কথা_দিল_রোদ্দুর (১১) #তুসিকা

0
3

#কথা_দিল_রোদ্দুর (১১)
#তুসিকা
অর্থি কে হসপিটাল থেকে বাসায় নেওয়ার পর রেবেকা বেগম ডক্টরের কথা মতো তাকে হালকা মসলায় খাবার তৈরি করে দিলেন,, যদি ও অর্থি খেতে চাইলো না, কিন্ত রেবেকা বেগমের চোখ রাঙানিতে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও খাবার টি খেল, যা একদমই ভালো লাগেনি অর্থির।

অর্থির ছোট থেকেই খাবারের তেমন বায়না করতো না, রেবেকা বেগম যখন যা তৈরি করে দিত তাই দিয়ে খুশি মুখে খেয়ে উঠে যেত, কিন্ত অর্থর ছোট থেকেই বায়না থাকতো খাবার নিয়ে,, সে ছোট থেকেই শাক সবজি খাবে না বলে নাক সিটকে নিত,, খাবার নিয়ে অর্থ নানা বাচবিচার থাকতো। বড় হওয়ার পর ও অর্থর এই শাক সবজি খাওয়া নিয়ে রেবেকা বেগমের মাথা ব্যাথার শেষ নেই। কিন্ত অর্থির এসবে কোনো কালেই সমস্যা ছিল না, তার একটু ভালো করে মসলা দিয়ে রান্না করলেই চলতো। তাই আজকে রান্না খেয়ে অর্থির হালকা পেট ভরলেও মন একদমই ভরে নি। তাই রেবেকা বেগম কে করুন স্বরে বলল;

–”আম্মু আজকের তরকারি একটু ও ভালো লাগেনি,, মন ভরেনি একটুও,, আম্মু একটু নুডুলস করে দাও না!

রেবেকা বেগম তখন দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন,, আজ আবার অর্থির ফুফু সুমনা বেগম আসবেন,, তাই নিত্যদিনের থেকে রান্নার পদ একটু বাড়িয়ে রেখেছেন। একা সব কিছু সামাল দিতেই যেন রেবেকা বেগম হিমশিম খাচ্ছেন তার মধ্যে অসুস্থ শরীরে অর্থির এমন কথা শুনে রেবেকা বেগম তেঁতে গেলেন। মেজাজে গলায় বললেন;

—” তরকারি ভালো না লাগলে ও কয়েকদিন এরকম খাবার ই খেতে হবে, তা না হলে আলু সিদ্ধ দিয়ে ভাত খাবি,, পেটে ব্যাথা ঠিক ভাবে না সাড়া পর্যন্ত ওই নুডুলস এর নাম ও যেন মুখে না আসে। আমি কিন্ত তোর জ্বালা আর সহ্য করতে পারবো না।

—” কিছু হবে না আম্মু, একটু করে দাও। একটু খাবো,,

–” তুই ডাক্তার হ্যাঁ! তুই জানিস কিছু হবে কি হবে না, এখনও আরেকটা ডাক্তার দেখানো বাকি, হসপিটাল থেকে ফিরে পারে নি এখন তার বায়না শুরু হয়ে গেছে,, বলি এসব কারনেই তো তোর কোনো গতি হচ্ছে না,,, একটু মেনে শুনে চল দেখবি শরীর সুস্থ থাকবে,,, তোর বয়সী মেয়েদের দেখেছিস এমন ঘন ঘন রোগ ব্যাধি তে ভুগতে, তারা তো নিজের যত্ন রাখে বলে তারা ফিট থাকে সবসময়,, তুই ও চেষ্টা কর!!

সামান্য একটা কথার উওর রেবেকা বেগম যে এত বড় করে দেবে অর্থির জানা ছিল না, কাল কত চিন্তা করছিল, কি সুন্দর তার মাথার পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল,, অসুস্থ ছিল বলে কত টেনশন করছিল আর এখন কত কথা শোনাচ্ছে,, একটু ভালো করেই বললেই তো হতো, অর্থির আবার মন খারাপ হতো না,,

তাই অর্থি মিনমিনে স্বরে বলল;
—” হয়েছে আর বলবো না,, এত কথা না শুনিয়ে তুমি ওই আলু সিদ্ধ ই দিতে, হজম হয়ে যেত,, কিন্ত এই কথা গুলো সহজে তো হজম হবে না আম্মু।

অর্থির মিনমিনে কন্ঠে বলা কথা গুলো রেবেকা বেগমের কান পর্যন্ত পৌছালো না,, তিনি শুনলে নিশ্চয়ই বলতেন—-” হ্যাঁ আমি তো তোদের খারাপ চাই, ইচ্ছে করেই তোদের খাবার তৈরি করে দিচ্ছি না,, সব দোষ আমার! আমি এই সংসারের জন্য এত কিছু করি বলেই তো দাম পাই না।

এসব কথা শুনতে হবে না বলেই অর্থি নিজের মনেই তার কথা গুলো সীমাবদ্ধ রাখলো। বাসায় এখন অর্থি আর রেবেকা বেগম ছাড়া কেউ নেই। জাবের সাহেব গেছে অফিসে, আজ অর্থ স্কুলে যায়নি দেখে সে গেছে খেলতে। বাসায় মা মেয়ে দুজনেই আছে, কিন্ত তাদের কোনোদিন ও সেভাবে বসে গল্পগুজব করা হয়নি,, একে অন্যের কাছে থেকে কোনোদিন সুখ দুঃখের কথা ও বলা হয়নি,, তাই বাসায় দুজনের উপস্থিত ও নিঃসঙ্গ বলেই মনে হচ্ছিল অর্থির কাছে।

আর এমন ভাবে বিছানায় শুয়ে থাকতে ও ইচ্ছে করছে না,, তাই যতক্ষণ না তার ফুফু রা আসবে ততক্ষণ সে না হয় মিষ্টির সাথে একটু সময় কাটিয়ে আসুক। তাই কোনো রকম শরীর স্থির করে রেবেকা বেগম কে বলে মিষ্টি কে নিয়ে এলো তাদের বাসায়। মিষ্টির সাথে থাকতে অর্থির ভালোই লাগে,, মিষ্টি কি সুন্দর করে পাঁকা পাঁকা কথা বলে আর অর্থি তার কথা গুলো মনোযোগ সহকারে শোনে। আর মিষ্টি ও অর্থির রুমে থাকা ডোরেমনের পুতুল গুলো দিয়ে খেলার জন্য তার সাথে চলে আসে।

——-

সে সময় টুকু মিষ্টির সাথে থেকে অর্থির ভালো লাগলো,, ভালো লাগাটা আরো দ্বিগুন হলো যখন তার ফুফু আর যুথি আসলো। যুথি বড় ভাই মানে অর্থির ফুফাতো ভাই মেহেরাজ আসেনি, তার নাকি কাজ পড়ে গেছে,, তাই সুমনা বেগম আর যুথি একাই আসলো।

অর্থি আর যুথি,দুটো তে খুব ভাব! তাই তো যুথি আসা মাত্রই অর্থি কে একেবারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে,, অর্থির অসুস্থতার খবর শুনেই তারা এসেছে, সাথে তার ফুফু সুমনা বেগম অর্থির জন্য তাদের গাছের ডাব, গাছ পাকা আম, আর পুকুরের তাজা মাছ কেটে ধুয়ে একেবারে পরিষ্কার করে নিয়ে এসেছে।

অর্থির ফুফু আবার খুব ভালো মনের মানুষ,, অর্থি যেমন তার বড় খালামনি সাজেদা বেগম কে খুব ভালো পায় তেমনি তার ফুফু সুমনা বেগম কে ও ভীষণ পছন্দ করে। তাই তো যুথির সাথে থেকে এবার ফুফুর গা গেঁসে বসলো অর্থি।

—”দেখেছো চোখ মুখ কোথায় চলে গেছে,, এমন টা কেই করে বল! শরীর খারাপ করলে আগে থেকে সবাই কে বলবি না,,

অর্থি ফুফুর আদর পেয়েছে, তাকে আর পায় কে,,, তবে এবার সে মেহেরাজের কথা জিজ্ঞেস করলো;

—” মেহেরাজ ভাই কেন আসেনি,,

—” তার কাজে পড়েছে তাই আসেনি,,

সুমনা বেগম অর্থির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে এবার রেবেকা বেগম কে বললেন;

—” কি বলতো রেবেকা তুই, মেয়েটাকে একটু দেখে রাখতে পারিস না বল! দেখতো মেয়েটার চোখ দুটোতে খাদ পড়ে গেছে।

—” আপা ও কি আর ছোট বলেন, এমন মেয়ে তো নিজের যত্ন নিজেই নিতে পারে। আমি আর কত দিক সামলাবো বলেন।

—” মেয়ে মানুষ হলো পরা ধন, এখন এমন করে বলছিস, পরে যখন পরের ঘরে যাবে তখন বুঝবি, মেয়ে ছাড়া মায়ের জীবন কতটা খালি!

রেবেকা বেগম অর্থির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিলেন,,,

—” আচ্ছা রাখো তোমাদের এসব ইমোশনাল কথা,, আয় অর্থি রুমে চল, আমার ফোনে চার্জ দিতে হবে।

এই বলে যুথি অর্থিকে নিয়ে সেখান থেকে রুমে চলে গেল। মিষ্টি এখনো অর্থির পুতুল গুলো দিয়েই খেলছে,, যুথি আসায় তার কোনো ধ্যান হলো না,, যুথি ও নিজের ফোন চার্জ দিয়ে এবার অর্থির ফোনটা চাইলো;

—’কেন!

—” দে কাজ আছে,, আনিসের সাথে আবার ঝগড়া হয়েছে তাই , ব্লক দিয়েছে শয়তান বেডা আমাকে, এখন তোর ফোন দিয়ে মেসেজ দিয়ে দেখি কি বলে!

—”আমার আইডি ও তো চেনে, আমি তো মেসেজ দিই না, এখন মেসেজ দিলেই বুঝবে তুই দিয়েছিস!

—”বুঝবে না, আমি বলিনি এখানে আসবো যে!!
এই বলেই যুথি অর্থির ফোনটা নিল,, আনিসের আইডিতে মেসেজ দিল, কিন্ত সে ব্যাক্তি অনলাইনে নেই, তাই যুথি মন খারাপ করে অর্থির ফোন টা দেখতে লাগলো,, সাথে সব ঘেটে ঘুটে নজরে আসলো মেসেজ রিকোয়েস্ট এ।

—” কি রে অর্থি এই সায়েফ আহমেদ লোকটা কে, তোকে এতবার মেসেজ দিয়েছে।

—”নোটিফিকেশন অফ রেখেছি দেখে বুঝতে পারি নি হয়ত। আর আমি চিনি না তো!

–”আচ্ছা দেখি কি দিয়েছে! এই বলেই যুথি আইডিতে মেসেজ গুলো দেখলো,, কিছু মেসেজ পাঠানো আর ছবি দেওয়া আছে।

–” কিরে তোর ছবি লোকটার কাছে!! লোকটা তোর ছবি কোথায় পেয়েছে। ব্যাপার কি বলতো অর্থি!

অর্থি চকিত হয়ে ফোন খানা হাতে নিল,, দেখলো আইডিটি,, প্রথম যেদিন মেসেজ এসেছে সেদিন রাতে মেসেজ না দেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাই তার খেয়াল নেই। কিন্ত এখন সবটা দেখে আর সাম্য নাম দিয়ে পরিচয় দেওয়ায় চিনতে পেরেছে এটা মেহেদী ভাইয়ের ওই ফ্রেন্ড টা। তাদের বাসায় ও এসেছে। এবার ভালো করেই মস্তিষ্কে বিষয়টা ধারন করলো অর্থির।

—” উনি তো মেহেদী ভাইয়ের ফ্রেন্ড।

—” ওনার কাছে তোর ছবি কেন!

—” আরে তিশা আপুর হলুদের দিন ফাহা সাথে তুলেছিলাম যে ওগুলো,, কিন্ত আমার আইডি উনি কোথায় পেল, আমি তো দেই নি!

—” হুম দাল ম্যে কুচ কালা হ্যে !

—” কি বলছিস,, আমি তো এসব কিছু জানি ই না,,, আর এমন করে কেন বলছিস বলতো!

—” আরে ক্ষেপছিস কেন,, আমি তো এমনিতেই বলছি,, আচ্ছা বাদ দে,, তবে ছবি কিন্ত লোকটা সুন্দর তুলেছে, দেখ তোকে কি ভালো লাগছে। একটা ধন্যবাদ দিস!

অর্থি দেখলো ছবিটা,, সুন্দর হয়েছে, তবে সাম্য নামটা মাথায় আসতে তার ওই নির্লিপ্ত, কুঁচকে যাওয়া কপাল আর গম্ভীর চোখ দুটোই ভেসে উঠলো সর্বপ্রথম। কি সেই কুঁচকানো নজর,, অর্থির তো এখনো মনে আছে সেই চাহনি।

__________

যুথিরা ছিল অর্থিদের বাসায় দুই দিন,, আর এই দুদিনে যেন চাঁদের হাট বসেছিল অর্থিদের বাসায়। অর্থির চুপচাপ স্বভাব, যুথি আর অর্থের কলকলানিতে যেন মেতে ছিল তাদের বাসাটা। অর্থির ও অসুস্থতার বিষয়টা যেন একেবারে ভুলে গেল সে। কিন্ত ওই যে বাসা থেকে মেহমান রা বিদায় নিলেন অর্থির মন খারাপ হয়ে যায়, যুথিরা যাওয়ার পরে তেমন টাই হলো,,

প্রতিবারের ন্যায় এবার ও যুথি আর সে রাত জেগে মুভি দেখলো,, অর্থ ও তাদের সাথে থাকবে বলে বায়না ধরলে রেবেকা বেগম তাকে ধমক দিয়ে ঘুম পাড়ায়, আর অর্থিদের ও বলে রাত না জেগে যেন ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্ত কে শুনবে কার কথা তাই রাত জেগে জেগে দুদিনে কত কথা বলেছে দুটো মিলে,, অর্থির সিক্রেট কথা নেই, তাই সে শুধু যুথির কথা শুনেছে।

এসব ভেবে যুথিরা চলে যাওয়া তে অর্থির আবারো মন খারাপ হলো,, কেমন যেন পরাণ পড়ছে তাদের জন্য। তাই রেবেকা বেগমের সামনে গিয়ে বলল;

—” আম্মু! আচ্ছা এবার পরীক্ষার পর আমি ফুফুর বাড়িতে যাবো কেমন!

রেবেকা বেগম কিছু বললেন না,

—” কি হলো আম্মু!

রেবেকা বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বললেন;
—” পরে দেখা যাবে, আর এখন ডক্টর কখন দেখাবো সে চিন্তা কর! হসপিটালের ডাক্তার বলেছে তিন চার দিন পর যেন গা’ইনী ডাক্তার দেখাই,, সে খেয়াল কি আছে।

অর্থির নাক মুখ কুচকে এলো, তার এসব ডাক্তার, ঔষধ এসব একদম ভালো লাগে না,, তাই সে বলল;
—” কেন আম্মু! আমি তো এখন সুস্থ আছি,, পরে দেখাবো!

—” না না,, এসব বিষয়ে হেলা ফেলা করলে চলবে না,, আমি ডাক্তারের সিরিয়াল দিয়েছি বিকেলে ডাক্তার দেখাতে যাবে।

—” এইই… আমি যাবো না,,, ওখানে ডাক্তার কে নিজের সমস্যা নিজেকে বলতে হয়।

অর্থির কথায় রেবেকা বেগমের এবার রাগ হলো,,
—”পেট ব্যাথায় কাতর হলে কষ্ট কি আমি করবো। আর মুখ নেই তোর! তোর কি কি সমস্যা ওটাই কি মানুষে বলে দেবে বল!

—” না আমি যাবো না,,,

–”‘ সিরিয়াল দিয়েছি এখন যেতে হবেই। তোর বাবা ওতো গুলো টাকা দিয়ে সিরিয়াল কেটে এসেছে না গেলে কিভাবে হবে।

ব্যস আর কি,, কত করে অর্থি বলল সে যাবে না,, তবু ও রেবেকা বেগমের চিল্লাচিল্লি খেয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই গেল আবারো ও ডাক্তারের কাছে।

চলবে।

আচ্ছা বলুন তো কিসের আভাস বইছে,,, আচ্ছা থাক ওসব,, এখন বলুন আপনারা মাশাল্লাহ কত বেশি মানুষ গল্প পড়েন অথচ লাইক কমেন্ট কিছু করেন না কেন,, আপনারা জানেন আপনাদের কমেন্ট দেখলে কি যে খুশি লাগে,,,

তাই ৪০০+ রিয়েক্ট তো করে দিন,,, আর বেশি বেশি করে কমেন্ট করুন,,, তাহলে গল্প সবার কাছে পৌছাবে,, প্লিজ এই ছোট অনুরোধ টি রাখুন,,

আর জানেন বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে,, এসবের জুটঝামেলার মাঝে গল্প দিচ্ছি,,হায়! আর জানেন বাকি গল্প চলমান দুটো গল্প লিখতে আমার তিন চার লেগে যায়, কিন্ত আপনাদের অধিক ভালবাসায় এই গল্প চার ঘন্টার মাঝে লিখছি,, মাশাল্লাহ!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here