#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১১(নানামি)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ভিলার রাতগুলো যতটা শীতল, তার চেয়েও বেশি নিঝুম। নোবারা আকারি তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পনেরো বছর পর সে আবার সেই জেনিনের সামনে দাঁড়িয়েছে, যে জেনিন একসময় তার জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়তে পারত। কিন্তু আজকের এই জেনিন নূরশাদ বড় অচেনা। তার চোখে এখন কেবল অধিকারবোধের আগুন, তার ঠোঁটে কেবল আদেশের সুর।
নোবারা হাত দিয়ে তার ভেজা চুলগুলো মুছল। সে কেন রুক্ষ আচরণ করে? কারণ সে জেনিনের এই দানবীয় রূপটা সহ্য করতে পারে না। সে চায় জেনিন তার সেই পুরনো বন্ধুর মতো হাসুক, তার সেই ‘ইগো’র দেয়ালটা ভেঙে ফেলুক। নোবারার চোখে জল চলে এল। সে বিড়বিড় করে বলল, “কেন নিজেকে এমন পাথরের মতো বানিয়ে ফেলেছেন জেনিন ভাইয়া? কেন আমায় এভাবে বন্দী করে রাখতে চান?”
হঠাৎ দরজায় করাঘাত ছাড়াই কেউ ভেতরে ঢুকল। নোবারা দ্রুত চোখের জল মুছে পেছন ফিরল। জেনিন দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে কালো সিল্কের পায়জামা আর পাঞ্জাবি। তার হাতে একটি ছোট পুরনো কাঠের বাক্স। জেনিনের চোখের সেই রুক্ষতা এখন কিছুটা স্তিমিত, সেখানে এক ধরণের উদাসীনতা খেলা করছে।
“এত রাতে ঘুমাননি কেন?” জেনিন ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর আজ আগের মতো কর্কশ নয়।
“আপনার ভিলার সিকিউরিটি গার্ডদের বুটের শব্দে ঘুম আসে না স্যার,” নোবারা নিচু স্বরে বলল।
জেনিন নোবারার খুব কাছে এসে থামল। সে নোবারার এই শান্ত রূপটা আগে দেখেনি। সারাদিন যে মেয়েটি বাঘিনীর মতো তার সাথে তর্কে লড়ে, এখন তাকে মনে হচ্ছে এক ঝরে পড়া শিউলি ফুল। জেনিনের বুকের ভেতরে কোথাও যেন একটা মোচড় দিল। সে তার হাতের বাক্সটা টিপয়-এর ওপর রাখল।
“এটা আপনার জন্য।”
নোবারা অবাক হয়ে বাক্সটি খুলল। ভেতরে একটি রুপোর নূপুর। নকশাটা খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে লেগে আছে পুরনো দিনের ঘ্রাণ। নোবারার মনে পড়ে গেল, ক্লাস টেনে পড়ার সময় সে একবার জেনিনকে বলেছিল তার নূপুর পরতে খুব ভালো লাগে। জেনিন কি তবে আজও সেই কথা মনে রেখেছে?
“কেন দিচ্ছেন?” নোবারার কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল।
জেনিন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “এটি কোনো গিফট নয়। এটি আপনার শৃঙ্খল। আমি চাই আপনি যখন এই বাড়িতে হাঁটবেন, তখন এই নূপুরের শব্দ আমাকে জানিয়ে দেবে আপনি আমার আশেপাশেই আছেন। আপনার প্রতিটি পদচিহ্ন যেন আমার কানে বাজে।”
জেনিন রুড হওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু নোবারা বুঝতে পারল এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর একাকিত্ব। নোবারা নূপুরটি হাতে নিয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। সে দেখল জেনিনের চোখের কোণে এক বিন্দু ক্লান্তি। নোবারা এবার আর তর্কে গেল না। সে খুব ধীর পায়ে জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“আপনি কি প্রতিদিন এভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন স্যার? এই রুক্ষতা, এই শাসন, এগুলো কি আপনার একাকীত্বের ঢাল?” নোবারার কণ্ঠে আজ কেবল মায়া।
জেনিন চমকে উঠল। সে নোবারার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সে ফিরতে চাইল, কিন্তু নোবারা তার হাতটা আলতো করে ধরল। জেনিনের সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশি এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে গেল।
“হাত ছাড়ুন মিস আকারি। আমি আপনার সাথে মায়া দেখাতে আসিনি।” জেনিন নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল।
“কেন? মায়া দেখাতে কি খুব ভয় পান? নাকি ভাবেন মায়া দেখালে আপনার এই নূরশাদ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বে?” নোবারা জেনিনের হাতটা আরো শক্ত করে ধরে নিল। “জেনিন ভাইয়া, আমি আপনার বন্ধু, কিশোরী নোবারা। আমি আপনার পিএ নই, আমি আপনার স্কুলের বন্ধু। আমরা তো একসাথে কত সময় কাটিয়েছিলাম, আপনার আমাকে মনে পড়ে না? আপনি কি একবারও আমায় মন থেকে ডাকবেন না?”
জেনিনের পাথুরে হৃদয়টা যেন এক মুহূর্তের জন্য গলে জল হয়ে গেল। সে নোবারার দিকে তাকালো। চাঁদের আলোয় নোবারার মুখটা এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরে আছে। জেনিন তার অন্য হাত দিয়ে নোবারার মুখটা ধরল। তার দীর্ঘ আঙুলগুলো নোবারার চিবুক স্পর্শ করল।
“আমি তোমাকে ডাকতে পারি না নোবারা। আমি এখন এমন এক অন্ধকারে বাস করি, যেখানে আলো ঢুকলে আমি অন্ধ হয়ে যাব। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, সেটাই আমার জন্য সহজ। তোমার মায়া আমাকে দুর্বল করে দেয়। আর জেনিন নূরশাদ দুর্বল হতে জানে না।”
জেনিন নোবারাকে নিজের দিকে আরও জোরে টেনে নিল। তার পসেসিভনেস আবার ফিরে এল। “আপনি এই নূপুরটি পরবেন মিস আকারি। কাল সকালে আমি যেন এর শব্দ শুনতে পাই।”
জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে। নোবারা নূপুরটি বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ল। সে হাসল, তবে এই হাসিটা ছিল কান্নামাখা। সে বুঝতে পেরেছে, জেনিন তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে, কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গিটা বিষাক্ত। জেনিন তাকে হারাতে চায় না বলেই তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে চায়।
পরের দিন সকাল। জেনিন তার ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। হঠাৎ সে একটা ছন্দময় শব্দ শুনতে পেল—’রুনঝুন রুনঝুন’। জেনিনের হাতটা থমকে গেল। সে দেখল নোবারা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তার পায়ে সেই রুপোর নূপুর। নোবারার হাঁটাচলার সাথে সাথে পুরো হলরুমে এক মায়াবী সুর ছড়িয়ে পড়ছে।
নোবারা জেনিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। “আপনার ব্রেকফাস্ট রেডি স্যার। আজ আপনার গ্রিন টি-র বদলে আমি নিজের হাতে কফি বানিয়েছি। চিনি ছাড়া, যেমনটা আপনি পছন্দ করেন।”
জেনিন নোবারার পায়ের দিকে তাকালো। নূপুরটি তার উজ্জ্বল পায়ে মানিয়েছে দারুণ। জেনিন আজ আর চিৎকার করল না। সে শান্তভাবে কফির কাপটা হাতে নিল। এক চুমুক দিয়েই সে বুঝল, এই স্বাদটা পনেরো বছর আগের সেই বিকেলের কফির মতো।
“কফিটা ভালো হয়েছে,” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল।
নোবারা হাসল। “আপনি চাইলে আমি রোজ আপনাকে কফি বানিয়ে দেব। তবে শর্ত একটা, আজ অফিসে গিয়ে আপনি কারোর ওপর চিৎকার করবেন না। আপনার কর্মীরা আপনাকে ভয় পায়, আমি চাই তারা আপনাকে শ্রদ্ধা করুক।”
জেনিন ভ্রু কুঁচকাল। “আপনি কি আমাকে শাসন করছেন?”
“না, আমি আমার বসের খেয়াল রাখছি,” নোবারা জেনিনের টাইটা একটু ঠিক করে দিয়ে বলল।
“আপনার টাইটা বাঁকা ছিল। একজন পারফেক্ট সিইও-র টাই এমন অগোছালো মানায় না।”
জেনিন নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নোবারার এই রূপটা তাকে দিশেহারা করে দিচ্ছে। সে ডমিনেট হতে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু নোবারার এই মমতাময় ডমিনেশন সে কেন যেন কাটাতে পারছে না। অফিসে যাওয়ার পথে গাড়িতেও জেনিন চুপচাপ ছিল। সে বারবার নোবারার পায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। নূপুরের সেই সূক্ষ্ম শব্দটা জেনিনের মাথার ভেতরে একটা গান হয়ে বাজছে।
অফিসে পৌঁছে জেনিন অবাক হয়ে দেখল, নোবারা সবার সাথে খুব সুন্দর করে কথা বলছে। জেনিনের যে এইচআর ম্যানেজার জেনিনকে দেখে কাঁপত, নোবারা তাকে ডেকে এক কাপ চা খাইয়ে দিল। জেনিনের ইগোতে একটু লাগলো ঠিকই, কিন্তু সে কিছু বলল না।
<><><><><><><><><>
শহরটা পনেরো বছরে অনেক বদলে গেছে। আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, ফ্লাইওভার আর নিয়ন আলোর ঝলসানি এখন ঢাকাকে এক অচেনা রূপ দিয়েছে। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে গলিঘুঁজিগুলো এখনো সেই পুরনো অন্ধকারের গন্ধ বয়ে বেড়ায়। বৃষ্টির পর ভেজা পিচঢালা রাস্তায় যখন ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো পড়ে, তখন শহরটাকে মনে হয় এক রক্তাক্ত ক্যানভাস। আর এই ক্যানভাসের ওপর দিয়ে ধীরলয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে যে মানুষটি হেঁটে যাচ্ছে, তার নাম নানামি জায়দান।
নানামি এখন আর সেই শান্ত, আবেগপ্রবণ কিশোরটি নেই। তার কাঁধে এখন পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সে এখন ডিবি (DB) পুলিশের তুখোড় ইন্সপেক্টর। তার চেহারায় এক ধরণের ধারালো কঠোরতা এসেছে। চোখের দৃষ্টিতে সবসময় এক ধরণের তীক্ষ্ণতা থাকে, যা অপরাধীদের মেরুদণ্ডে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পরনে তার সাধারণ ধূসর শার্ট, হাতা গুটানো। কোমরের হোলস্টারে থাকা সার্ভিস রিভলভারটি তার ক্ষমতার প্রতীক নয়, বরং তার একাকীত্বের সঙ্গী।
নানামি রাস্তার ধারের একটা টং দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। রাত এখন দেড়টা। শহরটা ঘুমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নানামির চোখে ঘুম নেই। সে এক কাপ কড়া লিকারের চায়ের অর্ডার দিল। চায়ের ধোঁয়া যখন তার নাকের ডগা দিয়ে উঠে যাচ্ছে, নানামির মনে পড়ল পনেরো বছর আগের সেই ট্রেন স্টেশনের কথা।
“কোথায় আছিস তুই, নুরশাদ?” নানামি বিড়বিড় করে বলল।
পনেরো বছর হয়ে গেল। জেনিন নূরশাদ সেই যে শহর ছাড়ল, তারপর তার আর কোনো হদিস মেলেনি। নানামি অনেক চেষ্টা করেছে তাকে খুঁজে বের করতে, কিন্তু জেনিন যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তার সাথে যোগাযোগ হারিয়েছে নোবারাও। নানামির জীবনে আজ সব আছে, ক্ষমতা, সম্মান, ক্যারিয়ার, কিন্তু তার সেই প্রাণের বন্ধু আর তার প্রথম ভালোবাসা, কেউ পাশে নেই। এই বিশাল শহরে নানামি আজ বড্ড একা।
তার বর্তমান মিশনের নাম, ‘মিশন শ্যাডো’। লক্ষ্য একটাই: আন্ডারওয়ার্ল্ডের রহস্যময় ডন জেড কে গ্রেফতার করা। এই নামটি এখন পুলিশের ফাইলে এক আতঙ্কের নাম। সে কোনো চিহ্ন রেখে যায় না, সে কোনো সরাসরি লড়াইয়ে আসে না। সে শুধু ছায়ার আড়াল থেকে পুরো শহরটাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
নানামিকে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলে, সে নাকি বড্ড বেশি জেদি। সে একবার কোনো কেস ধরলে সেটা শেষ না করে দম নেয় না। কিন্তু কেউ জানে না, এই জেদটা আসলে তার ভেতরের অপরাধবোধ থেকে আসা। সে মনে করে জেনিনের সেই উগ্র হয়ে যাওয়ার পেছনে তারও দায় ছিল। সে যদি সেদিন জেনিনকে আরও শক্ত করে ধরে রাখত, তবে হয়তো আজ জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।
হঠাৎ নানামির ওয়্যারলেস সেটটা ঝনঝন করে উঠল।
“ইন্সপেক্টর নানামি, রিপোর্ট করুন। তেজগাঁও এলাকায় একটা সন্দেহজনক ট্রাক দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি জেড এর কোনো অবৈধ শিপমেন্ট।”
নানামির চোখদুটো মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে উঠল। সে তার জিপ গাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। ইঞ্জিনের গর্জনে নিস্তব্ধ রাতটা কেঁপে উঠল। সে যখন ড্রাইভ করছে, তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। অপরাধ দমনের নেশা তার রক্তে, কিন্তু তার মনের এক কোণে আজও সেই পুরনো স্মৃতির ধুলো জমে আছে।
তেজগাঁওয়ের সেই অন্ধকার ডকইয়ার্ড। নানামি তার টিম নিয়ে পজিশন নিল। সে জানে জেড এর লোকগুলো বড্ড ধূর্ত। সে খুব সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মাথায় এখন কেবল জেড কে ধরার চিন্তা।
শিপমেন্টের কাছে পৌঁছে নানামি দেখল ট্রাকটি খালি। লোকগুলো আগেই সরে পড়েছে। নানামি রাগে গাড়ির বনেটে এক ঘুষি মারল।
“আবারও! ও সবসময় আমাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে কী করে?”
নানামির টিমের একজন কনস্টেবল এসে বলল, “স্যার, মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ ওকে ইনফরমেশন দিচ্ছে।”
নানামি চুপ করে রইল। সে তার টর্চের আলো ফেলে মাটির দিকে তাকালো। সেখানে একটা দামি চুরুটের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। নানামি সেটা হাতে তুলে নিল। এই ব্র্যান্ডের চুরুট কেবল বিত্তবানরাই ব্যবহার করে। নানামির কপালে ভাঁজ পড়ল। এই জেড যে কেবল একজন সাধারণ গুন্ডা নয়, বরং অনেক প্রভাবশালী কেউ, তা সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে।
সেদিন ভোরে নানামি যখন থানায় ফিরল, তার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। সে তার কেবিনে গিয়ে চেয়ারে হেলান দিল। টেবিলের ওপর রাখা নোবারার একটা ছবি, যেটা সে পনেরো বছর ধরে আগলে রেখেছে। নোবারা কোথায় আছে, কেমন আছে, নানামি জানে না। সে শুধু জানে, জেনিন আর নোবারা দুজনকেই সে খুঁজে বের করবেই।
নানামির এই নিঃসঙ্গ লড়াইটাই তার জীবনের গল্প। সে দিনের আলোয় একজন সৎ আর সাহসী পুলিশ অফিসার, যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সে কেবল এক নিঃসঙ্গ প্রেমিক আর এক ব্যথিত বন্ধু।
বৃষ্টি আবার শুরু হলো। নানামি তার কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তার একাকীত্বের গান শোনাচ্ছে। সে তার রিভলভারটা পরিষ্কার করতে করতে মনে মনে বলল,
“জেড, তুই যেই হস না কেন, আমি তোকে খুঁজে বের করবই। এই শহরটাকে তোর পাপমুক্ত করব, এটাই আমার শপথ।”
নানামি জায়দান এখন এক পূর্ণাঙ্গ ইন্সপেক্টর। তার বুদ্ধি, তার সাহসিকতা আর তার একাকীত্ব তাকে এক অদম্য চরিত্রে পরিণত করেছে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম!
<><><><><><><><><>
নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান কার্যালয় আজ এক অঘোষিত রণক্ষেত্র। সকাল থেকেই অফিসের আবহাওয়া গুমোট। কারণ একটাই, আজ একটি আন্তর্জাতিক ডিল সই হওয়ার কথা, আর সিইও জেনিন নূরশাদের মেজাজ তুঙ্গে। করিডোর দিয়ে জেনিন যখন হেঁটে যাচ্ছে, তার বুটের শব্দ যেন কোনো এক দণ্ডাদেশের আগাম ঘোষণা। তার ঠিক এক কদম পেছনে নোবারা আকারি।
জেনিন তার বিশাল কাঁচের ঘেরা কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসল। সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে নোবারার দিকে তাকালো।
“মিস আকারি, আমি আপনাকে স্পষ্ট বলেছিলাম জাপানি প্রতিনিধিদের জন্য প্রেজেন্টেশনটা যেন আমি অফিসে আসার আগেই আমার টেবিলে থাকে। ফাইলটা কোথায়?” জেনিনের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল।
নোবারা শান্তভাবে জেনিনের টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারটা টেনে বসল। জেনিন ভ্রু কুঁচকালো। সিইও-র সামনে পিএ-র এভাবে বসাটা এক চরম ঔদ্ধত্য।
“ফাইলটা আমি ডিলিট করে দিয়েছি,” নোবারা খুব নিস্পৃহভাবে বলল।
“দ্যা হেল! আপনি কী বলছেন?” জেনিন চিৎকার করে দাঁড়ালো। “আপনি কি জানেন এই ডিলটা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আমি আপনাকে এখনই ফায়ার করতে পারি!”
নোবারা একটুও বিচলিত হলো না। সে তার আইপ্যাডটা টেবিলের ওপর স্লাইড করে জেনিনের কাছে পাঠিয়ে দিল। “চিৎকার করে নিজের এনার্জি নষ্ট করবেন না স্যার। আপনার ওই পুরনো ফাইলে কিছু টেকনিক্যাল ভুল ছিল যা আমাদের ইনভেস্টরদের কাছে আপনাকে ছোট করত। আমি ডেটাগুলো রি-অ্যানালাইজ করেছি এবং নতুন একটি প্রপোজাল তৈরি করেছি। আপনি যদি আপনার ইগোটা একটু সাইডে রেখে আইপ্যাডটা চেক করেন, তবে বুঝবেন আমি আপনার চাকরি করছি না, আপনার সম্মান বাঁচাচ্ছি।”
জেনিন আইপ্যাডটা হাতে নিল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। নোবারা এমন কিছু পয়েন্ট ধরেছে যা জেনিনের অভিজ্ঞ চোখও এড়িয়ে গিয়েছিল। জেনিন বুঝতে পারল নোবারা তাকে ডমিনেট করছে, কিন্তু এমন এক জায়গায় যেখানে জেনিন তাকে দোষ দিতে পারছে না। জেনিন আবার বসল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
“আপনি বড্ড বেশি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন মিস আকারি। মনে রাখবেন, দাবার বোর্ডটা কিন্তু আমার।”
“বোর্ড আপনার হতে পারে স্যার, কিন্তু চালগুলো আমার,” নোবারা মৃদু হাসল। “এখন শুনুন, মিটিং শুরু হতে দশ মিনিট বাকি। আপনার কফি আমি অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছি, আর আপনার টাইটা একটু লুজ করুন, যখন আপনি নার্ভাস হন, আপনি টাই টেনে ধরেন। এটা আপনার পারসোনালিটির সাথে যায় না।”
জেনিন অজান্তেই নিজের টাইয়ের নটে হাত দিল। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল নোবারা তাকে কতটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। জেনিনের ইচ্ছে করল নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে ঝাপটে ধরতে, তাকে বলতে, কেন তুমি আমার ওপর এত প্রভাব ফেলো?’ কিন্তু সে কেবল বলল, “বাইরে যান। মিটিং শুরু হলে ডাকবেন।”
মিটিং রুমে জেনিন যখন কথা বলছিল, নোবারা তার ঠিক পেছনে এক ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। জেনিন লক্ষ্য করল, বিদেশি প্রতিনিধিদের প্রতিটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর সে দেওয়ার আগেই নোবারা খুব কৌশলে তাকে একটি করে নোট প্যাড এগিয়ে দিচ্ছে। জেনিন ডমিনেটেড হচ্ছে। সে সিইও হিসেবে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ নোবারার পরিকল্পনা মতো বের হচ্ছে।
মিটিং সফলভাবে শেষ হলো। প্রতিনিধিরা যখন জেনিনের প্রশংসা করছিল, জেনিন আড়চোখে দেখল নোবারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক বিজয়ী হাসি হাসছে। প্রতিনিধিদের বিদায় দিয়ে জেনিন তার চেম্বারে ফিরে এসেই নোবারাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
“কী চান আপনি?” জেনিনের নিশ্বাস নোবারার নাকে লাগছে। “আপনি কি সবাইকে দেখাতে চান যে নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ আসলে আপনি চালাচ্ছেন?”
নোবারা জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইল। তার হাত জেনিনের চওড়া কাঁধে। ” আমি ঠিক করেছি আপনার কাজকেও আমি আমার নিয়ন্ত্রণে নেব। আপনি আমাকে শৃঙ্খল পরিয়েছেন, আমি আপনাকে সাফল্যের জালে আটকালাম। স্কোর এখন ওয়ান-ওয়ান, মিস্টার নূরশাদ।”
জেনিন নোবারার কোমরে হাত দিয়ে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরল। তার ইগো আর আসক্তি এখন একাকার হয়ে গেছে।
“আপনি বড্ড ভয়ংকর মেয়ে নোবারা। আমি আপনাকে শাসন করতে চেয়েছিলাম, আর আপনি আমার সিংহাসনটাই টলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, দিনশেষে আপনি আমার নূরশাদ ভিলার সেই রুমেই ফিরে যাবেন যার চাবি আমার কাছে।”
নোবারা জেনিনের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
“চাবি আপনার কাছে থাকতে পারে, কিন্তু ওই ঘরে ফেরার ইচ্ছেটা কিন্তু আমার। আমি আপনার কাছে হারব না, বরং আপনাকে জিতিয়ে দেব যাতে আপনি বুঝতে পারেন আপনার এই রুক্ষতার চেয়ে আমার বুদ্ধি বেশি শক্তিশালী।”
জেনিন নোবারার জেদ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। সে তার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। সারা অফিসের মানুষ বাইরে কাজ করছে, আর ভেতরে এক সিইও আর তার পিএ-র মধ্যে চলছে এক অদৃশ্য মরণপণ লড়াই। জেনিন অনুভব করল নোবারা তাকে ডমিনেট করলেও সে সেটা উপভোগ করছে।
“কাল থেকে আপনার বেতন দ্বিগুণ,” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
“টাকা দিয়ে আমাকে কিনতে পারবেন না স্যার,” নোবারা জেনিনকে হালকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। “এখন কাজে ফিরুন। আপনার পরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাঁচ মিনিট পর। আর হ্যাঁ, ডিনারে আজ আমি আপনার সাথে বাইরে যেতে চাই। নূরশাদ ভিলার চার দেয়াল আমার ভালো লাগছে না।”
জেনিন ভ্রু কুঁচকালো। কিন্তু নোবারার ওই চ্যালেঞ্জিং চোখের দিকে তাকিয়ে সে না বলতে পারল না।
“ঠিক আছে। কিন্তু আমার কড়া পাহারায় থাকবেন।”
“পাহারা আপনার হোক স্যার, কিন্তু সন্ধেটা আমার হবে,” নোবারা ফাইল নিয়ে বেরিয়ে গেল।
জেনিন নূরশাদ তার রিভলভিং চেয়ারে ঘুরে জানালার দিকে তাকালো। সে বুঝতে পারল পনেরো বছর আগের সেই নোবারা ফিরে এসেছে, কিন্তু এবার সে শিকার হতে নয়, শিকারি হয়ে এসেছে। জেনিন নিজের অজান্তেই হাসল। সে জানত না এই ডমিনেশনের লড়াই তাকে কোন ভয়ংকর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে কেবল নোবারার এই ব্যক্তিত্বের মাদকতায় আচ্ছন্ন।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।

