আফতাব সাহেব ভেঙে পড়লেন। ব্যথিত কণ্ঠে কান্না জুড়ে দিলেন ।এ যেন নিজের পাপ ধুয়ে-মুছে ফেলার এক ব্যর্থ চেষ্টা। কিন্তু পাপ কি এত সহজে মুছে যায়? কথায় তো আছে,পাপ বাপকেও ছাড়ে না। আজ না হোক, কাল ।নিজের পাপের শাস্তি মানুষকে পেতেই হয়।
কায়সারের কণ্ঠ স্বদিগ্ন, তবু স্থির।
আচ্ছা দাদী, আপনার কি একবারও আমার আর ঊর্মিলার বিয়েটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি?
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন জহুরা বেগম। অপরদিকে ঊর্মিও সামান্য নড়ে উঠল। সবটাই খেয়াল করল কায়সার। এক মুহূর্ত থেমে আবার বলতে শুরু করল—
আপনি যখন ঊর্মিলার ক্ষতি করার জন্য অস্থির ছিলেন ।তখন ভালো ভালো বিয়ের ঘর একের পর এক তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মনে মনে খুঁজছিলেন আপনার মতোই এক ধুরন্ধর পরিবার ।যাতে এই মেয়েটা কোনোদিন শান্তি না পায়।
আর ঠিক তখনই পেয়ে গেলেন এক রিকশাচালক। যে জুয়া খেলে দিন কাটায়। যেন সোনায় সোহাগা। আপনি তো লুফে নিতেই যাচ্ছিলেন।
কিন্তু তখনই আসে দেওয়ান পরিবারের খবর। খোঁজখবর নিয়ে আমার ব্যাপারে জানলেন ।বাচ্চার বাপ, মেয়ে আছে, আগের বউও আছে। আপনার মনে হলো, এই বিয়ে হলে মেয়েটা কোনোদিন মেনে নিতে পারবে না। ঠকিয়ে বিয়ের দায়ে লেগে থাকবে একের পর এক অশান্তি। আর সেটাই হবে আপনার মোক্ষম সুযোগ।
কায়সারের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
প্রথম দেখাতেই আপনি বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। বাবা যখন রাজি হচ্ছিলেন না, তখনই শুরু করলেন মরে যাওয়ার হুমকি। আর আপনার ছেলে—সেই হুমকিতেই কাবু।
কিন্তু একটা ব্যাপার কি জানেন?
সে এক মুহূর্ত থামল।
আপনার ঘরে এত অমানুষের ভিড়ে একজন মানুষ আছেন। তিনি হলেন আপনার বউমা। যার সবচেয়ে বেশি রাগ থাকার কথা ছিল ঊর্মিলার প্রতি ।সেই মানুষটাই ঊর্মিলাকে বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কী আশ্চর্য! যেখানে মেয়েটা আপনার নিজের রক্ত, আপনি তাকে মারার জন্য ছলাকৌশলে মেতে উঠেছিলেন । সেখানে সৎমা নামের সেই মানুষটা তাকে বাঁচাতে মরিয়া।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
আমাকে ঊর্মিলার ব্যাপারে জানানো হয়েছিল। এমনকি ওর সম্পর্কে সব জেনেই আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বিবাহিত না অবিবাহিত—এই প্রশ্নটা আমার কাছে মুখ্য ছিল না। বিয়ে করাটাই উদ্দেশ্য ছিল।
কিন্তু যখন জানলাম ।মেয়ের অজান্তে এই বিয়ে হবে ঠিক তখনই আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে শুরু করে। এই বিয়ে ভাঙার একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলাম আমি।
কায়সারের চোখে এক মুহূর্তের জন্য কষ্ট ঝিলিক দিল।
ঠিক তখনই হাজির হন আপনার বউমা। হাতজোড় করে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন—চুপচাপ বিয়েটা করতে।
উনার ধারণা ছিল এই বিয়েটা যদি এখানে না হয়, অন্য কোথাও হলেও আপনি ঊর্মিলাকে বিয়ে দেবেন। আর যেভাবেই হোক, ওর ক্ষতি অবশ্যই করবেন।
আমি যে উনার কথা শুনে বিয়ে করেছি—এমনটা না। আসলে সেদিন এত কিছু ভাবতেই ইচ্ছে করেনি।
ভাগ্যিস… সেদিন ভাবিনি।
কায়সার এক নাগাড়ে বলে থামলেন। কথার ভারে যেন ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। আফতাব সাহেবের মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। কী করলেন তিনি? জীবনের প্রতিটা মোড়ে যে তিনি হেরেই চলেছেন।আজ আর তা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই।
এতক্ষণ ঊর্মি নিঃশব্দে সব শুনছিল। মনোযোগী শ্রোতার মতো বসে ছিল ঠিকই, কিন্তু আর পারল না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কারও দিকে না তাকিয়ে, কোনো শব্দ না করে হাঁটতে শুরু করল। পিছনে পড়ে রইল শুধু চাপা শ্বাস—যেন বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না কোথাও গিয়ে থেমে আছে।
ঊর্মিকে যেতে দেখে কায়সার আরও কিছু কথা শেষ করলেন। কিছু অমোঘ সত্য, কিছু অপ্রকাশিত হিসেব—যা ঊর্মির অজানাই থেকে গেল।
___________________________
আয়াশ আর নিঝুম চুল ধরে ঝুলে আছে। তারা স্বর্ণা আর ঊর্মিলার চুলোচুলি নকল করছে। কিন্তু কোনোভাবেই হদিস মিলছে না । কীভাবে করেছিল ওরা? এই ক্ষুদ্র চেষ্টা শুধু মিমিকে হাসানোর জন্য। অথচ মেয়েটা কেমন জানি মনমরা হয়ে আছে।
ওদের হাসি-ঝগড়ার মাঝেই আবার এসে পড়ল স্বর্ণা। এটুকুই যেন মিমিকে অস্থির করে তোলার জন্য যথেষ্ট। মিমি ক্রমাগত নড়াচড়া করতে লাগল। তবু চোখ খোলা রেখেই সে যেন কিছুই দেখছে না। চারপাশের শব্দ, হাসি, ব্যস্ততা—সবই তার কাছে অর্থহীন।
মিমির পাশে বসে কেউ যখন হাত বাড়াতে যাবে, ঊর্মি তখনি হাতটা ধরে ফেলল। আকস্মিক স্পর্শে স্বর্ণা খানিকটা হকচকে উঠল। কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ঊর্মি শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল তাকে।
নিঝুম আর আয়াশ থমকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কেন জানি তাদের মনে হলো—এখানে আরেকটা ম্যাচ বসতে যাচ্ছে। কৌতূহল দমাতে না পেরে তারা পিছু নিল। সঙ্গে মিমিকে কোলে নিতে ভুলল না।
ঊর্মি স্বর্ণাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি বদলে গেল। স্বর্ণার এক হাত পিছন দিকে, পিঠের কাছে উল্টো করে চেপে ধরল ঊর্মি। এতটুকু একটা মেয়ের শক্তির সামনে যে নিজেকে এত অসহায় লাগতে পারে—স্বর্ণার মুখেই তার প্রমাণ ফুটে উঠল। রাগ, অপমানের ছাপ স্পষ্ট।
ঊর্মি কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই চোখ চলে গেল বাইরে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল সেই তিন বানরের উপস্থিতি। বিরক্তিতে এক গভীর শ্বাস ফেলল সে।
অদ্ভুত ব্যাপার—এত বড় অপরা হয়ে যায় কেউ দেখে না। যখনই সে কিছু করতে চায়, তখনই কারও না কারও উপস্থিতি। যেন এই বাড়িটা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা থাকতে দিতে চায় না।
তার যন্ত্রণা, রাগ, জমে থাকা বিষ—সব কিছুর মাঝখানেই এদের ইতরামো।
চলবে,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৪
#ফারাজানা_প্রণয়_চৌধুরি

