#কথা_দিলো_রোদ্দুর (৪)
#তুসিকা
রুমে এসেই অর্থি প্রথমেই গায়ে জড়ানো শাড়িটি খুলল, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়েই গা এলিয়ে দিল বিছানায়। সবার সামনে নিপা তাকে অপমান করলো, একপ্রকার খাওয়ার খোটা পর্যন্ত দিল,, কিন্ত উপস্থিত তার মা কিছুই বলল না। অর্থির রাগ হলো একটু। বাইরে সকলের সামনে সে চুপ থাকে, সবার মুখের উপর কথা বলতে পারে না,, তাই বলে সব সময় কি এসব সহ্য করা যায়!!
নাক ফুলে উঠলো অর্থির,, গলা ধরে এলো,, তবে অর্থি জানে এই মুহুর্তে কি করলে তার মন শান্ত হবে। তাই ফোনটা হাতে নিল, কল লিস্টে “আমার বাবা” লেখাটি জ্বলজ্বল করছে, সেখানে স্পর্শ করতেই ভেসে উঠল অর্থি আর তার বাবার ছবি। বেশ আদুরে ছবি,,অর্থির মনে আছে এটি হলো তখনকার যখন অর্থের প্রথম জন্মদিন পালন করা হয়েছিল।
ফ্রেমে মা রেবেকা বেগম, তার কোলে অর্থ, পাশেই তার বাবা জাবের আহমেদ আর জাবের সাহেবের বাহুবন্ধনে অর্থি। ফ্রেমে তো তারা চারজনই আছে তবে অর্থি শুধু তার আর বাবার ছবিটি আলাদা করে কেটে নিয়েছে।
তাদের ফ্যামিলি ছবি বা অর্থির সাথে তার বাবার অনেক ছবিই আছে, কিন্ত অর্থির এই ছবিটি খুব পছন্দ তাই ফোনের কল লিস্টে এবং কি তার রুমে ও এমন একটি ছবি টানানো।
অর্থি কল দিল তার বাবার ফোনে, ফোনে কলার টোনে গান চলছে; গান টা অর্থি নিজেই দিয়েছিল;
—কাটে না সময় যখন আর কিছুতেই,
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসেনা,
জানালা গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা, মন হয় বাবার মতো কেউ বলে না,,
আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়!
প্রথম বার রিসিভ হয়নি, রাত হয়েছে, তাই হয়ত ঘুমাচ্ছে, কিন্ত তবুও অর্থি দ্বিতীয়বার কল দিল। অর্থির যত অবদার, যত মান, অভিমান, অভিযোগ সব জাবের সাহেবের কাছে। অর্থির জীবনে সে দুটো মানুষের সাথে নিজের মান অভিমান, রাগ ঘৃনা, সব দেখাতে পারে, এক হচ্ছে তার বাবা, দ্বিতীয় হচ্ছে তার ভাই অর্থ। এই দুই পুরুষ ছাড়া অর্থি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে ও কিনা সে জানে না।
তাই বাইরের মানুষকে তো কিছু বলতে পারে না কিন্ত অর্থ যখন অর্থি কে মোটা, মুটি বলে ক্ষেপায় তখন সে বিনা দ্বিধা য় অর্থের সাথে তর্ক করতে পারে। নির্দ্বিধায় দুই তিন ঘা বসিয়ে দিতে পারে পিঠের উপর। আর বাবার কাছে ও নালিশ দিতে পারে ভাইয়ের নামে।
তাই তৃতীয়বার ও কল দিল। এবার জাবের সাহেব রিসিভ করলেন।
অর্থি প্রথমেই সালাম দিল। জাবের সাহেব ও ঘুম জড়ানো কন্ঠে সালামের উওর দিলেন। আর বললেন;
—” কি হয়েছে মা, এত রাতে কল দিয়েছে, ওখানে সব ঠিক আছে তো। মজা কেমন করলে হলুদের প্রোগ্রামে।
মুখ ফুলিয়ে নিল অর্থি, আর ফোনের অপর পাশে মধুর সেই দুটি শব্দ উচ্চারণ করলো,
—” বাবা,,
মেয়ের এমন ডাক শুনে জাবের সাহেব চুপ রইল, তিনি হয়ত বুঝতে পারলেন কিছু হয়েছে, কিন্ত অর্থির কথা না বলা পর্যন্ত তিনি কিছু বললেন না। ফোনের অপর পাশ থেকে ও যেন নিরব কথা হলো বাবা, মেয়ের মাঝে।
নিপা, মেহেদী, মাহা এরা অর্থিদের নিজ মামাতো ভাই বোন নয়। ওদের বাবা ফারুক সাহেব অর্থির মায়েদের জেঠাতো ভাই, কিন্ত নিজের ভাইয়ের থেকে বেশি আপন করে নিয়েছেন তাদের। তাই তো অর্থির বড় মামা সোহেল সাহেব থাকা সত্ত্বেও ফারুক সাহেব কে বড় মামা হিসেবেই মানে, আর সোহেল সাহেব কে মেজো মামা হিসেবেই ডাকে। নিজ র’ক্তের থেকে ও তারা বেশি করে একে অপরের জন্য, আর ফারুক সাহেব ও তাদের বড্ড আদর করেন।
তাই নিপা আর তার মা নাশিদা বেগম যে কথা বলেছে এই গুলো বলে ফারুক সাহেব কে ছোট করতে অর্থির মন সায় দিল না। তাই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল;
—”বাবা আমি কারন বলবো না, কিন্ত যদি বলি এখানে আমার ভালো লাগছে না, তুমি কি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে!!
জাবের সাহেব কথা শুনে অবাক হলেন না, এমনটা অর্থি আগে ও করছে, আর যখন অর্থি নিজে থেকে স্বাভাবিক হয়েছে তখন নিজে থেকে মন খারাপ কারণ বলেছে।
তাই তিনি অর্থিকে বললেন;
—” তোমার মাকে কি বলবো,, এমনিতেই আমি যাই নি দেখে তার কত রাগ।
—”জানি না, …. আচ্ছা বলো কাল কলেজে রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিতে হবে, আমার সাইন ও লাগবে, এটা শুনলে কেউ জোর করবে না থাকতে।
—” আচ্ছা,,
—” তোমাকে বিরক্ত করেছি বাবা,,
অর্থির কথায় জাবের সাহেব হাসলে;
—” আমার মা জন্য তার বাবা কখনো বিরক্ত হবে না,, দাও এখন ফোন রেখে ঘুমাও। বেশি রাত জাগলে আবার শরীর খারাপ করবে।
ঠিক আছে বলে অর্থি ফোন রেখে দিল,, এখন তার কাছে একটু শান্তি লাগছে,, কিন্তু পেটে একটু একটু গুরগুর করছে খিদের কারনের। বিকেল থেকে কিছুই পেটে পড়েনি, আর একটু আগে যা হলো তাতে সে এখন বাইরে খেতে যাবে না। তাই সেভাবে অর্ধ শোয়া হয়ে পা দুলিয়ে রাখলো। কিন্ত কিছুক্ষণ বাদে দরজার কড়াঘাতে হুড়মুড় করে উঠে বসলো,,
ওড়না গায়ে নিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো তার মা রেবেকা বেগম দাঁড়িয়ে আছে। অর্থি দরজা পাশ থেকে সরে এসে আবারো বিছানার উপর বসলো। রেবেকা বেগম ঘরে এসে হাতের বাটি খানা টেবিলের উপর রাখলেন,,, তাকালেন অর্থির দিকে,, সে মুখ ঘুরিয়ে আছে। তাই রেবেকা বেগম ক্ষীণ রাগ নিয়ে বললেন;
—”তোরা সব সময় এমন কেন করিস আমার সাথে বলতো, তোর বাবা কে কত করে বলেছি আসতে, কিন্ত তিনি আসবেন না সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে,, এখন তোরা এসেও এসব নাটক করছিস।
কেন চলে এলি খাওয়ার ওখান থেকে, সবাই কি ভাবলো বলতো,, আর নিপা তো তোর ভালোর জন্যই বলেছে, তাই বলে এমন করে উঠে আসলি, কি বলবে বলতো ওরা।
অর্থি মায়ের সাথে একটা কথা ও বলছে না, সবাই কি বলবে, সবাই কি ভাববে, কার মনে কষ্ট লাগবে, সব সময় এমনটা চিন্তা না করে যদি রেবেকা বেগম এটা বলতেন;
–” কিছু মনে করিস না, ওরা ওইরকম, এসব কথায় কান দিস না, সব সময় মানুষ যা বলে তা চিন্তা করতে হয় না,,,
এসব যদি বলতেন তবে তার মনের জমাকৃত অভিমান টা একটু একটু ক্ষয়ে যেত। মায়ের সাথে ও সম্পর্কের টান টা ভেতর থেকে অনুভব করতো। কিন্ত না, আমরা সব সময় অন্যের টা ভাবি, অন্যের টা চিন্তা করি। এই যেমন রেবেকা বেগম বললেন, ওরা কি চিন্তা করবে, ওরা কি বলবে,, এমন না বলে যদি বলতো তুই কি চিন্তা করেছিস অর্থি, তোর কোথায় খারাপ লেগেছে,,, কিন্ত বলবে না।
এসব ভাবনার মাঝে রেবেকা বেগম অর্থির সামনে বাটি খানা ধরলেন। রেবেকা বেগম দুধ মুড়ি এনেছেন তার জন্য। তিনি জানেন এভাবে অর্থি খাবে না। তাই চামচ দিয়ে তার মুখের সামনে ধরলেন।
—”খেয়ে নে,,,, না খেলে পেটে ব্যাথা করলে তুই জানিস।
এর মধ্যে বড় খালা শাজেদা বেগম আর মেজো খালা নাহিদা বেগম আসলেন, রেবেকা বেগম কে ধমক দিতে মানা করলেন, আর মেজো খালা নিজেই অর্থিকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। খালামনির আদর পেয়ে অর্থি খেল খাবার টা।
—” এই তো আমার ভালো মেয়ে, যা ও এখন ঘুমিয়ে পড়ো, সকাল না হতেই আবার বিয়ের জন্য হুলস্থুল কান্ড শুরু হবে।
এতক্ষণ মনের মাঝে পুষিয়ে রাখা অভিমান টা হালকা হলো, তবে আরো ভালো লাগছে তার বাবা তাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে বলেছে সেই জন্য। তাই সে কিছু বলল না, মা খালারা যেতেই শুয়ে পড়ল। কিন্ত চোখে ঘুম ধরা দিল না,, বালিশ চেঞ্জ হলে তার ঘুম আসেনা, তাই ফোন নিয়ে বারান্দায় গেল। যুথি এখনো অনলাইনে ই আছে। নিশ্চয়ই আনিস ভাইয়ের সাথে কথা বলছে, তাই সে ছোট্ট একটি ট্যাক্স দিল।
মিনিট পাঁচেক পর যুথি নিজেই কল দিল,,
—”কি রে ঘুম পাগলি আজ এক টা পর্যন্ত জেগে আছে,,
—”মন খারাপ!
—” কেন রে অর্থি, কি হয়েছে,
—”নিপা কটকটি টা খাবার খাওয়ার সময় কথা শুনিয়েছে,,, সবাই ছিল জানিস, সবাই হেসেছে!
ফোন লাউড স্পিকারে ছিল, যুথি যা বলছে সব শোনা যাচ্ছিল স্পষ্ট ভাবে।
—”শাকচুন্নি টার এত সাহস,, নিজেকে দেখেছে কখনো, গায়ের হাড্ডি বেরিয়ে গেছে, কেমন কঙ্কাল কঙ্কাল লাগে। আমাদের কলেজে সাইন্স এক্সিভিশনের জন্য একদম পারফেক্ট হবে। আর সে কিনা আমার অর্থির মতো গোলুমুলু একজন কে এসব কথা বলে,, কুটনি, বান্দরের নানি।
কি হলো কথা বলছিস না কেন,,,
—”এখানে আর ভালো লাগছে না,
—” বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছে, তাইনা।
—”হুম! কাল বাবা এসে নিয়ে যাবে বলল।
—”আচ্ছা অর্থি এমন কতদিন চলবে বল, কারো মন্তব্যে তুই যেভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিস, সামনে ভবিষ্যতে কি করবি বল! সামনে পুরো জীবন তো আরো কঠিন হবে!! এবার একটু স্টং হ,, নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তোল। বুঝেছিস।
–”হুম,,,
—” আচ্ছা যা, ঘুমা এখন,, ওখান থেকে আসলে আমাদের বাসায় কয়দিনের জন্য তোকে নিয়ে আসবো,,,
—”হুম….
আরো কিছুক্ষণ কথা বলে যুথি ফোন রেখে দিল,, যুথি তাকে প্রায় এমন কথা বলে,, তার এই স্বভাবের জন্য প্রায়ই বকা দেয়। কিন্ত আবার বড় বোনের মতো আগলে নেয়। অর্থির তখন মনে হয় তার যদি নিজের একটি বড় বোন থাকতো তবে তার জীবনের দুশ্চিন্তার চাপ একটু হলে ও কম হতো।
_________
পরদিন সকাল সকাল রীতিমত শান্ত ভাবেই কাটল। বিয়ে বাড়ি যেমন জাঁকজমক হবে তা মোটে ও মনে হলো না। হবে কেমন করে, সারারাত হইহুল্লোর করে সবাই ঘুমে লুটোপুটি খাচ্ছে, অর্থির ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় রাত দুই টা। তখন ও ছাদে সবার উপস্থিতি টের পাচ্ছিল। খাওয়া দাওয়ার পরও তারা ছাদে আনন্দ উল্লাস করছিল যে সে ঠিকই টের পাচ্ছিল।
তবে এখন যে কেউ জেগে নেই এতেই শান্তি পাচ্ছিল অর্থি। নিরিবিলি নাস্তা করেই রুমে বসে থাকবে, আর বাবা আসার অপেক্ষা করবে। তাই খালামনি নাস্তা দিতেই চুপচাপ খেতে লাগলো,,
কিন্ত এই সময়ে সাম্য নামের লোকটা কে সে এখানে আশা করেনি, সে এসেছে কফি চাইতে, তার নাকি মাথা ব্যাথা করছে,, নাহিদা বেগম ও তার জন্য কফি করতে গেলেন, আর লোকটা তার সামনেই দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না নাহিদা বেগম আসলো। তবে এইটুকু সময়ে অর্থি চোখ তুলল না। সাম্য কফি নিয়ে যেতেই তাড়াতাড়ি সে করে নাস্তা করে রুমে গেল।
অর্থির বাবা আসলো এগারো টার দিকে। বিয়ে বাড়ি তাই ফল, মিষ্টি সব নিয়েই এলেন। সবাই ভেবেছিল বিয়ে উপলক্ষে এসেছে কিন্ত যখন বললেন তিনি অর্থি কে নিতে এসেছেন তখন সবাই মানা করলো,, রেবেকা বেগমের তো বাপ মেয়ের প্রতি ভীষণ রাগ। তবে জাবের সাহেব বুঝিয়ে বললেন;
—”দেখ অনুষ্ঠান তো আসবে যাবে, এখন কলেজ থেকে ফোন করেছে জরুরী ভিত্তিতে না হলে তো আর ফোন করতো না,,, তাই বলছি অর্থি কে নিয়ে আমি রওনা হই তুমি অর্থ কে নিয়ে বৌভাত সেরে আসো।
জাবের সাহেবের কথা শুনে নাহিদা বেগম বললেন;
—” এটা কি বলছো জাবের,, আজ না হয় কলেজে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে বলে নিয়ে যাচ্ছে ওকে,, তাই বলে বৌ ভাতে ও আসবে না, এটা কেমন কথা।
—” না আপা, এমন কিছুই না,, যদি কাজ না থাকে চেষ্টা করবো অবশ্যই আসতে।
তখন সবাই অনেক করে বলল বিয়েতে থাকছে না কিন্তু বৌ ভাতের সকালে যেন চলে আসে,, জাবের সাহেব সায় জানালো,, কিন্ত অর্থি জানে তারা আর আসবে না। তাই নিজের যা কিছু তা অন্য একটি ব্যাগে আগেই রেখেছিল,, সেটা নিয়েই বের হলো খালামনিদের বাসা থেকে।
তাদের সবাই এগিয়ে দিল, তবে মেইন ফটক পার হতেই পেছন থেকে শব্দ শুনে তাকাতেই দেখলো দোতালা বরাবর বাম পাশে বারান্দায় সাম্য নামের লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, দৃষ্টি তাদের দিকেই। তবে অর্থি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। গাড়ি চেপে চলল নিজের বাসার উদ্দেশ্যে।
চলবে।
(আচ্ছা বাবা মেয়ের সম্পর্ক টা কেমন লাগলো আপনাদের??
একটা কথা বলি উপরের বাবা মেয়ের কিছু অংশ কিন্ত আমি আমার নিজের সাথে যা হয় তাই লিখেছি,, তাই কেউ অবাস্তব মনে করবেন না,,, আমি ও এমন আবদার করি,, আর একটু জানাবেন কেমন লাগছে,, )

