কায়সারের কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে স্বভাবসুলভ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
–আমাদের প্রত্যেকেরই দুইটি রূপ থাকে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত। প্রকাশিত রূপ প্রত্যাশার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অপ্রকাশিত রূপটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত জটিলতায় ঘেরা। তুমি যতই সেই রহস্য ভেদ করতে যাবে, ততই জটিলতায় নিজেকে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ফেলবে।
ইয়াছিন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে কায়সারের দিকে। তার তাকানোর অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে,এই রূপক কথার দুর্বোধ্য অর্থ সে বুঝে উঠতে পারেনি। সবকিছু তার মাথার দুই ইঞ্চি উপর দিয়ে চলে গেছে।
কায়সার মৃদু হাসল। প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে আভিজাত্যের সঙ্গে কিছুক্ষণ অফিসের ভেতরে অস্থির পায়চারি করল। মনে মনে যেন কোনো হিসেব কষছে। হঠাৎ থমকে গেল। হাঁটা থামিয়ে দিল। কপালের দৃঢ়, মসৃণ ভাঁজ শিথিল হলো। চোখে ফুটে উঠল এক দুর্বোধ্য হাসি।
ইয়াছিন বোকা দৃষ্টিতে কায়সারের কর্মকাণ্ড দেখতে ব্যস্ত ছিল। স্যারের হঠাৎ অস্থিরতা, আবার মুহূর্তেই আগের সেই দৃঢ়তা—সবকিছুই গভীরভাবে পরখ করল সে।
তার মনে পড়ে গেল ,রোদ আর বৃষ্টি একসঙ্গে হলে যেভাবে উচ্ছ্বাস জাগে। আকাশের হাসি আর বিষণ্নতাকে নাহয় ‘শেয়াল মামার বিয়ে’ বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অদ্ভুত মানুষটির ব্যাখ্যা কীভাবে দেবে?
ভেতরের কৌতূহল দমাতে না পেরে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল,
–কি হয়েছে, স্যার?
কায়সার একবার ইয়াছিনের দিকে তাকাল। রহস্যময় হাসি হেসে, দাম্ভিক ভঙ্গিতে রকিং চেয়ারে বসল।
ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসি এখনো অটুট। রহস্যে মোড়া ধীর কণ্ঠে বলল,
—ঊর্মিকে সাধারণভাবে নিও না। মানুষের প্রতি মানুষের নির্ভরতা আর আস্থা যখন উঠে যায়, তখন সেই মানুষটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আঘাত সহ্য করতে করতে তার সহনশীলতার সীমা ভেঙে গেছে। ঊর্মি আর সেই আগের নিষ্পাপ, সরল মেয়ে নেই। সে ধীরে ধীরে আশেপাশের সবার জন্যই আতঙ্কে পরিণত হবে।
কিছুক্ষণ থেমে উদাসীনভাবে আবার বলল—
সে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনায় দেওয়ান বাড়ির বউ। শুরুতে তার অভিপ্রায় ছিল শূন্য, কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে ধীরে ধীরে দেওয়ান বাড়ির অঘোষিত শত্রু হয়ে উঠছে। বাড়ির প্রবেশদ্বারে এসেছিল এক সাধারণ, ঠকে যাওয়া নারী হিসেবে। কিন্তু বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছে কঠোর হয়ে। সময়ই বলে দেবে, তার সেই অপ্রত্যাশিত রূপ সবাইকে কোথায় নিয়ে যায়।
ইয়াছিনকে সামান্য ভীত দেখাল। চোখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, কণ্ঠে জড়তা নিয়ে মায়াভরা স্বরে বলল—
–তাহলে কি স্যার, আপনাদের মিলন আর দেখতে পাব না?
কায়সার উত্তরে কী বলবে খুঁজে পেল না। রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে বেরিয়ে এল হতাশার নিঃশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–জানি না, কতটা পারব। তবে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে।
ইয়াছিন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
কায়সার একমনে বিড়বিড় করল—
সাধারণ থেকে রহস্যময়ী,
কেন হলে এমন বিধ্বংসী?
————–
টিউশনি সেরে মাত্রই এসেছে ঊর্মি। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে সে থমকে গেল। সামনে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য—মিমি, আয়াশ আর নিঝুম বসে আছে। গালে দুই হাত ঠেকিয়ে দরজার দিকে উৎকণ্ঠাভরে তাকিয়ে। তিনজনই একই ভঙ্গিতে বসে আছে, যেন জীবন্ত পুতুল।
ঊর্মিকে দেখতেই সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
আয়াশ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে গেয়ে উঠল,
ভাবি আমার পরিয়াছে নীল রঙের জামা,,,
হঠাৎ থেমে গেল। মাথা চুলকিয়ে ভাবতে লাগল, পরের লাইন কী বলে মিলাবে। চাচার এই অবস্থা দেখে দুই বাচ্চা মুখে হাত দিয়ে হেসে উঠল।
বিরক্ত দৃষ্টিতে সবটা পরখ করল ঊর্মি। এদের থেকে যত দূরে থাকতে চাইছে, ততই এরা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে মরিয়া। কেন যে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে, কে জানে!
ঐ আবর্জনাসম বাড়ি থেকে বেরিয়ে লাভটাই বা কী হলো?
মিমি বলে উঠল,
–মাম্মা তলো না ঘুলতে যাই।
তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিঝুম বলল,
—বউমা, চলো না। খুব মজা হবে।
ঊর্মি আগেই বুঝেছিল, এরা ভালো উদ্দেশ্যে আসেনি। খানিকটা উৎকণ্ঠা নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
–একদম না। আমার টিউশনি আছে। খুব ক্লান্ত আমি। তোমরা যাও।
এই উত্তর যে আসবেই, ওরা যেন আগেই জানত। তাই নিজেদের সাজানো পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে নেমে পড়ল। ফলস্বরূপ ঊর্মি দুই দিক থেকে ধরা পড়ে গেল। দু’জন দুই পা ধরে ঝুলে আছে তা।
ঊর্মি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এমনটা করবে—কল্পনাতেও আসেনি। যত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, ততই ওরা শক্ত করে ধরে। পাশ থেকে আয়াশ চোখের ইশারায় না ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছে।
ঊর্মি শক্ত দৃষ্টিতে তাকাল। তার অবস্থা এখন—ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।
কোনোমতে নিজেকে সামলে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
—হয়েছে, থামো। আমি যাব।
সবার মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। ঊর্মি কাউকে পাত্তা না দিয়ে রেডি হতে চলে গেল।
আয়াশ আর ঊর্মি পাশাপাশি হাঁটছে। বাচ্চা দুটো একে অপরের হাত ধরে হেলে দুলে এগোচ্ছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে ঊর্মির দিকে তাকাল আয়াশ।
–ভাবি, কেন এমন শত্রুতা? সব ভুলে ভালো থাকতে পারতে না?
কোনো উত্তর এল না।আয়াশ ছাড়ার পাত্র নয়। আগের মতোই বলল,
ঠকিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, সৎ মেয়ে নিয়ে সংসার করবে না । এই সকল অভিযোগ মেনে নিলাম। কিন্তু তুমি যে মেতে উঠেছ এক নিকৃষ্ট খেলায়! আমাদের অজানা অতীত খুঁড়ে খুঁড়ে বের করছ। যে সময় না ছিলাম আমরা, না ছিলে তুমি । তার জের ধরে আজ কেন আমাদের সঙ্গে করছো অবিচার?
এবার মুখ খুলল ঊর্মি। ঠান্ডা দৃষ্টিতে সরাসরি তাকাল। সে দৃষ্টিতে যে কেউ কেঁপে উঠবে।চাপা, হিসহিসে কণ্ঠে বলল—
–তখন হয়তো ছিলে না। কিন্তু যাদের পাপের সম্পদে তোমরা আজ বিলাসে ভাসছ, তাদের অন্যায়ের ভাগ নেবে না কেন?
আমার পিশাচিনী দাদী প্রায় একটা কথা বলে আগের পিছা যেমনে যায়, পরেরটাও তেমনই যায়।
রক্ত যে কথা বলে। সেই রক্তের কারণেই তোমরা আমার জন্য অভিশাপ। আর সেই অভিশাপ আমি যে কোনো উপায়ে মুছব।
আয়াশ আপনা-আপনি থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর আবার হাঁটা শুরু করল। ঠোঁটে মৃদু হাসি, কণ্ঠে তীব্র উপহাস—
—তাহলে তো ভাবি সাহেবা, সর্বপ্রথম নিজেকেই শাস্তি দিতে হয়।
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল ঊর্মি।আয়াশ আবার বলল,
–রক্তের দোষ তো তোমারও আছে। এই কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তোমারই রক্ত থেকে। যতই অস্বীকার করো, পারবে কি নিজেকে সেই রক্ত থেকে আলাদা করতে?
ঊর্মি খানিকটা কেঁপে উঠল, তবে প্রকাশ করল না। বিড়বিড় করে বলল—
প্রয়োজনে তাই করব। কিন্তু সব শেষ করে তারপর। হারানোর ভয় আমার নেই। হারানোর মতো কিছু নেই। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ—কারণ আমার কোনো পিছুটান নেই।
আমি এখন সব করতে পারব। এই বৈরি হাওয়ায় বয়ে যাওয়া প্রতিটি অধ্যায়ের হিসেব হবে। তাতে নিজের ধ্বংসই যদি শ্রেয় হয়, তাতেই রাজি।
চলবে…
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৯
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি
গল্প সম্পর্কে আলোচনা ও আড্ডা দিতে জয়েন হয়ে নিন এই গ্রুপে ⬇️
https://facebook.com/groups/777129281464382/

