো? আমি শিউলিকে ছোট বোনের নজরে দেখি। ওকে বিয়ে করা সম্ভব নয় আব্বা।”
“ সে তোমার নিজের কেউ নয়, যে নজরে দেখো এখন অন্য নজরে দেখবে। ”
জিহান বুঝতে পারলো এভাবে আর হবে না। কতদিন আটকিয়ে রাখবে? তার চেয়ে সত্যি টা বলে দেওয়া ভালো। তাই সে আজ বলে দিলো,
“ বিয়ে যদি করতে হয় তবে পাপিয়া কে করবো। আপনার আমার বিয়ে নিয়ে এতো চিন্তা থাকলে তাদের বাড়ি যান।”
শফিকুল ঠিক বুঝতে পারলো কার কথা বলছে। তাই শুধালো,
“ কোন পাপিয়া? পমিরের মেয়ে, মাতবর বাড়ির তালাক প্রাপ্ত বউ?”
“ জ্বী।”
জিহানের এই ‘জ্বী’ সম্মতিতে বিস্ফোরণ ঘটলো মাস্টার বাড়িতে। শফিকুল ফুঁসে উঠলো। জিহান একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি এবার ছেলের কথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে দিলো,
“এটা অসম্ভব! এমন বাচ্চামো মানায় না তোমার জিহান। তালাক হওয়া মেয়েকে বিয়ে করতে চাও এটা কেমন কথা? আমি কিছুতেই মানবো না। ”
জিহান হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বলল,
“ আপনি একজন শিক্ষক হয়ে এই কথা বলছেন?
তালাক প্রাপ্ত নারী বিয়ে করা পাপ নাকি? কোনো বিধবা বিবাহ করলেও আঁড় চোখে দেখেন অথচ এই সমাজে অহরহ পুরুষ বউ থাকতে আরো চারটা,পাঁচটা বিয়ে করছে তখন সেটা নজরে পড়ে না? নাকি পুরুষ বলে সাত খুন ও মাফ আর নারীর বেলায় যত দোষ আর অপরাধ?”
শফিকুল একটু থমকে গেলো। ছেলের উত্তরের পেক্ষিতে কিছু বলতে না পারলেও সহ্য ও করলো না। অন্য প্রসঙ্গ টেনে বলল,
“ বন্দ্যা নারী কে বিয়ে করে বংশ শেষ হতে দেখতে পারবো না। তুমি শিউলি নয়তো অন্য কাউকে বিয়ে করবে কিন্তু ওই মেয়েকে নয়।”
জিহান শুনেও না শোনার ভান করে ঘরের ভেতরে চলে গেলো। তখনই ওর মা আসলো। শফিকুল তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ ছেলেকে বোঝাও। সমাজে আমার সম্মান যেন ধুলোয় না মেশায়।”
___________
“ আপনি আসতে এতো দেরি করলেন কেন ডাক্তার সাহেব? আজ বাদে কাল আমার বিয়ে। এখন আর কিছু করার নেই। আপনি কেন আগে আসেননি? আপনার কি আমার কথা মনে পড়েছি?”
শিউলি কান্নায় ভেঙে পড়লো। শরীরে জড়ানো হলুদ রাঙা শাড়ির অংশ নোনা জলে ভিজে উঠলো। মাহাদ র্নিলিপ্ত দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো কথা নেই। শিউলি কেঁদেই চলেছে। উত্তর না পেয়ে আবারো বলে,
“ আপনি কথা রাখেননি ডাক্তার সাহেব। আপনি ভালা মানুষ না। কিশোরী কন্যার হৃদয়ে অনুভূতির বীজ বুনে চইলা গেলেন আর আসলেন না।”
শিউলির কথা মাহাদের কানে যাচ্ছে না যেন। এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি এবার রেগে চিৎকার করে বলল,
“ কথা বলতাছেন না কেন? জবাব দিন। যদি আসার নাই ছিলো তবে কেন আশা দিয়া গেইছিলেন? যে আশায় আমি বুক বাঁইধা ছিলাম?”
মাহাদ এখনো চুপ। একটা সময় শিউলি দমে গেলো। ধীরে ধীরে মাহাদ পিছিয়ে যেতে লাগলো। শিউলিও ওর দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলো কিন্তু মাহাদ মুহূর্তে মিলিয়ে গেলো চোখের সামনে থেকে। তখনই শিউলি চিৎকার করে উঠলো,
“ ডাক্তার সাহেব।”
মধ্য রাতে মেয়ের চিৎকার ঘুম ভেঙে যায় আমেনার। তড়িঘড়ি করে পাশের ঘর থেকে চলে আসে। শিউলির গা থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে চোখ মুখ শুঁকিয়ে গেছে। হাফাচ্ছে অবিরত।
“ কি হয়েছে মা? চিৎকার করলি কেন?”
শিউলি ওর মায়ের দিকে চাইলো। নিজেকে শান্ত করে উত্তর দিলো,
“ আম্মা খারাপ স্বপন দেখছি তাই।”
আমেনা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। পাশে বসে শিউলির মাথা কোলে নিলেন। ঘুম পাড়ানোর চেষ্টায় মাথায় আদর মাখিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো। শিউলির দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। এমন স্বপ্ন কেন দেখলো তা নিয়ে ভাবতে বসলো। রাতে খাওয়ার পর করিম মিয়া আর আমেনার কথা শুনেছে। জিহান ভাইয়ের ব্যাপারে মাস্টার চাচার প্রস্তাবের বিষয়ে। জিহানের সঙ্গে বিয়ে কিন্তু এটা সম্ভব নয়। কিন্তু তাকে না জানানোয় মত দিতে পারেনি। সে না হোক অন্য কেউ হলে অমত করবে কিভাবে? কার আশায়? যার কোনো আশ্বাস এবং খোঁজ ও নেই?
বিয়ের বিষয় তার মধ্যে মাহাদ কে নিয়ে ভাবনা। এই দুই মিলিয়ে হয়তো এমন স্বপ্ন দেখেছে।
শিউলি এবার চোখ বুজলো। মায়ের হাত বুলানোতে জাদু আছে। না চাইতেও ঘুম আসবে। ঘুমিয়ে তলিয়ে যাওয়ার আগে অস্পষ্ট কন্ঠে ধীরে ঠোঁটের কোনে আওড়ালো,
“ আপনি কি কখনো ফিরবেন না ডাক্তার সাহেব? আপনার অপেক্ষায় আমার দিন আবার আসে কিন্তু আপনি আসেন না।”
চলবে………………?

