#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২৭
#আনিকা_আফসা
অন্ধকার ও ময়লা একটা রুম। চারিপাশে ধুলার স্তর হয়ে পড়ে আছে এবং মাকড়সার জাল বুঝিয়ে দিচ্ছে এই রুমে মানুষের আনাগোনা খুবই কম। পুরোনো ও ভাঙ্গা আসবাব পড়ে আছে চারপাশে। রুমের ছোট্ট একটা আয়তাকার জানালা। সেখান দিয়ে আলো এসে স্পট লাইটের মতো মেঝেতে পড়েছে আর সেই মেঝেতেই পড়ে আছে আনিশা। আলো চোখে পড়ায় চোখ পিটপিট করছে সামান্য। মাথার ভেতর তখনকার দৃশ্যপট। হঠাৎ চোখ মেলে তাকালো সে, জ্ঞান ফিরেছে মাত্রই। মেঝের ধুলায় গাল ভরে গেছে।
আনিশা ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করল। মাথার পেছনে তীব্র ব্যথা অনুভব হতেই মুখ দিয়ে চাপা গোঙানি বেরিয়ে এলো। হঠাৎ আনিশা খেয়াল করলো তার হাত ও পায়ের দৃঢ় বাঁধন এবং মুখে একটা কস্টেপ লাগানো।
ওর চোখ হঠাৎ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
আনির কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে তো আনিকে সব বলতে যাচ্ছিল! অয়নের আসল চেহারা, তার অপরাধ, সবকিছু জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তো,,,,
চারপাশে দ্রুত চোখ বুলালো আনিশা। এটা তো তাদের বাড়ির পেছনের স্টোর রুম। এদিকটায় কেউ আসেনা। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। জানালাটা এতটাই উঁচু যে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ভাঙা একটা আলমারি, দুটো কাঠের চেয়ারের অবশিষ্ট অংশ আর কিছু পরিত্যক্ত বাক্স ছাড়া আর কিছুই নেই।
আনিশা মরিয়া হয়ে হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু দড়িটা এত শক্ত করে বাঁধা যে সামান্যও নড়ছে না। আতঙ্কে তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। বারবার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে,
আনিকে বাঁচাতে হবে।
অয়নের আসল চেহারা যদি আজও সবার সামনে না আসে, তাহলে অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কি করবে সে ?
এদিকে সেদিকে তাকাতেই একটা ভাঙা কাঁচের বাল্ব দেখতে পেলো। আনিশার চোখ হঠাৎ সেই ভাঙা কাঁচের বাল্বটার ওপর গিয়ে স্থির হলো।
মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর আশার আলো জ্বলে উঠল।
সে ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে বাল্বটার দিকে এগোতে লাগল। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সামান্য নড়াচড়াও ভীষণ কষ্টকর ছিল। মেঝের ধুলা আর ছোট ছোট কাঠের টুকরো তার শরীরে বিঁধছিল, কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই।
কিছুক্ষণ চেষ্টার পর অবশেষে বাল্বটার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হলো সে। মাটিতে পড়ে থাকা ধারালো কাঁচের একটা টুকরোর সাথে হাতের দড়িটা ঘষতে শুরু করল। তিনবার চেষ্টার পর দড়িতে সামান্য ছেঁড়া দাগ পড়লেও পুরোপুরি কাটছিল না।
আনিশার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়তে লাগল ।মনে হচ্ছিল সময় যেন তার হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আজই তো আনির বিয়ে।যদি দেরি হয়ে যায়? যদি অয়ন তার পরিকল্পনায় সফল হয়ে যায়?
চোখের কোণে জল চলে এলো তার। না! সে হার মানবে না। আরও জোরে কাঁচের সাথে দড়ি ঘষতে লাগল।
হঠাৎ, সেটা ছিঁড়ে গেল!
হাতের বাঁধন খুলে যেতেই স্বস্তির একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। দ্রুত মুখের কস্টেপ খুলে ফেলল সে। তারপর পায়ের বাঁধনও খুলে ফেলল।
কিন্তু মুক্ত হওয়ার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ দরজাটা এখনও বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। আনিশা দরজায় কান পাতলো। দুজন লোকের কথোপকথন কানে আসছে। এখানে তো কারোর আসার কথা নয়। এটা বাড়ির পেছনের দিক। তাহলে কি এটা অয়নের লোক? হতে পারে কারণ অয়ন এত সহজে আনিশাকে ছাড়বে বলে মনে হয়না? আনিশা আঙ্গুল দিয়ে কপাল ঘষলো। কি করবে? এখানেই কি থেমে যাবে সব?
*************
আমি চুপচাপ স্থির হয়ে এক দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। আশেপাশে এখন কোনো মানুষ নেই। নিকি আপু সবাইকে কি বলে যেন নিয়ে গেছে। হঠাৎ করেই বেশ অস্থির লাগছে আমার। কেন এমন হচ্ছে? কিছু কি হতে চলেছে?
তখনই দরজা লাগানোর খট করে আওয়াজে আবারো আয়নার দিকে নজর গেলো। তখনই মাথার উপর আস্ত আকাশটা যেন ভেঙে পড়লো। কেননা আয়নার প্রতিবিম্বে ফুটে উঠেছে রুদ্রের প্রতিচ্ছবি।
রুদ্রকে দেখে আমার শরীর মুহূর্তেই অবশ হয়ে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল অবিশ্বাসে।
এটা কি সত্যি? নাকি আমার কল্পনা?
আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরে দাঁড়ালাম।
না, ভুল দেখিনি। রুদ্রই দাঁড়িয়ে আছে।
পড়নে কালো একটা শার্ট, এলোমেলো চুল, ক্লান্ত মুখ। চোখের নিচে কালচে দাগ স্পষ্ট। মনে হচ্ছে বহুদিন ঘুমায়নি।
আমি ভুলে গেলাম রুদ্রকে দেখে সব। আমার বাবার মৃত্যু, আমার বিয়ে সব। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম রুদ্রের দিকে। রুদ্রও এগিয়ে এলো। ওর নজর আমার দিকে স্থির। তাকিয়ে আছে মেরুন রঙ্গা লেহেঙ্গা পরিধানরত এই আমিকে। দুজন মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালাম। রুদ্রর নিচের ঠোঁটে তেছড়া করে কাঁটা দাগ। আমি ছলছল চোখে ছুঁয়ে দিলাম সেই জায়গা। রুদ্র সেই হাতে হাত রেখে আমার হাতের তালুতে চুমু খেলো। তার চোখের কোটরও জলে টইটুম্বর। হঠাৎ আমার কান্নারা বাঁধ ভাঙলো। দুনিয়াকে ভুলে ঝাপিয়ে পড়লাম রুদ্রের বুকে।
রুদ্রের বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম আমি।
গত কয়েক মাসের সমস্ত কষ্ট, অভিমান, অসহায়ত্ব যেন একসাথে বেরিয়ে আসছে। রুদ্র কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরলো আমায়। প্রেয়সী ঘ্রাণ পেলো অনেকদিন পর।
সময়টা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল ।
________________
“একটা কাজ যদি তোমার দ্বারা হয় আহান। তূর্যের সুন্দর মতো খেয়াল রাখো । আমি খুব দ্রুত আসছি। হাতে কিভাবে পোড়া লাগালে? ধ্যান কোথায় থাকে?”
আহানকে বকতে বকতে হাঁটছে নিকি। তার পাশে নিহান মুখ টিপে হাসছে। এখন তারা বাড়ির পেছনের অংশে এসেছে। প্ল্যান মোতাবেক রুদ্রের এই পথ দিয়েই আনিকে নিয়ে আসার কথা। নিকি ফোন রাখতেই নিহান বলল,
“আহানের মাগফেরাত কামনা করছি।”
নিকি ভ্রু কুঁচকে বলল,”কেন?”
নিহান বললো,”কেন আবার জিজ্ঞেস করছিস? তোর মতো ডায়নি জুটেছে কপালে। এদিক থেকে ওদিক হলেই তো জীবন খোয়ানোর আশংকা আছে। তাই বললাম আরকি।”
নিকি সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
“এসব তুই বলছিস? তুই? তুই তো বিয়ের আগেও আনিশার কথায় নাচতিস আর পরের কাহিনী তো চোখেই দেখা যাচ্ছে। হুহ্, আবার আমাকে বলছিস এই কথা?”
নিহান হাসলো খানিক। তারপর হঠাৎ বলল,”আচ্ছা আনিশা কোথায়? ওকে তো দেখলাম না।”
নিকি বলল,”আমিও খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। আন্টির সাথে দেখা হয়েছিলো , উনি বললেন আনিশা নাকি পার্লারে গিয়েছে।”
নিহান বলল,”তাই বলে এখনো আসবে না? ”
নিকি বলল,”কি জানি? এই এক মিনিট, ওটা কি?”
নিকি সামনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো। নিহান দেখলো দুজন মোটাসোটা লোক একটা রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এরা কারা? স্টোর রুম এভাবে পাহাড়া দিচ্ছে কেন?”
নিকি বলল, “বিষয়টা তো দেখতে হচ্ছে। আয় তো!!”
এই বলে নিকি চললো আগে, নিহান পিছু নিলো ওদের। নিকি গিয়ে দাঁড়ালো লোক দুটির সামনে এবং জিজ্ঞেস করলো,
“আপনারা কারা?”
নিকির আওয়াজ পেতেই ভেতর থেকে কান সজাগ হয়ে গেলো আনিশার। সে এতক্ষন অন্য পালানোর পথ খুঁজছিলো। নিকির আওয়াজ পেতেই আবারো দরজায় আড়ি পাতলো।
নিকির সরাসরি প্রশ্নে লোকদুটো থতমত খেলো। চোখে চোখে দুজন কিছু ইশারা করতে দেখে নিকি বলল,
“কি সব ইশারা চলছে? বলুন আপনারা কারা? এখানে কি করছেন?”
নিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,”কি হলো কথা বলছেন না কেন?”
একজন বলল,”আমাদের অয়ন স্যার রেখেছেন রুমটা পাহাড়া দেওয়ার জন্য।”
নিহান ও নিকি একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“অয়ন স্যার?”
নিহান জিজ্ঞেস করলো,”কেন? কি আছে রুমে?”
ওদের মধ্যে একজন লোক বলল,
“স্যার ম্যামের জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছেন বিয়ে উপলক্ষে। সেজন্য আমরা পাহাড়া দিচ্ছি।”
নিকি বলল,”কিন্তু আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তো রোস্ট মিস হয়ে যাবে।”
নিহান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। খাওয়া দাওয়া শুরু হলো কখন? ওর তো জানা মতে এখনও মূল অনুষ্ঠানই শুরু হয়নি।
নিকি তখনও লোক দুটোর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসছে এবং বলছে,
“আচ্ছা ভাই, আপনারা কতক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন?”
একজন বলল,
“অনেকক্ষণ।”
“ইসস! তাহলে তো আপনারা এখনও কিছু খাননি!”
লোক দুটো একে অন্যের দিকে তাকালো। নিকি এবার ষড়যন্ত্রমূলক ভঙ্গিতে বলল,
“আপনারা জানেন না? পেছনের বাগানের পাশে আলাদা করে কাবাব, রোস্ট আর কাচ্চির কাউন্টার বসানো হয়েছে। একটু আগে খুলেছে।”
লোক দুটোর চোখ চকচক করে উঠল। নিহান পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে নিকির অভিনয় দেখছে।
নিকি আবার বলল,
“আর পাঁচ মিনিট দেরি করলে কিন্তু কিছুই পাবেন না। আমি নিজে দেখেছি সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে।”
একজন দ্বিধায় বলল,
“কিন্তু স্যার তো বলেছে এখান থেকে নড়তে না।”
নিকি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আরে! দুজন একসাথে যাবেন কেন? একজন যান, আরেকজন থাকুন। তারপর উনি এসে গেলে আপনি যাবেন।”
লোক দুটো আবার চোখাচোখি করল। তাদের মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে খাবারের লোভে মন নরম হয়ে গেছে।
নিকি আরও একটু আগুনে ঘি ঢালল এবং বলল,
“বিশেষ করে রোস্টটা অসাধারণ হয়েছে। আমি তো দুই পিস খেয়েছি।”
নিহান কাশির ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অবশেষে একজন বলল,
“তাহলে আমি ঘুরে আসি?”
অন্যজন মাথা নাড়ল এবং বলল,
“আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসিস।”
লোকটা চলে যেতেই নিকি মনে মনে হাসল। প্রথম ধাপ সফল। এরপর সে অন্য লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাই, আপনার মুখটা এত শুকনো কেন? আপনার সাথী যদি সব ভালো ভালো খাবার শেষ করে ফেলে?”
লোকটা অস্থির হয়ে উঠল এবং বলল,
“না, ও তেমন করবে না।”
“আরে! মানুষকে বিশ্বাস করা ভালো, কিন্তু কাচ্চির ক্ষেত্রে না।”
নিহান এবার সত্যিই হাসি চেপে রাখতে পারল না। তাই মুখ চেপে দাঁড়িয়ে রইলো।
লোকটা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। যেহেতু সে একটু পেটুক টাইপের ছিলো। সে বলল,
“এক মিনিটে আসছি!”
বলে সেও দৌড়ে চলে গেল।
ওরা চোখের আড়াল হতেই নিকির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে দ্রুত স্টোররুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ স্বরে ভেসে এলো,
“নিকি…!”
নিকি থমকে দাঁড়াল। নিহানের মুখও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দুজনেই কণ্ঠস্বরটা চিনে ফেলেছে।
আনিশা!
#চলবে
(কেমন লেগেছে নিকির চাল?”)

