বৈরি_হাওয়া #পর্ব_২৪

0
9

–উফ চাচি, ওটা মৃত্যু নয়, ওটা হলো খুন। কনিকা খুন হয়েছে, এবং খুব নিকৃষ্টভাবে।

নিজের কথা শেষ করার আগেই ঊর্মির ধারালো কণ্ঠে হকচকালেন রেহেনা দেওয়ান। এই মেয়ে আসলেই সাধারণ না। বর্তমান সময়ে মেয়েদের এমন শানিত বুদ্ধি খুব কমই থাকে। মেয়েটাকে কোনোভাবেই সাত-পাঁচ বুঝানো যাবে না। সব জেনেই তবে মাঠে নেমেছে।

তাহলে কি এখান থেকেই শুরু?

কিছুটা ভীত দেখালেন তাকে। ঊর্মি দেখেও নির্বিকার। ইদানীং যেন সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। মানুষ কি হঠাৎ করে এতটা পরিবর্তন হয়ে যায়? এটাও কি সম্ভব? তাহলে কি সেই প্রবাদটাই ঠিক—কষ্ট সহ্য করতে করতে একসময় মানুষ পাথর হয়ে যায়?
কই, এখন তো আর আগের মতো কান্না আসে না। অভিমান হয় না। বিভিন্ন ফ্যান্টাসিতে বাঁচতে ইচ্ছে করে না। আগে তো ভালোই ছিল। এত চিন্তা ছিল না। বাবার মিথ্যা শাসনে ভালোবাসা খুঁজত। দাদীর তিরস্কার, সৎ মায়ের অভিনয় বুঝতে পেয়েও স্বাভাবিক থাকত।
কই, তখন তো খুব কান্না পেত। প্রতিদিনই তো কান্না করত।
তাহলে এখন কেন কান্না আসে না? কত সহজে, অবলীলায় বলে ফেলেছে এতদিনের ধামাচাপা দেওয়া সত্যটা—যে সত্য শুনেই বুক কেঁপে উঠেছিল।

এখনো একদৃষ্টিতে রেহেনা দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে অদ্ভুত শূন্যতা—জীবন্ত অথচ নিঃশব্দ। দৃষ্টি সামনে থাকলেও ধ্যান অন্য কোথাও। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে চাচি শাশুড়ির দিকে নজর দিল। কণ্ঠে স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই বলল,

–জানেন চাচি, আমি যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসলাম, খুব রাগ হয়েছিল । কেন এলাম এখানে? এ বাড়িতেই কেন বিয়ে হলো? এখানে যতদিন ছিলাম, দমবন্ধ হয়ে আসত। যখন মনে হতো, আমাকে ঠকিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামীর আগে বিয়ে হয়েছিল, তার একটা বাচ্চা আছে। গা ঘিনঘিন করত, যখন ওই লোকটার পাশে একই বিছানায় ঘুমাতে হতো। শুধু নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতাম । মনে হতো, এই জীবনটা আমার প্রাপ্য ছিল না।

তবে আমার ডেস্টিনি যে আমাকে এখানে এনে জুড়ে দিয়েছে । বিধাতার পরিকল্পনাই যে অন্য ছিল। কারণ আপনাদের সাথে তো আমি জুড়ে ছিলাম মায়ের পেটেই থাকতেই। খোদা চেয়েছে, আমি আবার আপনাদের মুখোমুখি হই। কনিকার খুনের জন্য দায়ী প্রত্যেককে খুঁজে খুঁজে বের করি । একজনকেও ছাড়ব না।
খোদার কলমে তাদের শাস্তি কী, জানি না। তবে তারা বেঁচে থাকতেই তাদের জীবন আমি নরক যন্ত্রণায় ভরিয়ে তুলব । ধীরে ধীরে, প্রতিটা শ্বাসে।

রেহেনা দেওয়ান এক পা পিছিয়ে গেলেন। চোখে ভয়। স্পষ্ট, কাঁচা ভয়। পাগলের মতো চারদিকে তাকাচ্ছেন।

হঠাৎ পড়ে যেতে নিলেন। তখনই ধরে ফেলল ঊর্মি। হালকা করে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,

মনে পড়ে সেই অসহায় মেয়েটির কথা? ওই অভাগি‌, যার একটাই দোষ, সে মেয়ে ছিল। গরিব ঘরের মেয়ে। এক শকুনের কুদৃষ্টিতে নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, সম্মান সব বিলিয়ে দিয়েছিল। চোখে ছিল কত আশা, কত ভরসা। সেই শকুনকে নিয়েই দেখেছিল একটা সুখের সংসার ।একটা নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু তার ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল । নিষ্ঠুর, অমানবিক‌ কাহিনী।
সে প্রতারিত হলো। ভীষণভাবে ঠকাল। গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে । আঘাতটা ছিল অসহনীয়। তার শেষ ভরসা ছিল পেটের সন্তানটা ।শেষ আশ্রয়, শেষ স্বপ্ন।

রেহেনা দেওয়ান কল্পনার জগতে চলে গেলেন। সেখানে স্পষ্ট হয়ে ভাসছে শান্ত, নির্মল একটা চেহারা। কী স্নিগ্ধ ছিল মেয়েটা। গর্ভবতী অবস্থায় এসেছিল তাদের বাড়িতে, কাজের খোঁজে। তার বাবার বাড়ি নেত্রকোনা। তার বাবা এবং শ্বশুর ছিল বন্ধু, যার ফলেই সে এই বাড়ির বউ ।

স্বর্ণা ছোটো থাকা অবস্থায় বাবার বাড়িতে একবার যাওয়া হয়। অনেক দিন থাকার জন্যই যাওয়া। ঠিক সেই সময়ে তাদের বাড়িতে কনিকার আগমন। সামান্য গোল, উঁচু পেটের অধিকারিণী সেই স্নিগ্ধ মেয়েটিকে তার খুব মনে ধরেছিল। মেয়েটার অসহায়ত্ব দেখে মায়া হয়। তাই তাকে কাজ করার সুযোগ দেয়। প্রথমে গর্ভবতী দেখে কাজে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল না, তবে কনিকার আকুতি-মিনতিতে রাখতে বাধ্য হয়।
তবে ভালোই হয়েছিল। তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একে অপরের সুখ-দুঃখের গল্প বলেই সময় কাটত। অদ্ভুতভাবে দুজনই ছিল দুঃখী। কনিকা সংসার না পেয়ে দুঃখী, আর সে সংসার পেয়েও দুঃখী। হুমায়ূন দেওয়ানের সাথে বিয়ে হলেও সে কখনো পরিপূর্ণ সুখ পায়নি। তার মাঝে ছিল বাজে নেশা। বাবার এবং ভাইয়ের আশকারায় ছিল বেপরোয়া। তবুও সে ছিল সংসার রক্ষায় ভীত‌। নিজের জীবন দিয়ে হলেও সংসার বাঁচাবে, এই এক জেদে বেঁচে ছিল।
কনিকার সাথে খুব ভালোই সময় কাটছিল। হঠাৎ একদিন হুমায়ূন দেওয়ান তাদের নিতে আসে। তখনই কনিকাকে তার চোখে পড়ে। নারীর প্রতি লালসা তার ছিল না, তবে সেবার যেন অন্য এক মোহে পড়েছিল। যে মানুষ শ্বশুরবাড়িতে একদিন থাকতে চায় না, সে প্রায় এক সপ্তাহ ছিল।
তখনই রেহেনার কাছে বিষয়টা গোলমেলে লাগে। তার চোখে পড়ে হুমায়ূন দেওয়ানের কনিকার প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টি ।যে দৃষ্টি আগে কখনো দেখেনি। সে ভয় পেয়ে যায়। সেই দিন থেকেই কনিকাকে তার অসহ্য লাগতে শুরু করে। শ্বশুরবাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু করে।
যাওয়ার আগের রাতে, গভীর রাতে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হুমায়ূন বাড়িতে ফেরে। কনিকা থাকত ছোট্ট একটা ঝুপড়ি ঘরে। সেদিন সবার অজান্তে সে সেই ঘরে ঢুকে পড়ে। তার চোখে মুগ্ধতা থাকলেও সে নিজের ভেতরে ছিল না।
ধস্তাধস্তি শুরু হয়। নিজের ইজ্জত আর বাচ্চাটিকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে কনিকা। বাচ্চার কথা চিন্তা করে ঐ ক্লান্ত দেহে যেন দানবিক শক্তি পেয়েছিল। তবে শেষ রক্ষা হয় নি! হঠাৎ একসময় পা পিছলে পড়ে যায়। পিঠ নয় ,তার পেটের উঁচু অংশটাই সজোরে আঘাত পায় মাটিতে।

একটা বিভৎস চিৎকারে রাতটি কেঁপে ওঠে।

দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায় রেহেনা। সামনে দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
সেই মুহূর্তে তার মনে ন্যায়-অন্যায়ের কথা আসেনি। একমাত্র চিন্তা ছিল—স্বামীকে বাঁচানো।
তড়িঘড়ি করে, কেউ আসার আগেই, হুমায়ূনকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলে। আধমরা কনিকাকে ফেলে রেখে স্বামীকে টেনে নিয়ে যায়।

অদ্ভুতভাবে সেদিন কনিকার চোখও ছিল শান্ত। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও চোখে জল ছিল না। শেষবারের মতো শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তাদের চলে যাওয়ার দিকে।একটা নিঃশব্দ অভিযোগ নিয়ে। হয়তো মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দারিয়েও মানুষদের প্রতি শেষ ঘৃনা ছিল সেই চোখে।

বাড়িতে কেউ টের পায়নি। রেহেনার বাবা ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমান। এবং মা ধীরে চলাচল করে। দারোয়ানও ছিল না সেদিন। তাই সবাই আসতে আসতে তার কাজ খুব সহজেই হয়ে যায়।

পরে যখন আবার ফিরে আসে, তখন সামান্য কষ্ট হয়েছিল তার। এতটুকু মেয়ে,কী নির্মম পরিণতি! কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার পথ ছিল না।

শেষবার কনিকা নিজের পেটের দিকে তাকাচ্ছিল। হাতভর্তি রক্ত। চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত । যেন সব মেনে নিয়েছে। কিংবা নিজের সন্তানের জন্যই শেষবার আফসোস হচ্ছিল।অবশেষে জ্ঞান হারায় সে। জ্ঞান হাড়ানোর মুহূর্তে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরে।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সবাই ভেবেছিল বাচ্চাটা মারা গেছে। কিন্তু সিজারের পর বাচ্চাটি কাকতালীয়ভাবে বেঁচে যায়। তবে কনিকা আর ফিরে আসে না । না ফেরার দেশে চলে যায়।

নিজের সন্তানের মুখটাও দেখতে পারেনি সে। যেই বাচ্চাটিকে বাঁচাতে এত লড়াই তার খবরটাই জানতে পারলো না অভাগী। আচ্ছা শেষবারের মতো একবার কি বাচ্চাটিকে দেখে প্রাপ্তির হাঁসিটাও তার কপালে লেখা ছিল না?

সে জানলোও না তার মেয়েটা কত বড় হয়েছে। তার মেয়েটি এখন তার মায়ের সরলতাকে ঘৃণা করে ।মেয়েদের যে এত সরল হলে চলে না।

সেদিনের খুনটাকে খুব সুন্দরভাবে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কিছু জানলও না। কেউ জানতে চাইলও না।

সবাই যখন লাশ নিয়ে বাড়ি আসে, তখন হুমায়ূন ঘুম থেকে ওঠে। শিশুর কান্নায় ভারী হয়ে আছে চারদিক। বাইরে এসে কনিকার নিথর দেহ দেখে তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়।এক এক করে সব মনে পড়তে থাকে।নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে তিনি

। কিন্তু এখন ঘৃনা করে কি লাভ? পারবে কি মেয়েটার জীবন ফিরিয়ে দিতে ? এ কেমন অপরাধবোধের ঝন্ত্রনা।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বুঝলেন নিজের বিপদমুক্ত থাকার কারন।

হায়রে নারী! এজন্যই বলে, এক নারী আরেক নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু।

সেদিনের ঘটনা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবুও নিজের অপরাধ স্বীকার করার সাহস হয় নি। মেয়েটাকে দত্তক নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, রেহেনা তা হতে দেয়নি। সে যেন সবকিছু মুছে ফেলতে চেয়েছিল।যেন কিছুই ঘটেনি।

হঠাৎ হালকা ঝাঁকুনিতে ধ্যান ভাঙল রেহেনা দেওয়ানের। ঊর্মির শান্ত চোখদুটো দেখে দুপা পিছিয়ে গেলেন তিনি।এই তো সেই চোখ…এ কি দেখছেন তিনি! হঠাৎ চারপাশ ঘুরতে লাগল,,

চলবে,,

#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২৪
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

( আসসালামুয়ালাইকুম। প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এভাবে এপ্রিসিয়েট করার জন্য। আপনারা যে আমার গল্পটি নিয়ে এত গভীর চিন্তা ভাবনা করেন ।এই ব্যাপারটায় আমি খুব খুশি। তবে দুঃখও লাগছে গল্পটির যাত্রা আর কয়েকটি পর্বে শেষ হবে।গল্পটি ছিল এক স্ট্রং চরিত্রের নারীকে নিয়ে। এবং মেয়েদের বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত সমস্যাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটা পেরেছি। তবে চেষ্টা ছিল। যদি আমার লেখায় কোনো ভুল হয়ে থাকে। তাহলে আমি মন থেকে দুঃখিত। বিভিন্ন জটিলতার কারনে আমি অনিয়মিত ছিলাম।এবার থেকে আমি নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো। সাথে আরো একটি দুষ্টু মিষ্টি গল্প নিয়ে আসছি। যদি আপনাদের সমর্থন পাই তাহলে অবশ্যই পরবর্তী গল্প নিয়ে আপনাদের সাথে থাকব। সর্বশেষে আবারো জানাই ধন্যবাদ 🌸)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here