#কথা_দিল_রোদ্দুর (৬)
#তুসিকা
সূর্যি মামার আগমনের সাথে নতুন একটি দিন শুরু হয়েছে ধরনীতে, প্রতিদিন যেমন কাটে সকালটা আজ তেমন কিছুই হলো না,, উল্টো অর্থির আজ দিন শুরু হলো রান্নাঘর থেকে। রোজ তো সকালে উঠে পড়তে বসে, না হলে ছাঁদে গিয়ে দশ পনেরো মিনিট হাঁটে বা একটু ব্যায়াম করে।
আর অর্থি ছাঁদ থেকে আসতেই দেখে তার বাবার খাওয়া শেষ হয়ে তিনি অফিসের জন্য রওনা দিবেন, আর তার মা অর্থ কে ডাকতে ডাকতে হয়রান হবেন। আর শেষে তার রেশ গিয়ে ঠেকবে অর্থির উপর।
মায়ের কথা শুনে অর্থি প্রায় সময় চুপ থাকে, মাথা নিচু করে শুনে রেবেকা বেগমের কথা গুলো কিন্তু কোনো ক্রমে যদি রেবেকা বেগমের মুখের উপর একটু উওর করে তখনই হলো! তিনি তার চিরচেনা সংলাপ গুলো বলতে থাকেন….
–” এই জন্য তোদের মানুষ করছি,, মা কথা বলছে শুনে থাকবে তা না, তোরা আমার মুখের উপর উওর করছিস,, খুব বড় মনে করিছিস নিজেকে তাই না। আজকাল আমার কথার কোনো দাম আছে নাকি এই পরিবারে,, কাজের লোকের মতো সারাদিন এই পরিবারের জন্য খাঁটি, শেষে কিনা ছেলে মেয়েরা ও আমার মুখের উপর তর্ক করে। দেখতাম তো দুদিন যদি না থাকি গরুঘরের থেকে খারাপ অবস্থা হবে এই পরিবারের।
এবার একটু দম নিয়ে হাতে থাকা কাজটা রেখে তিনি আবার ও বলতেন;
” অন্য কেউ হলে আমার মতো এভাবে সংসার টাকে গুছিয়ে নিত না, আমি আছি বিধায় তোদের সকল অত্যাচার সহ্য করছি, আর এতকিছু করে আমারই কিনা কোনো মূল্য নেই।
এমন চিল্লাচিল্লি শুনে অর্থ নিঃসন্দেহে ঘুম থেকে উঠে পড়তো, আর অর্থি নিজের রুমে বই খাতা নিয়ে বসতো।
কিন্তু আজ মা না থাকায় ঘরটা শান্ত লাগছে আর তার জন্য আর বাবার জন্য রান্না টা সেই করছে,
জাবের সাহেব বলেছেন বেশি কিছু করা লাগবে না ভাত করলেই হবে ফ্রিজে যা তরকারি আছে তা দিয়েই তিনি খাবেন কিন্ত অর্থি একটু পাকনামো করে আবার তরকারি রান্না করতে গেছে, আর সবজি কাটতেই হাত কেটে বসেছে। অর্থি রান্না পারে, পেঁয়াজ, মরিচ এসব কাটতে পারে কিন্ত সব্জি জিনিস গুলো একটু কম কাঁটতে পারে, তার উপর কিছুদিন হলো বটিতে শান দেওয়া হয়েছে, তাই তো বেঁফাসে হাত কেটে গেছে।
হাতটা একটু জ্বলছে কিন্ত অনেক মেয়ে আছে না পরিবারের আদরের, সামান্য একটু ব্যাথা পেলে, সামান্য একটু কেটে গেলে সারা ঘর মাথায় তোলে, ন্যাকামো শুরু করে,, অর্থি তাদের মতো নয়, সে নিজের ব্যাথা বেদনা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। তাই তো হাত কেটে যাওয়ার বিষয়টা তার বাবা জাবের সাহেব কে বলল না। সহজ করে শুধু মাছ ভাজি, ডিম ভাজি আর ডাল রান্না করল। রান্না শেষে পুরো রান্না ঘর পরিষ্কার ও করে রাখলো, মা যেন রান্নাঘর অপরিষ্কার দেখে কিছু বলতে না পারে।
শেষে সব কাজ করে বাবার দুপুরে খাওয়ার জন্য টিফিন বক্সে খাবার টা বেড়ে দিল।
জাবের সাহেব ও হাসি মুখে টিফিন বক্স নিয়ে চলে গেলেন অফিসে, যাবার আগে অবশ্য অর্থিকে কলেজে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে গেলেন আর বললেন কলেজ থেকে ফিরলে তাকে যেন ফোন করে জানায়।
আচ্ছা বলে জাবের সাহেব যেতেই অর্থি প্রথমেই গোসল সেরে নিলো, রান্না করতে একটু দেরী হয়ে গেছে বলে কলেজের জন্য তৈরি হয়ে নিল।
প্রতিদিন সে ওজন কমানোর সুবাদে আগের দিন রাতে ভেজানো জিরা পানি নয়ত সিয়া সিড খায় কিন্ত কাল রাতে সেগুলো ভেজানোর কথা মনে ছিল না বলে আজ আর খাওয়া ও হলো না,, আর কলেজে যেতে দেরী হবে বলে নাস্তা খেয়ে প্রতিদিন যে গ্রিন টি খায় সেটা ও খেলো না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজায় তালা দিল।
তালা দেওয়া দরজা টা দু তিন বার টেনে দেখলো তালা ঠিক ভাবে লেগেছে কিনা, এর পরে ও নিজের মনের খুতখুতানি থেকে তাদের বাসায় যে নতুন ভাড়াটে এসেছে সেই আন্টিকে বলল তাদের পাশটা একটু দেখতে। ভদ্র মহিলা বললেন তিনি দেখে রাখবেন। ভদ্র মহিলা ওনারা অর্থিদের বাসায় তিন মাস হলো এসেছে, খুব ভালো মহিলাটি। তার একটি ছয় বছরের মেয়ে ও আছে। দেখতে যেমন মিষ্টি,তার নাম ও মিষ্টি। অর্থি দেখা হলেই চকলেট দেয়, আজ ও দিল আর মিষ্টি কে একটু আদর করে চলে গেল কলেজের উদ্দেশ্য।
_________
বিয়ের একদিন পর সাধারণত বৌভাত অনুষ্ঠান করা হয়, কিন্ত তিশার বরের চাকরির সুবাদে বিয়ের পরদিনই বৌভাত অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছে। কর্পোরেট অফিসে চাকরি করায় ছুটি কম, তাই তো সকল আয়োজন করা হয়েছে চটজলদি। সকলেই উপস্থিত হয়েছেন, বড় ঘর বাড়ি দেখে তিশার বাবা মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন পরিবার ও ভালো। আদর আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখছেন না তারা।
সকলে তাদের আপ্যায়নে সন্তুষ্ট, তাই তাদের এই সকল বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে মহিলা গ্রুপে, গ্রুপ বলতে ওই কি,, অর্থির বড় খালা সাজেদা বেগম, মা রেবেকা বেগম,ওই যে বড় মামি নাশিদা বেগম, মেজো মামি শারমিন, ছোট মামি রাইমা, আর আছেন তিশা আপুর দুই ফুফু আর এক চাচি। তিশা আপুর মা নাহিদা বেগম তো বেয়াইন আলাপে ব্যস্ত তাই তিনি মিসিং আছেন তাদের গ্রুপ থেকে।
—”হারুন ভাই কিন্তু ভালোই মেয়ের বিয়েতে টাকা খরচা করেছেন,, এখন দেখো জামাই রা তো আরো দ্বিগুন খরচা করে সব আয়োজন করেছে! মেয়ে আরাম আয়েশে থাকবে!!
সকল কিছু ঠিক আছে কিন্ত নাশিদা বেগমের এমন খোঁচানো কথা বার্তার স্বভাব কোনোদিন যাবে না,, সময় কাল পরিস্থিতি তিনি কখনোই বালাই করেন না, তাই শারমিন বেগম তাকে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বললেন,,
—” শারমিন আমি কি ওদের দুর্নাম করছি বলতো, তিশার ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে তাই তো বলছি,,,
—” নাশিদা বলার মধ্যেই ও যে একটা পার্থক্য থাকে,, আর সবার মন মানসিকতা ও তো সমান নয়, রুমে আমরা আছি কিন্ত বরের বাড়ি কেউ শুনলে কি ভাববে! আমরা তাদের নামে সমালোচনা করছি,, তখন কেমন দেখাবে ব্যাপারটা।
সাজেদা বেগমের কথায় নাশিদা বেগমের মুখের ভাব পরিবর্তন হলো,, তবে রেবেকা বললেন;
–”থাক না আপা, ভাবী কি আর ওসব চিন্তা করে বলেছেন,, বাদ দাও ওসব কথা।
সাজেদা বেগম আর কথা বাড়ালেন না, নাশিদা বেগমকে আরো কিছু বলতে মন চাইল,, তিনি সব সময়, সবকিছু নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করেন, এই স্বভাব টাই সাজেদা বেগমের কাছে সব চেয়ে বিরক্ত লাগে। তাই তিনি নাশিদা বেগমের বিষয়ে ইতি টেনে রেবেকা বেগমকে বললেন;
—”অর্থির কাছে ফোন দিয়েছিলি,,, কি করছে মেয়েটা! রান্নাবান্না করেছে তো!
—” হ্যাঁ দিয়েছি,, কলেজে গেছে মনে হয় এখন। রান্নার কথা জিজ্ঞেস করতে বলল রাইস কুকারে ভাত নামিয়েছে, মাছ আর ডিম ভাজি করলো বলেছে,,,
—” যাক একা হাতে এই টুকু করেছে এটাই অনেক,, তবে মেয়েটার জিদের কারনে না হলে ফারিশ কে দিয়ে ঠিকই এখানে নিয়ে আসতাম!
রেবেকা বেগম একটু হতাশার সুরে বলল;
—” কি বলবো আপা, একদম বাপের মতো হয়েছে, সবার সামনে দেখায় না, কিন্ত পুরো মস্তিষ্ক জেদে ভরা। এই মেয়েকে নিয়ে পরে আমি কি যে করবো আল্লাহ জানে,,, ও তো সব সময় আর বাপের বাড়ি থাকবে না, শশুর বাড়ি গেলে কিভাবে কি করবে এই চিন্তায় আমি শেষ!
—” আরে চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে!
রেবেকা বেগমের কথা শুনে নাশিদা বেগম মুখ ভেঙ্গালেন; আর একটু কটাক্ষের সুরেই বললেন;
—” জিদ হলে কি হবে রেবেকা, মেয়েকে তো দেবেই বড় বোনের ঘরে।
বড় আপা তোমার মেয়েকে এখন যেমন চোখে হারায়, পরবর্তীতে এমন কিছু হলে তো মাথায় করে রাখবে!
নাশিদা বেগমের কথার অর্থ সবাই ঠিক বুঝতে পেরেছেন, নাশিদা বেগম যে ইচ্ছা করে এমন কথা বলেছেন এটাই সাজেদা বেগম বুঝতে পেরেছেন,
অথচ সাজেদা বেগম রাগ হলেন না, ঠিক এমন স্বভাবের কারনে তিনি নাশিদা বেগমের মুখের উপর কথা বলতে দু বার ভাবে না, তবে এখন উল্টো তিনি শান্ত স্বরে বললেন;
—” তোমার এই কথা যদি বাস্তবে ফলে আমার থেকে আর কেউ খুশি হবে না,, অন্য মেয়ে গুলো থেকে আমাদের অর্থি ভীষণ সাদাসিধে, কোনো প্যাচ নেই ওর মনে,, এমন লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে কে পেলে আমি নিজ হাতে গড়ে তুলবো।
শেষে রেবেকা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন;
” কি রে রেবেকা বেয়াইন বানাবি আমাকে, তোর দুলাভাই কে বললে তিনি ও মানা করবেন না কিন্ত!
সাজেদা বেগমের কথায় রেবেকা বেগম হাসলেন, উপস্থিত সকলের মুখে তখন মুচকি হাসি, শুধু নাশিদা বেগমের মুখটা আবার চুপসে গেলেন, অন্য মেয়ে বলতে যে তাদের মেয়েদের মেয়েদের বুঝিয়েছেন এটা নাশিদা বেগমের কুটিল মন ঠিকই ধরতে পেরেছেন। তাই তিনি রেগে সেখান থেকে চলে গেলেন,,,
——
নাশিদা বেগম যেমন স্বভাবের তার মেয়ে গুলো ও হয়েছে ঠিক তেমন স্বভাবের। অন্যের প্রশংসা শুনতে বা দেখতে পারেন না। মাহা মোটামুটি একটু স্বাভাবিক হলে ও নিপা একদম হিংসুটে।
তিশার বর মিজান ভাই তিশার সকল কাজিনদের সাথে কুশল বিনিময় করে, আর অনুপস্থিত অর্থির কথা জানতে চায়। অর্থির সাথে তার একবারই কথা হয়েছিল, সেই এনগেজমেন্টের দিন,,, এরপর তাকে আর দেখেনি, কিন্ত তার কথা মিজান ভাইয়ের মনে আছে।
—” আরে অর্থির কলেজে ইমপরন্টেন কাজ ছিল বলে বিয়েতে আসতে পারেনি,, আর এতদূর জার্নি করতে হয় বলে বৌভাতে ও আসেনি।
তিশার কথা শুনে নিপা বলে;
—”কি এমন কাজ আপু বলো,, চাইলেই ও আসতে পারতো,, শুধু শুধু কলেজের অজুহাত দিয়ে গিয়ে সবার নজরে আসছে, এর বেশি কিছুই না। এমনিতে ও পড়াশোনায় তো এতো টা ভালো না।
নিপা কথা গুলো কেমন অবহেলার সুরে শোনালো, তাই মিজান ভাই বললেন;
—” যেমন ই হোক এমনটা বলা তো ঠিক না নিপা, হয়ত সত্যিই ওর কাজ ছিল,, আর এমনিতেই অর্থি খুব কম কথা বলে আর ভীষণ মিষ্টি, আমার মনে হয় না এমন কিছু।
উপস্থিত সবাই শুনলো মিজান ভাইয়ের কথা গুলো,, বেশ অপমানিত বোধ করলো নিপা,, মনে মনে ভাবলো হয়ত অর্থি ইদানীং বেশি চর্চায় এসে পড়েছে।
বিয়ে বাড়িতে আসার পর ফারিশ, তার ফুফু রা, লাবিব ভাইয়ের বউ, আর আজ তো মেহেদীর বন্ধু দুজন ও অর্থির কথা জিজ্ঞেস করলো। যে মেয়ে কারো সামনে আসে না, কারো সাথে তেমন মিশে না তার জন্যই কিনা মানুষ এত খোঁজ খবর রাখছে,, এটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি মনে হলো নিপার কাছে।
নিজের মা নাশিদা বেগমের মতো নিপা ও মুখটা বেজার করে সেখান থেকে সরে আসলো,, সারাটা অনুষ্ঠান দূরে দূরে থাকলো তাদের থেকে। মাহা, ফাহা , তানভীর এরা সবাই ডাকলো তাকে কিন্ত সে খাবার সময় তাদের রেখে মায়ের সাথে বসে খেয়ে নিল,,, সবাই তো নতুন জামাইয়ের সাথে বসে মজা করে খাবার খেল,, এটাতে একটু জেলাস হলে ও নিপা ভাবটাই ছিল অন্য রকম।
কিন্তু পরে যখন শুনলো বড় ফুফু, লাবিব ভাইয়েরা, মেহেদী সহ তার তার ফ্রেন্ড রা সকলে অর্থিদের বাসায় যাবে নিপা রাগ যেন বিনা কারনে বেড়ে গেল।
চলবে
কেমন হচ্ছে জানাবেন কিন্ত, আমি কিন্ত সাধারণ ভাবেই লিখছি,, আর লিখতে লিখতেই ভাবী সবার পছন্দ হবে তো!! এই যেমন এই পর্বে ও সেইম অবস্থা, তাই আগে আপনাদের জিজ্ঞেস করে নিয়েছি,,, যারা আগ্রহী থাকেন তাদের ধন্যবাদ 🥹। আর যারা চুপচাপ গল্প পড়েন তাদের বলছি একটু রিয়েক্ট করুন পোস্টে।
আর সামনের দুই চার পর্বের পর ভালো লাগার মতো পর্ব আসবে,,, কিন্ত মাঝে পর্বে কি হবে???

