#বোকামন
#পর্ব_৪২
#Tahsin_Atoshi
আজ মিষ্টির বিয়ে। পার্লার থেকে লোক এসেছে সাজানোর জন্য৷ তেমন বড় অনুষ্ঠান করবে না কেউই। মিষ্টির বারণ। অসুস্থতার জন্য অতিরিক্ত মানুষ সে সহ্য করতে পারে না। তাই পরিচিত কিছু আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব। ছেলে পক্ষের দিক থেকেও সেই একই কাজ৷ হুমায়রা বসে বসে মিষ্টির সাজানো দেখছে৷ কেন যেন সাজানোটা তার পছন্দ হয়না৷ একা একা বিরবির করে বলে,
-এর থেকে আমিই ভালো সাজাতে পারি৷
সাথে সাথেই স্মৃতি পাশ থেকে চিমটি কেটে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলে। সাজানো দেখে মিষ্টিরও রাগ হয় একটু। এটা কেমন সাজানো? মুখে অতিরিক্ত মেকআপের কারণে ভুতুমের মতো লাগছে। তা দেখে বিরক্ত হয় সে। এমনিতেই মন পরে আছে অন্যদিকে। সেই বিরহে বাঁচে না। তার মধ্যে আবার পার্লারের মানুষের সাজানো দেখে আরো রাগ হয়। একটু বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-আপনারা কি সাজাতে পারেন না? প্রোফেশনাল না? এসব কি সাজাচ্ছেন? বলেছিলাম তো হালকা সাজাতে।
মেয়েটা একটু ভরকায়। মাথা নিচু করে বলে,
-জ্বী ম্যাম বিয়েতে তো এভাবেই সাজায়। আমি এর আগে অনেককেই সাজিয়েছি৷
রাগ হয় মিষ্টির৷ একটু উত্তেজিত হয়ে বলে,
-এই সাজানোর নমুনা? সাজাতে হবে না আপনা…
কথা শেষ হওয়ার আগেই থেমে যায় মিষ্টি। পাশ থেকে খুশি কাঁধে হাত দিয়ে থামিয়ে দেয়৷ এরপর ফলে,
-বিয়ের সাজ এমনই হয় মিষ্টি। মাথা ঠান্ডা কর।
জোরে শ্বাস নেয় এবার। বিয়ের কারণে এমনিতেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। এর জন্য সব রাগ গিয়ে পরছে পার্লারের মেয়েটার উপর। চুপচাপ উঠে ওয়াশরুমে চলে যায়। দরজা বন্ধ করে বেসিং এর আয়নায় নিজের মুখটা দেখে। রাগ হচ্ছে তার। মন চাচ্ছে সব ভেঙে ফেলতে। ইচ্ছে করছে ছুটে তুহিনের কাছে যেতে। গিয়ে জিজ্ঞেস করতে তার কি একটুও মায়া হয়না৷ কেন বুঝে না কতটা ভালোবাসে সে। কান্না পায় তার। মেকআপ মুখেই ইচ্ছে মতো চোখমুখে পানি দিতে থাকে। তবুও যেন শান্তি লাগছে না৷ এরই মাঝে দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়৷ বাইরে থেকে বৃষ্টি ডাকছে তাকে। নিজেকে ঠিক করে বাইরে চলে আসে। পার্লারের মেয়েটা চলে গেছে। মূলত হুমায়রাই পাঠিয়ে দিয়েছে। সে জানে মিষ্টির মনের অবস্থা৷ কি-ই বা করার আছে তার।
মিষ্টি বের হতেই হুমায়রা নিজ হাতে সাজিয়ে দেয়। ইশারায় বলে হাসতে। কিন্তু চাইলেই কি হাসা যায়। পাশ থেকে তুলি বলে,
-এখনও সময় আছে মিষ্টি। বিয়েতে না করে দাও। তুহিনের সাথে আমরা কথা বলবো। ও বুঝবে।
সাথে সাথে না বলে ওঠে মিষ্টি। তুলির দিকে তাকিয়ে বলে,
-জোর করে ভালোবাসা হয়না আপু। উনি যেভাবে থাকতে চায় সেভাবেই থাকুক।
কেউই কথা বাড়ায় না। মিষ্টিকে সাজানো শেষে সবাই হাফ ছেড়ে বসে। এর মাঝে হুমায়রার পেটের ভেতর ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি যেন থামছেই না। কি করবে এখন। বাইরে গিয়ে খাবার চাইবে? বিষয়টা কি ভালো দেখাবে? বুঝে উঠতে পারে না সে। ঠোঁট উল্টে সবার দিকে এক নজর চায়। তা চোখে পরে অর্নির। ভ্রুঁ কুঁচকে কৌতুহল নিয়ে বলে,
-ননদীনির ঠোঁট উল্টে আছে কেন? কি হয়েছে শুনি?
-ভাবি টু…!
বলে অসহায় চোখে তাকায়। ওমনি তুলিও পাশ থেকে বলে,
-উমম…কোনো আবদার আছে মনে হচ্ছে।
আবারে ঠোঁট উল্টায় হুমায়রা। হালকা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-ক্ষুধা লেগেছে খুব। বাহিরে পোলাও, রোস্টের ঘ্রাণ… আমাকে একটু খাবার এনে দিবে?
হাসে সবাই। বৃষ্টি বলে,
-আচ্ছা এর জন্য তোমার ঠোঁট উল্টে আছে৷ আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। এরপর বিয়ে পরানো হলে সবাইকেই খাবার দেয়া হবে।
মন খারাপ করে তাকায় হুমায়রা। কিন্তু কেউই এবার পাওা দেয়না। এরই মাঝে বরপক্ষের গাড়ির শব্দে সবাই হৈ-হুল্লোড় করে ওঠে বর এসেছে বলে। মিষ্টির হার্টবিট যেন বেরে যায়৷ কি করবে সে? অন্য একজনের সাথে সংসার কীভাবে করবে? পারবে সে? এর থেকে তো মরে যাওয়াই ভালো। কান্না পায় তার। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে। না পারছে না সে থাকতে। ফোনটা হাতে তুলে নেয় তুহিনকে কল করার জন্য। আবারো পাশে রেখে দেয়। আয়নার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায় সে। কি করবে এখন? রাগ হচ্ছে খুব। আবার আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে নিজেই বলে,
– তুই নিজেই তো বিয়েতে রাজি হয়েছিলি। তাহলে এখন কি হলো? জেদ শেষ হয়ে গেল? যাবি এখন ওই মানুষটার কাছে? আবারো অপমানিত করলে কি করবি তুই? পারবি সইতে? যার সাথে বিয়ে হচ্ছে সেও তো খারাপ না। তার সাথে মানিয়ে….
ভেবেই থেমে যায় আবার। কান্না পায় খুব। আবারো বিরবির করে বলে,
-একজনকে ভালোবেসে অন্যজনের সাথে কীভাবে মানিয়ে নিবো? এর থেকে তো মৃত্যুও শ্রেয়…!
হুট করেই চোখ যায় সামনে রাখা ঔষধের বাক্সটার দিকে। হাত বারিয়ে ধরতে যাবে সেই মুহূর্তেই একটা পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসে…
-বউ রেডি তো? কাজী আসবে বিয়ে পরানোর জন্য ।
শুভকে দেখে আবারও মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয় মিষ্টি। নিজেকে শক্ত করে নেয়। হুমায়রা বলে,
-হ্যাঁ একদম রেডি। আপনি কাজী নিয়ে আসুন।
এদিকে মিষ্টিও নিজেকে শক্ত করে বিরবির করে বলে,
-মানুষটা যেহেতু ভালোবাসে না আমিও ভুলে যাবো। পারবো আমি।
চুপচাপ উঠে বড় ঘোমটা টেনে বিছানায় বসে পরে। কিছুক্ষণের মাঝে কাজীকে সাথে নিয়ে মিষ্টির মামা হাজির হন। পিছু পিছু কিছু আত্মীয়রাও আসে। কাজী সাহেব মিষ্টির থেকে কিছুটা দূরেই বসেন। এরপর ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করেন….
-আপনি সাহেদা বেগম ও জয়নুল হাসানের একমাএ ছেলে সামিউল হোসেনকে স্বইচ্ছায় বিয়ে করতে রাজি? তাহলে মা বলো কবুল….
ঘরটা কেমন নিস্তব্ধতায় ভরে যায়। মিষ্টির শরীর কাঁপছে। শ্বাসটাও যেন দ্রুত গতিতে চলছে। তা দেখে পাশ থেকে স্মৃতি চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে। এরপর ইশারায় বুঝায় কবুল বলার জন্য। মিষ্টি একটু শান্ত হয়। এরপর নিচু স্বরে বলে ফেলে কাঙ্ক্ষিত সেই শব্দটি। বারে বারে তিনবার পরতেই সকলে আলহামদুলিল্লাহ পরে। এরপর কাজী এগিয়ে দেয় কাগজটা সাইন করার জন্য। কাঁপা হাতে সাইন করে মিষ্টি। সবাই স্থান ত্যাগ করে ছেলের কাছে যায় বিয়ে পরানোর জন্য৷ সেদিকে একবার তাকিয়ে মিষ্টি মনে মনেই বলে,,,
-সব শেষ…! এখন আমি অন্য এক পুরুষের স্ত্রী।
চোখ থেকে গড়িয়ে পরে দুই ফোঁটা জল। ঘোমটার আড়ালে তা কারো চোখে পরে না। বাইরে থেকে হৈ-হুল্লোড়ে বুঝা যায় ছেলের কাছ থেকেও ইচ্ছে জানা হয়ে গেছে। এবার মোনাজাতের পালা। সবাই আল্লাহর নিকট হাত তোলে। মিষ্টিও বাদ যায়না। সে মোনাজাত করে নিজের মতো। মনে মনেই দু-হাত তুলে বলে,
-হে আল্লাহ আপনি উওম পরিকল্পনাকারী। আপনি জানেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। হয়তো তুহিন আমার জন্য ঠিক ছিল না। কিন্তু ওই মানুষটাকে যে আমি ভালোবেসে ছিলাম। এখন যার সাথে বিয়ে হলো তাকে আমি সুখী রাখতে পারবো তো। আমি কি পারবো ওই লোকটাকে ভুলে আরেকজনের সংসার করতে। সবাইকে তো কেরে নিলেন। আরকিছু কি বাকি আছে? আমাকে শক্তি দিন আল্লাহ। শক্তি দিন। আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি আল্লাহ। তবুও আপনার দিকেই তাকিয়ে রইবো। আমি বিশ্বাস করি আপনি আছেন। আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি আমার জন্য সঠিকটাই রাখবেন।
গলা আটকে আসে মিষ্টির। সে পারছে না চিৎকার করে কাঁদতে। তুলি হয়তো বুঝতে পারে বিষয়রা।ধীরে ধীরে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,,,
-একটা কথা মাথায় রাখবে মিষ্টি.. বান্দা মন থেকে কিছু চাইলে আল্লাহ কখনো সেই বান্দাকে ফিরিয়ে দেন না। তোমার জন্য বেস্টটাই অপেক্ষা করছে৷
কিছুই বলে না মিষ্টি। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্থির হয়ে বসে থাকে। খাওয়া-দাওয়ার পালা শেষে বিদায় নিয়ে গাড়িতে বসে মিষ্টি। দুই পাশে হুমায়রা ও স্মৃতি। বরকে অন্য গাড়িতে দেয়া হয়েছে। এটাও নাকি বড়দের আচার। কিন্তু মিষ্টির এতে বেস একটা আগ্রহ নেই। মনটা যে অন্যকোথাও পরে আছে।
গাড়ি স্টার্ট হতেই ভেতরটা আবারো ধক করে ওঠে। যতটা পথ এগিয়ে যাচ্ছে ততবেশি হার্টবিট বেরছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বলার কিছু নেই তার। স্তব্ধ হয়েই বসে থাকে।
_____
বউকে বাড়িতে ঢুকিয়েই সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে আহান ও স্মৃতি। বিষয়টা খুব বিরক্ত লাগে স্মৃতির। কোথায় সবার সাথে মজা করবে তা না। লোকটার সব সময় বাড়াবাড়ি। কিন্তু বলার কিছুই নেই। ধীর পায়ে ঘরে এসে বসে। ক্লান্ত লাগছে খুব। আবার মেকআপ ধুয়ে ফেলতে হবে। শাড়ি চেঞ্জ করে আবার শাড়িও পরো এসব ভাবতেই বিরক্তি নিয়ে বসে পরে। একা একা বিরবির করে বলে,
-আগে রেস্ট তারপর সব।
এরই মাঝে আহানও পাশে এসে সুয়ে পরে। তা দেখে বিরক্তি নিয়ে তাকায় স্মৃতি। রাগ দেখিয়ে বলে,
-ওখানে থাকলে কি হতো শুনি? সবাই কত মজা করছে। আর আমি? এখানে বসে আছি।
হাসে আহান। এক হাতে ভর করে গালে হাত রেখে বলে,
-মজা করেছ তো। আর কত? আর ওখানে ছেলের বাড়ির কত কাজিন এসেছে জানো। তোমাকে কীভাবে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তা দেখে একটুও ভালো লাগেনি আমার।
ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্মৃতি৷ এরপর বলে,
-ঘুরে ঘুরে দেখে ভাবছিল এত পরীদের মাঝে এই পেত্নীটা কোথা থেকে এলো। এছাড়া কিছুই। আপনার বউ বিশ্ব সুন্দরী না ওকে..?
বলেই হনহন করে আয়নার সামনে এসে দাড়ায়। কানের দুলে হাত দিতে আহান এসে কোমড় জড়িয়ে ধরে। বিরক্ত হয় স্মৃতি। বলে,
-টায়ার্ড লাগছে। ফ্রেশ হয়ে ঘুমাবো। আপনিও ঘুমান যান।
কথা শোনে না আহান। স্মৃতির ঘারে মুখ ডুবিয়ে বলে,
-বউ আর কত দূরে ঠেলে দিবে? এবার তো একটু কাছে আসার সুযোগ দাও৷
এইটুকুতেই স্মৃতির চেহারার রঙ বদলে যায়। পুরোনো স্মৃতি তা কি চাইলেই ভোলা সম্ভব। আহানও আয়নায় স্মৃতির চেহারার প্রতিবিম্ব দেখে। কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থেকে ছেড়ে দেয় স্মৃতিকে। হয়তো বুঝতে পারে বিষয়টা। হালকা তুতলে বলতে থাকে,,
-আ্ আম… আম সরি স্মৃতি। আম্ এক্সট্রিমলি সরি। সরি….
বলে দূরে সরে দাড়ায়। হালকা মাথা নিচু করে বলে,
-তুমি নিজ থেকে না চাইলে আমি আর কখনো জোর করবো না। স্ সরি।
অবাক হয় স্মৃতি। সে তো কিছু বলেনি৷ তাহলে কিসের দ্বিধা এই লোকটার মাঝে। এতো বুঝে কেন সে স্মৃতিকে। হাসবেন্ডরা বুঝি এমনই হয়? হালকা হাসে স্মৃতি। ধীর পায়ে আহানের সামনে এসে দাড়ায়। ভালোমতো পরোখ করে বলে,
-গতরাতে আপনি সিগারেট খেয়েছেন?
হঠাৎ এমন প্রশ্নে চমকে তাকায় আহান। এটা ঠিক সে সিগারেট খেয়েছে। গায়ে তো কোনো দুর্গন্ধ নেই। তাহলে? স্মৃতি বুঝলো কীভাবে?
আহানকে ভাবনায় পরে থাকতে দেখে আবারো হাসে স্মৃতি। বলে,
-ভাবছেন কীভাবে জানলাম? শরীর থেকেই হালকা স্মেল আসছে তাই। ইউ নো হোয়াট আমার নাকটা একটু বেশিই ভালো। অল্পতেই ধরে ফেলে। এখন বলুন কেন খেয়েছেন?
-এ্ এমনি। বন্ধুরা মিলে…
-মানে ভাইয়াও খেয়েছে? হুমু জানে?
হালকা হাসে আহান৷ এরপর বলে,
-এই লাস্ট। আর খাবো না তো। তাই শেষ বারের মতো..
স্মৃতি আরো কাছে এসে দাড়ায়। আহানের শার্টের কলার চেপে ধরে বলে,
-এটাই লাস্ট হয় যেন। আমি হারাতে চাইনা আপনাকে বুঝতে পেরেছেন?
আহান মাথা নাড়ায়। এরপর অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে,
-বউ পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। রাগী রাক্ষ…
ভাবনার সুযোগটাও পায়না সে। স্মৃতির কান্ডে থমকায় সে। হালকা খুশিও হয়। কেটে যায় কিছুক্ষণ। নিজের কান্ডে নিজেই লজ্জা পায় স্মৃতি। আহানের থেকে দূরে গিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। আহান আবারো পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,,,
-মে আই?
#চলবে…….!

