বুকের_পাঁজর #লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা) #পর্ব:০৩

0
2

#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
#পর্ব:০৩

বড় রা বেরিয়ে গেছে কিছুক্ষণ হলো।হামিম,হাসিব,হিম যে যার রুমে।ওদিকে হাবিবা,হালিমা,হাওয়া আর হিরা এক রুমে।এখন কি করা যায় তাই ভাবছে।
“এই হিরা,তুই না তখন বললি তোর মাথায় কি আইডিয়া এসেছে,এখন বল তো কি ভেবেছিস।”
হালিমার কথায় সবার তখন হিরার কথাটা মাথায় এলো।
“সেদিন না বড় চাচু কতগুলো আমড়া কিনে আনলো।তাই বলছিলাম কি চলো না আমরা আমড়া মাখায়।”
“ভালো কথা বলেছিস তো।তাইলে আমি আর হালু যাচ্ছি আমড়া কাটতে।এই রুমে বসেই মাখাবো।তুই আর হাওয়া গিয়ে ছাদ থেকে শুকনা মরিচ নিয়ে আয় যা মা রোদে দিয়েছিল।”
“হাওয়াপুর যাওয়া লাগবে না।সে বরং মোবাইলে সবার সিআইডি দেখার ব্যবস্থা করুক,আমি গিয়ে ঝাল নিয়ে আসি।”
“আচ্ছা তবে তাই হোক।এই হালু আয় তো আমার সাথে।আর হাওয়া তাহলে তুই মোবাইলে সিআইডি দেখার ব্যবস্থা কর আর হিরা যা ঝাল নিয়ে আয়।”
বলেই হাবিবা বেরিয়ে গেলো।ওর পিছু পিছু হালিমাও চলে গেলো।
“হাওয়াপু তুই তাইলে তোর কাজ কর,আমি যায় আমার কাজে।”
“যা”
___________________________________________________________________________

ছাদে গিয়ে হিরা ঝাল খুঁজতে ব্যস্ত।এমনিতেই প্রচুর রোদ,ছাদে তো আরোও রোদ।চোখ মেলানো যায় না। অবশেষে পেয়েই গেলো।ছাদের কোনায় একটা প্লেটে শুকনা মরিচ রাখা।
সেখান থেকে পাঁচ টা মরিচ নিলো ও।মরিচ নিয়ে উঠে দাড়াতেই নিচেই চোখ গেলো ওর।যা দেখলো তাতে ওর মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম।হিম সিগারেট খায়!! শুধু সে না তার হামিম ভাইয়াও খায়!
এসব দেখে ওর চোখ বেরিয়ে আসবে বোধ হয়।ও আর কিছু না ভেবে মরিচ নিয়ে ছাদ থেকে নেমে এলো।কিচেনে গিয়ে হাবিবাকে মরিচ গুলো দিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় উদাস ভঙ্গিতে বসে পড়ল।এ বাড়িতে ধূমপান কেউ করে না।ও অন্তত কখনো দেখেনি।দাদু দাদি পান খায় ঠিকই কিন্তু ওসব সিগারেট খেতে কাউকে দেখিনি হিরা।ও বিশ্বাস করতেই পারছে না,হিম হামিম?
এটা তো ওর কল্পনার বাইরে।এসব ভাবার মধ্যেই দুই ভাই ঘরে ঢুকল।হিরাকে উদাস ভঙ্গিতে একদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হামিম ওর পাশে বসল।হিম আরেক সোফায় গিয়ে বসল।
“ছোটো?”
“হিরু?”
চমকে তাকালো হিরা।এরা কখন আসলো।ও একবার হামিমের দিকে তাকিয়ে হিমের দিকে তাকালো।যে কিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে। মিথ্যা বললে ধরা খাবে,এমনিতেও মিথ্যা বলা মহাপাপ।তাই ও সোজাসুজি হামিম কে প্রশ্ন করল,
“ভাইয়া তোমরা সিগারেট খাও?”

হামিম অবাক হলো অবশ্য।হওয়ারই কথা। শুধু ওরা না,মাঝে মাঝে তাদের বাবারাও খায়,তবে বাপ ছেলে একসাথে কখনো খাওয়া হয়নি তাদের।এটা তাদের নেশা না।খুবই কম খাওয়া হয়।একটু খেয়েই আবার ফেলেও দেয়।দাদা দাদি বা বাড়ির কোনো মহিলা এ ব্যাপারে জানে না।
হামিম চমকিত দৃষ্টিতে হিমের দিকে তাকালো। কিন্তু তার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ নেই।
“ঝাল খাওয়া বারণ না তোদের,কালকেই না একবার খেলি।”

এতক্ষণ পেছনে ছিল হাবিবা হালিমা।ওদের আসতে দেখেই আমড়া লুকিয়ে ফেলেছিল।হিমের কথা শুনে হামিম পেছনে তাকালো।ওদের দেখে ওর হতাশা বেড়ে গেলো বোধ হয়।
তখন হাসিব দোতলা থেকে নিচে নাচছে হায় তুলতে তুলতে। ঘুম থেকে উঠল কেবল।
এসেই হামিমের পাশে বসে পড়ল।
“কি হচ্ছে কি এখানে?হাওয়া কে দেখলাম উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।হাবিবা হালিমা ওভাবেই বা দাঁড়িয়ে আছে কেনো?”
কেউ বোধহয় হাসিবের কথা শুনতে পেলো না।হিম এখনো হিরার দিকে তাকিয়ে।হিরা কি বুঝে হঠাৎ করে হামিমের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“আমাদের কথা মা জানতে না পারলে আপনাদেরও কথাও কেউ জানতে পারবে না।ডান?”
“পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে”
বলেই হিম উপরে উঠে গেলো।হামিমও নিজের রুমে চলে গেল।ওরা যেতেই হাবিবা, হালিমা,হিরা সব উপরে চলে গেলো।হাসিব শুধু দেখলো। আচ্ছা ও কি অদৃশ্য হয়ে গেছে, কেউ পাত্তায় দিলো না।

উপরে উঠেই রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।কালকেই একবার ঝাল খেয়েছে,আজকে খেলে জানলে মা মেরেই ফেলবে। ঝাল খেলে আবার গ্যাস হয় যে।এই বারের মতো বেঁচে গেছে,এই বা কম কিসে।
“দেখো,এগুলো নামিয়েছি।ভালো লাগবে মনে হয়।”
হাওয়ার কথায় সবাই আবার পুরনো কাজে ফিরে এলো।এখন আমড়া মাখা খাওয়া হবে জমিয়ে।

আপাতত বাড়িতে কোনো ছেলে নেই।বড়রা তখনো আসেনি।হামিম,হাসিব,হিম গেছে মসজিদে নামাজ পড়তে।হাবিবা,হালিমা,হিরা নামাজ পড়ে কেবল উঠল।ওদের ভাইয়ারাও হয়ত এখনই চলে আসবে। শিউলি বসার ঘরে বসে সিরিয়াল দেখছে।
“হাবিবাপু?”
“বল”
“চলো না দুধ চা খায়।বাড়িতে তো কেউ নেই,আম্মুরা একটু পরেই আসবে বোধহয়।আসলে আর খেতে পারব না।মন টা যে বড্ড দুধ চা দুধ চা করে।”
হাবিবা হিরার কথায় বাকি দুই বোনের দিকে তাকালো। হাবিবাকে তাকাতে দেখে দুই বোন মাথা নাড়ালো।
“চল তাহলে কিচেনে।”
হিরাকে আর দেখে কে?হাবিবার কথা শেষ হতেই নিচে নেমে গুঁড়া দুধ বের করল। ততক্ষণে হাবিবা,হালিমা,হাওয়া ওর পাশে দাঁড়িয়েছে।চা টা হাবিবায় বানাবে,খুব ভালো বানাতে পারে ও।
চা বানানোর শেষের দিকেই হামিমের কাশির শব্দ কানে এলো।তারমানে তারা নামাজ পড়ে চলে এসেছে।হামিমকে সোফায় বসতে দেখে ওরা কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো,হিরা হামিমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
“ভাইয়া চলো না আজকে একটু দুধ চা খায়।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেনো হয়?”
হাসিব বলতে বলতে হামিমের পাশে বসল।হিম কে কোথাও না দেখে হাওয়া বলল,
“হিম ভাইয়া কোথায়?”
“ও তো হাসপাতালে গেছে নামাজ পড়েই।সার্জারি আছে বলল।”
“কিন্তু আজকে না তোমরা সবাই ছুটি নিয়েছো।হিম ভাইয়া নেয় নি নাকি?”
হিরার কথায় দুই ভাই রহস্যময় হাসি দিল।কে জানে কি আছে তাদের মাথায়।
“ও সব কথা ছাড়। দুধ চা খাবি বলে।তো সেটাই বানা।”
হামিমের কথায় হিমের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল সবাই।
“ভাইয়া যাও না একটু পাঁউরুটি নিয়ে এসো সামনের দোকান থেকে।”
“হাসিব যা তো নিয়ে আয়।”
হামিমের কথায় মাথা নাড়িয়ে হাসিব চলে গেল পাঁউরুটি আনতে।তাদের আবার পাঁউরুটি দিয়ে দুধ চা খেতে দারুন লাগে। চার বোন চলে গেল কিচেনে,চুলা থেকে চা নামিয়ে কাপে ঢালতে হবে।এদিকে হামিম শিউলির থেকে টিভির রিমোট নিল খবর দেখবে বলে।
হাবিবা চা নামিয়ে কাপে ঢাললে হিরা সেটা সোফার সামনের ছোটো টেবিল টাই রাখল।হাওয়া চিনির পাত্র নিয়ে আসলো,যে যার মতো চিনি নেবে।
ওরা সবাই চা নিয়ে সোফায় বসতেই হাসিব পাঁউরুটি নিয়ে ঢুকল।ছয় ভাইবোন আর শিউলি চা খাচ্ছে,কখনো টিভি দেখছে বা কখনো নিজেদের মতো কথা বলছে।সবার খাওয়া শেষে শিউলি কাপ নিয়ে কিচেনে চলে গেল।
___________________________________________________________________________

সাড়ে সাতটার দিকে শিকদার বাড়িতে দুটো গাড়ি প্রবেশ করল।এক গাড়ি থেকে ইসলাম শিকদার,আকরাম শিকদার,রহিমা বেগম এবং রোকেয়া বেগম নামলেন।অন্য গাড়ি থেকে আসলাম শিকদার, আলামীন শিকদার,রাবেয়া বেগম আর আসমা বেগম নামলেন।গাড়ির শব্দ পেয়েই হাবিবা,হালিমা,হাওয়া,হিরা নিচে নেমে এসেছে।
বাড়ির কর্তারা সবাই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পড়লেও কর্তিরা গেলেন চেঞ্জ করতে।বাবাদের সবাই বসতে দেখে চার মেয়ে তাদের কাছে এলো।হিরা আকরাম শিকদারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“বড় চাচ্চু,ভাবিকে কেমন দেখলে?”
হিরার কথায় আকরাম শিকদার মুচকি হেসে তার পাশে বসতে দিলেন।হিরা বসতেই তিনি হিরার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“মেয়ে ভালোই ছোটো মা। কিন্তু ভালো হলেই তো আর হয়না।তার কালচার আমাদের সাথে যায় না।তোমার দাদু জানতো মেয়ে ভালো, কিন্তু সমস্যা হলো মেয়ের চালচলন।শালীন ভাবে চললেও তার নখ প্রয়োজনের তুলনায় বেল বড়,তোমার আম্মুরা দেখেছে চুলে কালার করা। যায় হোক,তোমার ভাইয়ারা কোথায়?”
“হিম ভাইয়া হাসপাতালে গেছে।হাসিব ভাইয়া অফিসে,আর হামিম ভাইয়া তার ঘরেই আছে”
হিরার কথার মধ্যেই বাড়ির কর্তীরা ড্রয়িং রুমে হাজির হলো।
“কথা পরে হবে।খোকারা তোরা সবাই যে যার রুমে গিয়ে রেস্ট নে। আকরামের বাবা তুমিও রুমে যাও,ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নেও।আর বউমা’রা,চলো রান্না ঘরে চলো।রাতের ব্যবস্থা করা হবে।আর সুন্দরী রা,যাও সবাই যে যার পড়া পড়ো।রাতের খাবারের পরে বড় দাদুভাইয়ের বিয়ে নিয়ে কথা হবে।”
রহিমা বেগমের কথায় সবাই সম্মতি জানিয়ে যে যার ঘরে চলে গেল।
___________________________________________________________________________

“মন টা বিয়ে বিয়ে করে।কবে যে বাড়িতে বিয়ে হবে,কতই না মজা করব।ভাবলেইই নাচতে ইচ্ছে করে।”
হিরার কথা শুনে বাকি বোন কিছু বলে না।সবার ছোটো যে তারই তো বড় আনন্দ।
“হালু,আছরের নামাজের পর যে ছবি গুলো তুলেছিলাম সেগুলো দেখা তো আর হাওয়া হিরা,শাড়ি গুলো ঠিক জায়গায় রেখেছিস তো?”
“হ্যাঁ,একদম জায়গার জিনিস জায়গায় রেখেছি।”
“এই দেখো ছবি”

হালিমার কথায় তিন বোন তাকে ঘিরে বসল। তাদের শাড়ি পড়তে ভালো লাগে,বড় তিন নিজেরা যেমন শাড়ি পড়তে পারে তেমন সামলাতেও পারে। কিন্তু হিরা না পড়তে পারে আর না পারে সামলাতে।তবুও শাড়ির পড়ার বড্ড শখ তার।তাই তো আজকে আছরের নামাজ পড়ে মায়েদের ঘর থেকে শাড়ি নিয়ে চার বোন ইচ্ছামতো ছবি তুলেছে।ছবি গুলো আলাদা একটা ফোল্ডারে রাখা কারণ কেউ যদি কোনো ভাবে ছবিগুলো দেখে ফেলায় তাহলে গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর কখনো উপায় থাকবে না। এমন আরো ছবি আছে ঐ ফোল্ডারে।
“সবার ছবিই ফাটাফাটি বাট হিরা…!”

হাওয়ার কথায় হাবিবা হালিমার ঘাড়ে হাত রেখে ছবির দিকে তাকিয়ে বলে,
“মাশাআল্লাহ ফিগার আমাদের হিরার।ইস,এমন যদি আমার একটু হতো”
“ছিঃ আপু ছিঃ,তোমরা এভাবে আমার দিকে নজর দিতে পারো না। তোমাদের থেকে এটা আশা করিনি আমি।”
“তোর বিউটি’বন গুলো যা না রে হিরা,জাস্ট মারাত্মক!”
হাওয়ার কথায় হিরা ফোন বন্ধ করে দিয়ে বলল,
“এই তোমরা আমার দিকে বাজে নজরে তাকাচ্ছো কিন্তু।আমার লজ্জা লাগে না নাকি”
হিরার কথায় হাওয়া ওর গা ঘেঁষে বসল,
“এই তোমরা চুপ করো তো।আমার বোন টা লজ্জা পাচ্ছে দেখো না। আমাদের প্রসংসা তার কাছে বাজে লাগছে কিন্তু যখন তার জামাই কথা গুলো বলবে তখন তো আবার রোমান্টিক লাগবে”
হাওয়ার তিন বোন হেসে হিরাকে চোখ মারল।
“ধুর,থাকবোই না আমি এখানে ”

বলে রুম থেকে রাগ করে বেরিয়ে গেল হিরা।আজকে সে এদের একটা ব্যবস্থা করেই ছাড়বে।নিচে থেকে নেমে সে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা কিচেনে চলে গেল।
“বড় মা আজকে তুমি একটা বিচার করবে।তোমার বাকি তিন মেয়ে আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করছে।বলছে আমার নাকি নায়িকাদের মতো ফিগার,বিউটি’বন গুলো মারাত্মক।আমি নাকি সে***ক্সি।আমার জামাইয়ের কপাল নাকি সোনায় মোড়া।আমি তাদের ছোটো বোন আর তারা আমাকে এসব বলে আজকে তুমি একটা বিচার করবে।আরো বলেছে আমার বু….”

কথা শেষ করার আগেই কারো কাশির শব্দ কানে এলো।হিমকে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে থাকতে দেখে ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।ওর মা ওর দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে হিমের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।বেচারা হাসপাতাল থেকে ফিরে সোফায় বসেই পানি চেয়েছিল।আসমা বেগম পানি এগিয়ে দিলে ও যখন মুখে নেয় তখনই হিরা ওপর থেকে নিচে নেমে কথা বলা শুরু করে।পানি আর ওর গলা দিয়ে নামেনি।

কাশি থামতেই হিম কোনোদিকে না তাকিয়ে উপরে নিজের রুমে চলে যায়।হিম যেতেই আসমা বেগম মেয়ের দিকে তেড়ে এলেন।এই বেয়াদব মেয়ে নিয়ে তিনি কি করবেন।কিছু বলার আগে চারপাশে তাকিয়ে দেখবে না,কাকে কি বলতে হয় সেটাও জানে না।মা চাচিদের কেউ এসব বলে।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here