এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_২০

0
1

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২০
#আনিকা_আফসা

রুদ্র গাড়িতে হঠাৎ ব্রেক কষলো। দেখলো একটা লোক পড়ে আছে রাস্তায়, আশেপাশে রক্তে মাখামাখি। চিন্তিত মনে গাড়ি থেকে বের হয়েই ছুটলো লোকটার কাছে। কাছে আসতেই পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেলো তার। দৌড়ে কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো এবং বলতে লাগলো,

“আঙ্কেল!! আঙ্কেল!! এসব কি করে হলো? কে করলো?”

ততক্ষণে আরফান মির্জার অবস্থা বেশ খারাপ। দম ফুরিয়ে আসছে। পেটে গাঁথা সেই ঘাতক ছুরি। আশেপাশে রক্তে মাখামাখি। রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেলো। আরফান মির্জা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। চোখ এখনো খোলা। রুদ্র কাঁপা গলায় বলল,

“আঙ্কেল এসব কিভাবে হলো? ”

আরফান মির্জা তার হাত তুললেন, বড়ো ক্লান্তি তার চোখে। এখনই হয়তো বুঝে আসবে। রুদ্র তার হাত আঁকড়ে ধরলো। তখনই আরফান মির্জা বলল বড় ধীরে কিছু, রুদ্র কান এগিয়ে দিলো তা শোনার জন্য।

“আ,,, আমার মেয়েকে দে,,,দেখে রাখিস রু,,দ্র।”

অনেক কষ্টে আওয়াজ বের হলো তার মুখ থেকে। লম্বা দম নিলো। রুদ্র স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কাঁপা গলায় বলল,

“আ,, আঙ্কেল এসব কি বলছেন? আপনার কিছুই হবে না, আমি আপনাকে এখনই হসপিটালে নিয়ে যাবো। কিছু হবে না।”

তখনই রুদ্রের নজরে এলো পেটে গেথে থাকা ছুরি। মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গেলো। শুধু মনে হলো এই ছুরিটা তার আনির বাবাকে কষ্ট দিচ্ছে। তাই দেরি না করে একটানে উঠিয়ে নিলো তা। রক্ত ছিটকে এলো মুখে তার। ছুরি উঠিয়ে নেওয়ায় মৃদু চিৎকার করে উঠলো আরফান মির্জা। রুদ্র ছুরি হাতে নিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে আছে তখনই পেছন থেকে আওয়াজ এলো,

“রুদ্র!!”

রুদ্র পেছন ফিরে তাকালো। পেছনে আমি আর তৃষা দাঁড়িয়ে। আমি একবার ছুরি হাতের রক্ত মুখের রুদ্রকে দেখলাম আর একবার নিজের বাবাকে যার পেটে রক্তে মাখামাখি। পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেলো।

আমার মুখ থেকে চিৎকার বের হয়ে এলো। দৌড়ে গিয়ে বাবার পাশে বসে পড়লাম। কাঁপা হাতে বাবার মুখ ছুঁয়ে বললাম,
“বাবা! চোখ খোলো। বাবা কথা বলো! কি হয়েছে তোমার?”

তৃষা তাড়াতাড়ি ফোন বের করে অ্যাম্বুলেন্সে কল করতে লাগলো। আর আমি শুধু কাঁদছি। বাবার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। রুদ্র নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে। তার হাতে এখনো সেই রক্তমাখা ছুরি।

হঠাৎ বাবা কাঁপা হাতে আমার হাত চেপে ধরলেন। আমি দ্রুত তার দিকে ঝুঁকে পড়লাম।
“মা,,, মণি…”

“জি বাবা! আমি আছি। কিছু হবে না তোমার।”

তিনি কষ্টে চোখ মেলে তাকালেন। বড় মমতায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলাম, ব্যর্থ চেষ্টা। চোখ বুজে ফেললাম আবেশে। হঠাৎ খেয়াল করলাম বাবার হাত হালকা হয়ে আসছে। আমি চোখ খুলতেই হাতটা ধপ করে পড়ে গেল পিচঢালা ধুলাময় রাস্তায়। বাবার চোখ , নিঃশ্বাস সব বন্ধ হয়ে গেল। আমি শুধু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। কাঁপা কাঁপা হাতটা বাবার নাকের সামনে নিতেই আঁতকে উঠলাম। বাবার নিঃশ্বাস পড়ছে না। বাবার দুই বাহু ধরে বলে উঠলাম,

“বা,,বাবা!! এই বাবা। চো,,চোখ বন্ধ কেন তোমার? চোখ খো,,খোলো না। দেখো তোমার মেয়ে এসেছে। এই বাবা ওঠো। ”

কিন্তু নাহ্, বাবা উঠলো না। আগের মতো মা বলে বুকে জড়িয়ে ধরলো না। আমি যেন উন্মাদ হয়ে উঠলাম। আশেপাশে কিছু মানুষ জড়ো হলো। আমি চিৎকার করে বাবাকে ঝাঁকিয়ে বলে উঠলাম,

“বাবা!! ও বাবা!! ওঠোনা, প্লিজ ওঠো। বাবা!!!!”

তৃষা আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। রুদ্র নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তার সেই ছুরি। আমি বাবার বুকে শুয়ে ডাকতে লাগলাম নিষ্প্রাণ কন্ঠে। কিন্তু বাবা আর উঠলো না। পাশের একটা বড় গাছের সাথে অয়ন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। মুখে তার ক্রুর হাঁসি, বললো ধীরে,

“সরি আনি, তোকে পাওয়ার জন্য তোকে এতটুকু কষ্ট তো পেতেই হবে।”

___________________

বাসায় কান্নাকাটির রোল পড়েছে। একটু আগেও যেখানে গায়ে হলুদের জন্য আয়োজন চলছিলো সেখানে এখন বাড়ির কর্তার লাশ নিয়ে চলছে আহাজারি। বসার ঘরের মধ্যখানে একটা খাটিয়ায় রাখা হয়েছে লাশটা। সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। মা ও আপু চিৎকার করে কাঁদছে খাটিয়ার পাশে বসে। আমি বসে আছি চুপচাপ, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আছে আরো অনেক মানুষ , কেউ কাঁদছে, কেউ চুপচাপ আবার কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে। অয়ন, নিহান ভাইয়া, সানভি আর রিয়াদও উপস্থিত। তাদের সবাই আজ নিস্তব্ধ। আছে উপস্থিত রুদ্রও। সে এখনো ঐ রক্তাক্ত জামা নিয়ে চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। মা খুব কাঁদছে, তার ভাবনাতীত ছিল এই ঘটনা। বাড়ির অবস্থা কেমন করে বদলে গেলো। যেই বাড়ির দেয়ালে হাঁসি লেগে থাকতো কেই বা জানতো এই দিন দেখতে হবে তাদের? যেই বাবার কোলে কালকেও মাথা রেখে কেঁদেছি সে আজ আর নেই। হঠাৎ-ই চোখ গেলো রুদ্রের দিকে। মাথা নিচু করে বসে আছে চেয়ারে। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালাম। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম রুদ্রের দিকে এবং তাকে টেনে দাঁড় করালাম। রুদ্রের মুখে চমক দেখা গেলো। আমি নিষ্প্রাণ কন্ঠে বললাম,

“কি লাভ হলো আপনার? কেন মারলেন আমার বাবাকে?”

একটা প্রশ্ন সেটাতেই বদলে গেলো পরিবেশ। সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলাম আমরা। অনেকে মুখে হাত চেপে ধরলো। রুদ্রের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমাকে বলল,

“এসব কি বলছো? আমি কেন আঙ্কেল কে মারবো? তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।”

আমি চোখের পানি ছেড়ে গর্জে উঠলাম,”আমার ভুল হচ্ছে? আমার? নিজের চোখে দেখেছি আমার বাবার পেটে যে ছুরি গেঁথেছিল তা আপনার হাতে ছিলো। কেন এমন করলেন? আমার বাবাকে কেন মারলেন? কি ক্ষতি করেছিলাম আমি?”

বলতে বলতে রুদ্রের কলার ঝাঁকিয়ে কাঁদতে লাগলাম। সবাই কানাঘুষা করতে লাগলো। রুদ্র আমাকে বোঝাতে লাগলো যে,

“দেখো ,তুমি ভুল বুঝছো। আঙ্কেল আমার বাবার মতো আমি কি করে এমন করতে পারি? তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছো? ”

আমি রুদ্রের থেকে সরে দাঁড়ালাম এবং বললাম,

“আমাকে তুমি করে ডাকবেন না। আপনি আমার কেউ নন। আপনি আমার বাবার খুনি। ”

তখনই সদর দরজা দিয়ে কয়েকজন পুলিশ ভেতরে এলো। পুরো বাড়িটা মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেলো। সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো পুলিশের দিকে। সামনে থাকা অফিসারটা গম্ভীর চোখে চারপাশ দেখে বললেন,
“মিস্টার রুদ্র আফতাব চৌধুরী কে?”

অয়ন এগিয়ে এসে রুদ্রের দিকে আঙুল তুলে বললো,”এই যে ইনি, আপনারা এতো দেরিতে এলেন? ”

পুলিশ অফিসার পাশের কনস্টেবলদের ইশারা করতেই ওরা রুদ্রের দুই বাহু ধরে নিলো। আমি রুদ্রের থেকে দূরে সরে গেলাম, চোখে ঘৃণার পাহাড়। রুদ্র বিচলিত গলায় বলল,

“বিশ্বাস কর আনি , আমি এসব করিনি। আমি খুনী নই। ”

আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। চোখ বন্ধ করে অশ্রু বিসর্জন দিলাম। আজ রুদ্রের আর্তনাদ আমার মনের ভেতর ঢুকতে পারলো না। চোখের সামনে ভাসতে লাগলো বাবাকে মারার সেই দৃশ্য। রুদ্র কনস্টেবল থেকে হাত ছাড়িয়ে মায়ের কাছে এলো। মায়ের দুই হাত ধরে বললো,

“আন্টি দেখুন না আপনার মেয়ে কি বলছে? আপনি তো আমাকে ছেলে ভাবেন তাইনা? আপনার ছেলেকে তো আপনি চিনেন। প্লিজ আনিকে বোঝান আমি কিছু করিনি।”

মা রুদ্রের দিকে তাকালো, কাতর গলায় বলল,”আমি তো তোর কোনো ক্ষতি করিনি বাবা। আনিশা আর তোকে আলাদা করে দেখিনি। তাও এতো বড় ক্ষতি কেন করলি?”

রুদ্রের হাত কেঁপে উঠলো, দু’পা পিছিয়ে গেলো সে। তারপর ছটফটে পায়ে আনিশা কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েটা কাঁদছে খুব। দুই হাত তার ধরে বলল,

“নিশা তুই তো কিছু বল। আমাকে তো জানিস তুই। প্লিজ বোঝা একটু সবাইকে। আমাকে ভুল বুঝছে সবাই।”

আপু কথা বললো না। শুধু নিরবে হাত ছাড়িয়ে নিলো এবং পিছিয়ে গেল দু’পা। চোখে তারও অবিশ্বাস। রুদ্রের নিজেকে পাগল পাগল লাগলো। এক মুহুর্তেই সবাই পর হয়ে গেল? আবারো দৌড়ে আমার কাছে এসে হাত জোর করে বলল,

“প্লিজ একটু বোঝ আনি। তুই না তোর রুদ্রকে অনেক ভালোবাসিস? তাকে বিশ্বাস করতে পারছিস না? প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর, আমি এটা করিনি।”

আমি রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম,”আপনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”

রুদ্র এক কদম পিছিয়ে গেল। কাঁপা কন্ঠে বলল,

“তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না, আনি?”

আমি চোয়াল শক্ত করলাম তার কথায় এবং শক্ত কন্ঠে বললাম,

“আই জাস্ট হেইট ইউ। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কি জানেন? আপনার মতো একটা খুনিকে বিশ্বাস করা। আপনি একটা খুনি। আই জাস্ট হেইট ইউ রুদ্র, আই জাস্ট হেইট ইউ।”

রুদ্র যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো। অয়ন পুলিশকে বলল,

“আপনারা দাঁড়িয়ে কেন আছেন? নিয়ে যান অপরাধীকে।”

পুলিশ আবার জোর দিলো। রুদ্র এবার কোনো ছটফট করলো না। চুপচাপ হাত এগিয়ে দিলো শুধু আমার দিকে তাকিয়ে। কনস্টেবল হাতকড়া পরিয়ে দিলো তাতে। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, বুক ফেটে কান্না আসছে। কনস্টেবল টেনে রুদ্রকে নিয়ে যেতে লাগলো। আমি তাকালাম সেদিকে, রুদ্র যাওয়ার সময় একবার পিছু ফিরে তাকালো। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। তখন অয়ন আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। রুদ্র তা দেখে নিজের চোখ সরিয়ে সামনে পা বাড়ালো। জানেনা এমন কেন হলো? নিয়তি কেন এত নিষ্ঠুর হলো? চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

#চলবে

(নিয়তি তাদের কোথায় নিয়ে যাবে?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here