এতদিন পর ঊর্মিকে দেওয়ান বাড়িতে দেখে সকলে খানিকটা অবাক হলো। কৌতূহলী চোখে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে রইল। সেদিকে সে বিশেষ পাত্তা দিল না। সে ভেবেছিল, এখানে এসে সবার নাকের জল চোখের জল এক হয়ে যেতে দেখবে। কিন্তু এ কী! পরিস্থিতি এত স্বাভাবিক কেন?
স্বর্ণাকে যেদিন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। কোর্টে চালান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জামিন হয়নি। শুক্রবার ও শনিবার কোর্ট বন্ধ । রবিবারের আগে কোনো সুযোগ নেই। কায়সার ইচ্ছে করেই বিষয়টা এমনভাবে সামলেছে। যেন একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল।
আজ শুক্রবার। সেই হিসেবেই ঊর্মির এখানে আসা । এদের দুঃখ দেখে নিজের অশান্ত মনটাকে শান্ত করার এক গোপন তাড়না থেকে। কিন্তু এরা অদ্ভুত। আচরণে শোকের ছায়া নেই।
মিমি আর নিঝুম তাকে দেখে উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। মিমি আদো আদো বুলিতে জমে থাকা গল্প উজাড় করে দিতে লাগল। ঊর্মি শুনছে এমন ভান করলেও তার চোখ অন্য কাউকে খুঁজছিল।
হাসি আয়াশকে কায়সারের ঘরের দিকে ইশারা করল। দুষ্টু হাসি দিল ঊর্মির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আয়াশ চুপ। ভাবির ইঙ্গিত সে বুঝেছে, তবু নিশ্চুপ। সে জানে ঊর্মি আর তার ভাইয়ের সম্পর্ক জোড়া লাগার নয় । সে এখানে আসে কোনো এক অদৃশ্য উদ্দেশ্যে।
কেন এমন হলো? ভাইটা কেন সংসার পেল না? দীর্ঘশ্বাস চাপতে পারল না আয়াশ।
হঠাৎ ঊর্মির চোখে ঝিলিক। ঐ তো—তার আসার আসল কারণ।
পিছনে হাত জড়িয়ে, মাথা নিচু করে হেঁটে আসছে হুমায়ূন দেওয়ান। বাইরে থেকে ভদ্রলোক। কিন্তু ভেতরে? ঊর্মির ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল।
চোখাচোখি হতেই হুমায়ূন দেওয়ান থমকে গেলেন। বিয়ের পর থেকেই মেয়েটার চোখে কারও ছায়া খুঁজে পেতেন, কিন্তু ধরতে পারতেন না। এখন পারেন। সেই দৃষ্টি যেন ভেতরের গোপন সত্য পড়ে নিচ্ছে।
তিনি মাথা নিচু করে ঘরের দিকে হাঁটলেন। তবু অনুভব করলেন দৃষ্টি পিঠে গেঁথে আছে। হাঁসফাঁস লাগল। একবার পেছনে তাকালেন।
ঊর্মি স্থির, ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে। তিনি কেঁপে উঠলেন।
ঊর্মির হাসতে ইচ্ছে করল। দমিয়ে রাখল।
কিছু না করেও যখন প্রতিপক্ষের চোখে ভয় দেখা যায়—সেই তৃপ্তিই আলাদা।
“তুমি আমার ধারণার চেয়েও বেশি চালাক, ঊর্মি।”
ঊর্মি মোবাইলেই চোখ রাখল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
কায়সার আবার বলল,
“মা তোমাকে সব খুলে বলেছে। অথচ কী সুন্দরভাবে আড়াল করলে! যেন কিছুই জানো না।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“তুমি কি আমাকে ডিভোর্স দেবে?”
ঊর্মি তাকাল। স্বর নিরেট।
“সময় বলে দেবে।”
উত্তরটা কায়সারের ভালো লাগল না। রাগ চেপে বলল,
“নিজেকে খুব শেয়ানা ভাবো? একের পর এক বিপদ ডেকে আনছ। না নিজে শান্তিতে আছ, না আমাকে থাকতে দিচ্ছ।”
হঠাৎ তার চোখ বদলে গেল। এগিয়ে এসে ঊর্মির হাত থেকে ফোন ছুড়ে ফেলল। কবজি চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“বটতলায় একজনের সঙ্গে দেখা হলো, আর তাতেই গোয়েন্দাগিরি শুরু? জানো আরিয়ান কতটা বিপজ্জনক? ওকে ধরতে আমার বছর লেগে গেছে। আমার লোক সময়মতো না পৌঁছালে কী হতো, ভেবেছ?”
ঊর্মির মনে পড়ল সেই দিনের কথা।
বটতলায় আরিয়ানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই সন্দেহ জন্মেছিল। তার ওপর কায়সারের অদ্ভুত আচরণ। স্বর্ণার খোঁজে নামার পর সে বুঝেছিল—কায়সার সাহায্য করছে, আবার সূক্ষ্মভাবে আড়ালও করছে কিছু।
সূত্র জোড়া লাগিয়ে সে পৌঁছেছিল শহরের নির্জন প্রান্তের এক বাড়িতে। বাইরে সাধারণ, ভেতরে অজানা।
সেখানেই সে দেখেছিল । স্বর্ণা বেরিয়ে আসছে আতঙ্কিত মুখে।
ঊর্মি ঢুকে পড়েছিল ভেতরে। আর ঢুকেই বুঝেছিল—ভুল করেছে।
নিস্তব্ধ বাড়ি। সামনে আরিয়ান।
চোখাচোখি হতেই ধরা পড়ে যায়। শক্তিতে সে পারবে না জানত। তবু ভরসা ছিল, কায়সারের লোকেরা নজরে রাখে তাকে।
ঠিক তাই। আরিয়ান এগোনোর আগেই বাইরে নড়াচড়া। মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। লোকেরা এসে তাকে বের করে আনে।
তবু আরিয়ানের চোখের সেই ঠান্ডা, হিসেবি দৃষ্টি ভুলতে পারে না সে।
সবচেয়ে বড় আফসোস প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি। সন্দেহ আছে, প্রমাণ নেই। আর সন্দেহ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।
কায়সারের কণ্ঠে বর্তমান ফিরে এল।
“মানুষ ভুল করে, ঊর্মি। আমি ভালোবেসে ভুল করেছি। একবারও ক্ষমা করা যায় না?”
কণ্ঠে অদ্ভুত শীতলতা। আগের তীক্ষ্ণ সুর নেই।
ঊর্মি তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাই একটু আগে রাগে ফুঁসছিল, এখন অনুতপ্ত।
ঊর্মির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি।
“যেখানে লুকোচুরি, নিয়ন্ত্রণ আর ভয় মিশে থাকে… সেটা কি ভালোবাসা?”
ঘর ভারী হয়ে উঠল।
কায়সার ফিসফিস করল,
“একটা সুযোগ দাও। সব ঠিক করে দেব।”
ঊর্মির চোখ শান্ত, ক্লান্ত।
“সব ঠিক হয় না, দেওয়ান পুত্র। কিছু ভাঙন শব্দ করে না ভেতরটা ফাঁপা করে দেয়।”
চলবে,,,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২২
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

