#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৯ (বিশ্বাসঘাতকের ধ্বংস)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
সাগরের অতল গহ্বরে মাফিয়া জেড এর ‘ব্ল্যাক শার্ক’ সাবমেরিনটি ভলকানের গোপন নেভি ইউনিটের টর্পেডো থেকে বাঁচতে ডাইভ দিচ্ছে। লাল বাতিগুলো বিপদের সংকেত দিচ্ছে, আর চারদিকের ধাতব দেয়ালে প্রতিধ্বনি হচ্ছে বাইরের প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। কিন্তু জেনিনের সমস্ত মনোযোগ এখন নোবারার দিকে। নোবারা কেবল একটি অসম্পূর্ণ বাক্য বলে আবার ক্লান্তিতে চোখ বুজেছে। “বাবার খুনি মাহিতো নয়…”এই শব্দগুলো জেনিনের মস্তিষ্কে হাজারটা মৌচাকের মতো হুল ফোটাচ্ছে। যদি মাহিতো না হয়, তবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই তাকে এই পানি বের হতে হবে।
“মায়া! কাউন্টার মেজারস নাও! ওদের ডিস্ট্রাক্ট করো!” জেনিন গর্জে উঠল।
“ইউজি, মা হালিমার দেহ আর নোবারাকে নিয়ে স্পেশাল ইভাকুয়েশন পডে ঢোকো। আমরা সাবমেরিন ছেড়ে দেব!”
ইউজি অবাক হয়ে তাকাল। “বস! সাবমেরিন ছেড়ে দিলে আমরা কোথায় যাব? মাঝ সমুদ্রে?”
জেনিন এক অদ্ভুত হাসি হাসল। “মাঝ সমুদ্রে নয় ইউজি। আমাদের গন্তব্য বাইপাস ভিলা। সেই জায়গা, যার অস্তিত্বের কথা ভলকান বা সিআইডি, কেউই জানে না। সাগরের তলদেশ দিয়েই সেখানে যাওয়ার রাস্তা আছে।”
ইউজি আর দেরি করল না। সে অত্যন্ত সাবধানে হালিমা মায়ের নিথর দেহটি একটি বায়ুশূন্য আধারে রাখল। নোবারাকে স্ট্রেচারে নিয়ে সে ইভাকুয়েশন পডের দিকে ছুটল। জেনিন দ্রুত তার অমূল্য ডকূমেন্টসের ব্যাগ এবং নোবারার আধমরা বেলী ফুলের টবটা হাতে তুলে নিল। টবটা এখন তার কাছে এক যুদ্ধের স্মারক।
সাবমেরিনের পেছনের অংশ থেকে একটি ছোট, দ্রুতগামী ক্যাপসুল আকৃতির যান ছিটকে বেরিয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে অজ্ঞাত টর্পেডোটি জেনিনের খালি সাবমেরিনটিকে আঘাত করল।
এক বিশাল উজ্জ্বল গোলক তৈরি হলো সাগরের নিচে। জেনিন পডের জানালা দিয়ে দেখল তার দীর্ঘদিনের গর্বের ব্ল্যাক শার্ক চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। কিন্তু তাতে তার কোনো আক্ষেপ নেই। সে এখন তার জীবনের সবচাইতে সুরক্ষিত দুর্গের দিকে এগোচ্ছে।
বাইপাস ভিলা। এটি চট্টগ্রামের এক দুর্গম পাহাড়ি দ্বীপের নিচে অবস্থিত। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে কেবল জঙ্গল আর পাহাড়, কিন্তু মাটির কয়েকশ ফুট নিচে এটি একটি আধুনিক বাড়ি। জেনিন বিগত পাঁচ বছর ধরে নিজের ব্যক্তিগত তহবিল দিয়ে এটি তৈরি করেছে। নোবারা আসার আগে প্রায় সময় সে ভ্যাকেশন এ এখানেই আসতো।
পডটি যখন ভিলার আন্ডারগ্রাউন্ড ডকিং স্টেশনে এসে থামল, তখন জেনিন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে নিজেই নোবারাকে পড থেকে বের করে নিয়ে এল। সেখানকার ব্যক্তিগত মেডিকেল টিম আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। জেনিন নোবারাকে সাদা ধবধবে বেডে শুইয়ে দিল। পুরো বাইপাস ভিলা এখন জেনিনের নিয়ন্ত্রণে।
প্রধান পরিচারিকা মিসেস সারদা এসে জেনিনকে শুকনো কাপড় দিল। জেনিন তৎক্ষণাৎ তার ভেজা শার্টটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুকনো শার্ট আর ট্রাউজার পরে নিল। সে ভিলার ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। এখান থেকে সাগরের গর্জন শোনা যায়, কিন্তু পাহাড়ের কারণে কেউ দেখতে পায় না। সে তার হাতের বেলী ফুলের টবটা ব্যালকনির এক কোণে রাখল। লোনা পানির কারণে অনেকগুলো পাতা ঝরে গেছে, কিন্তু মাঝখানে একটা নতুন কুঁড়ি দেখা যাচ্ছে! হয়তো নতুন কিছুর সূচনা!
“ইউজি!” জেনিন ডাকল।
ইউজি এল। “বস, হালিমা মাকে ভিলার পেছনের বকুল তলায় সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেছি। লাশটা এতক্ষণ রেখে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। আপনি অনুমতি দিলে…”
জেনিন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ওখানেই ওনাকে শান্তিতে থাকতে দাও। নোবারা জ্ঞান ফিরলে হয়তো কাঁদতে কাঁদতেও একটু শান্তি পাবে যে তার মা অন্তত মাটির কাছে আছে।”
ইউজি চলে যাওয়ার পর জেনিন আবার নোবারার ঘরে ঢুকল। নোবারার নাকে এখন উন্নতমানের ভেন্টিলেটর লাগানো। ডাক্তার রহমান পরীক্ষা করে জানালেন, নোবারা এখন বিপদমুক্ত, তবে তার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ার কারণে সে গভীর ট্রমার মধ্যে আছে।
জেনিন নোবারার মাথার কাছে বসে তার হাতটা ধরল। সে ভাবতে লাগল নোবারার অসম্পূর্ণ কথাটার কথা। “বাবার খুনি মাহিতো নয়…”
জেনিনের বাবা আশফাক নূরশাদকে মারা হয়েছে নূরশাদ ভিলার গোপন আস্তানায়। জেনিন তখনো ভাবছিল এটা সিআইডির কাজ। কিন্তু নোবারার কাছে এমন কী তথ্য আছে যা জেনিন জানে না? তাছাড়া আশফাক নুরশাদ মারা যাওয়ার সময় নোবারা আইসিইউ তে ছিল। সে কিভাবে জানবে এসব! জেনিনের মাথা এবার যেন কাজ করা বন্ধ হয়ে গেল। বিগত চব্বিশ ঘন্টার বেশি সময় ধরে সে নিজের মাথাকে এতোটাই প্রেশার দিয়েছে যে তার আইকিউ ও যেন ফুরিয়ে আসছে।
ঠিক তখনই মায়া ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটি ট্যাবলেট। “বস, অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন? ভলকানের ডেরায় আমাদের এক ইনফরমার জানিয়েছে, ভলকান নিজে আপনার বাবার মৃত্যুর খবর শুনে অবাক হয়েছে।”
জেনিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। “তার মানে ভলকান বাবাকে মারেনি?”
“না বস। ভলকান তখন জেনিন নূরশাদকে ধরার মিশনে ছিল। আপনার বাবাকে মারার জন্য সে আলাদা কোনো টিম পাঠায়নি।” মায়া জানাল।
জেনিন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন এক নতুন সন্দেহ। যদি সিআইডি না হয়, যদি ভলকান না হয়, তবে তৃতীয় কোনো শক্তি এই খেলায় অংশ নিয়েছে। কেউ একজন চেয়েছিল জেনিনকে পুরোপুরি একা করে দিতে। কেউ একজন চেয়েছিল জেনিনের জীবনের শেষ আশ্রয়গুলো কেড়ে নিতে।
জেনিন নোবারার দিকে তাকাল। নোবারা এখন ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছে। জেনিন ঝুকে পড়ল তার ঠোঁটের কাছে। কিন্তু নোবারা চেষ্টা করেও কিছু বের করতে পারলো না তার মুখ থেকে!
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়ি জঙ্গলের রহস্যময় অন্ধকার আর সাগরের গর্জন মিলেমিশে বাইপাস ভিলায় এক থমথমে পরিবেশ তৈরি করেছে। জেনিন জানে, এই শান্তির আড়ালে এক বিশাল ঝড় লুকিয়ে আছে। সে তার ড্রয়ার থেকে সেই পুরনো ডকূমেন্টসগুলো বের করল। নীলিমা যে ফাইলগুলো চুরি করতে চেয়েছিল, জেনিন সেগুলো এখন খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল।
ফাইলের একদম শেষ পাতায় একটা ঝাপসা হাতের লেখা জেনিনের নজরে এল। সেখানে লেখা ছিল, “The Snake in the Grass is closer than you think!”
জেনিনের সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। সে ইউজির কথা ভাবল। না, ইউজি হতে পারে না। ইউজি তার জন্য নিজের জীবন দিতে পারে। এমন ভাবনা নিজের মাথায় আসায় সে নিজেই নিজেকে গালে জোরে থাপ্পর দিল! ছেলেটা এমনিতেই ট্রমায় আছে, তাও তার জন্য জীবনের বাজি রেখে কি না করছে! তবে কে এই তৃতীয় জন? মায়া? রায়ান? নাকি অন্য কেউ?
জেনিন যখন ভাবনায় মগ্ন, ঠিক তখনই নোবারার জ্ঞান ফিরল। সে এক ঝটকায় উঠে বসার চেষ্টা করল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, আতঙ্কে সে থরথর করে কাঁপছে।
“জেনিন! পালিয়ে যান! এখনই!” নোবারা চিৎকার করে উঠল।
জেনিন নোবারাকে জাপটে ধরল। “শান্ত হোন নূরা! আমরা নিরাপদ। আমরা বাইপাস ভিলায়। এখানে কেউ নেই।”
নোবারা জেনিনের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার চোখের জল জেনিনের বুকে আছড়ে পড়ল। “না জেনিন! কোথাও নিরাপদ নয়! ও… ও আপনার সব লোকেশন জানে! ও ভলকানকে খবর দিয়েছে! ও-ই আপনার বাবাকে মেরেছে!”
জেনিনের হৃদপিণ্ড যেন থমকে গেল। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে নূরা? কার কথা বলছেন আপনি? বলুন আমাকে।”
নোবারা যখন মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই ভিলার প্রধান হলরুমে একটি বিকট বিস্ফোরণ হলো। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল জেনিনের এই শেষ আশ্রয়স্থলে। জেনিন জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, অন্ধকারের মধ্যে কয়েকশ রেড-ডট লেজার ভিলার দিকে তাক করা।
জেনিন নোবারাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। আগুনের কুণ্ডলী আর ধোঁয়ায় ভিলার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। নোবারার চোখ তখনো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে আছে, সে জেনিনের শার্ট খামচে ধরে ফিসফিস করে বলল, “জেনিন… ও আসছে। ও সবাইকে শেষ করে দেবে।”
জেনিন এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে নোবারাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বেডরুমের পেছনের গোপন স্লাইডিং ডোর দিয়ে বের হয়ে এল। সেখানে আগে থেকেই ইউজি পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ইউজির হাতে এখন একটি ভারী মেশিনগান, তার চোখে চেনা খু’নি দৃষ্টি। কিন্তু জেনিনকে দেখে ইউজির চোখ দুটো নরম হয়ে এল।
“বস! ওরা পাহাড়ের উত্তর দিক দিয়ে ঢুকেছে! রায়ান আর মায়ার কোনো খবর পাচ্ছি না। ওদের কমিউনিকেশন চ্যানেল কেউ ব্লক করে দিয়েছে!” ইউজি চিৎকার করে বলল।
জেনিন ইউজির দিকে তাকাল। তার সারা জীবনের বিশ্বস্ত বন্ধু, তার ভাই। ইউজির ওপর জেনিন সন্দেহ করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। কিন্তু নোবারার কথাগুলো জেনিনের কানে বিষের মতো বাজছে। “ও আপনার সব লোকেশন জানে… ও-ই আপনার বাবাকে মেরেছে।”
জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ইউজি, নোবারাকে নিয়ে ভিলার নিচের সেইফ-হাউসে যাও। আমি মায়া আর রায়ানকে দেখছি। ওদের খুঁজে বের করতে হবে।”
“না বস! আমি আপনাকে একা ছেড়ে যাব না!”
ইউজি জিদ ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিলার ছাদ চিরে কয়েকটা দড়ি নেমে এল। কালো ট্যাকটিক্যাল স্যুট পরা চারজন ঘাতক সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে জেনিনদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করল। ইউজি এক নিমেষে পজিশন নিয়ে পাল্টা গুলি চালাল। দুজন ঘাতক সাথে সাথে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
জেনিন নোবারাকে এক হাতে আগলে রেখে নিজের কোল্ট-৪৫ বের করল। সে নিখুঁত নিশানায় বাকি দুজনকে খতম করল। কিন্তু জেনিনের মনে হচ্ছে, এরা কেবল টোপ। আসল শিকারি এখনো অন্ধকারের আড়ালে বসে খেলা দেখছে!
“ইউজি, যাও!” জেনিন গর্জে উঠল। “নোবারার কিছু হলে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না। তুমিই একমাত্র যাকে আমি বিশ্বাস করি। যাও!”
ইউজি চোখের কোণায় পানি মুছে নোবারার হাত ধরল। “চলুন ম্যাম। বসের আদেশ।”
ইউজি নোবারাকে নিয়ে সুড়ঙ্গ পথের দিকে চলে গেল। নোবারার এখনো সম্পূর্ণ হুঁশ আসেনি। তাই জেনিনকে ছেড়ে যাচ্ছে সে, এটা তাও মাথায় ও আসছে না! তাকে ইউজি যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে, সে ও সেদিকেই যাচ্ছে।
জেনিন এখন একা। ভিলার চারপাশের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। তার শখের বাইপাস ভিলা, তার এই শেষ আশ্রয়স্থলটাও আজ ধ্বংসের মুখে। জেনিন ধীর পায়ে হলরুমের দিকে এগোতে লাগল। মেঝের ওপর পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচের ওপর জেনিনের বুটের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ আগুনের শিখার আড়াল থেকে একটি ছায়া বেরিয়ে এল। জেনিন থমকে দাঁড়াল। ছায়াটি আর কেউ নয়, রায়ান। জেনিনের সিকিউরিটি চিফ, দ্যা ট্রিপল শ্যাডো’র একজন সে। তিনজনের ভেতর জিবরান পুলিশি মিশনে মারা গিয়েছিল, বাকি মায়া এবং রায়ান! রায়ানের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, তার মুখে এক বীভৎস ঠান্ডা হাসি। রায়ানের সারা শরীরে রক্ত, কিন্তু সেটা তার নিজের নয়।
“রায়ান?” জেনিন অবিশ্বাসের স্বরে ডাকল। “তুমি?”
রায়ান পকেট থেকে একটি সাদা রুমাল বের করে তার হাতের রক্ত মুছল। সে বিভৎস এঅ হাসি দিয়ে বলতে শুরু করলো তার অপকর্মের কথা,
“সরি বস। কিন্তু আপনার হয়ে কাজ করতে করতে কখন যে আপনার বউটাকে মনে ধরেছে! তাই ভলকানের সাথে হাত মিলিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার বউটা বড্ড চাদাক, সেদিন ভলকান এর সাথে কথা বলার সময় সে শুনে ফেলেছিল, তখন অবশ্য আপনি সিআইডির সাথে লড়ছিলেন! তবে ভলকান নেই তো কি হয়েছে, আমি একাই আপনাকে ধ্বংস করবোড়, তবে আপনার বউটা বাদে। ওকে আমার চাই।”
জেনিনের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। রায়ান! যে জেনিনের প্রতিটি গোপন আস্তানার নকশা তৈরি করেছে, যে জেনিনের বাবার সুরক্ষার দায়িত্বে ছিল। সেই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল! এই একটাই অপরাধ যেটা জেনিন সহ্য করতে পারে না! তবুও সে নিজের রাগ সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তোমাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম, আমি বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারিনা! তারপরও তোমার কি একটুও ভয় হয়নি, আমার ওয়াইফ এর দিকে নজর দিতে!”
রায়ান হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো বিশ্বস্ততা নেই, আছে শুধু দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিষ। “আমি সবসময় আপনার ছায়া হয়ে থেকেছি জেনিন নূরশাদ। লাভ লস কিছুই হলো না
কিন্তু ভলকান আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, আপনার পতন হলে নোবারা নুরশাদ আমার হবে। আর আপনার বাবা? আশফাক নূরশাদ বড্ড বেশি বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলেছিলেন আমি বেইমানি করছি। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।”
জেনিনের চোখের মণি তখন আগুনের মতো লাল হয়ে গেছে। তার বাবার খুনি তার সামনে দাঁড়িয়ে! জেনিন তার পিস্তলটা তুলতে চাইল, কিন্তু রায়ান ক্ষিপ্র গতিতে একটি রিমোট টিপল। জেনিনের পায়ের নিচের মেঝেটা হঠাৎ করে আলগা হয়ে গেল। জেনিন ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সে এক হাতে একটি লোহার রড আঁকড়ে ধরল।
“জেনিন নুরশাদ, বিদায়!” রায়ান চিৎকার করে বলল এবং ভিলার গ্যাস পাইপলাইনে একটি গ্রেনেড ছুঁড়ে দিল।
বিশাল এক বিস্ফোরণে পুরো হলরুমটা আগুনের গোলকায় পরিণত হলো। জেনিন আগুনের হলকা থেকে বাঁচতে নিচের সেই অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপ দিল। সে যখন নিচে পড়ল, তার মনে হলো তার হাড়গোড় সব ভেঙে গেছে। কিন্তু তার কানে তখনো বাজছে নোবারার আর্তনাদ।
নিচে, সেইফ-হাউসের দরজার সামনে ইউজি নোবারাকে নিয়ে পৌঁছাল। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই ইউজি দেখল রায়ান তার বিশাল ফোর্স নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইউজি নোবারাকে নিজের পেছনে আড়াল করল।
“রায়ান ভাই! আপনি এখানে? বস কোথায়?” ইউজি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
রায়ান তার পিস্তলটি ইউজির কপালে ঠেকাল। “বস তো এখন আগুনে পুড়ছে ব্রো। এবার তোমার পালা। নোবারাকে আমার হাতে দিয়ে দাও, হয়তো তোমাকে আমি দয়া করে ছেড়ে দেব!”
ইউজি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার আদর্শ, তার বড় ভাইসম রায়ান আজ বেইমান! ইউজির চোখে তখন পানি আর আগুন মিলেমিশে একাকার। সে জানত না জেনিন বেঁচে আছে কি না, কিন্তু সে জানত তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সে নোবারাকে রক্ষা করবেই।
“কখনো না! ম্যামকে আমি আপনার হাতে কখনোই দিব না।” ইউজি গর্জে উঠল।
ইউজি আর রায়ানের ফোর্সের মধ্যে শুরু হলো এক অসম লড়াই। ইউজি একা, আর সামনে রায়ানের বিশজন সশস্ত্র ঘাতক। কিন্তু ইউজি আজ মরতে আসেনি, সে আজ লড়তে এসেছে তার ভাইয়ের আমানত রক্ষা করতে। নীলিমার শোকে কাতর ইউজি আজ এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধার রূপ নিল। তার প্রফেশনালিজম এবার আরো কাছ থেকে দেখবে রায়ান। ইউজির ফাইটিং স্কিল এ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হলো তার স্পিড। চোখের পলকেই সে স্থান পরিবর্তন করার সাথে সাথে চার পাঁচজন ঘাতক কে শেষ করে দিতে পারে।
ওদিকে সুড়ঙ্গ পথের অন্ধকার থেকে তখন জেনিন নূরশাদ টলতে টলতে বেরিয়ে আসছে। তার সারা শরীর পোড়া, জামাকাপড় ছিন্নভিন্ন, কিন্তু তার হাতে ধরা কোল্ট-৪৫। জেনিন দূর থেকে দেখল ইউজি একা লড়ছে। জেনিনের চোখে জল এল। সে বিড়বিড় করে বলল, “ইউজি…তুমি আমাকে কোনোদিন একা ছাড়োনি। আজ আমি তোমাকে মরতে দেব না।”
জেনিন অন্ধকারের আড়াল থেকে প্রথম গুলিটি চালাল সরাসরি রায়ানের কাঁধ লক্ষ্য করে। রায়ানের হাত থেকে পিস্তলটি ছিটকে পড়ে গেল।
“জেএএএডডড…..” রায়ান আর্তনাদ করে উঠল।
ইউজি তখন মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে এক হাতে নিজের রক্তাক্ত উরু চেপে ধরে আছে, অন্য হাতে রিভলভার দিয়ে কভার দিচ্ছে নোবারাকে। নোবারা দেয়ালের সাথে মিশে থরথর করে কাঁপছে, তার পেটে মাহিতোর দেওয়া বিষের প্রভাব কমে আসলেও, শরীর সম্পূর্ণ দুর্বল।
জেনিনকে জীবিত দেখে ইউজির ফ্যাকাশে মুখে এক চিলতে অমানুষিক স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
“বস…আমার বস!” ইউজি চিৎকার করে বলল।
জেনিন কোনো উত্তর দিল না। তার লক্ষ্য স্থির। সে ধীর পায়ে রায়ানের দিকে এগোতে লাগল। রায়ানের বিশজন ঘাতক জেনিনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে চেয়েছিল, কিন্তু জেনিনের ক্ষিপ্রতা আজ মানুষের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। সে স্লাইডিং রোল দিয়ে পজিশন বদলে একে একে চারজনকে খতম করল। জেনিন যেন আজ এক অজেয় ছায়া।
রায়ান তার কাঁধের ক্ষত চেপে ধরে আর্তনাদ করল, “মারো ওকে! দাঁড়িয়ে আছো কেন? শেষ করে দাও এই জেড কে!”
কিন্তু বাইপাস ভিলায় জেনিনের বাহিনীর বাকি বিশ্বস্ত সদস্যরা, যারা এতক্ষণ রায়ানের জালে বন্দি ছিল, তারা সাইরেন শুনে এবং জেনিনের উপস্থিতি টের পেয়ে বিদ্রোহ শুরু করল। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্ত দিয়ে রায়ানের ঘাতকদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু হলো। পুরো সুড়ঙ্গ এখন এক রক্তগঙ্গায় পরিণত হয়েছে।
জেনিন সোজা গিয়ে রায়ানের সামনে দাঁড়াল। রায়ান ভয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা একটি পিস্তল তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু জেনিন তার বুট দিয়ে রায়ানের হাতটা পিসে ধরল। হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দে সুড়ঙ্গটা কেঁপে উঠল।
“রায়ান…” জেনিনের কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু যে তা প্রেতাত্মার ফিসফিসের মতো শোনাল। “আমার বাবা তোকে নিজের ছেলের মতো বিশ্বাস করে তার পিঠের দিকটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর তুই সেই পিঠেই ছুরি মারলি? তার উপর তুই আমার নূরার উপর নজর দিয়েছিস, তোর চোখ সমেত পুরো শরীরটাই আজ আমি শেষ করে দিব জানো’য়ার।”
রায়ান যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, “আমি… আমি শুধু ক্ষমতা চেয়েছিলাম জেনিন। ভলকান আমাকে কথা দিয়েছিল, ”
“ভলকান তোকে কবর ছাড়া আর কিছুই দেবে না,” জেনিন শান্ত গলায় বলল। সে তার পিস্তলের ব্যারেলটা রায়ানের কপালে ঠেকাল। “আমার বাবার শেষ নিঃশ্বাসের দাম তুই দিতে পারবি না রায়ান। তোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।”
‘ধাম!’
একটি মাত্র বুলেট। রায়ানের কপাল চিরে বেরিয়ে গেল। তার নিথর দেহটা সুড়ঙ্গের নোংরা পানিতে আছড়ে পড়ল। জেনিন এক মুহূর্তও সেই লাশের দিকে তাকাল না। সে দ্রুত গিয়ে ইউজিকে টেনে তুলল।
“ঠিক আছো?” জেনিন উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞেস করল।
ইউজি দাঁতে দাঁত চিপে হাসল। “আমি ঠিক আছি বস। মরে গেলে নীলিমার কাছে গিয়ে কী জবাব দিতাম? বলতাম যে আপনাকে একা ফেলে এসেছি? ওটা সম্ভব না।”
জেনিন ইউজিকে বাকি ফোর্সদের হাতে তুলে দিয়ে নোবারার দিকে এগিয়ে গেল। নোবারা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। জেনিন তার রক্তাক্ত হাত দুটো নোবারার সামনে বাড়িয়ে দিল না, পাছে সে ভয় পায়। সে শুধু হাঁটু গেড়ে বসে শান্ত গলায় বলল, “সব শেষ নূরা। আমরা এখন নিরাপদ।”
নোবারা হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। তার কান্নায় পুরো সুড়ঙ্গটা ভারী হয়ে উঠল। “আমি ভেবেছিলাম আপনিও আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন… আমি সব দেখেছি জেনিন… রায়ান যখন আপনার বাবাকে খু’ন করছিল, আমি ভিডিও লিঙ্কে সেটা দেখে ফেলেছিলাম। ও আমাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল…”
নোবারা যখন জেনিনকে জড়িয়ে ধরল, তখন জেনিন অনুভব করল তার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে যে প্রলয়ংকরী ঝড় বইছিল, তা হঠাত্ করেই এক নিবিড় শান্তিতে পরিণত হয়েছে। আগুনের তাপ, রক্তের গন্ধ আর প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতার যে বিষাক্ত শ্বাস তাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছিল, নোবারার এই আলিঙ্গন যেন সবটুকু ধুয়ে মুছে দিল।
জেনিন তার রক্তাক্ত এবং কালশিটে পড়া হাত দুটো দিয়ে অতি সাবধানে নোবারাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটিই তো তার পৃথিবী, যার জন্য সে আজ হাজারটা লাশের পাহাড় ডিঙিয়ে ফিরে এসেছে।
নোবারা জেনিনের বুকের রক্তমাখা শার্টটা খামচে ধরে হিক্কা তুলে কাঁদছিল। জেনিন নিজের থুতনিটা নোবারার মাথায় রাখল। সে চোখ বুজে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। নোবারার গায়ের ল্যাভেন্ডার আর বেলি ফুলের মিশ্রিত ঘ্রাণ তাকে মনে করিয়ে দিল, সে এখনো বেঁচে আছে। সে খুব নিচু স্বরে, এক মখমল কোমল কণ্ঠে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“জেনিন নূরশাদ অত সহজে মরে না, মেরিজান। এই জেনিনের শ্বাস চলে যতক্ষণ আপনি পাশে থাকেন।”
জেনিন নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের আঁজলায় তুলে নিল। নোবারার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। জেনিন নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে নোবারার চোখের কোণায় জমে থাকা অশ্রু মুছে দিল। সুড়ঙ্গের টিমটিমে আলোয় নোবারার চোখের মণি দুটো হিরের মতো জ্বলজ্বল করছিল। জেনিন ঝুঁকে এসে নোবারার কপালে এক দীর্ঘ, আবেগপূর্ণ চুম্বন এঁকে দিল। সেই চুম্বনে কোনো মাফিয়া ডনের কঠোরতা ছিল না, ছিল কেবল এক প্রেমিকের গভীর আর্তি।
“আপনার কিছু হলে আমি কার জন্য এই সাম্রাজ্য সামলাব নূরা? কার অভিমান ভাঙাতে আমি মাঝরাতে গান গাইব? আপনিই তো আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো,” জেনিন ফিসফিস করে বলল। নোবারা তখনো জেনিনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেই আছে। তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না সে বেঁচে আছে, সে জেনিনের বুকে ফিরে আসতে পেরেছে!
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা চলল বাইপাস ভিলার ক্লিন-আপ অপারেশন। জেনিনের কমান্ডোরা ভলকানের অবশিষ্ট ঘাতকদের পাহাড়ের নিচে সাগরে বিসর্জন দিল। রায়ানের বেইমানির পর জেনিন পুরো সিকিউরিটি সিস্টেম রিসেট করল। যারা রায়ানের সহযোগী ছিল, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হলো। ভিলার যে অংশটুকু বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা দ্রুত সিল করে দেওয়া হলো। আপাতত বাইপাস ভিলা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
চলবে ইংশাআল্লাহ…….….…….…
(চলুন পাঠিকারা, আমরা সবাই মিলে একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলি। আগামী কয়েকটা পর্ব একটু শান্তিতে পড়তে পারবেন। তবে এরপরের গুলোতে আমি কোন গ্যারান্টি দিতে পারতেছি না। হে হে হে!)

