একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #অন্তিম_পর্ব

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#অন্তিম_পর্ব

২০০৫ সাল। ক্যালেন্ডারের পাতায় ইংরেজি অক্টোবরের এগারো তারিখ। বাংলা আশ্বিন মাসের শেষ প্রায়। শরতের নির্মল বিকেল। ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। কখনো আবার মেঘের ও কালো ছাঁয়া পড়ে নীল দিগন্তের গাঁয়ে।
ঘর জুড়ে আলোড়ন তৈরি করা পাখিটা বর্তমানে চুপচাপ। শিউলি মাত্র নিধির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললো।পাশ থেকে নিধির ছোট মেয়ে নিশিও কথা বলল আধো আধো কন্ঠে। শিউলি কি মনে করে কল দিলো। ফ্রী থাকাতে মাহাদ ধরলো প্রথম বারেই। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো,

“কি করছো?”

“আপনার কথাই ভাবছি।”

নিঃশব্দে হেসে উঠলো শিউলি। মাহাদ বুঝতে পারলো তার দুষ্টুমি। সেও একই ভঙ্গিতে বলল,

“তাহলে আসতে হয় শিগগিরই। কি বলো?”

“আসুন। আমরা আপনার অপেক্ষায় আছি। ”

শিউলি লাইন কেটে দিলো। উঁকিঝুঁকি মারলো নিজের ঘরে। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘর দ্বার ঝাড়ু দিতে শুরু করলো। সব কাজ শেষ করে একটা উপন্যাসের বই নিয়ে বসলো। অবসর সময়ে প্রায়ই উপন্যাস পড়ে সে। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর কলেজে ভর্তি হলেও শেষ করা হয়নি পরিস্থিতির কারণে। মাহাদ তবুও বলেছিলো কিন্তু শিউলি শোনেনি তাই আর জোর ও করেনি। তার কাছে সংসার আগে৷ সংসার গড়তে এবং ভালো রাখতে সবকিছু ত্যাগ করতে হয় তা ওর মা,দাদির থেকে শিখেছে।

মাহাদ হাসপাতাল থেকে ফিরে শান্তি নীড়ের সামনে আসতেই থেমে গেলো। হঠাৎ মনে পড়লো কিছু একটা ভুলে গেছে সে। আবারো উল্টোপথে পা বাড়ালো। কিছু মূহুর্ত বাদেই আবারো ফিরে আসলো। সিঁড়ি বেয়ে উঠে দরজায় ঠকঠক করতেই
শিউলি খুলে দিলো। জুতা না খুলেই জিজ্ঞেস করলো,

“তিনি কোথায়?”

শিউলি নাক কুঁচকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিছন থেকে আধো আধো কন্ঠে ভেসে আসলো কিছু শব্দ।

“আব্বু আম্মু বুকু দিচে,মেলেছে দুতো। আম্মু বালো না।”

মাহাদ পিছনে ছেলের দিকে তাকালো। যে হেঁটে এসেই দৌঁড়ে মাহাদের কোলে উঠে পড়লো। নাম মিহির। বয়স সবে দুই হয়েছে। সব কথা স্পষ্ট বলতে পারে না। আপাতত ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদার ভান করছে। মাহাদ শিউলির দিকে কড়া নজরে তাকালো। ছেলেকে খুশি করতে বলল,

“মেরেছো কেন আমার ছেলে কে? তুমি পঁচা মেয়ে। তাই না আব্বু? আম্মু অনেক পঁচা।”

মিহির মাথা ঝাঁকালো। শিউলি ভ্রু উঁচু করে বাবার ছেলের দিকে তাকালো। তার পর মিহিরের দিকে রাগি চোখে চেয়ে বলল,

“মিহির তুমি আব্বুকে মিথ্যে বলছো কেন?
তোমাকে কেন মেরেছি তার কারণটাও বলো।”

“ কেন মেরেছো আম্মু? তুমি কি দুষ্টুমি করেছো?”

“উত্তু।”

শিউলি হা হয়ে গেলো। মাহাদ ছেলের উত্তরে হেসে উঠলো। সেদিকে চেয়ে শিউলি বলল,

“একটু বলে এটাকে? জানেন মিহির কি করেছে আজ? বসার ঘরে পুরো জগ পানি ঢেলেছে, দুটো বই রাখা ছিলো সেগুলোও ছিঁড়েছে।”

“তুমি এসব কেন করেছে আব্বু? জানো না বই ছিঁড়তে হয় না। আর কখনো ছিঁড়বে না ঠিক আছে? ”

মিহির মেনে নিয়ে নাথা নাড়ালো। যার অর্থ সে বুঝেছে আর ছিঁড়বে না। শিউলি বাবা ছেলের কাহিনি দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। যাওয়ার আগে বলে গেলো,

“সবাই ভালো কেবল আম্মুই পঁচা। আম্মুর কাছে যেন কেউ না আসে। আব্বুর কাছেই থাকুক সারাক্ষণ।”

মাহাদ শিউলির দিকে চেয়ে মিহিরের গালে চুমো খেলো। কাতুকুতু দিতে দিতে বলল,

“তোমার জন্য আম্মু রেগে গেলো এবার কি হবে আব্বু?”

মাহাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মিহির ও একই সুরে বলে উঠলো,

“আম্মু লাগ কলেচে এবাল কি হবে আব্বু?”

“কি আর হবে বাবার ছেলে মিলে রাগ ভাঙাবো চলো। তুমি একগালে চুমো দিবে আরেক গালে আমি ঠিক আছে?”

মিহির খুশি হলো। মায়ের রাগ ভাঙাবে ভেবে আনন্দে বলল,

“থিক আচে।”

বাবার ছেলের আলাপের মধ্যে আগমন ঘটলো শালিকের। সে মাহাদের কাঁধে বসলো। বলতে শুরু করলো,

“মিহি, মিহি। ডাক্তার সাহেব।”

শালিক মিহির কে মিহি ডাকে। আর মাহাদ কে কখনো নাম ধরে ডাকে যখন রাইসুল রহমানের মুখে শোনো কখনো আবার ডাক্তার সাহেব ও বলে শিউলির মুখে শুনলেই। মিহির দু’হাতে শালিক কে ধরতে চাইলেই উড়ে গেলো সে। পড়লো গিয়ে সামনে শিউলির হাতে। সে বাবা ছেলের দিকে মিথ্যে অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিলো। পাত্তা দিলো না এমন ভাব করে বলল,

“চল শালিক আমার সঙ্গী তুই ছাড়া আর কেউ নেই। তোর সঙ্গে কথা বলবো, লজেন্স ও দিবো।”

লজেন্সের নাম শুনেই মিহির ঝটফট করে মাহাদের কোল থেকে নামতে চাইলো। শিউলি আড় চোখে তা খেয়াল করলো। মাহাদ নামিয়ে না দিলে মিহির বলল,

“আব্বু ছেরে দাও লজেন খাবু। আম্মু দিবে না বুলচে।”

মাহাদ পকেট থেকে কতগুলো লজেন্স বাহির করে মিহিরের হাতে দিলো। এক টাকায় চারটে পাওয়া যায় এগুলো। মিহির খুশি হলো। কোল থেকে না নেমে মায়ের উদ্দেশ্য হাসতে হাসতে বলল,

“ আব্বু এনেচে। আব্বু এনেচে।”

শিউলি চোখ ছোট করে তাকিয়ে ঘরের ভেতরে গেলো। মাহাদ নিজেও পিছু নিলো তারই। তাদের বাবা ছেলের মিষ্টি এই মুহূর্তগুলো শিউলির ভীষণ প্রিয়। কাজের চাপে কখনো সময় না পেলে দুজনে অভিমান করে বসে থাকে। একজন থেকে দুজন হয়েছে এখন যারা মাহাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। এই ব্যাপারটাও দারুন অনুভূতি!

__________

সন্ধ্যা হয়ে আসছে এখনো জিসান বাড়ি আসলো না। আপনি আসার পথে দেখলেন নাকি ওকে?”

জিহান সবে বাজার থেকে আসলো। হাতে সদাইয়ের থলে। পাপিয়ার কথায় উত্তর দিলো,

“কই দেখলাম না। ভরা নদী,হাওর ওরে চোখে চোখে রাখতে হবে পাপিয়া। পোলার বয়স সবে চার সাঁতার শিখতে আরো বড় হতে হবে।”

পাপিয়া থলেটা হাতে নিয়ে রাখলো ঘরে। তার পর জিসান কে খুঁজতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। সবে পা বাড়াবে তখন শফিক সাহেব আর জাহিমা বেগম চৌকাঠ মাড়িয়ে আসলো। তাদের পিছুনে জিসানকেও দেখতে পেলো। যে লুকিয়ে আছে দাদির শাড়ির আঁচলের আড়ালে। পাপিয়া রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

“জিসান এতো দেরি হলো কেন আসতে? খেলা শেষ হয় না বিকেল গড়িয়ে গেলেও?”

“আম্মা মীরার সাথে খেলছিলাম। মালা আন্টি নিয়ে গিয়ে খাইতে দিলো পোলাও এজন্য আসতে দেরি হলো।”

“তোমারে না বলছি তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবে।”

জাহিমা বেগম জিসান কে কোলে তুলে নিলো। নাতী কে আহ্লাদ করে পাপিয়া কে বলল,

“থাকুক পাপিয়া আমার দাদুরে আর বইকো না। আমার দাদু চলতো আমরা আইজ একটা জিনিস খেলবো।”

জিসান কে নিয়ে তিনি ঘরে গেলেন। শফিক সাহেব ও স্ত্রী’র পিছু গেলেন। পাপিয়া জিহানের কাছে দাঁড়িয়ে আফসোসের সুরে বলল,

“পোলাডারে কেউ শাসন করতে দেয় না পরে বিগড়ে গেলে দোষ হবে মায়ের।”

জিহান পাশ থেকে সুর মিলিয়ে বলল,

“পোলা এবং পোলার বাপরে শাসনে রেখেও মহারানী বলে শাসন করে না।”

“আমি শাসনে রাখি? কি শাসন করলাম শুনি?”

পাপিয়া ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো। জিহান আড়ালে মিটিমিটি হেসে উত্তর দিলো।

“এ যে পোলা এবং পোলার বাপ তারে ছাড়া কিছু বুঝে না, চোখের আড়াল হলেই ছুটে আসে এ কি শাসন, বাঁধন নয়?”

“বাঁধন মুক্ত উড়তে পারেন আকাশে।”

“হ্যাঁ উড়তে চাই আমার জিসানের আম্মার মন আকাশে।”

পাপিয়া আঁড় চোখে তাকালো। জিহান তারই দিকে চেয়ে হাসছে। বুঝতে পারছে জিহানের হেয়ালি। এই বেখেয়ালি হেঁয়ালি তার ভালো লাগে। এভাবেই তো পাঁচটা বছর কেঁটে যাচ্ছে। দুঃখ ছুৃঁতে পারেনি, সুখের কমতি হয়নি। এক জীবনে আর কি চাই? মনের মতোন একজন জীবনসঙ্গী তাহলেই জীবন
হবে রুপকথার মতোন সুন্দর।

___________

মাতবর বাড়িতে আজ অতিথিতে ভরে উঠেছিলো। নীরার শশুড় বাড়ির লোকজন এসেছিলো। সন্ধ্যার পূর্বেই চলে গেছে সকলে। মালা সবে একটু নিস্তার পেলো। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে প্রবেশ করলো।
ঘরে এসে দেখে মীরা ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিন নুরুল আলম আর সালেহার সঙ্গেই থাকে বলা যায়। তাদের চোখের মনি সে। সাহেল ও ভাইয়ের মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে। নিজের জীবন আর গোঁছায়নি। সকলে বলেও আর বিয়ে করাতে পারেনি। জোর করলে বলে,

“যেদিন নিজেকে গোঁছাতে পারবো সেদিন জীবন কেও গুঁছিয়ে নিবো। তাছাড়া এমনই তো আছি বেশ!”

নাজির মেয়ের পাশে শুয়ে ছিলো। মালা কে আসতে দেখে উঠে পড়লো। বলল,

“এতোক্ষণে আসার সময় হলো?”

“থালা বাসন সব মাঁইজা সাঁজাইয়া রাইখা আসতে সময় লাগবো না? আপনি ঘুমাইয়া যাইতেন।”

“পাশে তোমার অস্তিত্ব টের না পেলে ঘুম আসে না জানো তো।”

মালা ততক্ষণে খাঁটের কিনারায় বসে পড়েছে। ওপাশে নাজির মাঝে মীরা ঘুমিয়ে আছে। সে নাজিরের পানে চাইলো। বলল,

“ বুড়ো হইতাছেন তবুও পিরিত শেষ হয় না?”

নাজির তার এই কথাকে মানতে পারলো না। তাই তো রুক্ষে বলল,

“সবে এক মেয়ের বাপ হইছি তাতেই বুড়ো হলাম? গ্রামের মুরব্বিদের মতে আমি এখনো পাক্কা যোয়ান আছি। বুঝলে?”

“হ আইছে আমার সালমান শাহ।”

“এ কি বললা? আমি কি সালমান শাহ এর থেকে কম সুন্দর আছি? শুধু একটু লম্বা কম এই যা। নইলে তোমার নায়কেও ছাড়িয়ে যাইতাম। আর আজ থেকে তোমার সিডি প্লেয়ার দেখা বন্ধ।”

মালা ততক্ষণে বালিশে মাথা এলিয়ে দিছে। সারাদিন রান্ধন,খাওন, সব মিলিয়ে ক্রান্ত শরীর। তাই নাজির আর কিছু বললো না মালাও কথা বাড়ালো না। তবে হুট করে টের পেলো মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চট করে চোখ খুললো। তাকালো ডানপাশে। নাজির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চেয়ে আছে তারই পানে। হ্যারিকেনের মিটিমিটি আলো তাদের দর্শনা স্পষ্ট করিয়ে দিচ্ছে।
নাজিরের শীতল ও ধীর কন্ঠ ভেসে আসলো,

“ঘুমাও।”

মালা চোখ বন্ধ না করে নাজিরের হাত খানা নিলো হাতে জড়িয়ে। তার পর বলল,

“আপনি ঘুমান আমি হাত জড়িয়ে রাখি। আমার ক্রান্তি আপনার স্পর্শে র্নিশেষ হয়ে যাবে নিমিষে।”

নাজির নিজেও শুয়ে পড়লো। মালা চোখ বন্ধ করলো। খনিকের মধ্যে ঘমিয়েও গেলো। কেবল নাজির জেগে রইলো। মালার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। অঁধর ছুঁইয়ে দিলো ললাটে। তার পর হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে গেলো মেয়ের সঙ্গে লেপ্টে।

___________

রাতের খাওয়া শেষ করে শিউলি রাইসুল রহমান কে মনে করিয়ে প্রেসারের ঔষুধ দিয়ে আসলো। সময়ের সাথে ভুলে যাচ্ছেন বেশ! অবসর জীবনে মিহিরই উনার সঙ্গী। ওকে নিয়েই মাঝে মধ্যে ভবঘুরে বেড়ান। বাড়ির সামনে চা’য়ের দোকানে আড্ডা জমান। মিহির ও ঘুরতে পছন্দ করে এতটুকু বয়স থেকেই এজন্য ছুঁটে দাদুর পেছনে। আপাতত
সে এখন ঘুমিয়ে আছে ঘরে। উনার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এলো শিউলি। দেখলো মাহাদ নেই। বেলকনিতে আছে কিনা তা দেখতে উঁকি দিলো কিন্তু দেখতে পেলো না। খাঁটের উপর মিহিরের দিকে তাকালো। এগিয়ে যেতেই নজরে পড়লো পুরোনো এলবাম খাঁটের পাশে। শিউলি মেলে ধরলো সামনে। যেখানে মাহাদ থেকে শুরু করে তার সকল প্রিয়জনের ছবি বাঁধাই করা আছে। মালার ছবি আসলে হেসে উঠলো। মনে পড়লো গ্রামের দুটি চঞ্চল মেয়ের কথা, যারা সময়ের শেকলে বন্ধি এখন। করিম মিয়া আর আমেনার বেগমের ছবিও আছে। এখানে এসেই মাহাদ সবার ফটো তুলে নিয়েছিলো শিউলিকে উপহার দেওয়ার জন্য।
একবার সকলে একসাথে এসেছিলো শহরে। তবে সবার ছবির মাঝে জবেদা বিবির ছবিখানা নজরে আসতেই মন খারাপ হয়ে গেলো। চোখের কোনে জল চিকচিক করছে। গড়িয়ে পড়লো এক সময়।
জবেদা বিবি মারা গেছেন এক বছর আগে। এখন আর গ্রামে গেলে মানুষটাকে দেখতে পায় না। পাশের ঘরটা পড়ে থাকে ফাঁকা। কেউ আর বলে না, “ শিউলি এমনে ছুঁটিস না মানুষ খারাপ কইবো। আয় তোর লাইগা আঁচলে বাঁইধা কয়টা বাতাসা রাখছি খাইয়া যা।”

“এ্যাঁ এ্যাঁ।”

মিহিরের কান্নার শব্দ শুনে শিউলি তড়িঘড়ি করে এলবাম টা রাখলো আগের স্থানে। চোখের জল মুছে ছেলের কাছে গেলো এগিয়ে। আধশোয়া হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে থামানোর চেষ্টা করলো। মায়ের উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে মিহির শান্ত হলো। ঘুমিয়ে গেলো মুহূর্তে। শিউলি ছেলের কপালে চুমো খেলো। হাসলো একটু। তাকিয়ে রইলো একধ্যাঁনে। একদম মাহাদের মতোই দেখতে হয়েছে। নাম,মুখ গায়ের রঙ সবই। কেবল তার সঙ্গে মিল আছে হাসিতে। মাহাদ বলে মা ছেলের হাসি নাকি একই। দুটো হাসিই নাকি তার ভালো থাকার কারণ।

“এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো?”

“আমার ছেলেকে।”

“আমিও একটু দেখি।”

বলেই মাহাদ শিউলির পাশে মিহিরের কাছে বসলো। বলল,

“তোমার মতোই সুন্দর।”

“ আমি মোটেও সুন্দর নয়। ”

মাহাদ ওর কথাকে অগাহ্য করলো করলো। শক্ত কন্ঠে বলল,

“তুমি আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর নারী। আর আমার ছেলে সেই নারীই একটুকরো মোহময় প্রশান্তি।”

“আর আপনি?”

“আমি তোমাদের একমাত্র রক্ষী। ভালোবাসার রাজ্যে রাজাও আমি রক্ষীও আমিই হবো মহা রানী।”

শিউলি ওর উত্তরে দৃষ্টি ফিরিয়ে ছেলের দিকে দিলো। চুমো দিয়ে শুয়ে পড়লো পাশে। মাহাদ নিজের ছেলের আরেক গালে চুমো দিয়ে শুয়ে পড়লো। তার পর কিছু একটা মনে হতেই উঠে পড়লো। শিউলির কপালে চুমো এঁকে দিয়ে আবারো শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করে শুনতে পেলো।

“এ অভ্যাস আর গেলো না?”

“তুমি নামক অভ্যাস কখনো হারিয়ে যাবে না। সারাজীবনই রয়ে যাবে হৃদয়ের গভীরে।”

___________

“শুনছো সুহির আম্মু?”

মিনমিনে কন্ঠে নিধি নড়েচড়ে উঠলো। নিজের উপরে ঝুঁকে থাকা হাতটা আগলে নিলো। তার পর আবারো ঘুমে মগ্ন হলো। সাঈদ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সে হাসির শব্দে আগে সুহি উঠে পড়লো। কান্না করতে শুরু করলো। নিধি তখনই চমকে উঠলো। তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়ে সাঈদের বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেলো। দেখলো মানুষটা তার দিকে ঝুকে আছে। মুখের দিকে চেয়ে হাসছে। ততক্ষণে মেয়েকে কোলে নিয়েছে সে। নিধি চোখ কচলে শুধালো,

“কখন আসলেন?”

“মাত্রই।”

সুহি কাঁদতে আছে। সাঈদ বিছানা থেকে উঠে মেয়েকে থামাতে নানান কথা বলতে লাগলো। সেসব কথা বুঝে কিনা জানা নেই তবে হেসে উঠলো। হাসলে বেরিয়ে আসছে দাঁতের ফাঁকা পিঁড়ি। সামনে সবে কয়েকটা দাঁত গজিয়েছে। সুহির বয়স বছর হয়েছে কিছুদিন আগেই। সাঈদ মেয়ের কান্না থামিয়ে নিধির কোলে দিলো। বলল,

“স্নিগ্ধা আসবে রাতে। আমি মাহাদ,শিউলি আর আরহাম ওর ওয়াইফ কেও আসতে বলেছি। রাতে জমজমাট একটা আসর হবে। তুমি পারবে সবটা সামলাতে? আমি কিন্তু রান্না জানিনা। প্রেমিক পুরুষের মতো রেঁধে খাওয়াতে পারিনা, সাহায্য করতে পারিনা।”

“আপনি দায়িত্ববান স্বামী রূপেই প্রেমিকের চেয়ে অধিক যত্ন করেন। এতটুকুতেই আমার চলবে সারাজীবন।”

নিধি বিছানা থেকে নেমে সুহি কে কোলে নিয়ে ঘর বেরিয়ে যেতে যেতে কথাগুলো শেষ করলো। সাঈদের ভেতরে ভালোলাগা ও সন্তোষ্ট কাজ করলো। শীতল অনুভব হলো হৃদয়ের গভীরে। এতটুকু শোনার জন্য, বোঝানোর জন্য তার সকল চেষ্টা। হুট করে উৎফুল্ল কন্ঠে পিছু ডেকে উঠলো,

“শুনছো সুহির আম্মু?”

“ হ্যাঁ?”

“ কিছু না।”

“তাহলে ডাকলেন কেন?”

“তোমাকে সব নামে ডাকার চেয়ে সুহির আম্মু বলে ডাকতেই ভালো লাগে। এই সম্মোধনে নিজেকে পরিপূর্ণ লাগে নিধি।”

নিধি থেমে থেকে সাঈদের দিক থেকে নজর সরিয়ে দরজা পেরিয়ে গেলো। চোখে মুখে রাগের বহিঃপ্রকাশ করতে চাইলেও মানুষটার কান্ডে হেসে ফেলতে বাঁধ্য হলো।

________

আজ ভোরবেলাই ঘুম ভেঙে গেলো শিউলির। চোখ মেলে দেখলো মিহির আর মাহাদ একে অপরের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মিহির আদুরে ছানার মতো বাবার বুকের ভেতর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। মাহাদ একহাতে আগলে রেখেছে। ঘুমানোর আগে শিউলির বুকে লেপ্টে থাকলেও ঘুমের ঘোরে প্রায়ই মাহাদের বুকে ঢুকে পড়ে। শিউলি মুগ্ধ হয়ে দুজনকে দেখলো। মনে মনে বলে উঠলো,

“আমাদের পূর্নতা,আমাদের সংসার এখন পরিপূর্ণ এবং সুখ সাগরে ভর্তি।”

শিউলি শোয়া থেকে উঠে পড়লো। অনেকদিন হলো ভোরবেলায় উঠে ভোরের আবহাওয়া অনুভব করা হয় না, দেখা হয় না সূর্যদ্বয়। বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নামলো। বাড়ির সামনে শিউলি গাছটার নিচে দাঁড়ালো। জবা গাছে হাতে গোনা কয়টা ফুল থাকলেও শিউলি গাছের নিচে অগনিত ফুল পড়ে আছে। বাতাসে এখনো পড়ছে। চারদিকে এখনো আঁধার। সূর্য উঠতে সময় নিবে কিছুটা। সে আশে পাশে হাঁটলো একটুখানি।
ভোরের শীতল হাওয়ায় গাঁ শিউরে উঠলো। রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো এজন্য শীতল পরিবেশ। শরৎ কালের প্রকৃতি বেশ সুন্দর। কোমল প্রকৃতি।

শিউলি আবারো গেইটের কাছে বাড়ির ভেতরের দিকে শিউলি গাছটার নিচে দাঁড়ালো। তার পর উপরে তাকিয়ে নিচে বসে পড়লো। শিউলি ফুলগুলো কুড়িয়ে হাতের আঁজলায় রাখছে। কয়েকটা ফুল কুড়াতেই খেয়াল করলো ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টির মতো শিউলি ফুল পড়ছে তার উপরে।
শিউলি আশ্চর্যতায় উপরে তাকালো। প্রথমে নজরে পড়লো গাছটা বেশ জোরে নড়ছে। উঠে পড়লো তক্ষণাৎ। দৃষ্টি গাছের গোঁড়ায় যেতেই বিস্ময়তা সরে গেলো তার। অঁধরে প্রফুল্ল হাসি ফুঁটে উঠলো। মাহাদ শিউলি গাছটা দুহাতে ঝাঁকাচ্ছে। আর ফুল গুলো অঝরে মাটিতে পড়ছে। মনে হচ্ছে শিউলি ফুলের বৃষ্টি হচ্ছে। যাকে বলে পুষ্প বৃষ্টি। শিউলি দুহাত মেলে আনন্দে নেচে উঠলো। অঁধরের হাসি বিস্তার হলো। চোখ বন্ধ অবস্থায় অনুভব করলো কেউ একজন চুলে কিছু একটা গুঁজে দিচ্ছে। কেউ একজনটা যে মাহাদ বুঝতে বাকি নেই। চোখ খুলতেই চুলে হাত গেলো। জবা ফুল তা বুঝতে পারলো। মাহাদের পরনে শুভ্র শার্ট আর চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। চুলগুলো কিঞ্চিৎ কোঁকড়া হয়ে আছে। বরাবরই এমনটাই থাকে। শিউলির কাছে মানুষটা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবকিছুই ভীষন ভালো লাগে। মুগ্ধ করে বারংবার।

“আপনাকে শুভ্র শার্টে একটু বেশিই সুন্দর লাগে ডাক্তার সাহেব। মনে হয় ধূসর সমুদ্রে শুভ্র জল থৈথৈ করছে।”

শিউলির প্রশংসার জবাবে কিছুই বললো না মাহাদ। কেবল স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারই পানে। অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মাহাদ হুট করে বলে উঠলো,

“আমি ঠিক এমনই দিন চেয়েছিলাম,সোনার কন্যা।
শুধু প্রেম কিংবা প্রণয়ের প্রথম দিন নয়,পাঁচ থেকে পঞ্চাশ সৃষ্টি কর্তার দেওয়া আয়ু পাঁচশ বছর থাকলেও একই আনন্দ এবং সুখ তোমার মাঝে বিরাজ করতো তবেই নিজেকে ধন্য মনে হতো। ঠিক আজকের মতো।”

শিউলি হাতে কুড়ানো ফুলগুলো মাহাদের হাতের আজলায় দিলো। হাতে হাত রেখে কিছুটা এগিয়ে গেলো। পায়ের তলায় পিষে গেলো সদ্য নির্বাসন হওয়া শিউলি ফুলগুলো। ফুলের আস্তরনের পথ মাড়িয়ে দাঁড়ালো ডানপাশে। কিছু একটা বলতে নিবে তখনই লক্ষ্য হলো পাশের ছাঁদে মিষ্টি নামের মেয়েটি খিলখিলিয়ে হাসছে। পাশে একজন যুবক তারই পানে প্রফুল্ল নয়নে তাকিয়ে আছে। যুবকটি তার স্বামী। মা বিহীন সৎ মায়ের অত্যাচারে বড় হওয়া মেয়েটির একটি মানুষ হয়েছে। যে কান্নার বদলে হাসাতে জানে,দুঃখের বদলে সুখে রাখতে পারে। শিউলি তাদের দিকে চেয়ে হেসে উঠলো নিজেও। মাহাদ ওর দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকালো। তার পর হাসি হাসি কন্ঠে বলল,

“অবশেষে মিষ্টি তার জীবনে মিষ্টি মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারছে। আনন্দে থাকার ভাগ্য হয়েছে। তৌসিফ ছেলেটা বেশ ভালো! যত্ন,ভালোবাসায় আগলে রাখে, জীবনের দূরদর্শায় পাশে থাকে। এক জীবনে আর কি লাগে বলো?

শিউলি এক ধ্যান থেকে নজর সরিয়ে নিলো। মাহাদের দিকে দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করে,অঁধরে হাসি ঝুলিয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে বলে উঠলো,

“পুরুষের ভালোবাসায় যত্ন আর সম্মান থাকলে,
নারীর জীবন রুপকথার গল্পের মতোই সুন্দর হবে।”

______সমাপ্তি______

[অবশেষে সমাপ্তি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পটা কেমন লাগলো অন্তিম পর্বে অন্তত এক-দু লাইন অনুভূতি লিখে যাবেন, ধন্যবাদ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here