কথা_দিলো_রোদ্দুর (৮) #তুসিকা

0
2

#কথা_দিলো_রোদ্দুর (৮)
#তুসিকা
মাহিয়া ভাবী আসতেই ফারিশ টুপ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল, যাবার আগে অবশ্য অর্থি কে ইশারা করলো সে যেন ভাবী কে কিছু না বলে,, অর্থি ও হালকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক অর্থ বোঝায়।

অদ্যদিন তো পড়ার টেবিলে বসলেই দুই তিন চ্যাপ্টার ওলোট পালোট করলেই চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ধরা দেয়। অনেক সময় তো ঘুম চোখে পড়ে বারি ও খায় টেবিলের উপর। আর মা এসে বকাঝকা করতেই তড়িঘড়ি করে ওঠে, আর নাহলে ঘুম কাটানোর জন্য ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসে। কিন্ত আজ অর্থির চোখে সেই চোরা ঘুম নেই। কারন আজ তার পাশে ছোট্ট লুবান রয়েছে। সে ও ভারী দুষ্টু, অর্থির গা ধরে হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে চাইছে, ছোট ছোট মোলায়েম হাত দিয়ে অর্থির শরীরে বারি দিচ্ছে, তাই তো অর্থির মন পড়ার দিকে নেই।

অর্থির ছোট মামাতো বোন জুন এর পর লুবান ই তাদের পরিবারের আদরের মনি! একদম রসগোল্লার মতো হয়েছে লুবান, ছয় মাসে পড়বে কিছুদিন পর কিন্ত হাত পা এদিক সেদিক করে মুখে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে অর্থিকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করছে। বোঝাচ্ছে হয়ত তার সাথে যেন খেলা করে একটু, তাকে যেন কোলে নেয়।

অর্থির বাচ্চাদের দেখলে আদর দিতে ইচ্ছে করে কিন্ত সে কোলে নিয়ে ঠিকভাবে সামলাতে পারে না,, তাই লুবান কে পাশে নিয়ে বিছানায় ওর সাথে খেলা করছে আর মাহিয়া ভাবীর সাথে টুকটাক কথা বলছে।

মায়েরা পাশের রুমেই আছে বিশ্রাম নিচ্ছে, সবাই ওতটা পথ জার্নি করে এসেছে তাই তাদের রুমে ঝামেলা করতে কেউ যাচ্ছে না, অর্থ ও হয়ত নিজের স্কুলের হোম ওয়ার্ক করছে আর নাহলে বাবার ফোনে গেমস খেলছে, তার ও শব্দ তেমন শোনা যাচ্ছে না। তাই ঘরের পরিবেশ টা একটু শান্ত।

অর্থি যেমন চুপচাপ মাহিয়া তেমন তার বিপরীত। একটু চটপটে তিনি,, তবে অর্থির শান্ত ভাবটা ভালো লাগে তার।
তাই তো অর্থির সাথে থাকতে তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিট এন্ড ক্লিন একটা উপস্থিতি পাওয়া যায় অর্থির কাছ থেকে, আর কোনো প্রশ্ন করলে উওর গুলো ও আসে একদমই সাধারণ।

তাই কথাবার্তার এক পর্যায়ে মাহিয়া ভাবী তাকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করে বসে;
—”আচ্ছা অর্থি তোমার কি কোনোদিন প্রেম ভালোবাসা এসব হয়েছে! না মানে তোমার মনের মানুষ কি আছে ? থাকলে ভাবী কে কিন্তু বলতে পারো, আমরা আবার দিল খোলা মানুষ। অবশ্যই সাহায্য করবো!

এমন প্রশ্ন সাধারণত অর্থি কারো কাছ থেকেই পায় না,, আর তার বিশেষ ক্লোজ যারা আছে তারা জানে অর্থির জীবনে আর যাই আসুক প্রেম ভালোবাসা এসব কোনোদিন আসেনি। তাই মাহিয়া ভাবীর এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা বিব্রত বোধ করলো অর্থি,, বলতে গেলে একটু লজ্জা পেল। তবু ও বলল;

—” আমার এসব ভালো লাগে না,, আমি কোনোদিন এসব করিনি!

—”ওহহ’ আচ্ছা প্রেম ভালোবাসা করোনি এটা তো মানলাম! কিন্ত পছন্দ হয়েছে কাউকে,,,
একটু থেমে আবার ও বলল —— আচ্ছা বাইরের মানুষ বাদ দাও, মানুষ তো এখন অহরহ কাজিন লাভ পছন্দ করে, ভালোবেসে কাজিন কেই বিয়ে করে। তোমার কি এমন কিছু হয়েছে!

মাহিয়া ভাবীর এমন প্রশ্নে এবার অস্বস্তি হলো অর্থির। সে এসব কোনোদিন কল্পনা ও করেনি,, মেহেদীর কথা বাদই দিলো অর্থি, মেহেদীর ব্যবহার অর্থির একদম পছন্দ নয়, তবে তানভীর, ফারিশ এদের সে নিজ ভাইয়ের মতোই মানে। আর বাকি যারা আছে তাদের সাথে অর্থির তেমন সখ্যতা নেই। তাই অর্থি এবার সরাসরি ই বলল;

—” না ভাবী,, এমন কিছু তো কখনোই নয়, ওদের তো আমি নিজ ভাইয়ের মতোই মনে করি,,

—” ও আচ্ছা,,
মাহিয়া বুঝলো অর্থির অস্বস্তি হচ্ছে তাই আপাতত তাকে এসব ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না, যখন এসব ব্যাপারে কথা বলার প্রয়োজন হবে তখন না হয় সরাসরি কথা বলবে তাই এসব বাদ দিয়ে অন্য টপিক নিয়ে কথা তুলল, আর মাহিয়া ভাবী ই কথা বলল নিপার ব্যাপারে,,

আজকে নিপার ব্যবহার টা ও বলল, সে কেমন ভাব দেখিয়ে চলছে সেটা বলল,, আরো বলল লুবান কেমন করে নিপার কাছে যেতে চাইলো কিন্ত সে কিছুতেই তাকে কোলে নিল না। অর্থি কথা গুলো শুনে শুধু মাথা নাড়ল। সে এসব বিষয়ে কথা বলতে একদমই ইচ্ছুক নয়। আর ওই নিপা কুটনির ব্যাপারে তো একদমই নয়।

তবে মাহিয়া ভাবী এই বিষয় বাদ দিয়ে আরো অনেক কথাই বলল,, অর্থির ভালো লাগে মাঝে মাঝে এমন কথা শুনতে,, সে কথা না বললে কি হবে কথা শোনার মতো মানুষের ও প্রয়োজন বোধ হয় আমাদের সকলের জীবনে দরকার। আর অর্থি তেমনই একজন মানুষ।

অর্থি মাহিয়া ভাবীর কথা গুলো মন দিয়েই শুনছিল, কিন্ত ব্যাঘাত ঘটলো ফোনের নোটিফিকেশনে। অর্থি ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখে না, এবং কি কথা বললে ও লাউড স্পিকারে দিয়ে কথা বলে তাই কথার মাঝে বারবার এমন নোটিফিকেশন পেয়ে বিরক্ত হলো সে,,

ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ফেসবুকে অচেনা আইডি থেকে রিকোয়েস্ট আসছে, এই দুদিনই এমনটা হচ্ছে, সেই সায়েফ আহমেদ আইডি আবারো রিকোয়েস্ট এসেছে। দেখে এমন বিরক্ত লাগলো অর্থির। তাই ফোন টা সাইলেন্ট করে এক পাশে রেখে দিল, আর আবারো মাহিয়া ভাবীর কথা শুনতে লাগলো!

__________

যাত্রার জন্য এসি গাড়ি বুক করেছিল মেহেদী রা,, যেন এই গরমে অসুবিধে না হয়, আর যেটুকু রাস্তা আছে তা যেন আরামে পাড়ি দেওয়া যায়। হাইরোডে গাড়ি আছে তবে রাত বিধায় হর্নের শদ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। নিরিবিলি পরিবেশ, আর দুই রাত জেগে থাকার ফলে মেহেদী, তানভীর এরা ঘুমে লোটপোট। তবে ঘুম নেই মুসাবের চোখে,, সে এক দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে,, তার পাশে অবশ্য সাম্য রয়েছে। সে জানালার পাশে মাথা হেলান দিয়ে আছে, দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। তবে একটু আগেই দেখলো ফোনে কি যেন করছে,, এর মাঝেই ঘুমিয়ে গেল!

তবে মুসাব শব্দ করলো না, সে তার মতোই ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যস্ত। ফোনের স্ক্রিনে দুই তিন টা মেয়ের অবয়ব দেখা যাচ্ছে, মুসাব তা দেখেই মুচকি মুচকি হাসছে। যে স্ক্রিনে অর্থি নামক মেয়েটির অবস্থান ও রয়েছে পরিপূর্ণ ভাবে।

—”তোর মোবাইলে অর্থির ছবি কেন??

পাশ থেকে সাম্যের এমন প্রশ্নে হতচকিত হয়ে যায় মুসাব,, সে ভেবেছিল সাম্য ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু সে যে মুসাবের কান্ড আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে এতক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছিল সে কি মুসাব জানতো। তাই মুসাব ও হেলার সুরে বলল;

—”এই তুই না ঘুমিয়েছিলি, তাহলে আমি কি করছি তা এভাবে লক্ষ্য করছিস কেন!

–'” কথা ঘোরাচ্ছিস,,

মুসাব হাসলো সাম্যের কান্ডে, তাই মুখে হাসি নিয়ে বলল;
—” কথা ঘোরাবো কেন, আর অর্থির ছবি আমার ফোনে থাকলে সমস্যা কি? ওর ছবি কি আমার ফোনে থাকা নিষেধ নাকি!

সাম্য তীক্ষ্ণ নজরে তার দিকে তাকালো,,
—”সমস্যা নেই! তবে তুই না একজনের সাথে রিলেশনে আছিস, আর এর মাঝে আরেকজনের ছবিতে নজর দিচ্ছিস! ব্যাপার টা কেমন না।

—”তুই তো দেখছি সিরিয়াস হয়ে পড়ছিস, কি ব্যাপার বলতো, ছবিতে ও আরো দুজন মেয়ে আছে তোর দেখছি তাদের দিকে খেয়ালই নেই! এই দেখ ভাই অর্থির সাথে যে আছে তাকেই দেখছি আমি!!

তাদের সামনের সিটে মেহেদী আর তানভীর বসে আছে, আর পুরো বাসের লোক এখন ঘুমাচ্ছে,, তাই আস্তে আস্তে ই তারা দুজন কথা বলছে যেন কারো ডিস্টাব না হয়। তবে মুসাব ও উওর দিচ্ছে একদম গা ছাড়া ভাবে।

—” আর তুই এমন রিয়েক্ট করছিস কেন,,,,, তুই কি আর পছন্দ করিস নাকি ওকে, যে ওর ছবির দিকে কেউ তাকাবে আর তোর সহ্য হবে না। আচ্ছা পছন্দ হয়েছে নাকি ওকে!

—” বাজে কথা রাখ!

—”হ্যাঁ বাজে কথাই তো,, আচ্ছা থাক বলবো এসব কথা!! তবে অর্থি ভীষণ মিষ্টি,,, আমার তো বেশ ভালো লেগেছে ওকে। দেখলি না আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কেমন এক্সসেপ্ট করে তাড়াতাড়ি।

বলেই মুসাব হাসলো,, আর মুসাবের কথা শুনে সাম্য দাঁত চেপে বলল;

–”শা’লা প্রেমিকার সাথে তোর ব্রেকআপ করিয়ে দেব,,,,

–” কেউ বলছে না কিন্ত কেমন জানি পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি,,,

মুসাব আবার ও হাসলো, সে গম্ভীর কিন্তু হাসলে মুসাব কে ভারী সুন্দর লাগে,,, আর এই হাসির দেওয়ানা হয়েছিল অর্থির প্রানবান্ধবী ফেরদৌস। মুসাবের প্রোফাইল দেখেই পছন্দ হয়, আর ফোনেই তাদের আলাপ, আর কথা বলার এক পর্যায়ে মুসাবের ও ভালো লাগা কাজ করলো ফেরদৌসের প্রতি। মোবাইলেই যেহেতু পরিচয় তাই মুসাব বিশেষ কিছু জানতো না ফেরদৌসের প্রতি,, তবে ওর একটি ছবিতে অর্থি কে দেখে মুসাবের আগ্রহ আরো বাড়ে।

তাই তো অর্থির থেকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিল, আর এসবের মাঝে খেয়াল করলো মুসাব যতবার অর্থির সাথে কথা বলে সাম্যের চেয়ারায় একটু নির্লিপ্ত ভাব লক্ষ্য করা যায়।
তাই তো মুসাব সাম্যের সাথে একটু মজা নিচ্ছে।

তবে সাম্য মুসাবের কথায় তেমন পাত্তা দিল না, মুসাবের কথার থেকে ও তার অর্থির প্রতি রাগ হচ্ছে। মেয়েটাকে সে তিনবার রিকোয়েস্ট দিয়েছে কিন্ত সে মেয়ে একবার ও এক্সসেপ্ট করেনি।

ওই যে সায়েফ আহমেদ নামের আইডি টি যে সাম্যের নিজের। তাই এবার ও ফোনে অর্থির আইডির দিকে তাকালো,, আর বিরবির করে বলল;

—” নেহাত ওর ছবি গুলো দেব না হলে আমার ঠেকা পড়ছে ওর সাথে ফেসবুকে ফ্রেন্ড হতে,,, হুম।

চলবে।

(আজকের পর্বটি তাদের জন্য যারা সাত পর্ব পড়ে হতাশ হয়েছেন নায়ক কে হবে এটা ভেবে,,, আশা করি বুঝতে পারছেন এখন। আর জানাবেন কেমন হয়েছে,,, না হলে কিন্ত ডিলিট দিবো,, আর আপনারা গল্প পড়ছেন কিন্ত লাইক কমেন্ট না করে এভাবে চলে যাচ্ছেন,,, ভীষণ খারাপ লাগে,,,,

আর একটি বিশেষ নোট,,,,

এই গল্প টা কিন্ত মেইনলি অর্থিকে নিয়ে, ওর পরিবার নিয়ে,,, আর শেষে তার অন্য কিছু নিয়ে,, আশা করি কি বলছি বুঝতে পারছেন,,, তাই সামনের দুই তিন পর্বে অর্থির জীবন নিয়ে লিখবো, ওর ভাবনা কে নিয়ে লিখবো,, রাজি তো,,,

আর পরে অর্থির জীবনে যে প্রেম আসবে তা নিয়ে লিখবো তাই জানাবেন আপনাদের মন্তব্য কী??? আর বেশি বেশি করে লাইক কমেন্ট করবেন প্লিজ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here