বৈরি_হাওয়া #পর্ব_১৬

0
8

স্বর্ণার ঠোঁট কাঁপছে। চোখ ঘুরপাক খাচ্ছে, তবু মনের অশান্তি থামছে না।
ঘরের এক কোণা থেকে আরেক কোণ পায়চারি করছে সে। চারপাশ যেন ভয়ে ঢাকা।
মনে মনে বিরবির করে উঠল—

“কীভাবে এমনটা হতে পারে? আমি নিজ হাতে তো রেখেছিলাম। কীভাবে এত সহজে চলে যেতে পারে?”
পায়চারি করতে করতে হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। মুহূর্তেই সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজতে লাগল।
স্বর্ণার দৃষ্টি তাৎক্ষণিক ছোড়া আলোর দিকে আটকে গেল। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল কায়সার।
হৃদয় ধড়ফড় করে উঠল। শ্বাস যেন আটকে গেল। কণ্ঠ সামান্য তুতলে উঠল—

“ত-ত-তুমি এখানে…?”
স্বর্ণা জায়গা থেকে নড়ার শক্তি পেল না। তার চোখে ভেসে উঠল এক অজানা নীলাভ ছায়া।
এক মুহূর্তে মনে হলো, এই ঘরটা আর সাধারণ কোনো ঘর নয়—এ যেন অতীতের এক গোপন দরজা, যা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।
কায়সারের কালো চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে তার দিকে।

স্বর্ণা আবার বলল,
“তুমি শেষবার মিমিকে নিয়ে বেরিয়েছিলে… আজ হঠাৎ…?”

প্রতিউত্তরে কায়সার কিছু বলল না। ধীরে হাতটা এগিয়ে দিল তার দিকে। সেই হাতে ঝুলছে এক টুকরো কাগজ।
স্বর্ণা যেন জমে গেল। এই ভয়টাই তো এতক্ষণ ধরে তাকে তাড়া করছিল।
এখন তার ধ্বংস আর কেউ ঠেকাতে পারবে না—এই উপলব্ধিটা কাঁটার মতো বিঁধল বুকে।
তার ভাবনার মাঝেই ভেসে এল কায়সারের হিমশীতল কণ্ঠ—
“আমি কায়সার দেওয়ান। কথার খেলাপ করি না। শেষবার এই রুমের বদ্ধ ঘরেই তোর আর আমার কথা হয়েছে। বলেছিলাম, এর থেকে বের হচ্ছি। সেদিনই ঢুকব, যেদিন তোর অবাধ্যতা সীমা ছাড়াবে। আজ সেই দিন।”
কায়সার থামল। নির্লিপ্ত চোখে কিছুক্ষণ স্বর্ণাকে পর্যবেক্ষণ করল। একবার দরজার দিকে তাকিয়ে ধীরে বিছানার দিকে এগোল। সেখানে বসে এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে নিল। লাইটারের আগুনে সিগারেট ধরল। মুহূর্তেই ধোঁয়ায় ভরে গেল ঘর। দু’আঙুলের ফাঁকে সিগারেট চেপে এমনভাবে টানছে, যেন সে জন্মগত চেইন স্মোকার।
এ যেন তার এক অদৃশ্য রূপ—যেখানে স্বর্ণার অবাক হওয়ার কথা। অথচ অদ্ভুতভাবে তার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক, যেন এসব তার চেনা।

আবার ভেসে এল সেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠ—
“সেদিন বাচ্চাটা ছিল আমার দুধের শিশু। বিয়েটা যেভাবেই হোক করেছিলাম। তোর অতীতের সব অবাধ্যতা জেনেই এই বিয়ে। বাড়ির সবাই ভেবেছে, বাবার কথা রাখতে গিয়েই তোকে বিয়ে করেছি। আদতে তা না। আমি বাচ্চা ছিলাম না। বাবা-চাচারা জোর করবে, আর আমি রাজি হয়ে যাবো!

ছোটবেলা থেকেই তোর প্রতি আমার এক আলাদা দুর্বলতা ছিল। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়লেও তোর উপর নজর ছিল সবসময়। প্রথম প্রথম বুঝিয়েছি। কিন্তু ফলাফল শূন্য দেখে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ফিরে আসবি। ফিরেছিস ঠিকই—কিন্তু নষ্ট হয়ে।

ওই ফিরে আসার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল তোর। আমাদের সমাজে কত মেয়ে এক টুকরো সুখের জন্য কত অপেক্ষা, কত ত্যাগ করে। আর তুই কত সহজে নিজের সুখগুলোকে নিজ হাতে খুন করেছিস।
আচ্ছা, পরেরবার যখন তোকে সুযোগ দিলাম—তখন কি নিজেকে শুধরাতে পারতিস না? কেন এমন করলি, স্বর্ণা? এই যুগে নাকি ছেলেরা ভালোবাসতে জানে না—কত সহজে ছেলেদের দোষ দিস। কিন্তু সত্যিটা জানিস? ছেলেদের ভালোবাসা ভয়ংকরের চেয়েও ভয়ংকর।
এই ভালোবাসার দোহাই দিয়েই তোকে বিয়ে করতে দু’বার ভাবিনি। তোর সব কলঙ্ক মুছে একটা সুন্দর সংসার গড়তে চেয়েছিলাম। ফলাফল—শূন্য।
কথায় আছে, কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। আবারও আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেলি। তাও আবার দুধের একটা শিশু রেখে—যার বয়স ছিল মায়ের বুকের শাল দুধ খাওয়ার।
যে ছেলে তোকে মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিল, যার জন্য প্রথম বাচ্চাটাকে গলা টিপে মারলি—তার কাছেই গেলি আমার মেয়ে আর আমাকে ফেলে? এতটাই নির্লজ্জ তুই?

আমার মাঝে মাঝে গা জ্বলে ওঠে। কেন আমি এই বোকামিটা করেছিলাম। ওই একটাই ভুল—কীভাবে শুধরাবো, স্বর্ণা?

তোর জন্য আমি আর আমার মেয়েটা কোনোদিন সুখী হতে পারব না। মা ভাবে, মিমি আমার মেয়ে না। অদ্ভুতভাবে ঊর্মিরও একই ধারণা। মেয়েটা হতাশ, আমিও লজ্জিত।
দিনশেষে আমার মেয়ে যখন শেষ আশ্রয় হিসেবে ঊর্মিকে চাইছে, সেখানেও তুই কু-ডাকছিস। তোর শকুনির দৃষ্টি ওখানেও।
তবে শুনে রাখ—আমার সরল, স্নিগ্ধ রূপ দেখেছিস। এবার বিষ দেখবি।”
এই পর্যায়ে কণ্ঠটা আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। হাতের জ্বলন্ত সিগারেট মেঝেতে ফেলে উঠে দাঁড়াল সে। ধীর পায়ে স্বর্ণার সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা খানিকটা নিচু করে গম্ভীর স্বরে বলল—
“অন্ধকারের রানী, স্বর্ণা দেওয়ানের ধ্বংস এখন সম্মুখে। পারবি তো ঠেকাতে?”

_________________

বিশ্বাস কর, ঊর্মি সেকেন্ড হ্যান্ড পাবি—এই কথাটা এত সিরিয়াস ভাবে আমি বলিনি। মজার ছলেই বলা।

ভাবতেই পারিনি, কথাটা এভাবে লেগে যাবে, দোস্ত।
ভাবতেই অবাক লাগে—জীবনে কত মানুষের কত কিছুতে নজর দিলাম, কিছুই লাগল না। কত দোয়া করলাম, কাজে এল না। এ নিয়ে আমার কত আফসোস।
কিন্তু এবার , পুরো আফসোসটা যেন বিসর্জনের পথে। কত সুন্দর করে, মজার ছলে বলা কথাটা কাজে লেগে গেল!
বিশ্বাস কর, তোর জন্য কষ্ট লাগলেও—আমার ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয়েছে দেখে গর্বে বুকটা ফুলে উঠছে।

“আআআ… ছাড়, টেরেটু!”

সামিয়া কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই চুল টেনে ধরল জাকির। ভেসে এলো ওর প্রতিবাদী কণ্ঠ—
“তোর ভালো কথা কাজে না লাগলেও অলক্ষী কথা ঠিকই লেগেছে। শেষ কবে ভালো কিছু বলেছিলি? ধুপি কোথাকার!”

সামিয়ার চুল ছেড়ে ঊর্মির দিকে তাকাল জাকির। তার দৃষ্টি আপাতত আটকে আছে এক জোড়া কপতি এবং কোলের বাচ্চাদের দিকে।
ঊর্মি চোখ সরিয়ে নিল। পাছে যদি তার নজর লেগে যায়।
সবটাই দেখল জাকির। ধীরে মাথায় স্নেহের হাত বাড়াল। কোমল স্পর্শ পেয়ে তাকাল ঊর্মি।
ভরসার হাত, ভরসার চোখ—দুটোর দিকে তাকানোর সময় পাশে এসে বসল সামিয়া। ক্লান্তিতে মাথা এলিয়ে দিল সামিয়ার ঘাড়ে।

ভেসে এলো সামিয়ার উপদেশ—
“নো টেনশন। ডু ফুর্তি। ঐ দেওয়ান পুত্রকে আমরা গোনায় ধরি নাকি? আমরা তোকে আবার বিয়ে দেব।
ঐ চ্যাপ্টার ক্লোজ। এবার নো তাড়াহুড়ো। বাচ্চাগুলো আমার পেটে বুড়ো হয়ে যাক—তবুও তোর টুন্নু-মুন্নু না দেখে আমি আন্ডা-বাচ্চা আনব না।”

এত বিষণ্নতার মাঝেও ঊর্মির মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
এখান থেকেই কি শুরু হবে নতুন কোনো অধ্যায়?
নাকি হারিয়ে যাবে পুরনো মরুভূমিতে?
বৈরী হাওয়ায় কি টিকিয়ে রাখতে পারবে নিজেকে?

চলবে,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৬
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here