#Soulmate_to_Enemy |৬৪|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
বাইপাস ভিলা, চট্টগ্রাম। সকালের রোদে পাহাড়ের চূড়া ঝলমল করলেও প্রাসাদের ভেতরে এক অনন্ত অন্ধকার জেঁকে বসেছে। নোবারার ঘরটি এখন এক জীবন্ত শ্মশান! জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, ঘরটি আধা-অন্ধকারে ডুবে আছে। মাঝেমধ্যে বাতাসের ঝাপটায় পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা এক চিলতে আলোয় দেখা যায়, বিছানার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে নোবারা।
তার উজ্জ্বল গায়ের রং এখন বিবর্ণ ফ্যাকাশে! চোখের নিচে কালি জমেছে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে ফেটে চৌচির। তার শরীরের বাম পাশের অসাড়তা পুরোপুরি না কাটলেও, মনের অসাড়তা তাকে এক অদ্ভুত উন্মাদের স্তরে নিয়ে গেছে। নোবারা এখন আর মানুষের সাথে কথা বলে না, সে কথা বলে ছায়ার সাথে।
মায়া হাতে একটা স্যুপের বাটি নিয়ে ঘরে ঢুকল। ঘরের ভ্যাপসা গন্ধে তার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। গত কয়েকদিন ধরে সে নোবারাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি। মায়া জানত জেনিন বস তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এই দায়িত্ব যে এতোটা যন্ত্রণাদায়ক হবে, তা সে ভাবেনি।
“ম্যাম, একটু স্যুপটা খেয়ে নিন। শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে আপনার,” মায়া খুব নরম স্বরে বলল।
নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে একদৃষ্টিতে তার কোলের ওপর রাখা চিঠিটার দিকে তাকিয়ে আছে। বিগত চব্বিশ ঘণ্টায় সে যে কতবার চিঠিটা পড়েছে তার হিসেব নেই। প্রতিবার পড়ার পর সে ডুকরে কেঁদে উঠে। মায়া এসে সামলে নেয়।
কিন্তু এবার নোবারার এই পাগলপ্রায় অবস্থা দেখে মায়ার চোখের কোণ ভিজে এল। সে বাটিটা পাশে রেখে নোবারার কাঁধে হাত রাখল।
“ম্যাম, বস তো চাইতেন না আপনি এমন করুন। আপনি সুস্থ না হলে বসের আত্মা শান্তি পাবে না।”
নোবারা হঠাৎ ঝটকা দিয়ে মায়ার হাত সরিয়ে দিল। তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় বড় হয়ে গেল। সে জানালার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কে? ওই যে ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছে? জেনিন! আপনি কেন ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন? ভেতরে আসুন! দেখুন, মায়া আমাকে জোর করে এই বিস্বাদ খাবার খাওয়াচ্ছে। আপনি ওকে শাসন করুন!”
মায়া জানালার দিকে তাকালো। সেখানে পর্দার ছায়া ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু নোবারার চোখে সেখানে জেনিন দাঁড়িয়ে আছে, সাদা শার্ট পরে, হাতে একগুচ্ছ বেলী ফুল নিয়ে। নোবারা বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করল, কিন্তু দুর্বল শরীরে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। মায়া দ্রুত তাকে ধরতে গেল, কিন্তু নোবারা তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল!
“মায়া, ও কেন ভেতরে আসছে না? ও কি আমার ওপর রাগ করেছে? আমি ওইদিন কেন ওকে যেতে দিলাম? আমি কেন ওর সাথে গেলাম না? ও আমাকে নিতে এসেছে মায়া, ওই দেখো ও হাসছে!”
নোবারার এই হ্যালুসিনেশন এখন প্রাত্যহিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে মাঝরাতে জেগে উঠে একা একা কথা বলে। কখনো কখনো সে জেনিনের স্টাডি রুম এ গিয়ে কার সাথে যেন কথা বলে! তার ব্রেইন এখন জেনিনের মৃত্যুকে অস্বীকার করার জন্য এক কাল্পনিক জগত তৈরি করে নিয়েছে। সেই কল্পনার জগতে জেনিন, তার স্বামী এখনো জীবিত। এখনো তাকে প্রতিটা মুহুর্তে আগলে রাখছে!
মায়া নোবারাকে টেনে তুলে আবার বিছানায় বসাল। নোবারা এখন মায়ার বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত হয়ে আছে। মায়ার খুব মায়া হলো এই মেয়েটির ওপর। যে নোবারা এক সময় দাপুটে সিআইডি অফিসার ছিল, যে বুদ্ধিতে জেনিনকেও টক্কর দিত, সে আজ এক অবুঝ শিশুর মতো মায়াকে আঁকড়ে ধরে আছে। মায়া অনুভব করল, নোবারার এই যন্ত্রণার ভাগীদার হতে হতে সে নিজেও যেন ভেঙে পড়ছে!
“ম্যাম, আপনি একটু ঘুমান। আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি,” মায়া ফিসফিস করে বলল।
নোবারা মায়ার চোখের দিকে তাকালো। সেই শুকনো চোখে এক মুহূর্তের জন্য চেতনার আলো ফুটে উঠল। সে মায়ার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি…তুমি খুব ভালো। জেনিন ঠিকই বলেছিল, তুমি ওর সবচাইতে বিশ্বস্ত। এই কদিন তুমি যেভাবে আমার যত্ন নিচ্ছো…! কিন্তু জানো মায়া, আমার খুব ভয় করে। আমার মনে হয়, আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তবে জেনিন ওই জানালা দিয়ে চলে যাবে। ও আর ফিরবে না।”
মায়া নোবারার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ঘরের কোণে রাখা ছোট ল্যাম্পটার আলোয় নোবারার মুখটা খুব অসহায় দেখাচ্ছিল। মায়া ভাবল, ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে জেনিন নুরশাদকে সে এতো দিন এক দুর্ভেদ্য সম্রাট হিসেবে দেখে এসেছে, সেই সম্রাটের সাম্রাজ্য আজ কেবল এই এক টুকরো ঘরে, এক পাগলপ্রায় নারীর স্মৃতির মণিকোঠায় বন্দি!
মায়া দেখল নোবারার চোখের পাতাগুলো ঘুমে ঢুলে আসছে, কিন্তু তার হাতটা এখনো সেই চিঠিটাকে শক্ত করে ধরে আছে। মায়া জানালাটা একটু খুলে দিল। বাইরের পাহাড়ি বাতাস ভেতরে ঢুকতেই নোবারা ঘুমের ঘোরে শিউরে উঠল। সে হয়তো স্বপ্নেও দেখছে কর্ণফুলী ব্রিজের দৃশ্য, সেই লাল রক্তের ধারা!
রাত বাড়ে। বাইপাস ভিলা নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। শুধু মাঝেমধ্যে নোবারার অস্ফুট কান্নার শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মায়া জেগে বসে থাকে। সে জানে, এই রাত শেষ হলেও নোবারার জীবনের অমাবস্যা কাটবে না। জেনিন নূরশাদ তার জীবনের সূর্য হয়ে এসেছিলেন, আর সেই সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নোবারা এখন এক অন্তহীন মেরু নিশিথের বাসিন্দা।
<><><><><><><><><>
নোবারার ঘরের বাতাস এখন বড্ড ভারী, প্রতিটি নিশ্বাসে এক ধরণের নোনা স্বাদ পাওয়া যায়, চোখের জলের নোনা স্বাদ। নোবারা জানালার পাশে মেঝের ওপর বসে আছে। তার পরনে একটা সাদা সুতির কামিজ, যা গত দুদিন ধরে বদলানো হয়নি। তার দৃষ্টি আকাশের ওই একটা নির্দিষ্ট নক্ষত্রের দিকে স্থির, যেন ওখানেই জেনিন নূরশাদ তার জন্য একখণ্ড জমি কিনে রেখেছে।
নোবারার ভেতরে এক প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। সে একজন সিআইডি অফিসার ছিল। তার মস্তিষ্ক তাকে বারবার বলছে, “জেনিন মারা গেছে। জেনিন আর ফিরবে না। নানামির বুলেট ওর বুক চিরে বেরিয়ে গেছে।” কিন্তু তার হৃদপিণ্ড, যা কেবল জেনিনের ছন্দে চলত, সে এই তথ্যটা মানতে পারছে না। এই দ্বিধা থেকেই জন্ম নিচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর হ্যালুসিনেশন।
হঠাৎ নোবারার মনে হলো তার কাঁধে কেউ একটা চাদর জড়িয়ে দিল। সে শিউরে উঠে পেছন ফিরল।
“জেনিন?” নোবারার কণ্ঠে এক আকাশ প্রত্যাশা।
ঘরের কোণের অন্ধকারে সে দেখতে পেল জেনিন দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন হাসছে না, কেবল গম্ভীর মুখে তাকে দেখছে। জেনিনের বুকের সাদা শার্টটা রক্তে ভেজা। জেনিন হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। নোবারা উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু তার অবশ বাম পা-টা আবার তাকে ধোঁকা দিল। সে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল!
“জেনিন, আমি… আমি আসছি আপনার কাছে। একটু দাঁড়ান!” নোবারা হামাগুড়ি দিয়ে সেই অন্ধকারের দিকে এগোতে লাগল। তার নখগুলো মেঝের কার্পেট কামড়ে ধরছে। চোখের জল তার দৃষ্টি ঝাপসা করে দিলেও সে ওই অবয়বটাকে হারাতে চায় না।
মায়া দরজার আড়াল থেকে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল যন্ত্রণায়। সে দেখল নোবারা শূন্য বাতাসের সাথে কথা বলছে, শূন্য অন্ধকারের দিকে হাত বাড়িয়ে হাহাকার করছে। মায়া আর স্থির থাকতে পারল না। সে দ্রুত ঘরে ঢুকে নোবারাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
“ম্যাম! কেউ নেই ওখানে! প্লিজ, নিজেকে সামলান!” মায়া চিৎকার করে উঠল।
নোবারা পাগলের মতো মায়ার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। সে মায়ার হাতে কামড় বসিয়ে দিল, নখ দিয়ে আঁচড়ে দিল।
“ছাড়ো আমাকে! দেখো ও চলে যাচ্ছে! জেনিন রাগ করে চলে যাচ্ছে কারণ আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি! ও একা একা ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, আমি কেন গেলাম না? মায়া, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না? ওর বুক দিয়ে রক্ত পড়ছে!”
মায়া নোবারাকে জোর করে ধরে মেঝের ওপর বসিয়ে দিল। সে নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“ম্যাম, বস নেই! উনি নেই! আপনি কেন নিজেকে এভাবে শেষ করছেন? উনি কি চেয়েছিলেন আপনি এভাবে পাগলামি করুন?”
নোবারা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। মায়ার কান্নার শব্দটা তাকে যেন এক মুহূর্তের জন্য বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। তার চোখের উন্মাদনা কমে গিয়ে সেখানে এক অগাধ বিষাদ নেমে এল। সে মায়ার ভিজে যাওয়া মুখটার দিকে তাকাল। নোবারার ভেতরে যে দক্ষ অফিসারটা লুকিয়ে ছিল, সে যেন এক মুহূর্তের জন্য জেগে উঠল। সে নিজের আবেগকে শাসন করার চেষ্টা করল।
“জানি মায়া… আমি জানি ও নেই।” নোবারার কণ্ঠস্বর এখন একদম নিচু, যেন কবরের ভেতর থেকে আসা কোনো প্রতিধ্বনি।
“আমি জানি এই চোখ দুটো আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু জানো? এই মিথ্যেটাই আমার এখন একমাত্র সত্যি। সত্যিটা বড্ড বিষাক্ত মায়া, সত্যিটা আমার নিশ্বাস বন্ধ করে দেয়। আমি যদি জেনিনকে না দেখি, তবে আমি বাঁচব কী করে?”
নোবারা মায়ার হাতটা নিজের বুকের ওপর রাখল। “শোনো মায়া, এখানে এখনো একটা হাহাকার হয়। মাঝরাতে যখন পাহাড় শান্ত হয়, তখন আমি শুনতে পাই জেনিন আমার নাম ধরে ডাকছে। ও বলছে, নূরা, আমাকে জড়িয়ে ধরুন, আমি শান্তিতে ঘুমাবো!”
মায়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। সে বুঝতে পারল, নোবারা পাগল হয়ে যায়নি, সে আসলে ভালোবাসার এক এমন স্তরে পৌঁছে গেছে যেখানে জীবন আর মৃত্যুর সীমানা মুছে গেছে। নোবারার এই হ্যালুসিনেশনগুলো আসলে তার মনের এক ধরণের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা তাকে পুরোপুরি ভেঙে পড়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে।
রাত যখন আরও গভীর হলো, নোবারার শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করল। প্রচণ্ড জ্বরে সে আবার অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করল। সে জেনিনের রক্তমাখা শার্টটা খুঁজতে লাগল।
“কোথায় ওটা? ওই শার্টটা দাও আমাকে! আমি ওটা ধুয়ে দেব! জেনিন নোংরা শার্ট পরে থাকতে পারে না! মায়া, দাও না আমাকে!” নোবারা জ্বরের ঘোরে ছটফট করতে লাগল।
মায়া নোবারার মাথায় জলপট্টি দিতে শুরু করল। নোবারা মাঝেমধ্যে ডুকরে উঠছে, মাঝেমধ্যে জেনিনের নাম ধরে ডাকছে। বাইপাস ভিলার এই নিঃসঙ্গ ঘরে এক নারীর হৃদয় আজ তিলে তিলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। জেনিন নূরশাদ হয়তো পরপার থেকে দেখছেন তার আমানতের এই করুণ দশা। ভালোবাসার এই দহনকাল যে কতটা দীর্ঘ হতে পারে, তা যেন আজ এই পাহাড়ের প্রতিটি পাথর সাক্ষ্য দিচ্ছে!
নোবারা শেষ রাতের দিকে একটু শান্ত হলো। সে মায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ঘোরেও তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রুতে ছিল এক হারানো সম্রাটের জন্য এক নিঃস্ব রানীর শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য। জেনিন নুরশাদ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া এই বিরহ আজ নোবারার অস্তিত্বের সাথে মিশে গেছে!
<><><><><><><><><>
বাইপাস ভিলার ওপর দিয়ে আজ এক বিষণ্ণ হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা বিকেলের ম্লান আলোয় ঘরের ধুলিকণাগুলো স্থির হয়ে আছে, যেন সময় নিজেই এখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। নোবারা মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ে আছে, তার হাতটা এখনো চিঠিটার ওপর রাখা। জেনিনের শেষ স্মৃতিটুকু সে বুকের সাথে এমনভাবে চেপে ধরে আছে, যেন ওটা সরালেই তার হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে যাবে। আজ প্রায় তিনদিন হতে চললো, তার জেনিন তাকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়েছে! লোকটা তো ফিরে এলোই না, উপরন্তু তাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে নিজে হারিয়ে গেল! লোকটার কি তার নূরার উপর মায়া হয় না? এই যে মেয়েটার মৃতপ্রায় দশা, সে কি সামনে থেকে এর এক শতাংশ ও দেখতে পারতো?
ঠিক এই সময় ভিলার প্রধান ফটকে একটা সাদা পুলিশের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল নানামি, তার ঠিক পেছনে নামল তনুজা। তনুজার চোখেমুখে এক প্রগাঢ় উদ্বেগ! জীবনে কখনো কখনো এমন কিছু আকস্মিক ঘটনা ঘটে যে, তখন আমরা কথা বলাতেও খেই হারিয়ে ফেলি! তনুজার ও হয়েছে তা। কিন্তু নানামির দায়িত্ব কেও সে এড়িয়ে যেতে পারে না, সে নানামিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। পৃথিবীর প্রায় সকল স্ত্রী বোধহয় এমনি, ভালোবাসার মায়ায় জড়ালে তারা তাদের স্বামী ভালো কিংবা খারাপ কাজ করছে নাকি তাও পরোয়াই করে না! নোবারা তনুজার মতো স্ত্রীরা ঠিক এমনই!
মায়া বারান্দা থেকে ওদের দেখে নিচে নেমে এল। তার চোখমুখ শক্ত। নানামিকে দেখার সাথে সাথে মায়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ইউজি নেই, তাই মায়া নিজেকেই এখন এই ভিলার রক্ষক মনে করছে। যদিও মনে করতে হবে না, কারণ জেনিন নিজ হাতে মায়াকে সকল দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিল, ইউজির পর এর বিশ্বস্ত এজেন্ট হিসেবে।
“কেন এসেছেন?” মায়া সোজাসুজি প্রশ্ন করল, তার কণ্ঠে কোনো সৌজন্য নেই।
নানামি এক মুহূর্তের জন্য মায়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ঘৃণার প্রতিফলন দেখে সে চোখ সরিয়ে নিল। নানামির কণ্ঠস্বর এখন বড্ড নিচু, “নোবারাকে নিতে এসেছি। ওর এখানে একা থাকা আর নিরাপদ নয়। শহর থেকে বড় একটা ফোর্স আসতে পারে তল্লাশিতে। আমি চাই তার আগেই ওকে রাঙামাটি সরিয়ে নিতে।”
মায়া ব্যঙ্গ করে হাসল।
“নিরাপদ নয়? যার কারণে উনি আজ জ্যান্ত লাশ, সেই আপনিই কি ওনাকে নিরাপত্তা দেবেন? জেনিন বসের বুলেটটা তো আপনিই চালিয়েছিলেন, তাই না?”
নানামির চোয়াল কেঁপে উঠল। সে কোনো উত্তর দিল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তনুজা মায়ার হাতটা ধরল। তনুজার চোখে পানি। সে কাঁপা গলায় বলল, “আমি জানি না আপনি কে। তবে বিশ্বাস করুন, ও যা করেছে তা ওর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু নোবারা আমার বোনের মতো। ও এইখানে জেনিনের স্মৃতি আগলে ধরে থাকলে সত্যিই পাগল হয়ে যাবে। ওর এখন ভালোবাসা আর সেবা দরকার। প্লিজ, আমাদের ওর কাছে নিয়ে চলুন।”
মায়া আর বাধা দিল না। সে জানে, নোবারার অবস্থা এখন এমন যে মায়া একা তাকে সামলাতে পারছে না। উপরন্তু তনুজার কথায় সে ভরসা পেয়েছে। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় সে এইটুকু তো উপলব্ধি করতেই পারে! সে ওদের নিয়ে দোতলার সেই অন্ধকার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজাটা খুলতেই এক ভ্যাপসা গরম আর কান্নার গন্ধে তনুজার নাভি পর্যন্ত মোচড় দিয়ে উঠল। ঘরের এক কোণে নোবারা পড়ে আছে। তার চুলগুলো অবিন্যস্ত, শাড়িটা কুঁচকে একাকার। তনুজা দৌড়ে গিয়ে নোবারার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
“নোবারা? বোন আমার… একি হাল করেছো নিজের?” তনুজা নোবারাকে জড়িয়ে ধরল।
নোবারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তার শূন্য দৃষ্টি ছাদের দিকে স্থির। সে যেন চিনতেই পারছে না তনুজাকে! তনুজা ওর মুখটা নিজের হাতের তালুতে তুলে ধরল। নোবারার গাল দুটো বসে গেছে, সেখানে এখন আর সেই রক্তিম আভা নেই।
নানামি দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। জেনিনকে মারার পর সে ভেবেছিল সে আইনের জয় করেছে, কিন্তু আজ নোবারার এই দশা দেখে তার মনে হচ্ছে সে আসলে এক বিশাল অপরাধ করেছে। জেনিনের মতো এক পাপিষ্ট পুরুষের জন্য এই নারীর যে ধ্বংসাত্মক ভালোবাসা, তার সামনে নানামি নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে করল!
নোবারা হঠাৎ বিড়বিড় করে উঠল,
“জেনিন… আপনি এসেছেন? জেনিন..!”
নোবারার হ্যালুসিনেশন নানামির বুকে তপ্ত শলার মতো বিঁধল। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এই সেই নোবারা, যে এক সময় স্কুলে নিজের বুদ্ধির দীপ্তিতে সবাইকে চমকে দিত, যার প্রেমে পড়ে দুই বন্ধুর বিচ্ছেদ হয়েছিল। আজ সে কিনা এক ছায়ার সাথে কথা বলছে!
তনুজা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নোবারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
“জেনিন নেই নোবারা। তুমি কেন বুঝছো না? ও আর ফিরবে না। তুমি আমাদের সাথে চল, আমরা রাঙামাটি যাব, নানামির নতুন বদলি হয়েছে ওখাষে। সেখানে পাহাড় আছে, মেঘ আছে… তুমি সব ভুলে যাবে!”
ভুলে যাবে শব্দটা শুনতেই নোবারার ভেতরে যেন এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে হঠাৎ তনুজাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে এখন সেই মরণপণ তেজ।
“কে বলল ভুলে যাব? আমি কেন ভুলব? জেনিন এই ঘরে আছে, এই বাতাসে আছে!” নোবারা চিৎকার করে উঠল। তার কণ্ঠস্বর এখন এক উন্মাদিনীর মতো।
“মায়া! নানামিকে বের করে দাও এই ঘর থেকে! ওর হাতে জেনিনের রক্তের গন্ধ! ও আমার জীবন কেড়ে নিয়েছে! মায়া, ওকে সরাও!”
নানামি এক পা এগোতে চাইল। “নোবারা, শোন…”
“ছুঁবেন না আমাকে!” নোবারা ডেস্কের ওপর থেকে ফুলদানিটা তুলে নিয়ে নানামির দিকে ছুড়ে মারল। “আপনি আমার বন্ধু ছিলেন নানামি ভাইয়া, কিন্তু আজ আপনি আমার শত্রুর চেয়েও বড়। আপনি কেন ওকে মারলেন? ও তো আপনার বন্ধু না? নিজের বন্ধুকে নিজের হাতেই খুন করলেন! পিশাচ আপনি। সরে যান, সরে যান এখান থেকে।”
নোবারার এই অভিযোগের কোনো উত্তর নানামির কাছে ছিল না। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তনুজা আবার নোবারাকে জড়িয়ে ধরল, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। দীর্ঘক্ষণ ধস্তাধস্তির পর নোবারার দুর্বল শরীর আবার ভেঙে পড়ল। সে তনুজার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে লাগল। সেই কান্নার কোনো শেষ নেই, কোনো শুরু নেই। ওটা এক অন্তহীন হাহাকার।
শেষে ইনজেকশন দিয়ে নোবারাকে সাময়িকভাবে ঘুম পাড়ানো হলো। তনুজা আর মায়া মিলে ওর কাপড় বদলে দিল।
সন্ধ্যা যখন গাঢ় হলো, তখন নোবারাকে কোলে করে গাড়িতে তোলা হলো। সে ঘুমের ঘোরেও বিড়বিড় করে ‘জেনিন’ ‘জেনিন’ বলে ডাকছিল। মায়া ভিলার গেটে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। এই কয়দিনে মেয়েটার উপর মায়ার বড় মায়া সৃষ্টি হয়েছে! প্রতিটা মুহূর্ত সে নোবারাকে আগলে রেখেছিল। কিন্তু আজ নোবারার তার এই সাময়িক দ্বিতীয় সংসার টাও ছেড়ে যাওয়ার সম। হয়েছে। নুরশাদ ভিলা থেকে বাইপাস ভিলা, নোবারা কেবল এক অনিশ্চিত যাত্রায় ছিল। আজ সেই যাত্রার সমাপ্তি ঘটলো যেন!
নানামি তনুজাকে নিয়ে গাড়িতে উঠল। গাড়িটা যখন পাহাড়ের বাঁক নিয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো, তখন বাইপাস ভিলা এক অতল অন্ধকারে ডুবে গেল। এই ভিলার এজেন্ট বডিগার্ড সবাই তাদের মালকিনের এঅ বিষাদময় বিদায় দেখলো। কেউ কেউ কেঁদে উঠলো, আবার কেউ কেউ মুক্তির খুশিতে উল্লাস করলো!
রাস্তার দুই পাশে জঙ্গল আর পাহাড়। নোবারার মাথা তনুজার কোলে। তনুজা জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, যে ভালোবাসার শুরু হয়েছিল এক সিআইডি অফিসার আর এক মাফিয়ার দ্বন্দ্বে, তার শেষটা কি আসলেই এমন বিষাদময় হওয়ার কথা ছিল? কোন এক অলৌকিক ক্ষমতায়, যদি…যদি জেনিন নুরশাদ আবারো এই ধরিত্রীতে ফিরে আসতো!
চলবে ইংশাআল্লাহ…….

